স্কুলের বাধ্যতামূলক পাঠ্য বইয়ের বাইরে কবে যে প্রথম আউট (বাংলায় বলা যাক ‘অপাঠ্য’) বই পড়তে শুরু করেছিলাম তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। ওই বয়সে পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য যেকোনো বইকেই গুরুজনরা আউট বই বলতেন, যেন আউট ল-এর ব্যঞ্জনামধুর এক শব্দবন্ধ; তো সেই আউট বই স্পর্শ করে নিষিদ্ধ আনন্দের জগতে কবে যে প্রথম প্রবেশ করেছিলাম তা একেবারেই মনে নেই। তবে তা যে হাই স্কুলে উঠবার পরপরই ঘটেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সত্যি কথা বলতে কি, হাই স্কুলে উঠবারও আগে, প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে থাকতেই আমি আউট বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। আমার এক সহপাঠী একদিন রুশ দেশের উপকথা বইটি ক্লাসে নিয়ে এসেছিল। বইটির সুন্দর প্রচ্ছদ আর পাঠ্য বইয়ের বাইরেও যে বইয়ের একটা জগৎ আছে তা দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম ওই অল্প বয়সে। ওর কাছ থেকে বইটি সেদিনই হাতে নিয়ে দুএকটি গল্প পড়ে বিস্ময়ে আরও অভিভূত হয়েছিলাম অবিশ্বাস্য এক পৃথিবীর স্বাদ পেয়ে। অচেনা দেশ অজানা সংস্কৃতির আকর্ষণ সবার মধ্যেই থাকে। শিশু বয়সে তা আরও বেশি থাকে বলে আমার ধারণা। সহপাঠী ওই বন্ধুর কাছ থেকে সেটাই ছিল অপাঠ্য বইয়ের প্রথম পাঠ, অপাঠকের কৌমার্য হারানোর প্রথম শিহরন। সেই দিন থেকেই আমার সত্যিকারের পাঠকসত্তার জন্ম। ওই প্রাইমারি স্কুলে বই ও পাঠের প্রতি আমার আকৃষ্ট হওয়ার আরও একটি গৌণ কারণও মনে হয় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। আমার আরেক সহপাঠী ছিল। গাট্টাগোট্টা নাদুস-নাদুস সেই সহপাঠী বন্ধুটির নাম ছিল সাইদ। সে একদিন, কোনো এক ছুটির দিন সকালবেলা আশ্চর্য উপহার নিয়ে হাজির হলো। বলল, তোমার জন্য একটা জিনিস নিয়ে এসেছি। কী জিনিস দেখি তো—আমি ওই ছোট্টবেলার অস্থিরতার পেখম মেলে ওর প্রতি কৌতূহল প্রকাশ করেছিলাম। সাইদ ওর সার্টের পকেট থেকে ছো্ট্ট এক টুকরো সাদা কাগজ বের করে আমার চোখের সামনে তুলে ধরল। ছোট্ট একটি সাদা কাগজ এত বিস্ময় ধারণ করতে পারে তা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। ওই ছোট্ট কাগজটিতে বড় বড় অক্ষরে আমার নামটি মুদ্রিত, ঠিক যেমনটা বইয়ের পৃষ্ঠায় আমরা লেখাকে মুদ্রিত অবস্থায় দেখতে পাই। আমার বয়স তখন নয় বা দশ। ১৯৭০ বা ৭১ সাল। তখনকার দিনে আজকের মতো প্রযুক্তির প্লাবন এই দেশে ছিল না। বড় জোর টাইপ রাইটার ছিল। জানি ওই সাদা পৃষ্ঠায় সে টাইপ রাইটার নাকি কোনো মুদ্রণালয়ের শিশার টাইপে কম্পোজ করে ওই কাণ্ড ঘটিয়েছিল কিনা। সেই বয়সে তা জানার কৌতূহল আমাদের থাকে না। তো ওই প্রথম নিজের নাম সাদা কাগজে কালো অক্ষরে দেখে হৃদয় আমার অমর্ত্য লোকের আলোয় প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল। আমার ওই বয়সের তুলনায় সেই আলো ছিল দুকূলপ্লাবী। আমার মাথার ভেতরে সাইদ যেন অক্ষরের প্রতি, নিজের প্রতি, পাঠের প্রতি, সর্বোপরি অপাঠ্য বইয়ের প্রতি রূপকথার জাদুকরী বিনের (Bean) বীজ পুঁতে দিয়েছিল যা ক্রমশই বেড়ে উঠেছিল পাঠের অদম্য ক্ষুধায়। আমি মনে মনে মুদ্রিত নামের মোহ থেকে ক্রমশই বইয়ের মুদ্রিত অক্ষরের অনুগত দাসে পরিণত হচ্ছিলাম।
বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, দুর্গেশনন্দিনী, কৃষ্ণকান্তের উইল—এসব বই পড়েছি, স্রেফ তিনি বিখ্যাত লেখক বলে। কিন্তু বঙ্কিমের ওই উনিশশতকী সংস্কৃত ও তৎসম শব্দবহুল ভাষার প্রাচীর আমার কাছে জেলখানার প্রাচীরের চেয়ে এত বেশি উঁচু ছিল যে তা ডিঙিয়ে যাওয়ার সাধ্য আমার ছিল না।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাকে ভর্তি করা হয়েছিল গেন্ডারিয়া হাই স্কুলে। সেখানে ক্লাস সেভেনে থাকতেই পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে বই কিনে পড়ার অভ্যেস তৈরি হচ্ছিল। আমরা তখন থাকতাম পুরান ঢাকার পুরোনো স্বামীবাগে। প্রতিদিন না হলেও, প্রায়শই বিকেলবেলা হেঁটে হেঁটে সদরঘাট এলাকায় চলে যেতাম। বাহাদুর শা পার্ক থেকে সদরঘাটের দিকে যাওয়ার রাস্তাটায় প্রবেশের আগে বাঁদিকের রাস্তায় ফুটপাতে পুরোনো বইয়ের সম্ভার নিয়ে বসে থাকতেন অনেক বিক্রেতা। এছাড়া পাশেই ছিল, এখনও আছে, ছোট ছোট বইয়ের একগুচ্ছ দোকান। আর সদরঘাটে প্রবেশের আগেই বাঁদিকে বাংলাবাজারের যে-বইয়ের দোকানগুলো দুই পাশে সারি বেধে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোই ছিল আমার প্রধান আকর্ষণ। তবে ওই বয়সে এইসব দোকান থেকে বই কেনার চেয়ে ফুটপাতে ভূমিষ্ঠ বইগুলোই কেবল কেনার সাধ্য ছিল। সেখান থেকে প্রথম যে-বইগুলো কিনেছিলাম তার একটা ছিল আল-কামাল আবদুল ওহাব-এর মেঘ বৃষ্টি বাদল আর অন্যটি ছিল মুহম্মদ আবদুল হাই রচিত বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন বইটি। আরেকটি বইও কিনেছিলাম, সেটি ছিল হাতিম তাঈ-এর কিচ্ছাগুলোর একটা অপূর্ব সুন্দর অলংকৃত বই। বইটির অনুবাদক বা সংকলক কে ছিলেন তার কিছুই মনে নেই। কিন্তু বইটির স্মৃতি এতই প্রখর আর প্রগাঢ় যে মনে হয় আজও ওই সংস্করণটা দেখলে আমি ঠিকই চিনতে পারব। পাগল ছিলাম রূপকথার বইগুলোর জন্য। তবে এই বইগুলোর পাশাপাশিই কিভাবে যেন রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী বইটিও পড়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য সেটা পড়ার একটা কারণ ছিল এই যে আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের (তখনও এটি বিশ্ববিদ্যালয় হয় নি) বাংলা বিভাগের ছাত্র। হয়তো বাধ্যতামূলকভাবেই রবীন্দ্রসাহিত্য পড়তে হতো। কিন্তু আমি তা হাতের কাছে পেয়ে অবাধ্য বোধ থেকে পড়েছি। সত্যি বলতে কি, ওই মূল কবিতাটির অর্থ তখন কিছুই বুঝি নি। বুঝি নি ওই বইয়ের বেশির ভাগ কবিতাই। শুধু মনে হতো বাক্যগুলো সুন্দর, চমৎকার ছন্দোময়, ধ্বনিস্পন্দন পাঠককে আন্দোলিত করছে। কিন্তু কিছুতেই শিরোনামের কবিতাটির অর্থ তখন উদ্ধার করতে পারি নি। বলাকাও বোধহয় তখন পড়েছিলাম, সেও ছিল আমার বোধের বাইরে। আসলে রবীন্দ্রনাথ তখন ভালো লাগা থেকে নয়, পড়েছিলাম তার খ্যাতির প্রভাবের কারণে। আমার ওই বয়স তখন সাধারণ গল্প, দেশ বিদেশের রূপকথা, কিংবা বড় জোর বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন-এর মতো বই পড়ার মতো দুধদাঁত গজিয়েছে। এ দিয়ে আমি রবীন্দ্রনাথের শক্ত পেশির মাংস কিভাবে চিবিয়ে খাব! তবে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতায় ওই দুধদাঁত বসাতে অসুবিধা হয় নি। সেটাও যে খুব বুঝেছি, সেটা আজকের পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে বলার সাহস নেই। তখন আসলে নজরুলের বিদ্রোহের উত্তাল স্রোতে ভেসে যাওয়াতেই ছিল অপরিপক্ক এক আনন্দ। কিন্তু ওই কবিতার কত শব্দ, কত যে অনুষঙ্গ আর পর্বততুল্য যে বিপুল ভাবৈশ্বর্য, তার পদতলে আমি তখন মুশিকের মতোই ছুটাছুটি করেছি। ওই বয়সে পাঠের ক্ষুধা থেকে তখন হাতের কাছে যা পেয়েছি পড়ে গেছি নির্বিচারে। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, দুর্গেশনন্দিনী, কৃষ্ণকান্তের উইল—এসব বই পড়েছি, স্রেফ তিনি বিখ্যাত লেখক বলে। কিন্তু বঙ্কিমের ওই উনিশশতকী সংস্কৃত ও তৎসম শব্দবহুল ভাষার প্রাচীর আমার কাছে জেলখানার প্রাচীরের চেয়ে এত বেশি উঁচু ছিল যে তা ডিঙিয়ে যাওয়ার সাধ্য আমার ছিল না। কিন্তু কৈশোর এমনই এক বয়স, এই বয়সে যে-কেউ সেই প্রতিরোধগুলোরই মোকাবেলা করে—জয় পরাজয়ের তোয়াক্কা না-করেই। কারণ ওই বয়সের ধর্মই ওটা। ওই বয়সে স্বধর্মে নিহত হওয়ার মতো শহিদি আত্মার জোস তার থাকে। প্রাপ্ত, পরিণত ও পরিপক্ক বয়সে এসব জোস রীতিমত প্রয়াত ও বিলুপ্ত। যে-কারণে জয়েসের মতো জগদ্বিদারী লেখকের ওই দুই কুখ্যাত বই আর নতুন করে কখনোই পাঠের ইচ্ছে হবে না, তা সে যতই অনিবার্য বলে সাফাই গাওয়া হোক না কেন। এখন মনে হয় ওই বয়সটা ছিল দন কিহোতের মতো, যে-কিনা পাঠের প্রণয়ে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। মেক্সিকান লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস সের্বান্তেসের অবিস্মরণীয় চরিত্র দন কিহোতে নিয়ে যা বলেছিলেন তার সাথে নিজেরই এক দূরবর্তী আত্মীয়তা সম্পর্কিত বলে একটু বিলি কেটে যাব:
Don Quijote is a reader. Or, perhaps more to the point, his reading is his madness. Possessed by the madness of reading, Don Quijote would like to take the things he has read—books of chivalry –and turned them into reality.
ওই বয়সে বাস্তবের যা-কিছু আকর্ষণীয়, যেমন খেলাধুলা, মারামারি, নানান রকম দুষ্টমি—বই আমাকে এগুলো থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়, ঠিক যেমনভাবে কিহোতেকে বাস্তব থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বইয়ের জগৎটাকেই আমার কাছে অনেক বেশি গ্রাহ্য, বেশি ভোগ্য আর উপযোগী বলে মনে হতে থাকে। এর ফলে বইয়ের জন্য ক্ষুধা আমার বাড়তে থাকে। কিন্তু ওই বয়সে ক্ষুধা বাড়লেই তো সহজে বই পাওয়া যায় না। টাকাও তো লাগবে। টাকা পাব কোথায়? প্রবাদ বলে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। উপায়টা সহজেই পেয়ে গিয়েছিলাম। ভাইবোনদের মধ্যে আমিই ছিলাম বড়, ফলে বাজার-সদাই আমাকেই করতে হতো। আমাকে যদি পাঁচ সের চাল আনতে বলা হতো, আমি কিনতাম চার শের। যে-মাছটা আমি ১০ টাকায় কিনতাম সেটার দাম আমি হয়তো ১২ টাকা বলতাম। এভাবে চাল ডাল থেকে প্রতিদিনই আমি অল্প অল্প করে পয়সা মেরে দিতাম। এই মেরে দেয়া টাকার একটা অংশ যেত বই কেনায় আর অন্য অংশ যেত সিনেমা দেখায়।
কাজলের সরল স্বীকারোক্তি হলো, আপনার আস্তানায় রাতের বেলা থেকে পরের দিন ভুল করে নিয়ে চলে এসেছিলাম। বুঝলাম চুরির মাল বেশি দিন থাকে না। তাছাড়া চোরের উপর বাটপারি তো থাকেই।
এরই মধ্যে বই না কিনে পড়ার আরেকটা উৎস আমি আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম। সেটা হলো গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভারতীয় গ্রন্থাগার বলে একটা গ্রন্থাগার ছিল। এটা আবিষ্কার করে আমি রীতিমতো ওই যুগে স্বর্গ হাতে পেয়েছিলাম। ওখানে বইয়ের বিপুল সম্ভার আমার পাঠের ক্ষুধাকে তৃপ্ত করার জন্য ছিল যথেষ্ট। ওটার সদস্য হওয়া যেত, কিন্তু আমি হই নি। আমি প্রতিদিন না হলেও, কয়েক দিন অন্তর অন্তর বিকেলবেলা ওখানে গিয়ে ঘণ্টা দুই-তিনেক পড়াশুনা করতাম। ওখানে বাংলা ভাষার সেরা লেখকদের লেখা তো পড়েছিই, পাশাপাশি অনেক দেশি-বিদেশি লেখকদের সম্পর্কে প্রবন্ধের বই পাঠের মাধ্যমে আমার পাঠের জগৎ আরও বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। সংস্কৃত ভাষার কালিদাস-এর মেঘদূত ও জয়দেব-এর গীতগোবিন্দ আমি ওখানেই প্রথম পড়ি। মেঘদূত-এর অসংখ্য বাংলা তর্জমা আছে গদ্যে পদ্যে। কিন্তু কার যেন একটা অনুবাদ পড়েছিলাম ওই গ্রন্থাগারে যা আমার হৃদয়কে উদ্বেলিত করে তুলেছিল ছন্দগুণে আর তর্জমার প্রাণবন্ততায়। মেঘদূত-এর পূর্বমেঘ অংশে কালিদাস অভিশপ্ত যক্ষের মানসিক পরিস্থিতি আর প্রকৃতির অবস্থা বর্ণনা করছেন। এই কাব্যে যক্ষ তার প্রেমিকার কাছে তার মনের অবস্থা জানিয়ে বার্তা পাঠাবে, কিন্তু কিভাবে পাঠাবে? মেঘকেই দূত ভেবে বার্তা পাঠাবার কথা তার মাথায় এল। কিন্তু মেঘ তো একটা জড়পদার্থ, বার্তাবাহককে হতে হবে জীবন্ত, ইন্দ্রিয় শক্তিসম্পন্ন; মেঘ কী করে তার বার্তা পৌঁছে দেবে? কালিদাস এই কঠিন প্রশ্ন, এই অবাস্তব পরিস্থিতিকে কিভাবে সামাল দিলেন? তিনি এক বিস্ময়কর যুক্তি দিয়েছিলেন যা প্রেমোন্মাদ ও কামোন্মাদের পক্ষে যৌক্তিক ও স্বাভাবিক। ড. মুরারিমোহন সেন-এর গদ্য অনুবাদে সেই যৌক্তিক অংশটা এরকম: “যারা কামার্ত—চেতন-অচেতন ভেদজ্ঞান তাদের কাছে আশা করা যায় না।” অনেক পরে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে এই বাক্যটির অনুবাদ দেখেছিলাম: “চেতনে-অচেতনে দ্বৈত অবলোপ, তা-ই তো কামুকের স্বাভাবিক।” কিন্তু আমি যে অনুবাদটি তখন ওই গ্রন্থাগারে পড়েছিলাম সেটা ছিল আরও বেশি চিত্তাকর্ষক, আরও বেশি আশ্লেষী: “কামাতুর জনে জড় ও চেতনে ভেদাভেদ নাহি জানে।” বুদ্ধদেব মন্দাক্রান্তা ছন্দে করলেও তার ওই বাক্য কামোত্তেজকের ইন্দ্রিয়ের রঙিন স্মারক হয়ে উঠেছে বলে মনে হয় না। কিন্তু মাত্রাবৃত্তে আমার পড়া সেই অনুবাদক এই অংশটি অনুবাদে অনেক বেশি হৃদয়াবেগ সঞ্চার করতে পেরেছিলেন বলেই আমার তা এখনও মনে আছে। দুর্ভাগ্য এই যে অনেক খুঁজেও আমি সেই অনুবাদকের নাম এবং সেই অনুবাদটি আর কোনোদিন খুঁজে পাই নি। আমার পাঠে ওটাই ছিল মেঘদূত-এর সেরা অনুবাদ। আরেকটি অনুবাদও আমার সেই সময়কার পাঠকহৃদয়কে প্রবলভাবে মথিত করেছিল, সেটা হলো তরুণদেব ভট্টাচার্যের অনুবাদে গীতগোবিন্দ-এর ছন্দোবদ্ধ অনুবাদ। এই কাব্যের প্রায় শুরুতে একটা অংশ তিনি তর্জমা করেছিলেন এভাবে: “শৈলছায়ার কান্তিসম ব্যাপ্ত হলো মেঘের দল।/ রাত্রি নামে সঙ্গোপনে আঁধার হলো তমালতল।” অনেক পরে বুঝেছি, তর্জমার জন্য কবিতা কঠিনতম এক শিল্পমাধ্যম। তার চেয়েও বেশি কঠিন যদি তাকে অনুপ্রাসে বেঁধে দিতে হয়। তরুণদেব ভট্টাচার্য অপূর্ব দক্ষতায় এই অনুবাদে সেই কাজটিই করেছেন। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, এই অনুবাদটিও আামি আর পরে কোথায়ও খুঁজে পাই নি। এদেশে এবং কোলকাতায় বহু লেখকবন্ধুকে বলেও এর কোনো কপি জোগাড় করতে পারি নি। এই বই দুটোর জন্য আমার এক স্মৃতিকাতরতা রয়েছে। ওই সময়ই আমি বাংলা কবিতার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাগীতির সাথেও পরিচিত হই। হাজার বছর আগের চর্যাগীতি যে এত সাহিত্য ও শিল্পগুণসম্পন্ন ছিল তা প্রথম আমি জানার সুযোগ পেয়েছিলাম সৌমেন্দ্রনাথ সরকারের চর্যাগীতিকোষ বইটি পড়ে। এই বইটি পরে আমি জোগাড় করেছিলাম। এটি এখনও আমার প্রিয় একটি বই।
ভারতীয় গ্রন্থাগার আমাকে দিয়েছিল পাঠের প্রসাদ আর চিত্তের ব্যাপ্তি। সেই কারণেই এক সময় আমার ক্ষুধার্ত আত্মা আবিষ্কার করেছিল স্টেডিয়ামের দোতলায় নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে বইয়ের দোকানগুলি, নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলি আর নীলখেতের পুরোনো বইয়ের দোকান তো ছিলই। ততদিনে আমার চাকরি-জীবন শুরু হয়ে গেছে বলে বই কেনার বাধা অনেকটাই দূর হয়ে গেছে। মেরিয়েটা তখন বই কেনার জন্য একটা আদর্শ দোকান ছিল নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে। ওখানেই কত গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের বই যে কিনেছি। দেবেশ রায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সুবিমল মিশ্র, সন্দীপন চট্টোপাধ্য্যায়সহ কত সব লেখকের বই! মনে পড়ে ওই সময় গ্রন্থনিলয় থেকে প্রকাশিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ও ছোটগল্প সিরিজ আর 'চারু প্রকাশ'-এর 'নোবেল সাহিত্য সম্ভার'-এর সিরিজটির কথা খুব মনে আছে। বিশ্বসাহিত্যের ক্ষুধা মিটিয়েছিল এই দুটি সিরিজ। তখনকার তুলনায় বইগুলো যথেষ্টই দামি ছিল। কিন্তু তবুও কিভাবে কিভাবে যেন টাকা জোগাড় করে ওই সিরিজগুলোর অনেক খণ্ড কিনেছিলাম। সেগুলো কিছু হারিয়ে গেছে, আর এখনও কয়েক খণ্ড সংগ্রহে আছে। পেঙ্গুইন সিরিজের কিছু বইও কিনেছিলাম তখন গুলিস্তানে এখনকার প্রীতম ভবনের বিপরীতে 'সাহিত্য প্রকাশ' নামক বইয়ের দোকান থেকে। তবে স্টেডিয়ামের দোতলায় 'হাক্কান্নি পাবলিশার্স'-এর একটা বইয়ের দোকান ছিল, সেখানে অক্তাবিও পাসের Alternating Current বইটি একটু উল্টেপাল্টে দেখে আমি এতটাই আকৃষ্ট হয়েছিলাম যে বইটি তখনই পাওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু পকেটে তখন ফাঁকা। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে, এবং প্রবল ঝুঁকি নিয়ে বইটি আমি চুরিই করে ফেলি। আমার ভয় ছিল হয়তো পরে এসে আর পাব না। অন্যদিকে বিদেশি এই বইটি কেনার টাকাও আমার হাতে ছিল না। ফলে চুরি করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বইটি চুরি করে যখন বের হয়েছি তখনই দেখা বন্ধু কাজল শাহনেওয়াজের সাথে। অক্তাবিও পাসের বইটি দেখে কাজলও বেশ মুগ্ধ। বইটি বহুদিন আমার কাছে ছিল, কিন্তু পরে বইটিও হারিয়েও ফেলি। সম্প্রতি কাজল জানালো বইটি নাকি তার বাসায়। কিভাবে গেল তার বাসায়? কাজলের সরল স্বীকারোক্তি হলো, আপনার আস্তানায় রাতের বেলা থেকে পরের দিন ভুল করে নিয়ে চলে এসেছিলাম। বুঝলাম চুরির মাল বেশি দিন থাকে না। তাছাড়া চোরের উপর বাটপারি তো থাকেই।
