গাছের শিকড় হতে ঘাসের শিখর ছুঁয়ে

নির্জন এই কবরের পাশে ছেলে বসে কাঁদে :
কেবল একটি বার বাবা যদি তার
বলত একটি কোনো কথা—

গাছের শিকড় হতে ঘাসের শিখর ছুঁয়ে ঠিকই
বাবা হাঁক দেয় জোরে : কবে খোকা ওরে
কেটে যাবে তোর বধিরতা !

ঈদগাহ থেকে গোরস্থানের দূরত্ব কত? সম্ভবত দশ মিনিট। কারণ ঈদগায় নামাজ শেষ করে আমরা দলবেঁধে বাড়ি ফেরার পথে প্রথম যে গোরস্থান জিয়ারত করতাম সেখানে পৌঁছুতে দশ মিনিট লাগত। ধনুকের মতো বাঁকা সেইটুকু পথ। আমার ছোটবেলার ঈদ এই একটি পথে, যেন একটি রেখায় বাঁধা পড়ে আছে। আর এই রেখাটি এঁকেছেন আমার বাবা।

প্রথম কবে ঈদের নামাজ পড়তে গেছি মনে নেই। কিন্তু মনে আছে, নামাজশেষে মাঠের পাশে আমগাছের নিচে আমরা দাঁড়িয়ে আছি কয়েকজন—চাচাত-ফুপাত ভাই—হাতে সবার জায়নামাজ। বাবা ইমাম সাহেবকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, তাকে অনুসরণ করব আমরা। বাড়ি গিয়ে সবাই বাইরের ঘরে বসে একসঙ্গে মিষ্টিমুখ করব, তারপর যে যার মতো মুক্ত। কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যে কোনো নড়চড়ের সুযোগ নেই। ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফেরার পথে যতগুলি কবর পড়বে, একে একে সব জিয়ারত করতে হবে। শেষ গন্তব্য আমাদের লিচুতলার গোরস্থান। আশ্চর্য এই যে, আমাদের পাড়ার সবাই এই রিচুয়াল মেনে চলত। এটা একটা নিয়মের মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

সেই থেকে আমার মনে ঈদের সঙ্গে মৃত্যুর একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছে। যদিও মত্যু ব্যাপারটাকে তখন সামন্যই অনুভব করতে পারতাম। অবলীলায় কবরের পাশ দিয়ে কতবার হেঁটে গেছি, কবরের উপর আতাগাছে উঠে ফুল পেড়েও এনেছি। এত মিষ্টি সে ফুলের গন্ধ, তাতে মৃত্যুর কোনো ঘ্রাণ ছিল না। আর এখন কবরের কাছে প্রায় যাওয়াই হয় না, কিন্তু চারপাশে মত্যুরই আঘ্রাণ।

মৃতের সাক্ষাতে এই যে বারবার আমাকে নিয়ে গেছেন বাবা, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখা হলো তার মাধ্যমেই। ৬৭ বছরে বয়সে ভোররাতে মারা গেলেন তিনি। মারা যাবার আগে মশার কয়েল জ্বালাতে বলেছিলেন মাকে। কয়েল জ্বালাবার কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান। আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল আমার ভাগ্নে, ওর বয়স তখন ৪/৫ বছর। আমি উঠে দেখি বাসায় কান্নার রোল পড়ে গেছে।


সেই প্রথম আমি অনুভব করলাম, মৃত্যু হলো ভাষাহীনতা, ভাষা-বিপর্যয়। চিরতরে সংযোগ-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।


বিছানায় অসাড় শুয়ে থাকা বাবার কাছে গিয়ে আমার একটি কথাই মনে হলো, যদি এখন তাকে ডাক দিই, তার সাধ্য নাই সাড়া দেবার। যদি-বা তিনি সাড়া দেন, আমার সাধ্য নাই তা শুনবার। সেই প্রথম আমি অনুভব করলাম, মৃত্যু হলো ভাষাহীনতা, ভাষা-বিপর্যয়। চিরতরে সংযোগ-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

শিক্ষক বাবা : কোনো এক ছাত্রীর ক্যামেরায়

বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েও বাবা কিন্তু আমাকে সংযোগপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে গেলেন। অনেক আগেই তিনি বলে গিয়েছিলেন তার জানাজার নামাজ যেন আমি পড়াই। মাঝে মাঝেই আমাকে তাগাদা দিতেন, জানাজার নামাজটা ভালো করে শেখো। সে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা আমার ছিল বটে, কিন্তু জানতাম না ইমামতি করতে গেলে বিশেষ কী করতে হয়। তা জানার বা শেখার ইচ্ছাও ছিল না। কারণ আমার ধারণা ছিল, যেদিনই এটা শিখব, সেদিনই মারা যাবেন তিনি।

এই কুসংস্কারবশে আমি আনপড়ই থেকে গেলাম। ফলে তিনি যখন সত্যিই মারা গেলেন, দেখলাম আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ অপূর্ণ রয়ে গেছে। সেই শোকাকুল পরিস্থিতিতে, নামাজ-শিক্ষার বই খুলে পড়তে বসলাম ঘরের দরজা বন্ধ করে। শুধু তাই নয়, আমার ছোটবেলার শিক্ষক এক হুজুরকে সামনে বসিয়ে একটু রিহার্সেলও করে নিলাম। উচ্চারণগুলি শুদ্ধ হচ্ছে কিনা, অর্থটা ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি।

ব্যাপারটা একটু নিষ্ঠুরই বটে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, কাজটা নিখুঁতভাবে করতে হবে। এটা হলো জীবিত ও মৃতের যৌথ-সম্পাদনায় একটি চিঠি-রচনা। দিতে হবে নির্ভুল তথ্য, লিখতে হবে মোক্ষম ঠিকানা—যে ঠিকানায় আমরা যাই নি কখনো।

মৃতের সঙ্গে কি কথা বলবার ভাষা
রপ্ত হবে, এ স্তব্ধতা ছুঁলে—
হীরকের দ্যুতি পেয়ে জ্বলে উঠব কি
জন্মান্ধের চোখ দুটি খুলে?

দাবা খেলায় মগ্ন দুজনে

নিশ্চিতই হ্যালুসিনেশন। নির্জন গ্রামের পথে, শহরের ফাঁকা ফ্ল্যাটে, কখনো নিজেরই ঘরে—ভোররাতের দিকে হয়তো জেগে আছি—কিছু লিখছি বা পড়ছি; মনে হতো তিনি আমাকে ডাকছেন। যেন কিছু বলতে চাইছেন। আমি ভয় না পেয়ে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতাম।

কিংবা হয়তো আমিই ডাকতাম তাকে। সত্যিকার অর্থে শেয়ারিং বলতে যা বোঝায়, সেটা আমার বাবার সাথেই ছিল। অভিভাবকত্বের মোড়কে জড়ানো বন্ধুত্ব বলা যায়। কিংবা কাউন্টারপার্ট, যার মাধ্যমে নিজের চিন্তা ও মতামত যাচাই করে নেয়ার সুযোগ ছিল। বাবার মত্যুর পর এক অর্থে আমিই হয়ে উঠলাম বাবা। অর্থাৎ নিজের অভিভাবকত্ব নিজেই গ্রহণ করলাম। এই গ্রহণের মধ্যেও লুকিয়ে আছে কৈশোরকে ফেলে আসার মতো অনিবার্য এক নিসঙ্গতার বেদনা।


কেমন মৃত্যু চাই আমি—কখনো যদি এমন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হই, নির্দ্বিধায় বলব, বাবার মতন।


তিনি মারা যান প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায়। ব্যাংকে ছিল মাত্র বিশ হাজার টাকা। তার ব্যক্তিগত দেরাজে ছিল কিছু কাগজ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস আর তসবি। অথচ একটা সফল, দায়দেনাহীন জীবন পার করে গেছেন তিনি। সন্তানদের প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে একেবারে নির্ভার প্রস্থান। ঐ শূন্য দেরাজের দিকে চেয়ে তাই মনে হয়, কেমন মৃত্যু চাই আমি—কখনো যদি এমন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হই, নির্দ্বিধায় বলব, বাবার মতন।

তার কফিন সামনে রেখে আমি যখন নামাজে দাঁড়ালাম তখন সূর্য দিগন্তরেখায়। সেখানে মিশে গেছে রক্তাভ-নীল দুটি চোখের বিচ্ছুরণ। পেছনে সারি সারি লোক, যাদের অনেককেই চিনি না। সামনে বিষণ্ন সবুজ ধানখেত। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। দুএকটা পাখিও উড়ছে। কয়েকটি ছিন্নপাতা পড়ে আছে পায়ের কাছে। হঠাৎ একটা কবিতা মঞ্জরিত হয়ে উঠল আমার ভিতর। তারপর ঘরে ফিরে লিখলাম :

দেরাজ

যদি চলে যেতে পারি প্রসন্ন পিতার মতো
অন্তিম নির্দেশ দিয়ে সন্ততিরে, অন্ত্যেষ্টির,

চলে যাব কোনো বাদাবনের আঁধারচোষা আলোটুকু নিয়ে—
দায়-দেনাহীন; লিখে রেখে দেরাজের কোণে
শূন্যফল সরলাঙ্ক। যদিও একটি ছোট্ট পাতার ভিতরে
লুকানো সংহিতা, আছে সাংখ্য—
শিরাজালে ব্যাপ্ত আয়ুসঞ্চার-বাহিনী;
একটি ফুলের শীর্ষে কাঁপে কত রঙ, কত চিত্রল কাহিনি।

ততদিন আমার এ দেরাজটি ভুলেও খুলো না।

অনেক রেণুর অপচয় তুমি দেখেছ বাতাসে,
মেঘেরও ফটিক-জল নেমেছে তো নর্দমায়—
মুছে গেছে শিলালিপি—অবাক পাখির ঠোঁটে
রেখে তার নির্বাক তুলনা;

সবই তুচ্ছ—হয়তো তেমন বালিশের ’পরে
ঝরে-পড়া মাথার চুলও না।

সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা