পর্ব-২৬
পুরস্কার নামক সোনারহরিণের পেছনে আমি তেমন করে কখনই ছুটে যাই নাই। বা তেমন করে লালায়িতও হই নাই। বরাবরই পুরস্কার আমি পেতে চেয়েছি টাকাপয়সার জন্য। কারণ টাকাপয়সার টানাটানিতে আমাকে আগাগোড়াই থাকতে হয়েছে। নিজে চলার মতো টাকা বা হাতখরচের টাকা বা এমনকি নিজের মোবাইল ফোনের খরচের টাকা বা প্রয়োজনীয় বা শৌখিন কিছু কেনার শখ হলে—তার জন্য যে টাকা দরকার, সে টাকা আমাকেই বহু কষ্ট করে উপার্জন করতে হয়েছে। এদিকে আমি লেখালেখিকে বাণিজ্যিক খাতেও ব্যবহার করতে পারি নাই। শুধুমাত্র টাকার জন্যই লিখব—এ বিষয়েও নিজের সাথে আপস করতে পারি নাই কোনোদিনই। আমার অবস্থা চিরকালই শাঁখের করাতের অনুরূপ, নিজের লেখাকে বাণিজ্যকরণ করতে পারি না, আবার হাতে টাকাপয়সাও একেবারেই নাই।
কিন্তু নিজে চলার মতো টাকাপয়সা হাতে না-থাকলে শুধু লেখা কেন, কোনো কিছুই ঠিকভাবে করা যায় না বোধহয়।
ভার্জিনিয়া উলফের ওই কথাটা তো সর্বজন বিদিত, ভালো লিখতে হলে নিজের একটা ঘর থাকা চাই। আর নিজস্ব কিছু টাকা থাকা চাই। নইলে লেখালেখির মতো সুকুমার-বৃত্তি কন্টিনিউ করা ইম্পসিবল। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে।
‘A woman must have money and a room of her own if she is to write fiction.’
তোমাকে এরা কোনোদিনই সেইরকম প্ল্যাটফর্ম দেবেই না। পুরস্কার দেবে এটা তুমি ভাবলে কী করে?
আমার হাতে কিছু টাকা থাকলে আমি নিশ্চিন্তে লিখতে পারব—এই চিন্তা থেকেই পুরস্কার পেতে চেয়েছি। পুরস্কার পেতে চেয়েছি, কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পথঘাট চিনি নাই। পুরস্কারের জুয়ার আসরে তুখোড়-খেলোয়াড় হতে পারি নাই আমি কোনোদিনই। খেলা না-শিখেও দুই/চারবার তবুও চেষ্টা করেছিলাম। সেই চেষ্টার কথাই বলব বলে এতসব গৌরচন্দ্রিকা করলাম।
দৈনিক আজকের কাগজ ২০০০ সাল থেকে ‘তরুণ লেখকদের’ জন্য এক সাহিত্যপুরস্কারের আয়োজন করে আসছিল। [যা এখন জেমকন নামে চালু আছে পুরস্কারের টাকার মান ২৫,০০০ টাকা। তাছাড়া আরেকটা সুবিধা তাঁরা দিচ্ছিল, পুরস্কারপ্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি বই আকারে প্রকাশের দায়িত্বও আজকের কাগজই নেবে। এঁরা পুরস্কার দিচ্ছিল অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির জন্য। তো আমিও কোমর বেঁধে লাগলাম যে ওই একথোক টাকা আমাকে পেতেই হবে। টাকাটা পেলে নিজের কিছু টাকা মিলিয়ে ব্যাংকে রেখে দেবো। ওই টাকা থেকে অল্প অল্প খরচ করব আর দুই হাত খুলে কেবল লিখব। নিজে চলার মতো টাকার চিন্তা যেন আমাকে আর করতে না-হয়। পুরস্কার পাওয়ার জন্য লিখতে তো চাইছি—কিন্তু আমার স্বভাবের খুঁতখুঁতানির জন্যও যা-তা কিছু তো আমি লিখতে পারি না। পারবও না। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে লিখলাম আমার প্রথম উপন্যাস পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ। এবং যেহেতু শামীম রেজাকে সর্বদাই বন্ধু জ্ঞান করেছি, মনে মনে ভাবলাম ওই একথোক টাকা আমি হয়তো পেয়েও যেতে পারি। [নিজের লেখাপত্র নিয়ে কিঞ্চিৎ ধারণা রাখি বলে ভেবেছিলাম—ওই পুরস্কারের টাকা পাওয়া থেকে এবার কেউ আর আমাকে ঠেকাতে পারবে না!
কিন্তু কথায় বলে না লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু! [আরে কত শত মহাপাপী কতকিছু করে পার পেয়ে যাচ্ছে, আর আমি কষ্ট করে লিখে, নিজের সামান্য-মেধার বিনিময়ে, নিজে চলার জন্য সুপথে কিছু টাকাই তো পেতে চেয়েছি। চুরি-ডাকাতি-ব্যাভিচার-ব্যাংকলুট-রাহাজানি-খুন-গুমের মতো পাপ তো আমি করি নাই। তাও কিনা এত স্বল্প-পাপেই আমার মরণ হয়! পাপ আমার যেটা ছিল, তা হলো নিজের একটা প্রতিশ্রুতিশীল উপন্যাসের চৌদ্দটা বাজানো। কারণ আজকের কাগজের ডিমান্ড ছিল আটফর্মার বেশি কিছুতেই লেখা যাবে না। এখন আমি ওই ফর্মা হিসেব করতে গিয়ে নিজের লেখার চৌদ্দ দুগুনে একেবারে আটাশ বাজিয়ে ছাড়লাম। [ওই অভিজ্ঞতার পর নাকে খত দিয়ে তওবা করেছি, যে যাই আবদার করুক না কেন, হোক তা কোটি টাকার মামলা স্যরি পুরস্কার, আমার লেখা যতটা স্পেস চাইবে, আমি তাই দিব। কোনো অবস্থাতেই নিজের লেখার আটাশ বাজানো যাবে না।
এখন এত সব চরিত্রদের জীবন্ত করে তাদের কিছুকাল বাঁচতে না দিয়েই মেরে ফেলতে হলো। এই যে নিজের লেখার প্রতি এমন ভয়ানক অবিচার আমি করলাম তার বিনিময়ে আমার ভাগ্যে কী জুটেছিল? জুটেছিল শূন্য এবং শূন্য। আহা! শুভঙ্করের ফাঁকি আমি শিখি নাই যে! সেটা খুব সম্ভবত ২০০৩ সালের ঘটনা। [এতদিন পর সালটা সঠিক মনে নাই।
তো বিধি আমার সদা বামেই থাকে, তা অন্দর কী মামলা হোক বা বাহার কী মামলা হোক! আমার বিধি বামের কারণে ওই বছর ‘আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কার’ অঘোষিত থেকে যায়। কিন্তু তার পরের বছরই আরেকজন নারীলেখককে বেশ ব্যান্ড-বরাত বাজিয়ে পুরস্কৃত করা হয়! এইসব দেখেশুনেবুঝে আমাদের এক অগ্রজ লেখক আমাকে তখন বলেছিলেন যে, বুঝলা না পাপড়ি, তোমার বইকে প্রমোট করলে তো বিপদ! তখন অমুক লেখিকার বইটার সাথে তোমার বইকেও গুরুত্ব দিতে হয় । অমুককে ওঠাবে বলেই তোমাকে ইচ্ছে করে ডাউন রাখা হলো। অমুককে সাহিত্যিক-তকমা দেবে বলে এরা আটঘাট বেঁধেই নেমেছে। তোমাকে এরা কোনোদিনই সেইরকম প্ল্যাটফর্ম দেবেই না। পুরস্কার দেবে এটা তুমি ভাবলে কী করে?