বিদেশি বইয়ের কথা যেহেতু এলই, তখন বাংলা মটরে অবস্থিত আজকের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথাও বলা উচিত। শেষের দিকে বই পড়ার জন্য এই কেন্দ্রই হয়ে উঠল আমার প্রধান ঠিকানা। এদিকে আজিজ মার্কেটে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে বইয়ের দোকানগুলো। বিজুর 'পাঠক সমাবেশ' তখন আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বই কেনার জন্য তখন স্টেডিয়ামের দোতালার দোকানগুলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে আর আজিজে দোকানগুলো সলতে পাকিয়ে জ্বলতে শুরু করেছে। পেশা এবং আবাসের নিকটবর্তী হওয়ায় আজিজ মার্কেটের দোকানগুলো আমাদের কাছে কেবল কেনার জন্যই নয়, আড্ডার জন্যও হয়ে উঠল কেন্দ্রবিন্দু।
দীপেনদার মাধ্যমে একবার এর্নেস্তো কার্দেনালের Apocalypse and other poems বইটি উপহার পেয়েছিলাম। দীপেনদা কেনার পর সম্ভবত খেয়ালও করেন নি যে ওই কপিটাতে স্বয়ং কার্দেনালের স্বাক্ষর রয়েছে।
বাংলা ভাষা ও ইংরেজি ভাষার বইয়ের পাশাপাশি আমার আগ্রহ যখন স্প্যানিশ বইয়ের দিকেও বিস্তৃত হতে শুরু করে তখন আমার আনন্দ এক ভিন্নমাত্রা অর্জন করেছে। সেই ভিন্নমাত্রার প্রধান কারণ কেবল ভিন্ন ভাষার বই প্রাপ্তিই নয়, বরং এমন কিছু দুর্লভ বই আমার করতলে এসেছে যেগুলো পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। সহজ না হওয়ার প্রধান কারণ বাংলাদেশে বসে স্প্যানিশ বই তো দূরের কথা, কাঙ্ক্ষিত ইংরেজি বইও পাওয়া দুষ্কর।
স্প্যানিশভাষী লেখকদের রবীন্দ্রচর্চা ও অনুবাদের বহু বই আমি হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। খোঁজার কারণ লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাসটিকে বুঝতে চাওয়া। নানান সূত্রে যখন ওই ইতিহাসের উপাদান হিসেবে কাঙ্ক্ষিত উৎস-গ্রন্থগুলোর হদিস পেলাম, তখন প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো দূরত্ব এবং মূল্য পরিশোধ। কারণ বইগুলো যেখানে পাওয়া যায়—বেশির ভাগই লাতিন আমেকিরার দেশ এবং স্পেন—সেখান থেকে কিংবা বাংলাদেশ ভিন্ন অন্য কোনো দেশ থেকে সেগুলো অর্ডার দিয়ে পেতে হবে। অথচ আমি থাকি বাংলাদেশে। সৌভাগ্যক্রমে আমার কিছু বন্ধুবান্ধব ওইসব দেশে আগে থেকেই প্রবাসী, যেমন তারিকুল আলম খান, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, দীপেন ভট্টাচার্য, যুবায়ের মাহবুব, আনিসুজ জামান, তাপস গায়েন—এরকম কয়েকজন বন্ধুদের মাধ্যমে সেগুলো অর্ডার দিয়ে জোগাড় করেছি। যেমন দীপেনদার মাধ্যমে একবার এর্নেস্তো কার্দেনালের Apocalypse and other poems বইটি উপহার পেয়েছিলাম। দীপেনদা কেনার পর সম্ভবত খেয়ালও করেন নি যে ওই কপিটাতে স্বয়ং কার্দেনালের স্বাক্ষর রয়েছে। আমি কপিটা হাতে পাওয়ার পর রীতিমতো অভিভূত হয়ে গেলাম কবির স্বাক্ষরিত একটা কপি পেয়ে। যদিও স্বাক্ষরটি আমার উদ্দেশ্যে নয়, কিন্তু তাতে কী! আর সরাসরি আমার উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত কার্লোস ফুয়েন্তেস, কার্লোস মনসিবাইস, স্পেনে দুদফায় প্রেসিডেন্ট এবং বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ হোসে লুইস রদ্রিগেস সাপাতেরো এবং আর্জেন্টাইন বন্ধু ও বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ আলেহান্দ্রো বাক্কারো, মেক্সিকোর লেখক ও সাংবাদিক ব্রাউলিও পেরাল্তার স্বাক্ষরিত বইগুলো আমার সবচেয়ে মূল্যবান সঞ্চয়। তবে সবেচেয়ে বেশি গৌরবান্বিত বোধ করেছি বোর্হেস অনুবাদক আমার প্রয়াত বন্ধু নরমান টমাস ডিজিওভান্নির এক উপহারে। বোর্হেসের ‘দ্য কংগ্রেস’ নামে একটি দীর্ঘ গল্প আছে, সম্ভবত এটি বোর্হেসের দীর্ঘতম গল্প। এটির একটি পুস্তক সংস্করণ বেরিয়েছিল হুয়ান আন্দ্রলিস ও জিওভান্নির সম্পাদনায় ১৯৭১ সালে ১৭ মার্চে। এই সংস্করণটির বাণিজ্যিক লক্ষ্যে মুদ্রিত হয়েছিল ৩ হাজার কপি আর এর বিশেষ একটা সংস্করণ বেরিয়েছিল ৩শ কপি। এই বিশেষ সংস্করণে প্রতিটি কপিতে ছিল ‘Borges 71’ শীর্ষক একটা লাল ফিতা (স্প্যানিশে যাকে Faja বলে)। জিওভান্নি আমাকে আর রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীকে এই সংস্করণটি আলাদা আলাদাভাবে স্বাক্ষর ও বাণীসহ উপহার দিয়েছিলেন। এই উপহারটি আমার কাছে সবচেয়ে দুর্লভ এক সঞ্চয়।
কয়েকজন বিদেশি বন্ধুও বহু দুর্লভ বই আমার জন্য কিনে এনেছেন বাংলাদেশে বেড়াতে এসে। কেউ কেউ এদেশে কর্মসূত্রে বসবাস করছেন এবং বিভিন্ন ছুটিছাটায় দেশে গিয়ে ফেরার সময় আমার জন্য কাঙ্ক্ষিত বইগুলো নিয়ে এসেছেন। আমার সেরকম এক বন্ধু আর্জেন্টিনার আরিয়েল কোলমান। আমার একুয়েডরের বন্ধু এবং লেখক মারিয়া এলেনা বাররেরা-আগারওয়ালের এক বিস্ময়-জাগানিয়া উপহারের কথা এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে। লাতিন আমেরিকার কবিতার এক প্রধান স্তম্ভ হোর্হে কাব্রেরা আন্দ্রাদে। এই কবির Registro del Mundo নামক বইটির প্রথম সংস্করণ বেরিয়েছিল একুয়েডরের রাজধানী থেকে ১৯৪০ সালে। এই দুর্লভ সংস্করণটি তিনি আমার জন্য জোগাড় করেছিলেন এই কবির প্রতি আমার প্রগাঢ় প্রেমের কথা মনে রেখে। কিন্তু আমাকে উপহার দেয়া এই বইটির প্রধান আকর্ষণ কেবল এই প্রথম সংস্করণেই নিহিত নয়, আমার জন্য অতিরিক্ত বিস্ময় ছিল এই দুষ্প্রাপ্য কপিটিতে ১৯৪০ সালের ১২ ডিসেম্বরে নিকারাগুয়ার কবি, ঔপন্যাাসিক ও সাহিত্য-সমালোচক হুয়ান ফেলিপে তোরুনঞকে উপহার হিসেবে দেয়া মূল লেখকের স্বাক্ষর। আমার এই হৃদয়বান বন্ধু আমাকে আরও একটি দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য বই উপহার দিয়েছিলেন, যেটি ছিল মেক্সিকোর অকালপ্রয়াত কবি ও অনুবাদক পেদ্রো রেকেনা লেগাররেতার অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি। কিভাবে যেন তিনি আমার জন্য ১৯১৮ সালের প্রথম সংস্করণটা জোগাড় করে ফেলেছেন। এই একই অনুবাদকের আরেকটি বই আমি পরে মেক্সিকো শহরের পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে জোগাড় করেছিলাম, যেটি আমার রবীন্দ্রচর্চার জন্য অনিবার্য এক গ্রন্থ। বইটি যদিও পেদ্রো রেকেনার মৌলিক কবিতার বই, কিন্তু এই বইয়ের ভূমিকায় আছে রবীন্দ্রনাথের সাথে তার সম্পর্ক ও চর্চার এক অজানা ইতিহাসের উপাদান। ফলে এই বইটিও আমার জন্য ছিল লোভনীয়। এটির নাম Poesias Liricas, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে। আমার এমনই সৌভাগ্য এই বইটিও পেয়ে গিয়েছিলাম।
ভলতেয়ারের প্রতি আমার আকর্ষণ প্রবল। এতই প্রবল যে পাঠের ফসল হিসেবে আমি করোনার বন্দিকালে তাকে নিয়ে একটি বইও লিখেছিলাম। কিন্তু লেখার আগে তো লেখার উপাদান চাই। সেই রকম এক উপাদান হিসেবে প্রবাসজীবনে একবার সান দিয়েগোর এক পুরোনো জিনিসপত্রের দোকানে পেয়ে গিয়েছিলাম Complete Romances of Voltaire নামের এক দুর্লভ সংস্করণ। এই সংস্করণটির বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, ভলতেয়ারের এতগুলো আখ্যানধর্মী লেখা আমি আর অন্য কোনো সংস্করণে দেখি নি। আর প্রকাশকাল—১৯২৭! ভাবা যায়, এরকম প্রায় শতবর্ষী সংস্করণ কোনো রকম চেষ্টা-তদবির ছাড়াই হঠাৎ করে পেয়ে যাওয়া! এই বইটি আমার আনন্দের এক অনিঃশেষ ফোয়ারা। এরকম আরও কত বই যে আছে, যা আমি প্রবাসে পুরোনো বইয়ের দোকানে পেয়েছি।
