জীবনানন্দ দাশের একটি অপ্রকাশিত কবিতা ও কবিতার ভাষ্য
সময়ের ফাঁকে আমি বহু দিন নগরীর রাজপথে ফিরে ..
তবুও এসেছি চ’লে সর্বদাই হেমন্ত-ঋতুর দিন চিনে ...
নাড়ির ভিতরে এক প্রয়োজন বোধ ক’রে পৃথিবীর অপর সকল ...
মাইলস্টোন’এ—হেমন্ত-নদীর পারে এসে দাঁড়ায়েছি ...
তাকায়ে দেখেছি ঘাস দীর্ঘতর হয়ে গেছে মানুষের চেয়ে ...
ঈষৎ সোনালি রঙে বিকেলের সূর্যের আলোয় .
মাথার উপরে নীল—আধো-ফিকে—ধূর্ত আকাশের .
সক্রিয়তা রেখে দিয়ে—কী ক’রে এ-সব ঘাসগুলো .
নদীর কিনারে থেমে—ন’ড়ে উঠে—উপহাস ক’রে .
কোনও এক অবলুপ্ত বৈজন্তিয়ম’এর .
পণ্ডিত—মনীষী—কবি—নারী আর গণিকার মতো .
জীবনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত নয়? জীবনেরই কেউ .
নয়। জানি আমি। নদীর ধূসর জলে তাহাদের ছবি .
সবিশেষ কিছু নয়। জানি আমি। ইন্দ্রিয়ের নিবিড় হেঁয়ালি .
তবুও হৃদয় তৃপ্ত ক’রে রাখে হেমন্তের বেলা .
হৃদয়ে জিজ্ঞাসা আসে (মন্থর ঢেউয়ের ১ আলোড়নে .
পরিদৃশ্যমান এই অববাহিকার পথে ফিরে, .
হেমন্তের নদী, বৃক্ষ, পাখি, ঘাস, ঢিলের ভিতরে .
রৌদ্রের ছায়ার মতো ২ সহজেই ঢুকে পড়ে, আহা, .
নির্জন জলের মতো পুনর্বার বার হয় স্বাভাবিকতায়) হৃদয়ে জিজ্ঞাসা আসে—আমি কোনও সদুত্তর খুঁজে .
পাই না কো। এইখানে তিত্তিরাজ-গাছের বল্কল .
উই কিছু খেয়ে গেছে—হলুদ লিচেন’গুলো এসে .
কিছুটা ঘিরেছে তাকে—লুপ্ত কাঠঠোকরা’রা কবে .
গিয়েছে খোঁড়ল খুঁড়ে—তবুও সমগ্র অবয়ব .
এই সব গুনাগার—লোকসান—হয়তো-বা পরিতৃপ্তি নিয়ে .
আমার হৃদয়ে এসে দাঁড়াবার মতন জিনিস কৌটিল্য’এর চেয়ে আরও অনু এক স্বতন্ত্র গরিমা ৩ .
আবহে বহন ক’রে—হেমন্ত-নদীর পারে জেগে। .
আমি তার ঘ্রাণ পাই—আমি তার কাছে যাই—স্পর্শাতুর হয়ে .
তবুও সংশয়ে থেমে—নগরীর গুরু গরীয়ান .
বিদূষকদের শেষে গাধা’র মতন কান পেতে .
তবু তাকে স্পর্শ করি—তবুও মহানুভব কিছু .
নিমেষেই সংঘটিত হয় নাই পৃথিবীর পারে .
আমাদের দু’ জনার এ-রকম গোপনীয় অন্তরঙ্গতায় .
হেমন্ত তবুও তার অর্থ নিয়ে নদীর শিয়রে .
বটের’এর বিবর্ণ ডানার রোমে—তিতির’এর রঙে .
নিভৃত ৪ ডিমের ঘ্রাণে—অসংখ্য চিল’এর ৫ মাঝে একা .
ব’সে আছে, মনে হয়—তবুও সে বিবর্তিত সুখে .
কোথাও বৃক্ষের জন্ম দিয়ে যায়—কোথাও নদীর— .
সূর্যতার—অণ্ডের আলোর—দীর্ঘ মানুষের মতন ঘাষের— .
নগরীর—গম্বুজের নিচে ক্লান্ত নাগরিকদের— .
গলির ভিতরে ক্ষুব্ধ গণিকার .
দূর—আরও দূরতর মাইক্রোফোন’এ হিংস্র শ্বাপদের .
যেন লক্ষ নিরক্ষর প্রাণের নিকটে .
প্যারাডিম সর্বদাই মিশে যায় কুয়াশায় .
প্যারাডিম’এ। আজ এই হেমন্তের নদীর নিকটে এসে বিকেলবেলায় .
একটি গাছের সাথে আমার এ-হৃদয়ের অর্গাজম .
নতুন অক্ষর এক শিখায়েছে আবার আমাকে .
অথবা সে সমধিক পুরাতন ব’লে সে নিজে ভেবেছিল .
আমিও শিখেছি তাকে—হয়তো-বা বহু দিন আগে।
খ্রিস্টাব্দ ১৯৪০ সেপ্টেম্বর .
বিকল্প: ১. জলের/রসের; ২. নীরব লোষ্ট্রের মতো; ৩. মর্যাদা; ৪. গোপন; ৫. খড়ের
.
সৌজন্য: অমিতানন্দ দাশ প্রিয়ব্রত দেব, প্রতিক্ষণ
❑
গত অর্ধশতকেরও বেশি কাল ধরে যে কবি বাংলার কবিতা-পাঠক ও সমালোচকের সর্বাধিক সমবেদনা পেয়ে এসেছেন, তার নাম জীবনানন্দ দাশ। প্রথম দিককার দু-একজন মার্ক্সবাদীর অনাস্থা বাদ দিলে একে নিরঙ্কুশ সত্য বলে ধরে নেয়া যায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারে নজরুলের নাম, কিন্তু সে নাম পরাহত কবিদের কাছে। কতিপয় গৌণ কবি ও স্লোগানজীবীদের কথা আলাদা। বাঙালি মুসলমানের ভাবাবেগও এখানে বিবেচ্য নয়, কেননা সেটা সাহিত্যের বাইরের বিষয়।
সম্ভবত এই দুজনের জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ট্র্যাজেডি, যা ধরা দিয়েছে শিক্ষিত বাঙালির আর্দ্র অনুধাবনে, কবিতার অতিরিক্ত কবির একটা মূল্য তৈরি করেছে। একে পূর্বে বলেছি সমবেদনা, এরই ভিন্নরূপ সমাদর। এই সমাদরে কিছু অতিরঞ্জন তো হয়েছেই; দেখতে পাই, বিগত চল্লিশ বছরের জীবনানন্দ-চর্চার গভীরে একটা হাহাকার লুকিয়ে আছে, তার কবিতার মতোই। সেই হাহাকারের মূল সুর: সমকালে ঠিকভাবে মূল্যায়িত বা পঠিত হন নি এই মহান কবি। ভাবখানা যেন, সব মহৎ কবিই সমকালের শিরোভূষণ হতে পেরেছেন, কেবল জীবনানন্দ দাশই পদদলিত। জানিয়ে রাখা ভালো, এখানে তথ্যগত বিভ্রাট আছে। যেমন বিভ্রাট আছে কবি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর মূল্যায়ন বিশ্লেষণে। তরুণ কবির রচনা পড়ে রবীন্দ্রনাথ যে মন্তব্য করেছিলেন, তা নিয়ে জুড়ে দেয়া হয়েছে জীবন-দাশের পরিণত বয়সের কবিতার ব্যাখ্যা হিশেবে। ওদিকে বুদ্ধদেব, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তার সমকালীন একজন কবিকে যতখানি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন, বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা, এর কাছাকাছি কিছুও আর ঘটে নি কখনো। এমনকি, ধূসর পাণ্ডুলিপি ও বনলতা সেন অপেক্ষা শেষদিককার কবিতাগুলি, বিশেষত বেলা অবেলা কালবেলা যে দুর্বলতর রচনা, যদিও সরাসরি এমন মন্তব্য করেন নি বসু, তবু তার সে বিচারের অব্যক্ত অভিপ্রায়ে আমি একমত।
আমাদের আলোচ্য কবিতাটির রচনাকাল ১৯৪০। অর্থাৎ বনলতা সেন থেকে মহাপৃথিবী-র মধ্যবর্তী কালপরিসর। এটা হলো সেই কালপর্ব যখন বিশ্বব্যাপী চলছে ‘সেরেনিটি’ ও ‘অশান্তির আগুন’-এর তুমুল বোঝাপড়া। আমরা জেনেছি, এরই প্রায় বছর দশেক আগে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের মধ্যেও চলেছিল এই বোঝাপড়ার লড়াই। আমাদের কবি, জীবন, সেরেনিটির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি, কবিজীবনের একটা বিরাট অংশ তার ব্যয় হলো এরই সন্ধানে। কিছু উদাহরণ না দিলেই নয়: ‘আমরা মানুষ ঢের ক্রূরতর অন্ধকূপ থেকে/ অধিক আয়ত চোখে অমৃতের বিশ্বকে দেখেছি;/ শান্ত হয়ে স্তব্ধ হয়ে উদ্বেলিত হয়ে অনুভব করে গেছি/ প্রশান্তিই প্রাণরণনের সত্য শেষ কথা, তাই/ চোখ বুজে নীরবে থেকেছি।/...যা হয়েছে—যা হতেছে—এখন যা শুভ্র সূর্য হবে/ সে বিরাট অগ্নিশিল্প কবে এসে আমাদের ক্রোড়ে ক’রে লবে।’
জীবনানন্দের শেষপর্বের কবিতাগুলো এমনই, বক্তব্যনির্ভর, ঘুরে ফিরে একই কথা, সহজেই গদ্যে রূপান্তরযোগ্য
এই আশাবাদ খুব সরল, লিনিয়ার, তবু কবিতাকে শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হতে দেয় নি এইজন্য যে, তিনি বলতে পেরেছেন, ক্রূরতর অন্ধকূপে আছি বলেই অধিক আয়ত চোখে অমৃতের বিশ্বকে দেখা সম্ভব হয়েছে। এবং এই প্রশ্ন তুলতে পেরেছেন: ‘আমরা ওদের হাতে রক্ত ভুল মৃত্যু হয়ে হারায়ে গিয়েছি?’ তার মীমাংসাটি অনির্দেশ্য, কিন্তু বেশ প্রতিশ্রুতিময়: সময় কোথাও/ পৃথিবীর মানুষের প্রয়োজন জেনে বিরচিত নয়; তবু/ সে তার বহির্মুখ চেতনার দান সব দিয়ে গেছে ব’লে,/ মনে হয়; এরপর আমাদের অন্তর্দীপ্ত হবার সময়।’ জীবনানন্দের শেষপর্বের কবিতাগুলো এমনই, বক্তব্যনির্ভর, ঘুরে ফিরে একই কথা, সহজেই গদ্যে রূপান্তরযোগ্য এবং ‘পৃথিবীর গভীরতর অসুখ ও নিরাময়’ এই মর্মে প্রবন্ধ রচনার সমতুল।
‘মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছুদূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি।’—কবির নিজস্ব প্রতীতি এমন। ‘মহাবিশ্বলোকের ইশারা’ কথাটা কেমন যেন শোনায়, মনে হয় ঠাকুর বাড়ির আঙিনা থেকে আসা। অথচ ঠাকুর সম্পর্কে তিনি বলছেন: ‘...তাঁর প্রকৃত কাব্যলোকে সমাজ-ও-ইতিহাসচেতনা একটা নির্ধারিত সীমায় এসে তারপর মন্থর হয়ে গেছে।’
কী সেই ইতিহাসচেতনা যা ঠাকুরের কবিতায় মন্থর হয়ে এল, অথচ জীবন-দাশের কবিতায় অস্থির হয়ে উঠল? খানিকটা ক্রিটিক্যালি বিষয়টাকে অনুসরণ করলেই আমরা বুঝতে পারব কবি যাকে ইতিহাসচেতনা বলতে চাইছেন, সেটা মূলত রোমান্স, খানিকটা ইউটোপিয়া, বাসনার বিসরণ এবং চূড়ান্ত বিচারে অ্যাপলিটিক্যাল। যে অর্থে বঙ্কিম তার উপন্যাসে, ভিন্নভাবে রবীন্দ্রনাথ তার কথা ও কাহিনীতে—ইতিহাস ও তার টুকরো-ছিন্ন উপাদানগুলিকে ব্যবহার করেন—তার তলায় থাকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পাটাতন। পক্ষান্তরে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ইতিহাসের একটা ফ্র্যাগমেন্টেড রূপ, মোটিফ আকারে, আভাস দিয়ে মিলিয়ে যায় যেন। কোনো ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে হাজির হয় না। উদাহরণত এই কবিতাটিতে দেখতে পাচ্ছি একটি বাক্যাংশ—‘কৌটিল্যের চেয়ে আরও অনু (আসলে হবে অণু, সূক্ষ্ম অর্থে) এক স্বতন্ত্র গরিমা আবহে বহন ক’রে...’—এইখানে ইতিহাসের শরণ নয়, তাকে মাত্র স্মরণ করলেন কবি। আমাদের মনে পড়ল খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের রাজা চন্দ্রগুপ্তের এক মন্ত্রণাদাতার কথা। সুশাসন ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কীভাবে রাজ্যের সমৃদ্ধি ও বিস্তার ঘটানো যায়, এইসব পরিকল্পনার মূলে ছিলেন এই চাণক্য। চারপাশের ছেঁড়াখোঁড়া যে বাস্তবতা, যাকে জীবনানন্দ ধরতে চেয়েছেন তিত্তিরাজ গাছের বাকল ও কাঠ খেয়ে যাওয়ার প্রতীকে, হলুদ ছত্রাকের আচ্ছন্নতায়, সেইখানে তবুও সব এক পরিতৃপ্তি নিয়ে জেগে উঠতে পারে, মানুষের প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের ইশারা পেলে—হেমন্তের নদীর পারে এসে এই মনে হয়—দীর্ঘ ও জটিল বাক্যটির সরলার্থ এমনই।
ক্ষমতার ছত্রছায়ায় যে ইতিহাস রচিত হয়, তাতে আমাদের রোমাঞ্চ জাগতে পারে, কিন্তু রয়ে যায় কিছু মোহনীয় ভুল-বোঝাবুঝি।
হেমন্তের ব্যাখ্যায় আমরা পরে যাব, তার আগে ইতিহাসচেতনার সঙ্গে একটা রফা করে নিই। জীবনানন্দ দাশ এখানে ইতিহাসের যে রেখাচিত্র জলছাপের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন, সেটি অতীতের এক পিঠ। অন্য পিঠে লুকিয়ে আছে খরশান চাবুকের প্রায়-মুছে-যাওয়া দাগ। যদিও শান্তি ও কল্যাণের জন্য চন্দ্রগুপ্তের দেশে ছুটে গেল কবির মন, সেই চন্দ্রগুপ্ত কিন্তু পররাজ্যগ্রাসী, সেনা-বিদ্রোহী, নিজরাজা উৎখাতকারী। তারই সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন রাজদরবারেরই আরেক অমাত্য কৌটিল্য। তাই ক্ষমতার ছত্রছায়ায় যে ইতিহাস রচিত হয়, তাতে আমাদের রোমাঞ্চ জাগতে পারে, কিন্তু রয়ে যায় কিছু মোহনীয় ভুল-বোঝাবুঝি।
ফলে একে আমরা বলব না ইতিহাসচেতনা। এ হলো অবিরাম ছুটে চলা—সফলতা, সুস্থতা, সূক্ষ্মতা, প্রশান্তি ও স্থিরতার দিকে। কেননা ‘একদিন আমাদের মর্মরিত এই পৃথিবীর/ নক্ষত্র শিশির রোদ ধূলিকণা মানুষের মন/ অধিক সহজ ছিল’। আসলেই কি তাই? রিরংসা হত্যা লুণ্ঠন বর্বরতা কি শুধুই আজকের? আজকের পৃথিবীতে মানুষের জ্ঞান কি সমস্ত সূক্ষ্মতা ও সৌন্দর্য হারিয়েছে? এই যদি সত্য হয়, তবে কী আমাদের কর্তব্য? সময়ের যে দুইটি প্রসরণমুখ—অতীত ও ভবিষ্যৎ—তাকে ক্রমাগত আকাঙ্ক্ষা দিয়ে রচনা করে যাওয়া—যা একবার হয়েছে বা হয়েছিল বলে মনে হয়, তা আবার হবে—এই প্রত্যয়ে। আর বর্তমানকে টেনে হেমন্ত-নদীর পারে এনে ফেলা, কারণ—‘আকাঙ্ক্ষার আলোড়নে চলিতেছে বয়ে হেমন্তের নদী’।
