পর্ব-২
চলো অই যে ভাগাড়
বিদ্যালয়ে এলেই আভার মন খারাপ হয়ে যায়। বিদ্যা যোগ আলয়, বিদ্যালয়। বহুবারের মতো আজকেও আভা মনে মনে বিদ্যালয়ের সন্ধি বিচ্ছেদ করে আর হাসে। বেদনার হাসি। অসহায়ের করুণ হাসি। একটি পবিত্র অঙ্গনে ফুলের মতো শত শত শিক্ষার্থীরা আসে সুগন্ধি ফুল হয়ে ওঠার জন্য। একদিন তাদের মনের আলো আর হৃদয়ের সুবাসে আলোকিত হবে, সুবাসিত হবে এই দেশ, জাতি, পৃথিবী। তাদের শিশু মনে যারা স্বপ্নের বীজ বুনবে, জ্ঞানের পিপাসা জাগাবে, মূল্যবোধ আর মানবতার মন্ত্র শিখিয়ে, আত্মা আর আলোর শুশ্রূষা দিয়ে মানব শিশু নামের একটা দ্বিপদী অবোধ জীবকে মানুষ করে গড়ে তুলবে, শিক্ষক নামের উচ্চশিক্ষিত সুবেশধারী সেই মানুষগুলো যদি তাদের সামান্য স্বার্থচিন্তায় তাড়িত হয়ে বাচ্চাদের উপস্থিতিতেই স্কুলের অফিসকে ষাঁড়ের লাড়াইয়ের ময়দান বানিয়ে ফেলে আর যদি অন্যের ছিদ্র সন্ধ্যানে কি ক্লাসে, কি অফিসে সারাক্ষণ চিকার মতো ছোঁক ছোঁক করে বেড়ায় তবে কী তা আর বিদ্যালয় থাকে? সেই ব্যক্তিটি কী আর শিক্ষক থাকে? কে না জানে, পাত্রগুণে ঘিও গু হয়ে যায়।
আজ আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায় নিউইয়র্ক যা, বাংলাদেশও তা।
আভা বেজার মনে বুক ভরে একটা শ্বাস লয়। এই জামানার কেমিক্যালভোজী হাইব্রিড মানুষগুলো ঠিক পোলট্রি মুরগির মতো; পুষ্টিকর খাবার খায়, আরামে ঘুমায়। তারপর ওহ্ আহ্’র মতো কোনো স্নায়ুবিক শব্দ ব্যতিরেকেই ছুরির নিচে গলা পেতে দিয়ে গোস্ত হয়ে যায় কিংবা অন্য কারো গলা কেটে গোস্ত খায়। সম্ভবত তাই আজ সবকিছু পণ্য : মায়ের বুকের নরম গোস্ত, বাপের মাথার খুলি, ভাইয়ের পাঁজরের হাড়, বোনের মিষ্টি হাসি, প্রেমময়ী স্ত্রীর গোপন অঙ্গ আজ আমাদের কাছে পণ্য! কারণ আমরা মানব সভ্যতার আধুনিকতম যুগে আছি। সেই পাথরের যুগ থেকে লক্ষ লক্ষ বছরের কর্ষণে আমরা আজ বিশ্বায়নের যুগে পা দিয়েছি। বিশ্বায়নের ডাক হচ্ছে, পৃথিবী একটি গ্রাম। ধর্মকর্মের দিকে গ্রামের মানুষের টানটা একটু বেশি। তাই শুধু ধর্ম নয়। তার কঙ্কালটা দিয়ে সবাইকে চেপে ধরতে হবে আর সবার, সব জাতি-উপজাতির শেকড়-বাকড়, ডালপালা সব কেটে ফেলে দিতে হবে। তাই আজ আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায় নিউইয়র্ক যা, বাংলাদেশও তা।
আভার স্কুলের স্টাফরুমের টেবিলটা যেন রাজনীতির ময়দান। এখানে শিক্ষকদের গলার তাকদ আর চিন্তার যে স্ফুরণ ঘটে তার দশভাগের একভাগ যদি ওরা ক্লাসে দিত তবে একদিন এই দেশ সত্যি সত্যিই সোনারবাংলা হয়ে যেত। সেই ইগো সমস্যা, সেই বড়ত্ব আর লোভের দাসত্ব। তাই অতি তুচ্ছ বিষয়াশয় নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে মাসের পর মাস চলতে থাকে ঠান্ডা লড়াই। মাঝে মাঝে স্টাফ মিটিংয়ে ফাৎ করে জ্বলে ওঠে ছাইচাপা আগুন। তখন আভা অবাক হয়ে দেখে : খাতা দেখা, পরীক্ষার হল-ডিউটি কিংবা কোচিং নামের ডাকাতির টাকা ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে ওরা কতটা নিচে নামতে পারে!
মাঝে মাঝে এইসব পেট সর্বস্ব মানুষগুলো এটা-সেটার উছিলা করে আভার কাছে এসে মাঠের সব খবরই শোনায়। সবার কথাই সে মন দিয়ে শুনে কিন্তু কোনো মন্তব্য করে না। কারণ টিউমার রুপি ক্যান্সারের আশপাশে যেমন ছোট ছোট কিছু গুপ্তি-টিউমার থাকে তেমনি তার স্কুলের দেড় ডজন শিক্ষকের মাঝে তিন-চারটা সক্রিয় গ্রুপ আছে। সেই গ্রুপিং-কালচারে কে যে কোন মাজহাবের অনুসারী খোদাকা মালুম! তাই সে শুধু মনোযোগী শ্রোতা। তার এই নীরবতায় সবাই তাকে নিজ নিজ আমল আখলাকের তালিম দিতে চায়।
বছরের শুরুর দিকে যখন ক্লাস রুটিন হয় তখন স্কুলের পরিবেশ থাকে থমথমে। গণিত আর ইংরেজি বিষয়ের জন্য স্কুলের বাতাসে ভেসে বেড়ায় গৃহযুদ্ধের আমেজ। তাই বড় আপা শান্তি চুক্তির জন্য ঘন ঘন শিক্ষকদেরকে নিয়ে মিটিংয়ে বসেন। ক্লাসে এই দুইটা বিষয়ের যেকোনো একটা থাকলে প্রচুর টিউশানি পাওয়া যায়। সেজন্য মাঝখানে মিটিংয়ের টেবিলটা রেখে শিক্ষকদের মাঝে চলে মোরগের লড়াই। ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য মানুষ যখন ঘেউ ঘেউ করে তখন দেখতে কি বিশ্রী লাগে! আভা তার হালকা-পাতলা দেহটা চেয়ারে মিশিয়ে দিয়ে পিটপিট করে তখন সবাইকে দেখে, তার মুখের ভেতরটা তেতো স্বাদে বিষাক্ত। তারপর মাস্টারদের রেষারেষির এই ক্লোরোফ্লোরোকার্বণটা সারা বছর জুড়ে স্কুলের ওজন স্তরটাকে নিরন্তর ছিন্নভিন্ন করতে থাকে!
আভার মনে পড়ে তার প্রিয় শিক্ষকদের কথা। সে কিংবা তার সামনে অন্য কেউ শিক্ষক শব্দটা উচ্চারণ করলেই আভার চোখে ভাসে তার প্রিয় শিক্ষাগুরুদের মুখ। কত অভাবের জীবন ছিল তাঁদের। তিন মাস পর পর অনুদান হিসাবে সামান্য খুদকুড়া পেত শিক্ষকরা। পেটে ঠিকমতো ভাত নাই, পরনে কম দামি পাজামা-পাঞ্জাবি। কিন্তু মুখের হাসি আর হৃদয়ের ভালোবাসাটা ছিল আভাদের কাছে বেহেস্তের সামিল। আজ সে শিক্ষক। তাই ক্লাসে যাওয়ার সময় আজও প্রায়ই মনে পড়ে তাঁদের মুখ। তাঁরা যেন মুখ বেজার করে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে ভর্ৎসনা, তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছিলাম? তুমি জানো না, শিক্ষক হলো জাতির গুরু, জগতের গুরু, শিক্ষার্থী হলো তাঁর সন্তান।
আভা টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে দুই ঢোক পানি খায়। তারপর ভাবতে ভাবতে আবার বিছানায় এলিয়ে পড়ে : আজ যে মানুষ এত ধর্ম ধর্ম করে চিৎকার পারছে, তারা তো ধর্মের মজ্জা ফেলে হাড় নিয়ে ডাংগুলি খেলছে। তারা কি জানে না আমাদের সুন্নি মাজহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা (রা.) একদিন জুতা সেলাই করার সময় এক মুচির কাছ থেকে জেনে ছিলেন, কুকুর সাবালেগ হলে পা তুলে পেশাব করে। আলাপে আলাপে মুচির কাছ থেকে পাওয়া এই জ্ঞানটুকুর জন্য ইমাম সাহেব আজীবন সেই মুচিকে তাঁর আর সব ওস্তাদদের মতোই শিক্ষাগুরুর সম্মান দিতেন। তার মানে কী এই নয় যে বিনয়, ভদ্রতা, নম্রতা, মানবতাই হচ্ছে ধর্মের মূল কথা?
এখন মাস্টারদের বেতন বেড়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতি নামের কৃষ্ণগহ্বরে রাহাবর হওয়ার সুবাদে সুযোগ আছে টিউশানি করে প্রচুর পয়সা কামানো আর সাথে বোনাস হিসাবে আছে অফুরন্ত ছুটিও। এই ভয়াবহ বেকারের দেশে আকার পেতে এখন শিক্ষকদের একটা বড় অংশ পড়াতে নয় শুধু চাকরি করতে আসে। পড়ানো একটা মহৎ পেশা। দায়িত্ব আর কর্তব্যের নিগড়ে বাঁধা কৃষকের মতো ধৈর্য আর বিধাতার মতো উদার না হলে মানুষগড়া অসম্ভব।
রাজনীতি এখন সবচে লোভনীয় পেশা। তাই যারা পেশিবাজ, লুণ্ঠন প্রিয় তাদের থাবার নিচে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশ!
আভা হোস্টেল থেকে বাসস্ট্যান্ডে আসতে আসতেই ঢাকার আকাশ রোদে তেঁতে ওঠে। অথচ ভোর রাত থেকেই শুরু হয়েছিল ক্যাট্স অ্যান্ড ডগ্স। জোরাল বাতাস আর ঘন ঘন বাজের শব্দে রাতে হোস্টেলের বিছানায় ঘুম আসছিল না তার। সে কান খাড়া করে বয়ে যাওয়া ঝড়টাকে মন দিয়ে অনুভব করতে গিয়ে শুনেছে শুধু ইট-কাঠ আর থাই এলোমেনিয়ামের গায়ে আছড়ে পড়া বাতাসের কাতরানি! যেন সারা শহর মাতালের মতো চিৎকার পারছে, অসুখী, আহত দৈত্যের মতো ধ্বংসের নেশায় আস্ফালন করছে। তারপর সারাটা সকাল-জুড়ে আকাশে ছিল থরে থরে কালো মেঘ। হাবভাবে সে ধরেই নিয়েছিল আজ আর রোদের দেখা মিলবে না। তবু সকাল আটটা নাগাদ বড় বড় ফাটল ধরেছিল জমাট মেঘে মেঘে, রোদ ওঠেছিল চিড়বিড় করে! মেজাজি বর্ষার এমন কাণ্ড দেখেই হয়তো ভারত জয় করতে আসা আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাস শঙ্কা আর সন্দেহে বলে উঠেছিলেন ‘হায় সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ! যেখানে আবহাওয়া এত অনিশ্চিত সেখানকার জন-বসতিরাও নিশ্চয়ই জটিল ও বিপদজনক হবে।’
তাই এখানে বসত কিংবা শাসন কোনোটাই তাদের জন্য নিরাপদ নয় ভেবে সেলুকাস খুব তাড়াতাড়িই সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেছিলেন।
তো মহানগরের আগুন-ঝরা-রোদ, ঘিনঘিনে জলকাদা, দিগ্বিদিক ছুটে চলা যানবাহনের তর্জন-গর্জন আর ভিড়-ভাট্টায় চারপাশটাকে জনবিস্ফোরিত বাংলাদেশ ও আত্মঘাতী বাঙালির প্রকৃত স্বরূপ বলে আভা বিবেচনা করে। আর এই ভয়াবহ নাগরিক বিশৃঙ্খলায় তার নিজেকে খুব অসহায় ও তুচ্ছ লাগে। লাখ লাখ মানুষ এক সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে চাইছে! আর এইসব ভাবতে ভাবতে আভার মনে হয়; বাসের জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এখন তার ঘামে ভেজা শরীরটা শিঙাড়া ভাজা হচ্ছে। মনের অনুভূতিগুলো মার খাওয়া বিড়াল ছানার মতো দিগ্বিদিক পালাতে চাইছে! ক্লান্তিতে দেহটা চাইছে ঝপাত করে ভেঙে পড়তে। তবু সে একরোখা কিশোরীর মতো পিঠ-মাথা খাড়া রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কাল রাতে তার একটুও ঘুম হয় নি। তাই চোখ দুইটা জ্বালা করছে, পারমাণবিক রিঅ্যাক্টারের মতো জ্বলছে মগজটাও। আভা আরেকবার চারপাশটা দেখে : এই মহানগর নামের নরকে কোথাও সবুজ ও সুন্দরের আশ্রয় নাই, প্রশ্রয় নাই স্নেহ-মমতার, আছে শুধু উলঙ্গ ইটকাঠ, ব্যস্ততা যা বিকারগ্রস্ত বখাটেদের মতো মনের শান্তি নষ্ট করে; চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় : মেগাসিটির মোড়ে-মোড়ে, খাম্বা-খাম্বায়, ফ্লাইওভারের পেট-পাঁজর, হাত-পা কিংবা আরো উপরে ঝুলে থাকা ক্যাবলে-ক্যাবলে, আকাশে-বাতাসে ব্যানার-ফেস্টুনে, ডিজিটাল বিলবোর্ডে অসংখ্য নেতা-নেত্রী মাসলম্যানদের মতো ক্ষমতার মহাকাশে ডানা ঝাপটাচ্ছে!
আভা বিষাদভরা চোখে চেয়ে থাকে। একটা বড়সড় পোস্টারের কোনার দিকে এই এত্তটুকু জমিন দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসের হিমালয় বঙ্গবন্ধুকে। আরেক কোনায় হাসুমণি। তারা এত ছোট যে তাদেরকে ভালো করে দেখতে হলে একটা বাইনোকোলার দরকার। আভা যাদেরকে দেখতে চায় না, পোস্টারটার শীর্ষ থেকে শেকড় অবধি সেইরকম পাঁচজন নেতার বিশাল বিশাল ফিগার ক্ষমতার ক্রমানুসারে নিচের দিকে নেমে এসেছে। ইয়াবাখোরের মতো শেষের জনের চোখ-মুখে অসভ্য লোভ ও নিষ্ঠুর অপচ্ছায়া। আভা জানে ফাঙ্গাসের মতো এইসব দৃশ্য এখন দেশময়। রাজনীতি এখন সবচে লোভনীয় পেশা। তাই যারা পেশিবাজ, লুণ্ঠন প্রিয় তাদের থাবার নিচে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশ!
মগজটা আভাকে একটুও থামতে দেয় না। একটু সুযোগ পেলেই মনটা তার অবাধ্য হয়ে ওঠে। দগদগে ঘাগুলোকে খোঁচায়। নিরুপায় আভা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে নেতাদের একটা শ্রেণিবিন্যাস করে ফেলে : সরকারি নেতা-বিরোধী নেতা, খুনি নেতা, খুন হওয়া নেতা, পাতি নেতা, ত্যানা নেতা, এই গ্রুপের নেতা, সেই গ্রুপের নেতা, আপেল আপেল মহিলা নেতারাসহ সমুদয় নেতা বাহিনী ঢাকার হাগু-মুতু ভরা বিষাক্ত বাতাসে পত পত করে উড়ছে! চারপাশের দালান-কোঠা, দালাল-বাটপার, তদবিরদার, ইয়াবাখেকু, ভূমিখেকু, ঋণখেলাপি, ব্যাংক-খাদক, তেলচোরার মতো সর্বভুক আর অভিযোজন ক্ষমতায় অদ্বিতীয় আমলা এবং রাজনৈতিক লোমশ প্রাণীদের অভয়ারণ্য ঢাকা নামের এই গহিন বনে মানুষের জন্য কোথাও এক তিল স্বস্তি আছে কি?
আভা ঘড়িতে সময় দেখে। রাতের সেই বৃষ্টির জন্য এখনও রাস্তায় রাস্তায় হাঁটুপানি। তার মনে হয় এই পানিতে মাসিকের রক্ত-মাখা ন্যাপকিন, ব্যবহৃত লিপস্টিকের চকচকে খোসা, নাগরিক আরাম, আবর্জনা, কুটিল প্রেম-ভালোবাসা, কামরস, বীর্ষ ভরা প্যান্থার, ধর্ষিতা মেয়ের নিহত ভ্রূণ, গুম হয়ে যাওয়া যে কোনো দুর্ভাগার গুমরানো চিৎকারসহ কোটি কোটি এডিস মশার স্ফুটন-উন্মুখ ডিম্বানু!
আভা একটু সরে দাঁড়ায়। পাশে দাঁড়ানো লোকটা একটা সিগারেট ধরিয়েছে। অতিষ্ঠ আভার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা তাকে দু’চোখে লেহন করছে! চারপাশের এই দুর্যোগময় বর্তমানের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি? কে না-জানে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মায়ের মতো পরিবেশও একটা নিয়ামত। এই জঘন্য সময় থেকে ধর্ষক, জঙ্গি কিংবা সেভেন মার্ডারারস নূর হোসেন, ইয়াবা ডন আমিন মাহমুদ, সাধারণ মানুষের হাজার কোটি টাকা বাগিয়ে পালিয়ে যাওয়া হায় হায় কোম্পানি আর অপঘাতে মৃত্যু ছাড়া কীই-বা আশা করা যায়?
ক্রিক করে একটা শব্দ হয়। আবাবিল! আবাবিল! আভা চমকে ওঠে দেখে বোরাক নামের আরেকটা বাস আবাবিলকে পাশ কাটিয়ে একটু সামনের দিকে দাঁড়িয়েছে। পেছন থেকে হুইসেল দিচ্ছে ‘ইনসাফ ডায়গনস্টিক সেন্টার’ লেখা একটা লাইটেস। আবাবিল আর বোরাক উড়াল দিতেই এল ঝলমলে চেহারার লাব্বাইক! আভা মনে মনে হাসে। বাঙালিরা তেমন ধর্মপ্রাণ নয়, চিরকাল ধর্মভীরু। তাদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে সব খাদকেরা এখন ধর্মের লেবাসে, আতরের সুবাসের জাদুতে বশ করে, ক্ষুর দিয়ে চেঁছে চেঁছে ইচ্ছা মতো ছাল-চামড়া তুলে নিচ্ছে, বদলে দিচ্ছে প্রেম, মায়ামমতা আর মানবতার জাত বাঙালিকে, বাংলাদেশকে। তাই এলাকার লিডার সাহেব পাঁচটা খুনের আসামি হয়েও দাড়ি রেখেছেন, বছর বছর ওমরাহ পালনে রাসুলে করিমের বাড়ি যাচ্ছেন। ঠিক এক-ই কায়দায় প্রাইভেট স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লিনিক, বাস-ট্রাক থেকে শুরু করে তিন চাক্কার মিশুক রিকশা পর্যন্ত সবার নসিবে একটা না একটা ইসলামি নাম লেখা। ঘর থেকে পা ফেললেই সবকিছুতে মক্কা-মদিনা, মক্কা-মদিনা ভাব তবু আমাদের চারপাশে মানুষের কত অভাব!
স্রেফ একটা মোবাইল ফোন দেশের মানুষের চরিত্রকে কত দ্রুত ভাগাড়ে নিয়ে যাচ্ছে!
আভা বিসমিল্লাহ বলে ঝটপট বাসটায় উঠে পড়ে। সে দুর্ঘটনাকে খুব ভয় পায়। তার বিবেচনায় পৃথিবীর এই দুর্যোগময় সময়ে মরে যাওয়া তো বেঁচে যাওয়া কিন্তু ল্যাংরা-লুলা হয়ে নরক ভোগ করতে সে নারাজ। দেশে এখন প্রতিদিন গড়ে দশ-বারোজন করে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে, পঙ্গু হচ্ছে তারচে কয়েকগুণ বেশি। মৃত্যু ভাবনা আভার মনে মহত্ত্ব এনে দিলে সে পিঠে ব্যাগ, ছাগল টাইপ দাড়িওয়ালা তরুণটাকে মনে মনে একটা ধন্যবাদ দেয়। কারণ বাসে উঠবার সময় এই তরুণ আভাকে আগে ওঠতে দেবার জন্য তার জিমকরা সুঠাম শরীর ও পিঠের ব্যাগ দিয়ে পেছনের বদ চরিত্রের লোকটাকে কোয়াটার সেকেন্ড ঠেকিয়ে রেখেছিল। সেই ফাঁকে আভা টপ করে বাসে উঠে পড়ে। ছেলেটার এই সামান্য একটু উদারতার জন্য মনটা তার খুশি হয়, জীবনটা এক পলকের জন্য হলেও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
শেষবার তরুণের সাথে চোখাচোখি হলে কৃতজ্ঞ আভা তাকে নীরবে একটা ধন্যবাদ জানায়। পেছন দিকে দুই-তিনটা সিট খালি। বাসটা আবার ঝড়ের গতিতে ছুটতে শুরু করেছে তাই সে এ-সিটের হাতল সে-সিটের মাথা ধরে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার তিন সিট আগে চোখে চশমাপরা কালোমতো এক তরুণ কাত হয়ে ঘুমাচ্ছে। নিজের আসনে বসতে বসতে আভা শোনে পাশের সিটের একজন ফোনে জোরে জোরে বলছে, ‘আমি এখন নাবিস্কোতে। আর দশ মিনিট লাগবে।’
আভার মনটা খারাপ হয়ে যায়। লোকটা শুধু শুধু মিথ্যা বলছে। বললেই হয় আমি এখন রাজারবাগ। জ্যামে আটকা আছি। আসতে একটু দেরি হবে। এই সত্যটুকু বললে কী তার বউ তালাক হয়ে যাবে, না ফাঁসি হবে?
আভার মুখটা ছোট হতে হতে এই এতটুকু হয়ে গেলে সে বিড়বিড় করে আক্ষেপ করে, স্রেফ একটা মোবাইল ফোন দেশের মানুষের চরিত্রকে কত দ্রুত ভাগাড়ে নিয়ে যাচ্ছে!