রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটা সমস্যা চট করে আমাদের চোখে পড়ে। সেটা হলো প্রগল্ভতা। কবিতাকে কথা ও কাহিনি করে তোলার খাসলত শুরু থেকেই তার মজ্জাগত। কবিতা লিখতে লিখতে কবিতার ব্যাখ্যা লিখে দেয়া অর্থাৎ রাত্রি নাম্নী কোনো পাঠিকার চিত্তে ‘বিশদ জোছনা’ ফেলার এক বিশেষ প্রবণতা তার আকৈশোর-চর্চিত। এই যে বেশি বলা, ফেনিয়ে তোলা—এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতাটি। এ কবিতার প্রথম দুতিনটি স্তবকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে কবি কী বলতে চান। তারপরও তিনি থামছেন না। বিচিত্র উপমা-অনুষঙ্গে তার বাগবল্লরি কেবলই পল্লবিত হয়ে চলেছে। তাতে নতুন নতুন রূপের উন্মোচন হচ্ছে, কিন্তু নতুন ভাবের উন্মেষ আর ঘটছে না। ফলে, ভাব-শিকারি তরুণ কবি এ ভাষারণ্য ত্যাগ করে অন্যত্র যাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে মনে মনে। তৈরি হচ্ছে অন্তর্গত বিচ্ছেদ।
দ্বিতীয় বিচ্ছেদের নাম : প্রত্নায়ন। মানে, কবিতায় আশ্রিত রূপকল্পের অতীতে পর্যবসিত হওয়া। রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাব-সংস্কৃতির সেই ‘রূপান্তর বিন্দু’, যাতে হাজার বছরব্যাপী কাব্যে ব্যবহৃত মেটাফরসমূহের দ্রুত অপসারণ ঘটেছে—প্রাত্যহিক বাস্তবতা থেকে। যেমন : রাজা, রানি, রথ, ডাকঘর, তপোবন, খেয়ানৌকা, জীবনতরী, জীবনদেবতা—সব মিলিয়ে এমন একটি জগৎ, যা আমাদের কাছে অনেকখানি অতীত বা স্মৃতিসম্পদে পরিণত। জীবনের জীবন্ত ও জাগ্রত বস্তু-প্রতিবেশ যে নতুন মেটাফর দাবি করছে কবিতার কাছে, তার উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি তার কবিতাকে চর্যাপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রবীন্দ্রকাব্যে পরমের দ্বারা শান্তি ও নিশ্চয়তাবিধানে কোথাও যে কোনো প্রশ্ন নেই তা নয়। কিন্তু সে প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে তাকে নির্মূল করার বাসনায়।
তৃতীয় বিচ্ছেদটি হলো পরমের ধারণায় আত্মসমর্পণ। রবীন্দ্রকাব্যে পরমের দ্বারা শান্তি ও নিশ্চয়তাবিধানে কোথাও যে কোনো প্রশ্ন নেই তা নয়। কিন্তু সে প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে তাকে নির্মূল করার বাসনায়। যেমন তার শেষ কবিতাটিতে জগৎ প্রবঞ্চনাময় বলবার পরই তিনি সমাধান দিচ্ছেন—‘এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;/ তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।’ এমনকি বিশ্বময় এত যে উৎপীড়ন, তার নিয়ন্তা শক্তিরূপ সেই পীড়নশীল পরমকেও তিনি বরণ করে নেন মধুর মর্ষকামিতায়—এই করেছ ভালো, নিঠুর,/ এই করেছ ভালো।
খুব সংক্ষেপে ও মোটা দাগে আমরা তিনটি ছেদরেখা টানার চেষ্টা করলাম, যেখানটায় এসে রবীন্দ্রকাব্য অনেক তরুণের কাছে প্রণম্য তো নয়ই, অনেকখানি বর্জনীয় হয়ে উঠল।
২
কিন্তু তারপরও, রবীন্দ্রনাথের কবিতা কেন বর্জন করা চলে না, সেটা ভাবা দরকার। রবির কবিতায় বিদ্যমান দ্বিধা ও দ্বৈরথের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে পারলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে উঠবে আশা করি।
আর্টের প্রশ্নে ঠাকুর বেশ কিছু বাইনারি অপজিশনকে তার কবিতায় জাক্সটাপজিশনের চেষ্টা চালিয়েছেন জনমভর। একটি সরলরেখার দুই প্রান্তকে বাঁকিয়ে নিয়ে একটা বৃত্তের পরিধি রচনার প্রয়াস বলতে পারি। সেই প্রান্তবিন্দুগুলি অনেকটা এমন—প্রাচ্য-প্রতীচ্য, লোকসংস্কৃতি-বাবুসংস্কৃতি, জনহিত-জনতুষ্টি, আস্তিক-নাস্তিক, বস্তু-অবস্তু, মূর্ত-বিমূর্ত, রোমান্টিক-আধুনিক, ক্লাসিক-প্রাত্যহিক, নির্দিষ্টতা-অনির্দিষ্টতা ইত্যাদি।
প্রত্যেকটি বিষয় ধরে ধরে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। অন্তত দুটি পয়েন্টে আমরা আলোচনা করব। কেননা সাম্প্রতিক কাব্যপ্রয়াসে দ্বিরাগমনের মতো এ দুটি প্রসঙ্গের দোলাচল টের পাওয়া যায়। সে দুটি যুগলবৈপরীত্যের নাম—আস্তিক-নাস্তিক এবং নির্দিষ্টতা-অনির্দিষ্টতা।
পূর্বদেশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্ম ও পর, ঘর ও বাহির, অতীত ও ভবিষ্যৎকে চক্রাকারে, একই পরিধিপথে চালনা করার নিরন্তর যে প্রয়াস, সে প্রয়াসেরই সশব্দ উচ্চারণ হলো—আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব।
একদিকে মানুষের কল্পনা ও স্মৃতিশাসিত যে অতীন্দ্রিয় জগৎ, তা থেকে বিচ্ছুরিত অনুভূতিরাশি, অন্যদিকে যুক্তিশাসিত অতিপ্রত্যক্ষ বাস্তবতা ও তার ঘাত-প্রতিঘাত—এ দুই মেরুকে আমরা ধরতে চাইছি আস্তিক-নাস্তিক ডাইকোটমির মধ্যে। রবীন্দ্রকাব্যে যে পরম ‘তুমি’ রূপে হাজির থাকে, আমাদের প্রতিদিনকার আমি-তুমির অভিজ্ঞতার চাপে তা নেমে আসে বন্ধু ও সঙ্গীর বেশে, কখনোবা এসে হাত ধরে প্রেমাস্পদ হয়ে। আরও গভীরে গিয়ে আমরা দেখব, সেই তুমি শেষ পর্যন্ত ‘আমার আমি’ হয়ে সংলাপে ও সংকল্পে আপাত মুখরতাসহ আতত নীরবতায় ঠাঁই পায়। পরমের এই প্রয়াণকে পশ্চিমা পরিভাষায় ডিথিয়োলাইজেশন বললে আদতে কম বলা হয়। পূর্বদেশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্ম ও পর, ঘর ও বাহির, অতীত ও ভবিষ্যৎকে চক্রাকারে, একই পরিধিপথে চালনা করার নিরন্তর যে প্রয়াস, সে প্রয়াসেরই সশব্দ উচ্চারণ হলো—আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব।
এই লীলা কাব্যের জন্য খুব জরুরি এই কারণে যে, এতে কবিতার শব্দ, প্রতীক, উপমা—সব মিলিয়ে কাব্যের যে ধ্বন্যালোক—তা অর্থের নির্দিষ্ট কাঠামো ভেঙে ফেলার ফুরসত পায়। কবিতার বাকপ্রতিমা হয়ে ওঠে দর্পণে বিম্বিত সত্যের মতো। দর্পণের নিজস্ব ও নির্দিষ্ট কোনো বিম্ব বা ছবি নেই। যে মুখ সামনে চলে আসে, তারই প্রতিবিম্ব সে রচনা করে। এভাবেই দর্পণ নির্দিষ্ট একটি কাঠামো দান করেও তা অনির্দেশ্য, সদা-পরিবর্তনশীল এক অনিত্যতার ধারক হিশেবে আমাদের অবধারণে জেগে থাকে।
৩
এইখানে এসে সেই চিরকেলে দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটে। অর্থাৎ কবিতায় কোনো বক্তব্য থাকবে কি থাকবে না, কবিতা নির্দিষ্ট কোনো মানে তৈরি করবে কি করবে না, সেই প্রাগৈতিহাসিক টানাপড়েনের একটা রফা।
একটা কবিতায় ঠাকুর বলছেন : নাম রেখেছি কোমল গান্ধার,/ মনে মনে।/ যদি তার কানে যেত অবাক হয়ে থাকত বসে,/ বলত হেসে ‘মানে কী’।/ মানে কিছুই যায় না বোঝা সেই মানেটাই খাঁটি।
এখানে তো স্পষ্ট, মানে একটা আছে বটে, কিন্তু তা বোঝা যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না? কারণ তা স্থির-নির্দিষ্ট নয়। মুহূর্তে মুহূর্তে পাল্টে যাচ্ছে, প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতার সাথে সাথে। অনিত্যতার সেই চিরন্তন রূপকে কিভাবে ধরা যায় কবিতায়, তা আমরা একটা উদাহরণের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করব। উদাহরণটা নিচ্ছি একটা গান থেকে। বলা প্রয়োজন, রবির কবিত্বের পরাকাষ্ঠা আমরা খুঁজে পাই তার গানে। সেখানেই তিনি সবচেয়ে সংহত। সম্ভবত গানের কাঠামোগত পরিসরের অপ্রতুলতা কবিকে বাকসংযমে নিষ্ঠাবান হতে সহায়তা করেছিল।
তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার
কত রঙে রঙ-করা।
মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার
অশ্রুর রসে ভরা ॥
সহসা আসিল, কহিল সে সুন্দরী
'এসো-না বদল করি'।
মুখপানে তার চাহিলাম, মরি মরি,
নিদয়া সে মনোহরা ॥
সে লইল মোর ভরা বাদলের ডালা,
চাহিল সকৌতুকে।
আমি লয়ে তার নব ফাগুনের মালা
তুলিয়া ধরিনু বুকে।
'মোর হল জয়' যেতে যেতে কয় হেসে,
দূরে চলে গেল ত্বরা।
সন্ধ্যায় দেখি তপ্ত দিনের শেষে
ফুলগুলি সব ঝরা ॥
পরস্পর-বিরোধী ভাবের আপসরফা করে কেবল আপন সংবেদনের আলো ফেলে কিভাবে উপলব্ধির জগৎ নির্মাণ করা যায় সেই দৃষ্টান্ত পরখ করে নেয়া যেতে পারে ঠাকুরের পদাবলি ও পঙ্ক্তিনিচয়ের মধ্যে।
গানটার প্রথম লাইন : তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার। পরবর্তী অংশে তাকে বিশেষায়িত করে লিখছেন : কত রঙে রঙ-করা। এই বাক্যের প্রথম অর্থগত দ্যোতনা হলো, ঝলমলে রঙিন পুষ্পের প্রলোভন। গানের শেষে গিয়ে বুঝব, রঙে রঙ-করা কথাটার নিহিতার্থ ‘ফেক’ বা কৃত্রিম। গানটির দ্বিতীয় চরণ : মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার। তাকে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলতে কবি লিখছেন : অশ্রুর রসে ভরা। এই বাক্যের প্রথম অর্থগত দ্যোতনা হলো, নিঃস্ব-নিরানন্দ জীবনের ক্লান্তি। যথারীতি গানের শেষে এই অর্থ পাল্টে গিয়ে হবে : অভিজ্ঞতার অমূল্য নির্যাস, সাধনার ফল।
গানটা ছিল প্রেমের, আমি-তুমির লীলাভূমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেমের প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে তা আটকে রইল না। সেখান থেকে সরে গেল জীবনের সার-সন্ধানে ব্যাপৃত এক নিভৃত সত্তার স্বখাত-সলিলে, ব্যর্থতা-সঞ্জাত অভিজ্ঞানে। ফুল, ফল, মালা ও ডালা—অতিচেনা ও অতিজীর্ণ এই মেটাফরগুলি ব্যবহার করে কবি আমাদের নিয়ে গেলেন এক চিরন্তন হাহাকারের মধ্যে। এটাকেই আমরা বলছি নশ্বরতার আদলে শাশ্বত রূপ নির্মাণ। প্রাত্যহিকের কণ্ঠে ক্লাসিকের বরমাল্য।
৪
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে বাহ্যত কিছুই নেবার মতো নেই আমাদের। কিন্তু শেখার আছে কবিতার অন্তর্গত বুনন, বয়নরীতি। দেখার আছে বিচিত্র বিপরীত-সন্নিবেশের দ্বৈতাদ্বৈত লীলা। পরস্পর-বিরোধী ভাবের আপসরফা করে কেবল আপন সংবেদনের আলো ফেলে কিভাবে উপলব্ধির জগৎ নির্মাণ করা যায় সেই দৃষ্টান্ত পরখ করে নেয়া যেতে পারে ঠাকুরের পদাবলি ও পঙ্ক্তিনিচয়ের মধ্যে।
সত্যি বলতে কি, আত্মকণ্ডুয়ন-কুলষিত, ব্যক্তিগত কূপ-খননের যে একটি কাব্যধারা আশির দশক থেকে উৎসারিত, পরবর্তীকালে শব্দক্রীড়ায় পর্যবসিত, তার উৎসাদন সম্ভব হতে পারে রবীন্দ্রকাব্যপাঠের আন্তরিক অভিজ্ঞতা থেকে।