এই নদীর ধারে দীর্ঘ ঘাসগুলো নড়ে ওঠে উপহাস ক’রে। কী জন্যে এই উপহাস? সেই এক বৈজন্তিয়ম-এর অধিবাসীদের মতো জীবনের কাজ নিয়ে কেউ ব্যস্ত নয়—তাই লক্ষ ক’রে?—এ প্রশ্ন কবির। মানুষের প্রচেষ্টাগুলি আবছায়া, অস্পষ্ট, নদীর ধূসর জলে প্রতিবিম্বের মতো, সবিশেষ কিছু নয়। তারপরও হৃদয়কে তৃপ্ত করে রাখে হেমন্তের বেলা। কেননা কোনো জিজ্ঞাসাই নিসর্গকে স্পর্শ করে না। অথচ এই নির্লিপ্তি স্থায়ী হয় না কবিমনে, থেকে থেকে প্রশ্ন ও চিন্তার আঘাত এসে লাগে।
সম্ভবত আমাদের প্রত্যেকের ভেতর বাস করে এক জাতিস্মর, ক্রমাগত আমাদের শুনিয়ে চলে জাতকের গল্প, অতীতের দিকে মুখ ফিরিয়ে। কেন অতীতের দিকে? এখানে বুদ্ধের সহজতম কৌশলটি এই, যে উত্তরণ তার জীবনে বহুবার ঘটেছে ইতোমধ্যে, তা কেন সামনের দিনের মানুষের জীবনে ঘটবে না—এই প্রশ্নের মুখোমুখি শ্রোতাকে আত্মজিজ্ঞাসায় উদ্বুদ্ধ করা। কার্যত বুদ্ধের মৃত্যুর পর জাতকের গল্পগুলিই সাধারণের জন্য হয়ে উঠেছিল উদ্দীপনার ব্রহ্মাস্ত্র। জীবনানন্দও বলছেন: ‘কত পূর্বজাতকের পিতামহ-পিতা,/ সর্বনাশ ব্যসন-বাসনা,/ কত মৃত গোক্ষুরের ফণা,/ কত তিথি,—কত যে অতিথি, কত শত যোনিচক্রস্মৃতি/ করেছিল উতলা আমারে!/ আধা আলো—আধেক আঁধারে/ মোর সাথে মোর পিছে এল তারা ছুটে!’ সহস্র যোনিভ্রমণের স্মৃতি আমাদের না থাকুক, তবু আছে বলে মনে হয়, অন্তত একটা যোগসূত্র যেন আমরা গড়ে তুলতে চাই—‘সে কোন প্রথম ভোরে পৃথিবীতে ছিল যে সন্তান/ অঙ্কুরের মতো আজ জেগেছে সে জীবনের বেগে!/ আমার দেহের গন্ধে পাই তার শরীরের ঘ্রাণ।’ কেননা রিয়েলিটি তো তাই, যা অর্গানিক্যালি আমরা অনুভব করতে পারি। নিদেনপক্ষে ইন্দ্রিয়গোচর বলে প্রতিভাত হয়।
প্রথম মহাযুদ্ধের ভারে ন্যুব্জ, আহত ইউরোপের পটভূমিতে এই নগরীর প্রতিস্থাপন—জীবনকে নতুন ইশরায় জাগিয়ে তোলারই অভিপ্রায়।
প্রসঙ্গত বলা অসমীচীন হবে না, এই বৈজন্তিয়ম, প্রাচীন গ্রিক নগরীর মৃদু উচ্চারণ, হঠাৎ মনের কোণে জাগিয়ে দিল ইয়েটসের Sailing to Byzantium কবিতাটির প্রতিধ্বনি। যেখানে প্রৌঢ়ত্বের সীমা পেরুনো কবি তাঁর বর্তমান আইরিশ ভূখণ্ড ছেড়ে যাত্রা করেছেন বাসনারচিত এক দ্বীপে, সময় যেখানে জেগে উঠেছে কারুভাবনার চির-ভাস্বরতায়, আয়ু যেখানে শ্বাস ফেলছে অনশ্বরতার মন্ত্রে। অতীতের পানে মুখ-ফেরা এই 'সেন্স অব ইটার্নিটি'—একে আমরা ঠিক পলায়ন বলবো না। প্রথম মহাযুদ্ধের ভারে ন্যুব্জ, আহত ইউরোপের পটভূমিতে এই নগরীর প্রতিস্থাপন—জীবনকে নতুন ইশারায় জাগিয়ে তোলারই অভিপ্রায়। কবি-মনের অতলশায়ী এ জগৎ একটা আইডিয়া বটে, ইউটোপিয়া নয়—কেননা জীবন-দাশ বলছেন, আমি তার ঘ্রাণ পাই, তার কাছে যাই, যেন প্রায় স্পর্শ করি ফেলি। যদিও এ চেষ্টা অনেকের কাছে হিস্টিরিয়া-তুল্য, ইল্যুশন-বিশেষ। এবং কবিও জানেন এমন ঘটনা, অর্থাৎ এই পৌঁছানো কাঙ্ক্ষিতের কাছে, পৃথিবীতে সহসা সংঘটিত হবার নয়।
