ইমরে কারতেশ একমাত্র হাঙ্গেরীয় লেখক যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০২ সালে তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন কথাসাহিত্যের জন্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নাৎসি-গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া এই লেখকের কৃতি সম্পর্কে নোবেল কমিটি বলেছিল, ‘ইতিহাসের বর্বরোচিত স্বেচ্ছাচারিতার কবলে পড়া ব্যক্তিমানুষের বিপন্ন অভিজ্ঞতা লেখায় তুলে আনার জন্য’ তাকে পুরস্কৃত করা হলো (Press release, The Nobel Prize in Literature 2002)।
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা ও সেই অভিজ্ঞতা-তাড়িত মানুষের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার নিষ্করুণ আখ্যান কারতেশের কথাসাহিত্যের মূল প্রতিপাদ্য। তার চারটি উপন্যাসের চরিত্র এই পটভূমি কেন্দ্র করে আবর্তিত। উপন্যাস চারটি হলো : ফেইটলেস (১৯৭৫), ফিয়াস্কো (১৯৮৮), কাডিস ফর আ চাইল্ড নট বর্ন (১৯৯০) এবং লিকুইডেশন (২০০৩)। সে বিবেচনায় এই রচনাগুলিকে টেট্রালজি বা চতুষ্টয় নামে অভিহিত করা যায়। বাংলা সাহিত্যে টেট্রালজির উদাহরণ সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ ও মৌষলকাল।
কারতেশের টেট্রালজির মধ্যে প্রথম তিনটি উপন্যাসকে নোবেল কমিটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। এই ট্রিলজিকে তারা বলেছে ‘ব্যর্থতার উপাখ্যান’। এর মধ্যে কাডিস ফর আ চাইল্ড নট বর্ন উপন্যাসটি বিশিষ্ট তার আঙ্গিকের জন্য। আঙ্গিকের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তিনি ঋণী তার প্রায় সমকালীন এক অস্ট্রীয় লেখক নিকোলাস থমাস বার্নহার্ডের কাছে (Nicholas Lezard : The Guardian)। কোনো এক নীরব শ্রোতার সামনে স্বগতোক্তির মতো ক্লান্তিহীন বর্ণনার মধ্য দিয়ে অন্তর্গত বিষাদ ও বিচ্ছিন্নতার চিত্র তুলে ধরাই বার্নহার্ডের মূল কৌশল। ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ একা কথা বলা। এতে বাইরের জগতের ঘটনা প্রকাশ পায় সামান্যই, সেও আসে টুকরো-ছিন্নভাবে। তাতে কাহিনির পারম্পর্য তেমন রক্ষিত হয় না। কিন্তু কথকের চিন্তার প্রবাহ থেকে যায় অবিচ্ছিন্ন। এই অবিচ্ছিন্ন চিন্তাস্রোত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে 'চৈতন্যপ্রবাহরীতি'র। এ রীতির কিছু বৈশিষ্ট্য আমরা তুলে আনতে পারি এভাবে: ঘটনা বর্ণনা নয়, চরিত্রের চিন্তাকে অনুসরণ; আকস্মিকতার মধ্য দিয়ে বর্ণনা শুরু এবং আকস্মিকভাবেই তা শেষ; বর্ণনার মধ্যে কোনো ছেদ থাকবে না; আখ্যানভাগের সময় খুবই অল্প, হতে পারে কয়েক ঘণ্টার বা কয়েক দিনের; এক ধরনের বিষাদ, উদ্বেগ ও শূন্যতাবোধ এর মূল প্রেষণা।
