আমার বিশ্বাস, আর্হেন্তিনো সংস্কৃতি ও ইতিহাসের যথার্থতার প্রশ্নে কেবল বোর্হেসের অসংখ্য পরোক্ষোল্লেখ সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ ধারণার ক্ষেত্রে আর্হেন্তিনার পাঠকদের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পার্থক্য হতে পারে।
কিন্তু বোর্হেস জন্মেছেন ১৮৯৯ সালের আগস্টে এবং একইরকমভাবে তার পরোক্ষোল্লেখগুলো রহস্যময় মনে হতে পারে তার অনেক পরে [যেমন, আমার জন্ম ১৯৪২ সালের শেষের দিকে জন্মগ্রহণকারীদের কাছে। এমনকি এই পার্থক্যগুলো বিভ্রমপূর্ণও হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বোর্হেসের সত্যিকারের গুরুত্ব এই উল্লেখসমূহে নিহিত নয়, বরং তা নিহিত তার বিস্ময়কর কল্পনা প্রতিভায়, আখ্যান নির্মাণের তীব্রতায়, অধিবিদ্যা সম্পর্কে তার আবেগে। মৌলিক ও অনন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে তা সবসময় একেবারে প্রাত্যহিক বিষয়কে তুলে ধরে।
বিশুদ্ধ রকমের মৌখিক যে সাহিত্যিক আবিষ্কারগুলো আছে তা অনুবাদে প্রায়শই যথাযথতা হারিয়ে ফেলে।
উনিশ বছর বয়সে আমি প্রথমবারের মতো পড়তে শুরু করি—মুক্তমন ও অজ্ঞতাসহ—বোর্হেসের লেখা Ficciones-এর গল্পসমূহ। মিথ্যাচার হবে যদি বলি যে সেই পাঠের উপলব্ধি ও উপভোগ ছিল পরিপূর্ণ; সেই সময় আমার সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও সাহিত্যিক উপলব্ধিতে অনেক ঘাটতি ছিল।
আজ, ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে পঞ্চাশ বছর আর আমার জীবন এখন সত্তরের কোঠায়, তারপরও যথেষ্ট পরিমাণে সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রজ্ঞার অভাববোধ করি [অন্য সবার মতোই। তবে দূর অতীতের সেই বছরগুলোয় যখন আমার কাছে পৃথিবীটাকে খুব নতুন মনে হতো, তখনকার তুলনায় এখন অবশ্য অনেক বেশি জানি।
এখন এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে পঞ্চাশ বছর—যদিও বেশি মনে হয়—আমার কাছে যথেষ্ট নয় বোর্হেসের রচনাকর্মের অনিঃশেষ পাঠের আনন্দের জন্য, বলছি সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও শিশুতোষ আনন্দের সাথে পাঠের কথা। বার বার আমি এগুলোর কাছে ফিরে আসি এবং সবসময়, সর্বদা, প্রত্যেকবার দেখতে পাই নতুন নতুন ব্যাখ্যা, নতুন স্পন্দন, নতুন সব সূক্ষ্ম কারুকাজ।
বিশুদ্ধ রকমের মৌখিক যে সাহিত্যিক আবিষ্কারগুলো আছে তা অনুবাদে প্রায়শই যথাযথতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বই, বিশেষ করে যেসব বই ঘটনানির্ভর, সেগুলো তাদের তীব্রতাকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারে তা সে যে ভাষাতেই অনুবাদ করা হোক না কেন। যেমন, কিহোতে, ডেভিড কপারফিল্ড, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট কিংবা দ্য ট্রায়াল পৃথিবীর যে-কোনো জায়গাতেই একইরকমভাবে আকর্ষণীয় হওয়ার কথা, তা সে পাঠক স্প্যানিশভাষী, ইংরেজিভাষী, রুশভাষী, জার্মানভাষী না হলেও।
বাংলাদেশি সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বোর্হেসের কাজ যে প্রীতি ও উপলব্ধি নিয়ে আবির্ভূত হতে পারছে তার জন্য প্রধানত রাজু আলাউদ্দিনের উদ্দীপনা ও অধ্যবসায়ের কাছে আমাদের ঋণ।
এই ধরনের বিশ্বসাহিত্যেরই অন্তর্গত বোর্হেসের রচনাসম্ভার। এটা সত্যি যে বিদেশি পাঠক কিছু কিছু ঘোরপ্যাঁচ [travesura বা ভাষিক ঠাট্টা অনুধাবন করতে পারবেন না, যেগুলো হয়তো আমাদের মতো আর্হেন্তিনো ও উরুগুয়াইয়োদেরকে [এবং হয়তো স্প্যানিশভাষী অন্য সবাইকে আমোদিত করবে, কিন্তু ওই সামান্য ঘাটতি—আনন্দের বিস্ময়কর উপাদানে আমাদের লেখকের যে বিশাল জগৎটি গড়ে উঠেছে—তাতে ভ্রমণে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
ফের্নান্দো সর্রেন্তিনোবাংলাদেশি সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বোর্হেসের কাজ যে প্রীতি ও উপলব্ধি নিয়ে আবির্ভূত হতে পারছে তার জন্য প্রধানত রাজু আলাউদ্দিনের উদ্দীপনা ও অধ্যবসায়ের কাছে আমাদের ঋণ। অপেক্ষা ও আশা করব এই বইটি প্রতিভাবান লেখকের পছন্দ ও পাঠ, তার রসবোধ, তার মানবীয় ও শৈল্পিক ব্যক্তিত্বে সামান্য [কিন্তু আনন্দদায়ক অবদান রাখবে।বাঙালি বন্ধুদের জন্য রিও দে লা প্লাতার দক্ষিণ তীর থেকে জানাই উষ্ণ শুভেচ্ছা।
ফের্নান্দো সর্রেন্তিনো মার্তিনেস [বুয়েনোস আইরেস ২০ মার্চ, ২০১৯