এই আকাঙ্ক্ষা, হৃদয়ের তীব্র অস্ফুট এই জিজ্ঞাসা—সকল মুলতুবি রেখেই নৈসর্গিক নিয়মের আবর্তন-বিবর্তন চলছে, নির্বিকার। জ্ঞানের নানা উদ্ভাবন, মনীষার বিচিত্র উন্মেষ ও নবতর উদ্ভাসনে মিশে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আবহমানের পটভূমিতে সবই কুয়াশাচ্ছন্ন। যেহেতু ক্লান্তি, ক্ষয় ও হিংস্রতার পুনরুৎপাদন হয়েই চলেছে। তবু হেমন্তের মুখোমুখি কবি দাঁড়িয়েছেন গোপনীয় অন্তরঙ্গতায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, হেমন্ত জীবনানন্দের কাছে ধরা দেয় দুটি রূপে—ফসলের পূর্ণতায় ও ফসল কাটার পর মাঠের শূন্যতায়। এ-রূপের নিত্যতা তিনি অনুভব করেন জগৎ ও জীবনের পরিণামের ভেতরেও। চিন্তনের এই পদ্ধতি বাইনারি, অপরাপর আধুনিকের মতো তার ক্ষেত্রেও সত্য বটে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কৌতূহল জাগে, কোনদিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি শেষ পর্যন্ত। এ কৌতূহল কবি নিবৃত্ত করেন একটি বৃক্ষের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, যে বৃক্ষ তাকে এক নতুন অক্ষর শিখিয়েছে, অথচ সে নতুন নয় প্রকৃত প্রস্তাবে।
তাহলে কী সেই অক্ষর—এর উত্তর পেতে আমরা এবার দ্বারস্থ হব রবীন্দ্রনাথের। মজাটা হলো এই, যেন এক আধুনিক (!) অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে এসে শেষে কণ্ঠ মিলালো এক রোমান্টিকের (!) সুরে:
অভিব্যক্তির ইতিহাসে মানুষের একটা অংশ তো গাছপালার সঙ্গে জড়ানো আছে। কোনো-এক সময়ে আমরা যে শাখামৃগ ছিলাম আমাদের প্রকৃতিতে তাহার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তাহারও অনেক আগে কোনো-এক আদি যুগে আমরা নিশ্চয়ই শাখী ছিলাম, তাহা কি ভুলিতে পারিয়াছি। সেই আদিকালে জনহীন মধ্যাহ্নে আমাদের ডালপালার মধ্যে বসন্তের বাতাস কাহাকেও কোনো খবর না দিয়া যখন হঠাৎ হূহু করিয়া আসিয়া পড়িত, ...আমরা সমস্ত দিন খাড়া দাঁড়াইয়া মূকের মতো মূঢ়ের মতো কাঁপিয়াছি, আমাদের সর্বাঙ্গ ঝরঝর মরমর করিয়া পাগলের মতো গান গাহিয়াছে...
যদি বল অনুতাপের দিন তাহার পরে আসিত, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের খরা চুপ করিয়া মাথা পাতিয়া লইতে হইত, সে কথা মানি। যেদিনকার যাহা সেদিনকার তাহা এমনি করিয়াই গ্রহণ করিতে হয়। রসের দিনে ভোগ, দাহের দিনে ধৈর্য যদি সহজে আশ্রয় করা যায়, তবে সান্ত্বনার বর্ষাধারা যখন দশ দিক পূর্ণ করিয়া ঝরিতে আরম্ভ করে তখন তাহা মজ্জায় মজ্জায় পুরাপুরি টানিয়া লইবার সামর্থ্য থাকে।
এই সামর্থ্যেরই ইশারায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে হেমন্ত-নদীর পারে এক বিকেলের গল্প।
লেখাটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক 'নতুন ধারা' পত্রিকায় ২০১১ সালে প্রকাশিত
প্রাসঙ্গিক পাঠ: