পর্ব-২৭
কাহেরে ঘিনি মেলি অচ্ছহু কীস।/ বেঢ়িল হাক পড়অ চৌদীস।।/ অপণা মাংসে হরিণা বৈরি।/ খনহ ন ছাড়অ ভুসুক অহেরি।।/ তিণ ন চ্ছু পই হরিণা পিবই ন পানী।/ হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জাণী।।/ হরিণী বোলঅ হরিণা সুহ হরিআ তো। /এ বণ চ্ছড়ী হোহু ভান্তো।।/ তরঙ্গেতে হরিণার খুর ন দীসঅ।/ ভুসুক ভণই মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ।।
[চর্যাপদ, চর্যা নং---৬, রাগ: পটমঞ্জরী, ভুসুকপাদ
‘এই পাণ্ডুলিপি লইয়া আমি কী করিব?’—সত্যি সত্যি আমি মুসিবতে পড়লাম। আমার উপন্যাস লেখার শুরু থেকে বা ‘আজকের কাগজ তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কারের’ জন্য জমা দেয়া পর্যন্ত—যা কিছু ঘটেছিল সবই আমি সেলিনা আপাকে [সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন জানিয়ে ছিলাম। পূর্বেই বহুবার বলেছি, আপা আমাকে কন্যাসম স্নেহ করেন। কোনো কিছুর সাথেই সে স্নেহের কোনো তুলনা হয় না।
সিঁদুরে মেঘ দেখলেও আমি যে ভয় পাব, সেটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা।
এখন আমার এই অপ্রকাশিত উপন্যাসের গতিক কী হবে—এই ভাবনা সেলিনা আপাকেও ভাবিয়ে তুলল। আপা বরাবরই আন্তরিক ও আমার যে কোনো সমস্যাই নিজের সমস্যা বলেই গণ্য করেছেন। তখন ফেব্রুয়ারি মাস ম্যালা দূর, সেজন্য বইয়ের ভাবনা পরে ভাবা যাবে, তার আগে এই উপন্যাস কোথাও না কোথাও প্রকাশ করা দরকার। এ বিষয়ে আমিও যেমন ভাবছিলাম, আপাও আমার মতো করেই ভাবছিলেন। আমরা দুইজনই একইরকমভাবে চিন্তিত ছিলাম। [অবশ্য চিন্তার কথাই, উপন্যাসের থিম চুরি হয়ে গেলে শেষে আমিই কিনা নকলের অভিযোগে অভিযুক্ত হবো।
আপা অনেক ভেবেচিন্তে আমাকে বললেন যে—
পাপড়ি, সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকা তো বেশ ভালো মানের ঈদসংখ্যা করে, তুমি ওদের এই পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে আসো। দেখ ওরা কী বলে?
আমিও বাসায় এসে সাপ্তাহিক ২০০০-এর ঠিকানা বের করে নোটপ্যাডে টুকে নিলাম আর পাণ্ডুলিপি স্পাইরাল বাইন্ডিং করতে দিলাম।
নানা সময়ে নানা রকম বাতিকে আমি আক্রান্ত হয়েছি। তন্মধ্যে একটা বাতিক ছিল বর্ষাকাল এলেই নীল রঙের শাড়ি পরা। তাও আবার যেইসেই শাড়ি নয়, বেইলি রোডে গিয়ে আট/দশটা বুটিক শপ ঘুরে বেছে বেছে কেনা শাড়ি। বা ‘বাংলার মেলা’ ‘কে ক্রাফট’ ‘রঙ’ ‘অঞ্জনস’ এইসব বুটিক শপের বেশির ভাগ নীল শাড়িই আমার সংগ্রহে থাকত। [শাড়ির বিষয় কেন আনলাম সেটা একটু পরেই বলছি।
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘভাসা আসমান দেখতে দেখতে আমি চললাম ২০০০-এর অফিসে। যেহেতু আষাঢ় মাস, বর্ষাবরণ হেতু আমার পরনে রাধানীল শাড়ি [টাংগাইল শাড়ি কুটির থেকে কেনা। কপালে নীল টিপ আর খোঁপায় বেলফুলের মালা। [আহা! কী দারুণ সুবাসিত এক তরুণীই না ছিলাম আমি! মনে কিঞ্চিৎ ভয়, শঙ্কা আর অস্বস্তি। না জানি এইবার এই উপন্যাসের কপালে ফের কোনো অঘটন জোটে? ওই যে বিধি আমার চিরকালই বামেই থাকে, ডানদিকে সে কোনোদিনই সামান্যও কভু নাহি হেলে!