বাংলা ভাষায় এমন দুটি উপন্যাসের নাম এক-নিশ্বাসে বলে ফেলা যায়—সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র চাঁদের অমাবস্যা এবং সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী। বিশেষত জাগরী উপন্যাসটি, যা বিবৃত হয়েছে উত্তম পুরুষে। তবে একান্তই যদি মিলিয়ে পড়তে হয় সেক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উপন্যাসের কথা। এটি উত্তম পুরুষে বর্ণিত নয়, তবে এর পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দশক, যেখানে একজন যুবকের উপলব্ধিতে ধরা পড়ছে বৈরী সময়, আতঙ্ক-সঞ্চারী প্রতিবেশ—যার উৎসে আছে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা। তেমনি কাডিস ফর আ চাইল্ড নট বর্ন উপন্যাসটিরও পশ্চাৎপটে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিতাড়িত মানুষের বয়ান রচিত হচ্ছে আশির দশকের শেষে, যখন পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলিতে চাপিয়ে দেয়া সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ছে একে একে। গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। কিন্তু ততদিনে মর্মগতভাবে মৃত্যু হয়েছে আমাদের কথকের।
গণতন্ত্রের সেই উষালগ্নে একদিন একটি কফিশপে গিয়ে সে শুনতে পায় পাশের টেবিলে বসা দুই তরুণীর কথোপকথন। এক তরুণী তার বান্ধবীকে বলছে, একজন ইহুদির সঙ্গে কখনোই সে শারীরিক সম্পর্কে যেতে পারবে না। এতটাই ঘৃণ্য এই ইহুদি। চট করে লেখকের মনে পড়ে যাবে, সে তো প্রথাগতভাবে ধার্মিক নয়। নিজেকে ইহুদি না ভাবলেও এই জাতি-পরিচয়ের ভার তাকে বহন করতে হয়েছে আশৈশব। সহ্য করতে হয়েছে ঘৃণা ও অত্যাচার। তাহলে এর শেষ কোথায়?
২
উপন্যাসটা শুরু হয়েছিল এক আকস্মিক আর্তনাদের মধ্য দিয়ে। সুতীব্র সেই ‘না’ ধ্বনি বিরাজমান বাস্তবতার প্রতি প্রত্যাখ্যানও বটে। কিন্তু তারও অধিক, বাস্তবতার সঙ্গে খাপ-খাওয়াতে না পারা। নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার এই ‘না’ বেশ কয়েকবার উচ্চারিত হয় উপন্যাসে। এ কারণে নিকোলাস লেজার্ড মন্তব্য করেছেন, উপন্যাসটার নাম ‘না’-ও হতে পারত। প্রসঙ্গত তিনি থমাস বার্নহার্ডের ইয়েস (হ্যাঁ) উপন্যাসের প্রচ্ছন্ন প্রভাবের কথা বলেছেন। স্বীকার করতেই হবে, এই ‘না’ কথাটা বেশ নাটকীয় উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে কাহিনির বয়ানে। পুরো উপন্যাসটাকে টেনে নিয়ে গেছে এই সামান্য কথাটুকু। কেননা পাঠের সূচনাতেই আমরা উদগ্রীব হয়ে উঠি—কেন এই ‘না’? এর উত্তর পেতে আমাদের উল্টে যেতে হয় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। ক্রমান্বয়ে আমরা বুঝতে পারি এই ‘না’ হচ্ছে লেখকের পিতা হতে না পারার ও না চাওয়ার মর্মন্তুদ বেদনা। সেই বেদনা আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে, যখন তার ছেড়ে যাওয়া স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে আসে একটি কফিহাউজে। উদ্দীপনাময় জীবনের পিপাসা তার স্ত্রীকে চলে যেতে বাধ্য করেছে। অবলীলায় সে বিয়ে করেছে একজন খ্রিষ্টান ডাক্তারকে। ফুটফুটে দুটি ছেলেমেয়ের হাত ধরে সে প্রবেশ করে কফিহাউজে।
