কবিতা দশমী
১
হ্রেষা
উপেক্ষার দৃষ্টিভেদ আমি
ছত্রিশ দিগন্ত ঘুরে তবে
শিখেছি। এবার সামনে এসে
দাঁড়াতেই পারো তুমি, ওই
প্রশ্ন-স্বাক্ষরিত চোখ তুলে।
রবারের বনে, কী গন্ধের
তুবড়িতে থেমে গেল হাসি!
যেতে যেতে হাওয়া বলে হেঁকে :
ঘোড়ায় চড়েছি বটে। আজও
তবু, পার হই নি তো হ্রেষা...
২
জ্যোৎস্না
তাই নামে জ্যোৎস্না—সেমেট্রি ও
ডাকবাংলো-আঙিনায়। যেন
পরানীল হয় পরানের ভাষা!
যেন মুছে যায় ভেদ—ভূতে
আর ভবিষ্যতে। ফুলেদের
অট্টহাসি শুনে যেন ঠিক
বুঝতে পারি, তারার নিনাদ।
কত না রৌদ্রের প্রতিধ্বনি
মৃত এই জোনাকিগুঞ্জন...
কত না চুম্বন সাক্ষী তার!
৩
কেরাত
টের পাই বহুদিন পর
কিতাবের কোলের ভিতর
শুয়ে আছি একটি পালক।
পাখি-শিস-দেয়া আলো ফোটে
শিউলি নাম্নী বালিকার ঠোঁটে
দেখে শুনে আমি আহাম্মক।
ভোরবেলা এমন কেরাত
নিংড়ে নিল সব ঘুমরাত।
মুখে রা নাই, চোখেও জ্বর—
আমার ঘুঘু হারালো স্বর ॥
৪
হংসী
আকাশের ছায়া ধরে রাখে
জল। প্রতিবিম্ব বলে কাকে—
তাই নিয়ে ছুটেছে কৌতুকে
পাখিদের কোলাহল। আজ
ঢেউ তুলে, একটি নিভাঁজ
শাপলার পাতা কার বুকে
শার্টের ভেতর শুয়ে আছে।
শান্তি তবু কত্থকের নাচে
কাঁপায় দিঘির কালো জল—
হংসী, তুই ডাঙা দিয়ে চল ॥
৫
ঘুম
সারারাত তুমি বিছানায়
কাত হয়ে। শোয় নি তোমার
পাশে এসে ঘুম। ‘নেমে আয়’
—অন্ধকার ডেকেছিল, আর
ভোর-ভয়ে পাপড়িতে শিশির
জেগেছিল হিমবাহ ঘামে।
তখন আকাশ-বন্দি খামে
চিঠি আসে তারকালিপির।
হায়ারোগ্লিফিক্স কেন শেখো!
জানালায় রাত্রি খুলে দ্যাখো...
৬
ব্যালেরিনা
নিজেরই ডানার ছায়া দেখে
উড়ে এসে যেই বসে পাখি
অমনি সে ছায়া উড়ে যায়
আকাশেই ফিরে যায় না-কি?—
গাছেদের মনে এই কথা।
কবরের পাশে আতাফুল।
নিজেরই ঘ্রাণের ঊর্ধ্বটানে
মাটি ফুঁড়ে জাগবে কি মূল?
জানবে কখনো ব্যালেরিনা—
একাকী ঘুঙুর বাজে কিনা?
৭
জল
একটি পাতার করপুটে
একটি হলুদ ফোঁটা শুধু—
জ্বলুক বনের শিরে সূর্য
আমার আঙুলে রৌদ্রমধু।
এ আঙুলে ছোঁব না আকাশ,
ছোঁব মেঘ, শূন্যে ভেসে থাকা;
দিগন্তে সে নয়, বন্ধ চোখে
একবার—রংধনুটি আঁকা।
মুছে নেব জল, তবু নদী—
বয়ে যাক, বইতে পারে যদি...
৮
ফোয়ারা
সাফা, মারওয়া—এই দুটি
পাহাড় তো দিয়েছেন প্রভু
তাই টলমল হয়ে ছুটি
পুণ্যব্রতে—স্মৃতির প্রতিভূ
উৎকণ্ঠা যদি-বা সত্য হয়
পেয়ে যাব লুকানো ফোয়ারা
দহনেই তৃষ্ণা হবে ক্ষয়
বলেছিল আকাশের তারা
কিন্তু কোথায় সে মরুভূমি—
মরীচিকা ঠেলে দেখি তুমি ॥
৯
বিপ্রলব্ধ
তমা, তুমি দুঃখ হও। দুঃখ—
সে তো অমাবস্যা-চাঁদ নয়।
বলো, রক্ত-গোধূলির কাছে
কেন দুপুরেরা ম্লান হয়?
আপাত প্রভেদ নেই শুধু
রাত্রির প্রথম ও তৃতীয়
যামে—এই অন্ধ বোধিজ্ঞানে
আলোর অপেক্ষা জেগে থাকে।
হায়! অপেক্ষার আলো কোথা—
ঘুমবনে ফোটে না কুসুম ॥
১০
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
‘অধিবিন্না’ যদি হও তুমি,
আমাকে কি আর বন্ধু মানো?
ফণীমনসাটা ফণা তোলে
যত, জল ঢালো তত বুঝি!
ঢেউ ভেঙে তবু, ডুবে ডুবে
সূর্যও পশ্চিম থেকে পুবে
ছুটে যায়। তাই দৃশ্য খুঁজি—
কুলটা স্রোতের বাঁকা কোলে
কলশি ভাসায়ে কবে আনো
না হারায়ে বিগত মৌশুমি ॥
সোহেল হাসান গালিব
জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...
বিস্তারিত
জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা।
প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন [সমুত্থান, ২০০৭]
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
রক্তমেমোরেন্ডাম [ভাষাচিত্র, ২০১১]
অনঙ্গ রূপের দেশে [আড়িয়াল, ২০১৪]
তিমিরে তারানা [অগ্রদূত, ২০১৭]
ফুঁ [বাতিঘর, ২০২০]
চৌষট্টি পাখুড়ি (আদর্শ, ২০২২)
দরজায় আইভিলতা [ঐতিহ্য, ২০২৩]
প্রেমের কবিতা [ক্রিয়েটিভ ঢাকা, ২০২৩]
পায়ে বিঁধেছে হসন্ত [বুনন, ২০২৫]
প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) [অগ্রদূত, ২০১৮]
আমার খুতবাগুলি [উজান, ২০২৪]
সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) [বাঙলায়ন, ২০০৮]
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) [শুদ্ধস্বর, ২০০৮]
সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।
ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
(স্বল্প)