নারী—এক অদ্ভুত নগরী

গিরিবালা

এটা হলো গ্রীষ্মদেশ, যত খরার বচনে ভরা,
তবু মধুমাস, তবু মাধবীর জ্বরে পুড়ে মরা।

এসিড যখন অশ্রুবিন্দু, হাসিতে ব্লেডের ধার,
বৃষ্টিও গলিত মোমপারা, মধুতে লবণ সার,
অহম যখন নিঃসঙ্গতা—মানে একাকী কার্পাস,
নৈশব্দদাহিত মন চিরে, ফ্যালে সেও দীর্ঘশ্বাস।

নভচারী দিনগুলি—আমাদের ভূমায়িত রাত—
হাঁক দিয়ে চরাচরে, হাত তুলে কে ডাকে হঠাৎ!

‘গিরি-গিরি গিরিবালা’—গুনগুন গুনগুন স্বরে
এক ভিসুভিয়াসের গান লেখে হাওয়া ঘুণাক্ষরে।
ঘুণ বড় ভালোবাসি, আর ভালোবাসা নয় ট্রমা—
কাঠকুড়ালিও বলে—তুমি হলে কাঠের উপমা...


নারী—এক অদ্ভুত নগরী

‘এই এক অদ্ভুত নগরী—বাগদাদ। এ কথা জানে না কেউ, একদিন সে নিজেই চেয়েছিল দুরন্ত হালাকু খান এসে তাকে তছনছ করে দিয়ে যাক। আমি জানি, আর শুনতে পাই এখনো অজস্র হ্রেষা, খুরের বর্ষণ।’

‘কোথায় সে মঙ্গোলিয়া—কোন সুদূর মঙ্গল গ্রহে!’

‘এই বাগদাদ যার মঞ্জিলে-মোকাম, সেই ইরাকের কথা ভাবি। সে তো চায় তার সব শহরই লুণ্ঠিত হোক। মরখুটে, এক-রোখা—যারা আসে—তারা ভুলে যায় এখানেই মৃত্যু-উপত্যকা। কুফাবাসীদের ডাকে পথ ভুল করে তেমনি কজন একবার এসেছিল কারবালা প্রান্তরে।’

না, আমরা যাই নি বাগদাদ। করি নি তেমন বাগদান কাউরেই। কাঁচাবাজারের পিছে ঝুপড়ি-ঘরটাতে থাকি। আর গান শুনি : শূন্য এ বুকে পাখি মোর...

কোথা থেকে উড়ে আসে একশো পাখির ঝাঁক! তর্ক আর তাসের খেলায় এ পৃথিবী শোনে ঠিক দুপুর বেলায়—

শুধু একটি ঘুঘুর ডাক।


ভুজঙ্গনা

বিজলি তুমি, চপল আকাশযান—

দেখা ও শোনার ক্ষুদ্র তফাৎটুকুতে
যারা নির্ণে কতটা উঁচুতে               
               মেঘের সংঘর্ষ, সংস্থান

পাহাড়ের ছায়া মেপে তারা
উচ্চতার একদিন পেয়েছে ইশারা

দিশাহীন আমি, তবু নই, সত্যি নই
তাদের গোপন নথি, নোটবই

তবু তুমি তোলো ফণা!
আমাতে কী পাঠ করো ভুজঙ্গনা?


বাতাসের লিফলেট

পৃথিবীর যত রূপকথা 
একদিন বিকেলের আবছা আলোয় বসে
পড়বার কথা কেন ভাবো? 
ওইসব গল্প, যেন রাজহাঁস,
একটা অদ্ভুত চালাকির সঙ্গে, দ্যাখো, 
জলে নেমে শ্যাওলা-কাদার মতো
যৌনতা এড়িয়ে গেছে
কাঁটাঝোপ, বেতসলতার 
হাসি ছুঁয়ে ছুঁয়ে।

হাসিটি সশব্দ নয়, নীরব, প্রতীকী কবিতার
ছায়াবৃত মুহূর্তের আড়াল সে বটে।

অথচ মিছিলময় পৃথিবীতে 
হাঁক-ডাকা মানুষের পথ-সমাবেশ—
দিন যায় তর্জনী-ওঠানো বক্তৃতার পাশে
ফেলে রেখে শকুনের মন আর
ককুরের সন্দেহ।

নাগলিঙ্গমের ইশারায়, এইখানে
কোনো পরিসমাপ্তির গানে
ফুটবে কি তবে এইবার
ঝরাপাতাদের মর্মে না-লেখা স্লোগান
নিয়ে রক্তরঙ ন্যুব্জ ব্যাকুলতা, 
রোদ্দুরের বেগুনি বিভাস?—

ওই দুটি করঞ্জা গাছের নিচে
নামহারা কবরের নিশ্চুপ দার্শনিকতা
যেখানে অলক্সঘ্য, টলমল করছে 
আমাদের ভয় ভুল গ্লানি
মাথানিচু প্রশ্নসহ। 


আত্মঘাতী

‘পরাজয়’ শব্দটাকে এতদিন পর আজ দেখলাম
ভাঙা তবলার পাশে পড়ে থাকতে—
যেনবা নিহত সুর, ছিন্ন তাল
লিরিকের লিপিমধ্যে রয়েছে সটান শুয়ে।

প্রেমের বাগানে, আহা, কত অনায়াসে—
ফোটে পরিতাপ-পুষ্প ধীরে ধীরে...

ঘাতকের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে একটি কুকুর
ঠিক এসেছিল কাছে; তবু কেউ দেখে নি। শোনে নি তার
ঘেউ ঘেউ ঘৃণা কি চিৎকার।

নিজেরই ছায়ার সঙ্গে কথা বলা গাছটির
গোপন খোড়লে বসা পাখি শুধু
লক্ষ করেছিল এই পৃথিবীকে

খানিকটা উঁচু থেকে

সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা