গালিব নিশ্চিত ধনুর্বিদ। ওর মতো শব্দকে ছিলায় বাঁধতে আর ঘূর্ণায়মান মীনচক্ষুর মতো হৃদয় বিদ্ধ করতে পারে ক'জন? গালিব তির ছোড়ে, মুহূর্তে আরশি ছত্রখান হয়ে উঁকি দেয় শতেক মুখ, লুটিয়ে পড়ে মৎস্যগন্ধা থেকে যোজনগন্ধা; মিথচাষ থেকে মেট্রোপলিটন, নিভৃত এতেকাফ থেকে আট্টহাসির হান্ড্রেড জোকস—যেন দর্পণ থেকে ঠিকরে পড়া দর্শন, চেতন থেকে অধিচেতন, শয়নঘর থেকে মর্চুয়ারি—সব ওর ছিলায় এঁটে যায় ছত্রবদ্ধ অবলীল—পাথরও পর্যবসিত হয় পুলকপুষ্পে, আর তার বিভা যেন ১৯ ক্যারেট গোল্ড! তাকে অভিবাদন।
- মাজুল হাসান
সুরের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে অর্থহীনতার প্রবাহ দিয়ে অর্থকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া আছে তারানায়। গালিব তারানার পটভূমি হিসাবে নিয়েছেন অন্ধকারকে, মানে শূন্যকে—যার মধ্যে কিছু নেই, কিন্তু সবই আছে একসঙ্গে। গ্রন্থনামের মধ্যে তাই বিপুল স্বাধীনতা ব্যবহারের ইঙ্গিত আছে। শুধু শব্দ বা অনুষঙ্গই নয়, বিচিত্র চিন্তাকেও মিলিয়ে দিয়েছেন গালিব। ফুল তাই পেট্রোলিয়ামের সুবাস ছড়িয়ে দোলেই না শুধু, পাঠকের অনুমানকেও নস্যাৎ করে চলে। গালিব ছন্দের আঁটো কাঠামোতে যেমন নিজেকে প্রসারিত করেছেন, তেমনি ছন্দের মুক্ত পদক্ষেপেও পরিসীমা বাড়িয়ে নিয়েছেন—প্রবাহ কখনই স্বচ্ছলতা হারায় নি। এ জন্যই তারানা, যেখানে অপার স্বাধীনতা ও ছক গড়ার খেলা চলমান—অর্থকে সঙ্গে নিয়েছেন, চিন্তাকেও; কিন্তু প্রয়োজনে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে পথের পাশে ছেড়ে আসতে কসুর করেন নি। তারপরও বলব, কবি এ কবিতাগুলোতে উদ্ধত নন, কিংবা নন দুর্বিনীত; বরং নিজের দিকে মর্মের পানে তাকিয়েছেন নম্র গভীর চোখে, যেন কিছুটা অভিমানাহত। এখানেই কবি ও কবিতার বিজয়, পাঠকেরও।
- রাশেদুজ্জামান
সোহেল হাসান গালিবের কবিতাযাত্রা অবিরাম ভাঙনের—কল ও খল তরঙ্গের। কখনো তার কবিতা অরণ্যে হঠাৎ কোনো নিশাচর কিংবা পরিযায়ী পাখির ডানার ঝাপটানি, কখনো তা ধানি প্রান্তরের হাওয়ার গান, কখনো মেঘের দিগন্তে হাওরের দোতরার সুর, কখনো সমুদ্রের স্বর। কবিতায় তিনি এই বাংলার নদী, অরণ্য আর মাঠের ভাবুক। আঙ্গিক আর বয়নে চলনচিহ্ন আছে তার। কতটা প্রবল ও অক্ষয় সেই চিহ্নরেখা তা তো ঠিক করে দেয় কবির জীবনদৃষ্টি ও কাব্যবীক্ষা। তার এই দুই দশকের অবিরাম পরিবর্তমান কাব্যযাত্রায় যোগ হলো কি নতুন কোনো বীক্ষা? বাংলা কবিতার স্বভাবে ও স্বধর্মে আর কবির স্বদর্শনে লেখা হলো কি অভিনব কোনো কিছু? ‘তিমিরে তারানা’ই বলবে সেই কথা।
- ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
সা ত টি ক বি তা
হাওয়া
. বনের মৌমাছি সব একে একে উড়িয়ে এনেছে হলুদ রঙের হাওয়া। হুমকি। ছড়ালো কি দিন আজ ফুলে ফুলে, মৃদু পেট্রোলিয়াম সুবাসে? কোথাও অরণ্য ছিল, আছে নাকি! যদিবা অরণ্য থাকে, তার মধ্যে একটা কুটিরও থাকবার কথা, কুটিরের পাশে চিরবিষণ্ন কামিনী গাছ। সেই বলতে পারে, আমাদের ঈপ্সানত এই ভ্রুভঙ্গির কাছে গোঁসাইবাড়ির মূল্য কত? ফলে জানতে ইচ্ছে হয়, হাড়ের কীর্তন থেকে, আরক্তিম প্রেমের বয়স থেকে মে মাসের আয়ু আশলে কি বেশি? প্রতিটি চিন্তাই ভুল। ভুল বলেই তো হাওয়া ফণা তোলে আর সাপের খোলশ উড়ে যায়। অবিরাম দাও তুমি স্নায়ুতে টঙ্কার। কাঁপাও পাহাড়। মেঘ। ঐরাবত। অথচ জানো না হিমাদ্রির নিচে আজ পরাগকেশর দোলে বুকের ওপর, দোলে কার ঘুুমের থাবায়? ..
দেবলীনা
. কেবল তোমার নামটিকে আলতোভাবে ছুঁয়ে ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভেদ আমি কিছুটা বুঝেছি... শুনেছি তৈমুর লঙ বহু গিরিপথ পাড়ি দিয়ে এসে ছোট্ট এক সরোবরে থমকে দাঁড়িয়েছে দেখতে স্নানদৃশ্য, ভীল রমণীর মানুষেরা আর কত পড়বে গ্রন্থ, যদি নাই খুলবে গ্রন্থি, হৃদয়ের দেবলীনা, সেই কবে থেকে তুমি ভাষাকে কেবলই টানছো বর্ণের ভিতর আমি খুঁজছি আদিগন্ত পৃষ্ঠা মেলে নৈশব্দের পরাগচুম্বন— এইখানে, পাথরে ও তৃণে নামকে ছাপিয়ে দেহ আজও ফুটল না। ফুটবে না তবে কোনো হরফেই? ..
আত্মা
. কবরের ’পর দিয়ে হেঁটে হেঁটে কেউ যদি ফের চলে আসে ভোরবেলা নগ্নপায়, সেই ভয় চুপিচুপি জ্বলে রত্নদীপে আমার সমস্ত রাত্রি। রাত্রি কি নিঃসঙ্গ এক বাদুড়ের নাম, হৃদয়, মৃতের মুশায়েরা? পাতালে সুড়ঙ্গ আছে, চাতালে ময়ূরশয্যা। সুড়ঙ্গের এই শেষ মাথায় এসেই জানলাম, অসমাপ্ত পৃথিবীর পথ। বুঝেছি, নিষ্কৃতি নয়, ছাতিম গাছের নিচে বসে, তুমি হে মৌনী, সেদিন নিষ্ক্রান্তিই চেয়েছিল তবে! কার থেকে? প্রেম আর প্রত্যাশার ফাঁকগুলো আজ দাও যদি ভরিয়ে, গলিয়ে দেহমোম আমি তবে সে তাড়নাপুষ্প হয়ে ফুটি। ..
গোলাপ ও কৌতুক
. শুচিতা, তোমার কাছে এসে অজস্র শুদ্ধিকরণে বিদ্ধ মন। কফিনের ডালা খুলে যদি না তাকে চিনতে পারি এই ভেবে ঘুরি শুধু মর্চুয়ারি। দুরারোগ্য ব্যাধিহীন যারা ছেড়ে যায় পৃথিবীকে, তারাও কি বলে যায়, অন্তর্ধানের পথ কতটা মসৃণ! যেন অন্তরীণ হয়ে আছি দেয়ালের ভেতর। সুন্দরীর শয়নকক্ষে ফটোফ্রেমের পেছনে যে টিকটিকি জাগে পাহারায়, তারও মনশ্চক্ষুর আড়ালে। যদি অট্টহাসিতে ভাঙে এই খেয়াল... প্রুফরিডিংয়ের রুপালি অন্ধকারে ফেলে রাখি ‘হান্ড্রেড জোকস’। জোনাকি তা পড়ে হ্যাজাক নিভিয়ে। একটি ছিনে-জোঁকের অন্তর দিয়ে আমিও করেছি পাঠ তোমার কৌতুকের শোণিতধারা। দেখেছি গোপন গোলাপ পাপড়ি খুলে ফুঁশে ওঠে অভিশাপের মতো। তাই ভেঙে ফেলেছি মার্বেল। ছুড়ে দিয়েছি মুচড়ে-ওঠা আর্শিমহলের দিকে। আকাঙ্ক্ষা, তোমার কাছে এসে টুকরো টুকরো দর্পণে আর খুঁজে না পাই মুখ। ..
যোজনগন্ধা
. মৎস্যগন্ধা থেকে যোজনগন্ধা একটি উত্তাল সঙ্গমের ব্যবধান। যত নিঃশব্দেই জ্বলে উঠুক, সুগন্ধমাত্র সতীত্বমোচনের অপূর্ব কটাক্ষ— সাক্ষী যমুনাজল, টালমাটাল জীবনের খেয়া। তবু কোন পুরুষ নির্বাচিত করে বেশ্যাকে তার পুত্রের জননী বলে? সম্ভবত পরাশর জানে। ১৯ ক্যারট গোল্ডের এই পঙ্ক্তির ভেতর কত ভরি পুরুষতন্ত্র লুকানো তা মীমাংসার আগে আমাদের জানা দরকার সম্ভোগের আহ্বান থেকে পিতাডাকের দূরত্ব ক’ নটিকেল? সূর্যগ্রহণ যদি দেখতেই হয় নেপচুনে গিয়ে দেখব। কিন্তু এও সত্য, দেখা মানে দূরবিন, দৃশ্য মানেই ক্যামেরা। স্বীকার করা ভালো, লেন্সের ভিতর দিয়ে যাকে অনুসরণ করে এতদূর এসেছি সে তোমার নিয়তি নয়, তার নাম বিস্মৃতি। ..
রেল
. সব নারীর মধ্যে মা ও মাগির বাস— দুটি পাত যেন রেল-লাইনের, শুয়ে থাকে পাশাপাশি; উড়ে চলে আদিগন্ত হাত ধরে বৃশ্চিক ও মীন রাশি। পুরুষেরা যায় দ্রুত পার হয়ে মালবাহী ট্রেনের মতন ঝিক-ঝিক ঝাঁকুনিমুখর পথ এই পৃথিবীতে। সে কী ধ্যানযোগ!—মনোযোগ হারাবার নাই তো সুযোগ কোনোটিতে। যেকোনো অবজ্ঞা, হোক এক কণা, যেকোনো মুহূর্তে ঘটাবেই এবং ঘটায় শতাব্দীর ভয়াবহ ট্রেন-দুর্ঘটনা। যদিওবা নেই ফিচকে-পুঁচকে পিকেটার, কোথাও জংশন নেই, নেই কারো হাত চেন টানবার। তবুও হুইসেল বাজে, ওড়ে কত ফ্ল্যাগ। মনে পড়ে বসন্তখচিত মুখ?— স্টেশন-মাস্টার এক... ..