রবীন্দ্রনাথের স্প্যানিশ অনুবাদের বহু বইয়ের প্রথম বা দ্বিতীয় সংস্করণ আছে—যেগুলোর কোনোটার বয়স শতাধিক, কোনোটা শত বর্ষের, কোনোটা প্রায় শতবর্ষী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমার নিজের ভাষার শতবর্ষী কোনো বই আজও জোগাড় করতে পারি নি।
আমার আরেক আর্জেন্টাইন বন্ধু সেবাস্তিয়ান গুবিয়ার কাছ থেকে গত বছর বুয়েনোস আইরেস সফরে গিয়ে পেয়েছিলাম আরেকটি বিস্ময়কর উপহার। শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের কবিতার স্প্যানিশ অনুবাদের শীর্ণকায় এক গ্রন্থ। বইটির নাম Poemas, এর অনুবাদক ছিলেন আর্জেন্টিনার লেখক অনুবাদক কার্লোস মুস্সিও সায়েন্স পেইনঞা। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে। বহু খোঁজাখুঁজি করেও বইটি জোগাড় করতে পারছিলাম না। সেবাস্তিয়ানের সাথে পরিচয় হওয়ার পর তাকে বলেছিলাম, বইটির একটিমাত্র কপি এখনও আর্জেন্টিনার একটি অনলাইন বুক শপে আছে। তিনি যদি আমার জন্য ওটি কিনে রাখেন তাহলে খুব উপকার হয়। সেবাস্তিয়ান ঠিকই আমার জন্য কিনে রেখেছিলেন এবং বুয়েনোস আইরেস যাওয়ার পর তিনি আমাকে সেটি উপহার হিসেবে দেন। আমি ওটার মূল্য পরিশোধ করার জন্য পীড়াপিড়ি করলেও তিনি কোনোভাবেই নিতে সম্মত হলেন না।
কৌতুককর ব্যাপার হলো এই যে, আমি নিজের ভাষার কোনো বইয়ের শতাধিক বছরের পুরোনো সংস্করণ আজও জোগাড় করতে পারি নি, কিন্তু ইংরেজি ও স্প্যানিশ বহু বইয়ের শতাধিক বছরের পুরোনো সংস্করণ আমার কাছে আছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির স্প্যানিশে প্রথম অনুবাদের প্রথম সংস্করণটি বেরিয়েছিল বলিভিয়ার লেখক ও কূটনীতিক আবেল আলার্কনের অনুবাদে। এটি বেরিয়েছিল হিমেনেস-সেনোবিয়ার গীতাঞ্জলি অনুবাদেরও এক বছর আগে, অর্থাৎ ১৯১৭ সালে। সৌভাগ্যক্রমে সেই বইটিও আমি জোগাড় করতে পেরেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের স্প্যানিশ অনুবাদের বহু বইয়ের প্রথম বা দ্বিতীয় সংস্করণ আছে—যেগুলোর কোনোটার বয়স শতাধিক, কোনোটা শত বর্ষের, কোনোটা প্রায় শতবর্ষী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমার নিজের ভাষার শতবর্ষী কোনো বই আজও জোগাড় করতে পারি নি।
তবে পুরোনো কি নবীন, যে রকমই হোক না কেন, এখনও বই আমার কাছে প্রধান আকর্ষণ। এতটাই প্রধান যে মৃত্যুর পরে যদি জীবন থাকে তবে সেখানেও আমি বইয়ের বিশাল এক ভাণ্ডার চাইব। মোল্লা মওলানারা মৃত্যুর পর বেহেশতে আমাদের ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করার লোভনীয় সব তালিকা দেখিয়ে থাকে, অথচ বইয়ের কোনো উল্লেখ নেই। আমার প্রিয় লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস স্বর্গের কল্পনা করেছিলেন স্বর্গীয় কোনো কিছুর আদলে নয়, বরং পার্থিক গ্রন্থের আদলে: “গ্রন্থাগারের আদলে করেছি স্বর্গের কল্পনা। ” আমিও তার সাথে গলা মিলিয়ে বলব, স্বর্গে আর কিছু থাকুক না থাকুক, আমার প্রিয় বইগুলো চাই। চাই সেই বইগুলো যেগুলো সময়ের অভাবে ইহকালে পড়ার সুযোগ পাই নি।