‘বিধি বামের’ চিন্তাটাও মনের ভেতর কুরে কুরে খাচ্ছিল। কারণ তার আগে তো বহুবারই আমার বইঘর বহুবারই পুড়েছিল—এখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেও আমি যে ভয় পাব, সেটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা।
বহু খুঁজে হয়রান পেরেশান হয়ে আমি ২০০০-এর অফিসে পৌঁছালাম। [আমার ভৌগোলিক জ্ঞান একেবারে অন্ধের পর্যায়ে। আমি কোনো স্থান বা অফিস বা কারো বাড়ি চিনতে পারি না। চিনতে চাইও না, আমার হিসাব—ঠিকানা জানা থাকলে চীনদেশেও পৌঁছে যাওয়া কোনো বিষয়ই নয়
ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে বিকেলের প্রান্তে। কিন্তু সেইদিনের বিকেল কেন জানি বড় বেশি নিষ্প্রভ। সমস্ত আকাশ ঢেকে আছে রাশি রাশি ধুমল মেঘে। ওইসব মেঘেরা গিলে ফেলেছে আলোর কণা। অন্যান্য দিনের তুলনায় ওইদিনের বিকেলে ম্লানিমা যেন গাঢ় হয়ে আসন্ন রাত্রির কন্দরে মিশে গিয়েছে! যথারীতি আমি ভীরু পায়ে সম্পাদকের রুমের দিকে এগুলাম। আজকের কাগজের ওই ঘটনা আমাকে সত্যি সত্যিই আহত করেছিল, এক্ষণে ফের আর কী অপেক্ষা করছে আমার জন্য, একমাত্র ঈশ্বরই মালুম।
আমি সম্পাদকের রুমে ঢুকে সালাম দিয়ে বললাম,
সেলিনা আপা আমাকে পাঠিয়েছেন।
সম্পাদকের দৃষ্টি টেবিলে রাখা স্তূপ কাগজের দিকে। আমার দিকে চোখ না তুলেই বললেন—
আপনি বসুন।
আমি ভয়ে-সঙ্কোচে জড়সড় হয়ে বসলাম উনার সামনে রাখা একটা চেয়ারে।
উনি একসময় মুখ তুললেন। চশমার কাচের ভেতর দিয়ে আমাকে দেখেই যেন খানিকটা চমকে উঠলেন। [আমার দেখার বা বোঝার ভুল হতে পারে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন—
বলুন কী বিষয়?
আমার গলা দিয়ে যেন স্বর ফুটে বেরুতে চায় না। তবুও কোনো রকমে বলতে পারলাম—
আমার একটা অপ্রকাশিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছি। আপনারা যদি আপনাদের ঈদসংখ্যায় ছেপে দিতেন।
উনি ধীর ও গম্ভীর কন্ঠে বললেন—
আচ্ছা রেখে যান। আমি দেখছি।
আমি আগের মতোই ভয় আর সঙ্কোচ নিয়ে পত্রিকা অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম।
আপনাকে না অমুককে একটু কনভিন্স করতে হবে।
দিন চারেক বাদে একদিন রাত্রি আটটা কি নয়টার দিকে বাসার টি অ্যান্ড টি ফোনটা মিষ্টি টোনে বেজে উঠল। ওই যে বিধি আমার বামপন্থী—যার ফলে ফোন ধরব তো আমিই! ফোনে অপর প্রান্তে এক অচেনা পুরুষ কণ্ঠ বলল—
আমি সাপ্তাহিক ২০০০ থেকে বলছি। আপনার পান্ডুলিপিটা আমরা পড়েছি। আমাদের বিবেচনার এটা ঈদসংখ্যার জন্য মনোনীত হয়েছে।
আমি ও আচ্ছা, ও আচ্ছা বলে বলে শুনে যাচ্ছিলাম।
সহসা উনি বলতে লাগলেন—
দেখুন উপন্যাসটা আমরা ছাপব, কিন্তু আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।
আমি বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলাম—
কী কাজ?
উনি একটু থেমে বললেন—
আপনাকে না অমুককে একটু কনভিন্স করতে হবে।
এই ‘কনভিন্স’ শব্দটা শুনে মুহূর্তে আমি রেগে আগুন হয়ে গেলাম। আমার সারা শরীর ক্ষোভে ফেটে পড়তে লাগল।
আমি চিৎকার করে বললাম—
হোয়াট ড্যু ইয়ু মিন বাই কনভিন্স? আপনি কান খুলে শুনুন, আমার উপন্যাস ছাপা আপনারা বন্ধ রাখুন। বন্ধ রাখুন। আর কান খুলে শুনে রাখুন বান্দরবান থেকে যে লিটলম্যাগ বের হয়, সেখানে ছাপব আমি আমার উপন্যাস। বদমাইশি করার আর জায়গা পান না, তাই না?
উনি ততক্ষণে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে হাওয়া। আমি আর কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না!
আমি রিসিভার নামিয়ে রেখেই সেলিনা আপার বাসার নাম্বারে ডায়াল করলাম। কিন্তু আপাকে ফোনে পেলাম না। কিন্তু তুমুল রাগে গজগজ করে আমি বাসার বাসিন্দাদের মাথা খেয়ে ফেলতে লাগলাম।
সেলিনা আপাকে পেলাম রাত ১২টার পরে। খুলে বললাম বিস্তারিত। আপা শান্তভাবে সব শুনলেন। শুনেটুনে বললেন—
পাপড়ি কী বলছ! আমি তো ভাবতেই পারছি না অমুক এমন! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। কী সব অবিশ্বাস্য কাণ্ড!
আমি বললাম—
আপা, আমিই কী ভেবেছি যে উনি এমন?
আপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
পাপড়ি, এত রূপের মূল্য দাও এইবার।
আমি চেঁচিয়ে বললাম—
আপা, এক পয়সাও দেবো না। কোনোদিন দেই নি। কোনোদিনই দেবো না। আপনি দোয়া করবেন যেন দিতে না হয় । আমি রূপ বা অর্থের বিনিময় করে কোনোদিন লেখক হব না।
আপার যে কত ধৈর্য! আর আমার প্রতি কত যে উনি স্নেহশীল হলে আমার চিৎকার আপা চুপচাপ শুনে যেতে লাগলেন।
আমি তো এইগুলা করে যেতে লাগলাম, এদিকে তার পরদিন থেকে রাত ঘন হয়ে উঠলেই ফোন আসতে লাগল। আমি রিসিভার তুলি ঠিকই, অপর প্রান্তে কেউ কথা বলে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ ভেসে আসে শুধু। কোনো কোনো রাতে ফিসফিসিয়ে কী যেন বলে! আমি ধমক দিয়ে বলি—
কে আপনি? খেয়েদেয়ে কাজ পান না না? ফোন করেন কি আমার গলার স্বর শোনার জন্যে?
রোজ ফোন আসতে লাগল। আমিও বিরক্ত হয়ে আমার পার্টনারকে দিয়ে কল রিসিভ করাতে লাগলাম। একদিন পার্টনার ঘুমিয়ে পড়াতে আমিই ধরলাম।
ঘ্যাসে ঘ্যাসে গলায় কে যেন বলল—
তুমি এত সুন্দরী কেন?
আমি বললাম—
বদমাইশির আর জায়গা পান না না? থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলে দেবো।
বলে আমি ফোন কেটে দিলাম।
এরপর উপদ্রব থেকে বাঁচতে আমি ফোনের রিংটোন লো করে রেখে ঘুমিয়ে যেতাম।
ইতোমধ্যে ঈদ সন্নিকটে। প্রতিটা ‘ঈদসংখ্যা‘ বাজারে এসে গেল।
দুই-চারটা বড় হাউসের পত্রিকার একচেটিয়া মোড়লিপনার দিন শেষ হয়ে আসছে! তাঁদের পতনও অনিবার্য।
আমি একদিন বাংলা একাডেমিতে গেলাম কী এক কাজে যেন। সেলিনা আপার টেবিলে রাখা ‘ঈদসংখ্যার’ স্তূপ। আপা সাপ্তাহিক ২০০০-এর ঢাউস সংখ্যাটি আমাকে দেখিয়ে অত্যন্ত মন খারাপ করতে লাগলেন। বললেন,
পাপড়ি তোমার উপন্যাসটা ছাপা হলো না।
আমি বললাম—
না হোক, তাতে কী আপা?
বলে আমি হাসতে লাগলাম। কিন্তু আপা হাসলেন না। আগের মতোই বিষণ্ন হয়ে বসে রইলেন।
[আহা! জীবন চলিয়া গেছে কুড়ি কুড়ি বছরের পার! আজ আমি খোঁজই রাখি না কোথায় কত শত ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয় বা হলো! তাঁরা আমার লেখা ছাপল কী ছাপল না? অনেক ঈদসংখ্যায় লেখার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেই, আমার হাতে কোনো লেখা থাকে না বলে। কোনো কিছুই আজ আর আমাকে স্পর্শ করে না। দুঃখী করার প্রশ্নই ওঠে না! আর এখন তো সাহিত্যের জোয়ারের-কাল। দুই-চারটা বড় হাউসের পত্রিকার একচেটিয়া মোড়লিপনার দিন শেষ হয়ে আসছে! তাঁদের পতনও অনিবার্য
কাকে গ্রহণ করে ছেড়ে আছ (বা আছি) কিসে, আমাকে ঘিরে চারদিকে হাঁক পড়ছে। নিজের মাংসের জন্যই হরিণ নিজের শত্রু। ক্ষণমাত্রও ভুসুকু শিকারি ছুড়ে না। হরিণ তৃণ স্পর্শ করে না (বা দাঁতে কাটে না), সে জলও ছোঁয় না, হরিণ হরিণীর নিবাস কোথায় তা জানে না। হরিণ হরিণকে বলছে—ও হরিণ, তুই শোন তো,—এই বন ছেড়ে তুই ভ্রান্ত হ (দূরে চলে যা)। তরঙ্গে তরঙ্গে (হরিণের গতি যেন ঢেউ তুলে তুলে ছোটার মতো, তাই তার দৌড়ানোকে বলা হচ্ছে তরঙ্গে তরঙ্গে) হরিণের খুর দেখা যায় না। ভুসুকু বলেছেন—মূঢ়ের হৃদয়ে (এই তত্ত্ব) প্রবেশ করে না।।
[আধুনিক বাংলায় রূপান্তর, চর্যা-৬, ভুসুকপাদ, চর্যাপদ