কারতেশ বলেছিলেন আমি একবার মরেছিলাম, যেন বেঁচে উঠতে পারি। তার উপন্যাসের নায়ক সেই মৃত্যুর হাত থেকে এবার রক্ষা করতে চান নিজের সন্তানকে। কিন্তু সেও কি সম্ভব? কী নিশ্চয়তা আছে তার? সন্তানের মৃত্যুকে এড়ানো যেতে পারে কেবল তার জন্মকে রোধ করে। তাই পিতা হতে চান না তিনি। আয়রনি হলো এই, যে শিশু জন্মাল না সে তো মৃত্যুতেই লীন। ফলে তার জন্য কান্না আর হাহাকার ভিন্ন আর কোনো স্মৃতি নেই, থাকতে পারে না মানুষের জীবনে। শোক প্রকাশের কৃত্যকেই বরণ করেছেন লেখক। কাডিস শব্দটি তার কাছে জীবনের সমর্পণ। উপন্যাসের শেষে এসে ঈশ্বরকে বলছেন : ‘নিজেকে তুলে ধরার সর্বশেষ অন্তরঙ্গ প্রচেষ্টায় আমার পলকা একগুঁয়ে জীবনকে নিবেদন করছি, আমার জীবনকে নিবেদন করছি যাতে আমার উঁচু করে তুলে ধরা হাতে এই জীবনের লটবহরসহ চলে যেতে পারি আর দ্রুত প্রবহমান উষ্ণতার কালো, অন্ধস্রোতে ডুবে যেতে পারি...’ (কারতেশ : ৯৬)।
আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখব এর কথক, যিনি মূলত একজন লেখক ও অনুবাদক, তিনি তার ইহুদি পরিচয়কে স্বীকার করেন না বলেই ভেবেছিলেন। সেই তিনিই শেষ পর্যন্ত তার ইহুদিত্বকে বরণ করে নিচ্ছেন। কারণ তিনি বুঝতে পারছেন, কেবল ইহুদি হবার কারণেই একটি গণহত্যার অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে তাকে আসতে হয়েছে। জীবনের রূঢ় সত্যকে তিনি অনুভব করেছেন, যা তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। এই সত্যকে তিনি হারাতে রাজি নন কোনো কিছুর বিনিময়েই। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ছটায় তাকে ম্লান হতে দেবেন না, এই তার ব্রত। তাই সেই আউশভিচ কনসেন্ট্রশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতাকে স্বেচ্ছায় বয়ে চলেন সর্বদা। তারই ভেতর থেকে খুঁড়ে বের করে আনতে চান নিজের অস্তিত্বকে। তার লেখনীও চলে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, সভ্যতার এই গ্লানি যদি সেইসব মানুষকে স্পর্শ করে, যারা লাঞ্ছিতের জন্য এখনও লজ্জিত হয়।
অস্তিত্ব, অনস্তিত্ব, স্থায়ী, ক্ষণস্থায়ী, আত্মা, আদল—এমন কয়েকটি শব্দকে আশ্রয় করে লেখকের চিন্তার স্ফুরণ ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই দার্শনিক উচ্চারণগুলি প্রায়শ রূপ নিয়েছে কাব্যিকতার। যেমন : ‘তখন মাঝেমধ্যে খেয়াল করে দেখছিলাম নারীর একজোড়া চোখ আমার মুখের ওপর আঠার মত লেগে আছে যেন আমার ভেতর থেকে ঝর্নাধারার মত কোনো প্রবাহ আশা করছে : আমি আদি এক ধারণার অস্তিত্বের কথা বলছিলাম যা অজানা কোনো পার্থিব প্রভাবে আমাদের শরীর, আত্মা, আমাদের ভেতরের পশু—কোনো কিছুর দ্বারাই প্রভাবান্বিত নয়’ (কারতেশ : ৫৬-৫৭)।
এই কাব্যিকতা কবিত্বময় বর্ণনার নিরিখে বিবেচ্য নয়। অন্তর্জগতের নানা প্রতিক্রিয়া, ভাষাতীত বেদনার উপলব্ধি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই তাকে বিচার করতে হবে। ব্যাপারটা আউশভিচের মতোই—ব্যাখ্যা করার নয় বলে যার সম্পর্কে চুপ থাকতে হবে—এই কথা লেখক মানেন না বলেই তিনি অব্যাখ্যেয় আত্মসমীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। এবং এই আত্মসমীক্ষার সত্যনিষ্ঠতা উপন্যাসটিকে ‘আত্মজৈবনিক’ মর্যাদা দান করেছে।