শুনে আমি চুপ করে রইলাম। কী বলব আমি এর উত্তরে? কী জবাবই-বা আছে আমার কাছে? বা ছিল? মনে মনে শুধু ভেবেছিলাম, হায়-রে! সাহিত্যের রাজনীতি!
বিধি আমার বামেই থাকে, কিছুতে তা ডানদিকে হেলে না। একথাটা অবশ্য বন্ধুপ্রতীম কবি শামীম রেজাও আমাকে বলে—দেখো ভাগ্য বলেও একটা ব্যাপার আছে না? তোমার ভাগ্যটা সত্যিই খারাপ।
আহহা, আমি তো তা জানিই। সেটা সেই গত দুদশক ধরেই তো দেখছি—
পোড়া নদীরস্বপ্নপুরাণ, বয়ন পার হয়ে সম্প্রতি নদীধারা আবাসিক এলাকা পর্যন্ত আমার ভাগ্যে শনির অবস্থান বড় নির্মম! বড় নড়নচড়নহীন! ভাবছি কোনো জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে পাথরটাথর বা তাবিজকবজ পরে বা জড়িবুটি খেয়ে এই শনির দশাকে কাটানোর চেষ্টা করা দরকার। কিন্তু ‘সাহিত্য-পুরস্কার-পাওয়ার-তদবির’ এরকম কোনো বিজ্ঞাপন কোথাও দেখছি না বলে যেতেও পারছি না। দেখলেই জ্যোতিষ-বাবার থানে গিয়ে একেবারে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকব। বলব—বাবা, আমার ভাগ্য ফেরাও। কিছু টাকাকড়ির মুখ ইহজীবনে দেখতে দাও, প্লিজ, বাবা আআ।
আজকের কাগজ, যা বর্তমানে জেমকন—এঁরা তবুও তো মীনগোত্রীয় প্রাণী নন বা ততোটা চোখের পর্দাহীন তাঁরা নন। তাঁরা যে আমার মতো চুনোপুটি-সাহিত্যিককে মাঝেসাঝেই স্মরণে রেখে তাঁদের পুরস্কারের শর্ট লিস্টিতে স্থান দেন—সেজন্য আমি তাঁদের প্রতি সত্যি সত্যিই শুকরিয়া জানাই। এঁরা তো তাও আমাকে মনে করে, আমার বইটা যে মানসম্মত বই—এটা তাঁরা ঘুরিয়েপেঁচিয়ে হলেও বলে। এখন বাদবাকি অন্যেরা তাহলে কী করে? অন্যান্য পত্রিকা বা বড়বড়-পুরস্কারদেনেওয়ালারা? আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হয়ে ওঠে নাই বা সম্ভব হয়ে উঠবার কোনো সম্ভাবনাও নাই—কোনো সম্পাদকের দুয়ারে গিয়ে ধন্না নিয়ে পড়ে থাকা। বা কারো কাছ থেকে প্রেম-পীরিতির মায়াজাল বিস্তার করে কিছু বাগিয়ে নেয়া [প্রেমের বয়স অবশ্য ভাটির দিকে গড়িয়ে গিয়েছে বহু আগেই। আগামী একশ বছরেও যদি আমার লেখা কোথাও ছাপা না-হয়, তবুও নয়।
জেমকন বা শামীম রেজার কথা উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে, আমি তাঁদের বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছি। এখানে শামীমের দোষই কী বা কতটুকু? শামীমকেও হয়তো কারো না কারো মন রেখে চলতে হয়। হয়তো অনেক রকম প্রোটোকলের মাঝ দিয়ে তাকেও যেতে হয়। নানান দিকের চাপে হয়তো তাকেও থাকতে হয় । আর শামীমের একক সিদ্ধান্তে কিছু ঘটে বলেও আমার মনে হয় না।
পুরস্কারের জন্য লেখক নিজে বই জমা দেবে—এই বিষয়টা আমার কাছে চূড়ান্ত রকমের ন্যাক্কারজনক লাগে। কিন্তু এই পোড়ার দেশে কেই-বা আমার বা আপনার কথা অন্যদের বলবে? কেনই-বা বলবে? কেই-বা কোনো লেখকের ভালো বইটা বড় সাধ করে জমা দেবে? এ দায়িত্বটি প্রকাশকেরা নিতে পারে। প্রকাশক নিলেই শোভন দেখায়। এতে করে আর কিছু না হোক, লেখকের সম্মানটা কিঞ্চিৎ বাঁচে ।
শিল্পের জন্য, সাহিত্যের জন্য বন্ধন-মুক্তি জরুরি বলে মনে করি।
পুরস্কার প্রাপ্তির লোভে আমি এ যাবৎকালে আমার বই শুধুমাত্র দুইবার জমা দিয়েছিলাম। ২০০৮ সালে উপন্যাস ‘বয়ন’ জমা দিয়েছিলাম ‘দৈনিক প্রথম আলোতে’। আর তারও বহু পরে ২০১৬ তে ‘দৈনিক সমকালে’। ২০১৬ তে আমার দুইটা বই প্রকাশিত হয়েছিল। একটা স্মৃতিগদ্য মায়াপারাবার। অন্যটি গল্পগ্রন্থ শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প। এখন সেসব ভাবলেও লজ্জায়-অপমানে একেবারে কুঁকড়ে যাই। আর বয়ন উপন্যাস লেখার পরে আমি জানি, কোনো পুরস্কারই কোনোদিন আমার ভাগ্যে জুটবে না। [আমার বিধি বরাবরই বামপন্থী। ফলত সে বামেই অবস্থান করে! যদি তেমন জ্যোতিষীর সন্ধান পাই, তাহলে হয়তো ‘খুল যা ছিমছিম’ করে ভাগ্য খুলেও যেতে পারে , এইখানে একচোখ উইঙ্কের একটা ইমো হবে। এটা একদিক দিয়ে আমার জন্য ভালো হয়েছে। একেবারে পাখিদের মতো স্বাধীনভাবে আমি আমার আকাশে আমার মতো করে উড়তে শিখে গেছি। আমার আর কোথাও কোনো পিছুটান নাই।
শিল্পের জন্য, সাহিত্যের জন্য বন্ধন-মুক্তি জরুরি বলে মনে করি। যে কোনো লোভলালসা থেকে মুক্তিও আবশ্যক বলেই বলে করি। তা পুরস্কারের লালসা হোক বা অন্য যে কোনোকিছুর জন্য লোভই হোক না কেন?
ওই বছরে আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হলো না, এদিকে আমি পড়ে গেলাম ভয়ানক বিপাকে। এই পাণ্ডুলিপি লইয়া আমি কী করিব? কই বা কার কাছেই-বা যাব? সে এক মহামুসিবত যাকে বলে। যেহেতু পাণ্ডুলিপিটা আজকের কাগজকে জমা দেয়া, সেহেতু অনেকেই হয়তো দেখে-পড়েটড়ে থাকবেন। বইটা দ্রুত প্রকাশিত না-হলে উপন্যাসের বিষয়-আশয় অন্য কারো লেখায় যুক্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমি যে অন্ধ-পথিক, সাহিত্যের পথঘাট তেমন করে চিনি না । এক্ষণে আমি কার কাছে যাব বা কাকে গিয়ে বলব—এই যে শুনছেন, আমার বইটা দয়া করে প্রকাশ করে দেবেন কি?
Women have sat indoors all these millions of years, so that by this time the very walls are permeated by their creative force, which has, indeed, so overcharged the capacity of bricks and mortar that it must needs harness itself to pens and brushes and business and politics.
[Virginia Woolf, A Room of One's Own