এ পর্যায়ে আলোচনার ইতি টানব অনুবাদক সম্পর্কে দুটি কথা বলে। ক্রিস্টোফার সি উইলসন ও ক্যাথেরিনা এম উইলসন-কৃত ইংরেজি অনুবাদের বাংলায়ন করেছেন দুলাল আল মনসুর। এ কথা স্বীকার করতেই হয়, বাংলা অনুবাদের ভাষা মোটের ওপর প্রাঞ্জল, তবে প্রাণবন্ত নয়। তার কারণ দীর্ঘ বাক্য এবং প্রবন্ধাত্মক শব্দের (যেমন : অন্তর্ভুক্তকরণ) প্রয়োগ। দীর্ঘ বাক্যের একটা উদাহরণ দেয়া যাক:
কোনো ইনফ্লুয়েঞ্জাগ্রস্ত রোগী বিছানায় শুয়ে কাউকে তার আশেপাশে টুকিটাকি কিছু করতে দেখে বা এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখে, তার কাজকর্ম ঘোরাফেরা নিয়ন্ত্রণের জন্য অতীতের সুস্থ অবস্থার মতো দুএকটা ক্লান্ত কথা বলে, আর উপস্থিত ব্যক্তি যদি না শোনে বা শুনতে না পায় তাহলে সে সমস্ত প্রচেষ্টা পুরোপুরি দুর্বলতার সাথে বাদ দিয়ে দেয়—আমার মন কাজকর্মকে ঐ রোগীর মতো অনুসরণ করে। (কারতেশ ৫৩)
আক্ষরিক অনুবাদ অপেক্ষা ভাষান্তর এসব ক্ষেত্রে সহায়ক হতো বলে অনুমান করা যায়। তা সত্ত্বেও উপন্যাসের মূল সুরটি ধরতে পাঠকের সমস্যা হয় না। চূড়ান্ত অর্থে ‘রিলেইট’ করা যায়। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার বয়ান হিসেবে একে আমরা অনায়াসে পাঠ করতে পারি।
৩
কিন্তু পাঠের শেষে আরও পাঠ উন্মোচনের ব্যাপার সামনে চলে আসে। আপাতদৃষ্টে খুব নিরীহ আর বিষাদময় মনে হতে পারে উপন্যাসের কথক-চরিত্রের এই অ্যান্টি-নাটালিস্ট (জনন-বিরোধী) পজিশন। অপার শূন্যতায় যেন ট্রমা-শাসিত এক জীবন। এইখানে, একটু সতর্কভাবে খেয়াল করলে আমরা দেখব, সে জীবন কেবল ক্ষত বয়েই বেড়াচ্ছে না, তার অঙ্গীকারে বরং এই ক্ষত ফেরি করার প্রস্তাব আছে। সভ্যতাকে বিব্রত করা, বিশ্ববিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রচ্ছন্ন বাসনা রয়ে গেছে।
এই বাসনারই সংগঠিত রূপের নাম ‘ইয়াদ ভাশেম’ (Yad Vashem)। ইসরায়েলে প্রতিষ্ঠিত এই হলোকাস্ট মেমোরিয়াল সেন্টারে সমস্ত ক্ষত সঞ্চিত রয়েছে। একই নামের ইউটিউব চ্যানেলে দিবানিশি চলছে তারই ভিজুয়াল অর্কেস্ট্রেশন।
দুর্ভাগ্য ও দুর্দশার এই প্রদর্শন কেবল একশ বছরের ইতিহাস নয়, বরং হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে পথে এই বেদনাগাথা রচনা করে এসেছে ইহুদিরা। সে কারণে ইহুদি রাষ্ট্রের প্রবক্তা থিওডর হার্জেল তার প্রকল্প-পুস্তিকায় শতাব্দীকাল আগে বলে গেছেন, আমাদের দুর্দশাই আমাদের চালিকাশক্তি।
বিশ শতকের পটভূমিতে এই চালিকাশক্তিকে আমরা দেখি দুই দিক থেকে ক্রিয়াশীল হতে। প্রথমত জাতিগত সংহতি সৃষ্টিতে, যার রাজনৈতিক নাম জায়নবাদ। দ্বিতীয়ত, অপরের সহানুভূতি আদায়ে, যার ঐতিহাসিক পরিণাম বেলফোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
প্রসঙ্গত আমাদের মনে পড়ে যাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের কথা। কখনো ডাকাত, কখনো ভিক্ষুক—নাম তার ভিখু—সে খুব ভালো করে জানে ক্ষত মুছে গেলে ভিক্ষা মিলবে না। শরীরের ঘা-টাকে তাই নিজ হাতেই দগদগে করে তুলতে হয় প্রতিদিন।
কিন্তু ভিক্টিম কার্ড প্লে করে করুণা কুড়ানো এক জিনিশ আর অন্যকে ভিক্টিমাইজ করা আরেক জিনিশ। আক্রান্ত যখন আক্রমণকারীর ভূমিকা গ্রহণ করে তার পেছনে ন্যায়সঙ্গত যুক্তির চেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল থাকে ভয়, অস্তিত্বসংকট ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ। এসবেরই সামষ্টিক পরিণতি হলো অপরের প্রতি ঘৃণা।
এই বিষয়টা প্রামাণিক করে তোলার জন্য আমরা দ্বারস্থ হতে পারি মাহমুদ মামদানির হোয়েন ভিক্টিমস বিকাম কিলার্স বইটির। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে রুয়ান্ডায় যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, ৫ লক্ষাধিক তুতসি খুন হয়েছিল হুতুদের হাতে, সেখানে স্পষ্টত ক্রিয়াশীল ছিল হুতুদের মনে অতীতের দুর্দশার পুনরাবৃত্তির ভয়। জার্মান-বেলজিয়াম ঔপনিবেশিক শক্তি রুয়ান্ডার ন্যাটিভদের মধ্যে সৃষ্টি করেছিল দুইটি পলিটিক্যাল ক্লাস। উপনিবেশ-নির্মিত ইতিহাসের বয়ানে তুতসিদের উন্নত জাত বলে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে সংহত করা হয়েছিল। হুতুদের অবস্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল শাসনযোগ্য প্রজাশ্রেণি হিশেবে। তাই ১৯৫৯ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া রুয়ান্ডা-রেভুলেশনের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল খুব স্বাভাবিক কারণে। এবং এতে মদদ জুগিয়েছিল বেলজিয়ান প্রশাসন। প্রায় অনুরূপ চিত্র আমরা দেখব ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পূর্বে ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম দশায়।
স্বাধীন রুয়ান্ডা প্রতিষ্ঠার পর থেকে হুতুদের ক্ষমতাপ্রাধান্য বজায় ছিল অলমোস্ট ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। একই বছরের জুলাইয়ের শুরুতে তুতসিদের সামরিক সংগঠন রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্টের বিজয়ের মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতা হারায়। কিন্তু উগান্ডায় নির্বাসিত তুতসিদের তৈরি এই ফ্রন্টের ক্ষমতা দখলের ভীতি আপামর হুতুদের পরিচালিত করেছিল গণহত্যার দিকে, যা ত্বরান্বিত হয়েছিল মূলত সে বছরের ৬ এপ্রিলে সংঘটিত বুরুন্ডি ও রুয়ান্ডার হুতু বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্টযুগলের একযোগে হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায়। হুতুদের মনে তুতুসিদের প্রতি ঘৃণা ও ত্রাস সঞ্চারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল দুটি গণমাধ্যম। প্রথমত ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্বিমাসিক পত্রিকা Kangura (অপরকে জাগাও), দ্বিতীয়ত ১৯৯৩ সালে সম্প্রচার শুরু করা রেডিও স্টেশন Radio Télévision Libre des Mille Collines (RTLM)। এরা তাদের পাঠক-শ্রোতাদের বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিল, তুতসিরা ক্ষমতায় এলে হুতুরা আবার দাসে পরিণত হবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ গণহত্যায় শুধু নয়, আন্তর্জাতিক মাস-কিলিংয়ে গণমাধ্যমের যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে তা আমরা বিবিসি, সিএনএন-এর দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। আফগানিস্তান বা ইরাকে বোমাবর্ষণের আগে তারা বিপুল নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিল জঙ্গি-আতঙ্ক সংক্রমণে। সে আতঙ্ক মুছে যায় নি আজও, কিন্তু ব্যাবিলন ছাই হয়ে গেছে।
এবারে দৃষ্টি ফেরানো যাক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের দিকে। এখানে যা ঘটছে তাকেও এককথায়, কলোনিয়াল হ্যাঙওভার না ব'লে, বলা উচিত কলোনিয়াল পয়জনিং। এই পয়জন পুশ করেছিল মুখ্যত ব্রিটেন, কার্যত মার্কিন প্রশাসন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে উদ্গিরণময় দুটি জ্বালামুখ। যাদের কাজ হলো দেশে-দেশে ঘরে-ঘরে অগ্নিপ্রজ্বলন।
পক্ষান্তরে, হলোকাস্ট-উত্তর ইহুদি মানেই ‘সন্ত্রস্ত’ ইহুদি। কোনো সন্দেহ নেই, আমাদের আলোচ্য উপন্যাসের নায়ক সে দগ্ধ বাস্তবতার এক ধূসর ছায়ামূর্তি। বস্তুতপক্ষে তার সন্ত্রস্ত মনোবৃত্তিই পরবর্তীকালের ইহুদিসৃষ্ট সামরিক সন্ত্রাসের উৎস। সাপের আতঙ্কিত-বোধ সর্পদংশনের সূত্র যেমন। রেটোরিক্যালি বলতে পারি, হলোকাস্টের হ্যালোইন উৎসব যদি হয় ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি, পৌরাণিক স্মৃতি সেখানে কেবল সম্প্রসারণের উদ্দীপনা। আর তার নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা ভূমধ্যসাগরতীরে গোপন ও প্রকাশ্য সকল হামলা ও জবরদখলের পরাক্রান্ত যুক্তি।
ইসরাইল রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে বৈধতা বিতরণকারী পশ্চিমা জগৎ কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে বাঁধা—এমন সিদ্ধান্তে যাবার আগে কলোনিয়াল ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি এবং ন্যাটিভদের মধ্যে আপার ক্লাস তৈরির ইতিহাস স্মরণে আনা দরকার। সেমিটিকদের মধ্যে আরব-ইহুদি সংঘাত জারি রাখা, অর্থাৎ সংহত ও সমৃদ্ধ জাতির মধ্যে একটা বাইনারি-অপজিশন খাড়া করানো ছাড়া পশ্চিমা সভ্যতার ভাবাদর্শগত আধিপত্য যে টেকে না—এ প্রত্যয় পর্যালোচনা করা জরুরি। কিন্তু সে আলোচনা অন্যত্র।
শেষ কথা হলো, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের ‘ক্ষত আগলে রাখার ব্রত’কে জনৈক ভদ্রলোকের ব্যথিত অভিমান বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বিশেষত জায়নবাদী ইহুদির আগ্রাসী চরিত্র যখন আজ আমাদের সামনে জলজ্যান্তভাবে হাজির।