সম্প্রতি সলিমুল্লাহ খান তার এক ভিডিও আলোচনায় নানান বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এক ফাঁকে বলেছেন:
পশ্চিমবঙ্গ হচ্ছে বেশি কলোনিয়াল শহর, ইংরেজদের তৈরি করা শহর কোলকাতা; তাদের রাস্তার নাম দেখেন: লেনিন সরণি। তাতে কি সন্তুষ্ট? শেক্সপিয়ার সরণি। খুব ভালো। কিন্তু শেক্সপিয়ার রচনাবলি তো অনুবাদ করতে পারে নাই গর্দভেরা।
আমি সেই ভিডিওর কর্তিত অংশটুকুই বেছে নিয়েছিলাম একটি পোস্ট দেয়ার লক্ষ্যে। যেহেতু পুরো ভিডিওর সবটুকু নিয়ে আলোচনা করাটা আমার লক্ষ্য ছিল না, তাই ওই প্রাসঙ্গিক অংশটুকুই বেছে নিয়েছিলাম। যেহেতু পোস্টে আমি পশ্চিমবঙ্গের শেক্সপিয়ার-চর্চার ইতিহাসটিকে তুলে ধরতে চেয়েছি এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ‘গর্দভ’ বলাটা আপত্তিকর বলে মনে করেছি তাই ওই কর্তিত অংশটুকুই আমার কাছে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। আমরা কখনো কোনো বইয়ের কোনো একটি অংশ সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করতে গেলে নিশ্চয়ই গোটা বইটি নয়, বরং ওই প্রাসঙ্গিক অংশটুকুই উদ্ধৃত করি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে। আমি ওই রীতিটিই মান্য করেছি। কিন্তু দেখতে পেলাম সলিমুল্লাহর অন্ধ অনুসারীরা তাদের গুরুর আপত্তিকর মন্তব্যের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে মূলত কর্তিত অংশটুকু উদ্ধৃত করাটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আমাকে গালাগাল করেছেন। অবশ্য এটা করা ছাড়া তাদের আর কীই-বা করার আছে! যেহেতু সলিমুল্লাহর উক্তিটি একদিকে যেমন অসত্য, অন্যদিকে একটি গোটা সম্প্রদায়কে ‘গর্দভ’ বলে আখ্যায়িত করাটা ছিল গর্হিত অপরাধ। সলিমুল্লাহর এই অসত্য ও অপরাধকে আড়াল করার জন্যই তারা অর্থহীন অজুহাতে আমাকে নিন্দার নিশানা বানিয়েছে, এবং পাঠক-দর্শক-শ্রোতাদের মনোযোগকে প্রবাহিত করেছে অন্য খাতে। বিকারগ্রস্ত, অশিক্ষিত ও অন্ধদের সম্পর্কে আমার বলার কিছু নেই। আমি বরং সলিমুল্লাহর ব্ক্তব্য নিয়ে দুএকটি কথা বলব। তার আগে বলে নেয়া ভালো যে, শ্রদ্ধাভাজন সলিমুল্লাহ খান পণ্ডিত মানুষ। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ে কোনো কোনো উক্তি, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ আমার কাছে চক্ষুউন্মীলক বলে মনে হয়েছে। তার ক্ষুরধার যুক্তি, তথ্য ও বিশ্লেষণ আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং এখনও করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। তার স্মৃতিশক্তিও বিস্ময়কর। তিনি যেভাবে উদ্ধৃত ব্যক্তি ও ঘটনাপঞ্জির সাল-তারিখ স্মৃতি থেকে অনর্গল বলে যেতে পারেন তা এক কথায় শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও সমীহ-জাগানিয়া। এবং তিনি প্রায়শই এমন সব গ্রন্থ ও ঘটনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন যা সচরাচর আমাদের লেখক-পাঠকদের পাঠের তালিকার বাইরে। আমাদের লেখক-পাঠকদের পড়াশোনার পরিধি অনেক ছোট বলে সলিমুল্লাহ খানের এসব উদ্ধৃতির যথাযথতা যাচাই করার সুযোগ খুব একটা নেই। ফলে তার বিরুদ্ধে কারোরই কোনো অভিযোগ নেই। অন্যদিকে তিনি খুব ভালো বক্তা, এতটাই ভালো যে, টক শোতে প্রতিপক্ষকে পর্যন্ত তিনি বাচনিক কৌশলে খামোশ করে দিতে পারেন অনায়াসেই। সলিমুল্লাহ খানের মেধা আছে সন্দেহ নেই। তার বহুমুখী পাঠ আছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। আমি তার কোনো কোনো লেখার প্রশংসাও করি। কিন্তু তার সাহিত্য-বিষয়ক পাঠ নিয়ে আমার সন্দেহ গভীরতর। এই সন্দেহ ইতিহাস বিষয়ক তার গ্রন্থপাঠের ক্ষেত্রেও। সেটা আমি শেষের দিকে উল্লেখ করব। প্রথমে আসা যাক তার সাহিত্য বিষয়ক পাঠ, উদ্ধৃতি ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে। বিশেষ করে বাংলা ভাষার সাহিত্য নিয়ে যখনই কোনো কথা বলেছেন সেখানে তিনি কখনোই সুবিবেচনার পরিচয় দেন নি। এমনকি তা ঐতিহাসিক তথ্যের প্রতিও অনুগত নয়। ইতিমধ্যে তিনি কোনো কোনো সাহিত্যিক সম্পর্কে (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, গোলাম মুরশিদ, শহীদুল জহির প্রমুখ) এমন সব মন্তব্য করেছেন যেখানে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় আছে বলে মনে করি না। তিনি আহমদ ছফাকে মহৎ রূপে দেখাবার জন্য এমন সব কথা বলেছেন যা সাহিত্য সম্পর্কে গভীর ধারণাসম্পন্ন পাঠকের কাছে নিতান্তই হাস্যকর বলে মনে হবে। আহমদ ছফা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ লেখক। আহমদ ছফার গুরুত্ব তার বুদ্ধিজীবিতার ক্ষেত্রে। এই দেশের রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার অসামান্য স্বচ্ছ ধারণা এবং নতুন আলোকে বিশ্লেষণ তাকে আমাদের কালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব করে তুলেছে। কিন্তু একথা মেনে নেয়া অসম্ভব যে, তিনি রবীন্দ্রনাথের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক। আহমদ ছফার গুরুত্বকে তুলে ধরার জন্য কেন তাকে রবীন্দ্রনাথের সাথে তুলনা করতে হয়, যে রবীন্দ্রনাথকে তিনি বহু ‘অসম্পূর্ণতার’ জন্য সমালোচনা করেন? তুলনা খারাপ নয়, কিন্তু তুলনাটি যথাযথ হওয়া চাই। যে-রবীন্দ্রনাথকে তিনি রাজার নতুন জামা বলে পরিহাস করেন, যে-ররীন্দ্রনাথকে তিনি লালন ফকিরের নখের যোগ্যও মনে করেন না, সেই রবীন্দ্রনাথের সাথেই কেন তুলনা করে আহমদ ছফার বিশালতা প্রমাণ করতে হয়? যে-সলিমুল্লাহ খান ‘জসীম উদ্দীনকে জাতীয় কবিও বলা যায়’ বলে মনে করেন, কেন এই জাতীয় পর্যায়ের কবির সঙ্গে আহমদ ছফাকে তুলনা করছেন না তিনি? আহমদ ছফার মূল কৃতিত্ব বুদ্ধিজীবী হিসেবে সাহসী ভূমিকায়। সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে বিশ্লেষণকারী হিসেবে তার ভূমিকা অতুলনীয় । আর এই সূত্রেই আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে তার মননশীল প্রবন্ধের অমূল্য রত্নভাণ্ডারকে।
না, শুধু কবিতাই নয়, আহমদ ছফার উপন্যাস ও গল্পও খুব একটা উচ্চমানের নয়
কিন্তু কেমন ছিলেন কবি আহমদ ছফা? আমার কাছে কবি আহমদ ছফার কবিতাকে প্রাবন্ধিক আহমদ ছফার সমতুল্য মনে তো হয়ই না, এমনকি আমাদের অনেক গৌণ কবির চেয়ে তিনি নিম্নমানের। আহমদ ছফা নিজেও কখনো নিজের কবিতাকে অতটা গুরুত্ব দেন নি। কিন্তু এক রহস্যময় কারণে সলিমুল্লাহ গুরুত্ব দেন। সে তিনি দিতেই পারেন। কিন্তু কেন আহমদ ছফার সম্রাট ও কবি পাঠ করা ফরজ? একজন লেখকের সবকিছুই উচ্চমানের হয় না, সেটা পৃথিবীর সেরা লেখকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু সলিমুল্লাহ ‘বিরচিত’ আহমদ ছফার ক্ষেত্রে তা কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। আহমদ ছফার এই বইটি সম্পর্কে একালের এক কবি ও প্রাবন্ধিকের মূল্যায়ন তুলে ধরছি:
সলিমুল্লাহ খান বলেন, প্রত্যেক কবির জন্য এটি পড়া ফরজ। আমি তো ফরজ আদায় করেছি নিজ গরজে অনেক আগেই। তাতে বুঝেছি, খান সাহেব নফলকে ফরজ জ্ঞান করে কবিজীবন বরবাদ করেছেন গত শতকের আশির দশকের শুরুতেই এক আকাশের স্বপ্ন নিয়ে।
আহমদ ছফা কেমন কবি? অবশ্যই নিম্নমাঝারি মানের। দগদগে ও রগরগে চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরলেই ভালো কবি হওয়া যায় না। এর শোচনীয় উদাহরণ সলিমুল্লাহ খান।
(আমার খুতবাগুলি, সোহেল হাসান গালিব, উজান প্রকাশনী, ২০২৪, পৃ ৪৭)
না, শুধু কবিতাই নয়, আহমদ ছফার উপন্যাস ও গল্পও খুব একটা উচ্চমানের নয়। তবে আমি তার ওঙ্কার ও মরণবিলাস—এই দুটি উপন্যাসের সত্যিই খুব অনুরাগী। কিন্তু, আহমদ ছফার সবটাই সেরা—এরকম দাবি করাটা হাস্যকরই শুধু নয়, তা সাহিত্যের সহি এলেমেরও পরিপন্থি। কিন্তু সলিমুল্লাহ খান মনে হয় না এই সহি এলেমের ধার ধারেন।
আহমদ ছফার বিভিন্ন রচনা ও ব্যক্তিত্বের তিনি যে-সব বানোয়াট ও জবরদস্তি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাতে করে জেমস জয়েসকে নিয়ে প্যাট্রিক কাভানাগ-এর ‘Who Killed James Joyce?’ কবিতাটি মনে পড়বে আমাদের:
Who killed James Joyce?
I, said the commentator,
I killed James Joyce
For my graduation.
What weapon was used
To slay mighty Ulysses?
The weapon that was used
Was a Harvard thesis.
How did you bury Joyce?
In a broadcast Symposium.
That’s how we buried Joyce
To a tuneful encomium.
আহমদ ছফার স্বদেশ, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী, গরিবের রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি গ্রন্থের মাধ্যমে সলিমুল্লাহ খান আসলে আহমদ ছফার মতো জীবন্ত লেখককে হত্যা করেছেন। আহমদ ছফা যা নন তা উৎপাদন করে সলিমুল্লাহ সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার সৃজনশীলতার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে ছফার সত্যিকারের শক্তি ও স্বরূপ। ছফার গল্প, উপন্যাস ও কবিতার অবিশ্বাস্য মহিমা প্রণয়নের মাধ্যমে যে-ছফাকে তিনি আমাদের সামনে হাজির করেন তা সলিমুল্লাহ বিরচিত এক কাল্পনিক ছফা।
কলোনি, শেক্সপিয়ার ও গর্দভবৃত্তান্ত
যে-কারণে এই লেখার সূচনা, এবার ফিরে যাব সেই প্রারম্ভে। কিন্তু তার আগে তাহলে এই লম্বা বাখানি কেন? সেটা সলিমুল্লাহ খানের মনের গড়ন বোঝাবার তাগিদে। এই সূত্রে আমাদের মনে পড়বে তার গুরু আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক অসাধারণ প্রবন্ধটির কথা। মূলত বাঙালি মুসলমানের মন আর সলিমুল্লাহর মন এক সূত্রে গাঁথা। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লেখক, মূলত ‘হিন্দু’ সম্প্রদায়ের লেখকদের প্রতি নানা কারণে বিরূপ। তার কাছে ঘুরেফিরে আইকনিক ফিগার হিসেবে দেখা দেন হয় নজরুল ইসলাম, নয় তো জসীমউদ্দীন। আর অবশ্যই আহমদ ছফা। হিন্দু বংশোদ্ভূত পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা হয়তো এদের তুলনায় গৌণ বলে তাদেরকে আইকনিক ফিগার হিসেবে মনে করেন না। সেটা হতেই পারে। কিন্তু সেটা কি এই কারণে যে, 'পশ্চিমবঙ্গ হচ্ছে বেশি কলোনিয়াল শহর'? আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোও কি বেশি কলোনিয়াল ছিল না? এই দেশগুলো তো পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও বেশি কলোনিয়াল ছিল বলেই তাদের নিজস্ব ভাষা এবং ধর্ম পর্যন্ত লোপাট হয়ে গেছে। আফ্রিকার বহু দেশে ইংরেজি প্রধান ভাষা, দক্ষিণ আমেরিকার নামক গোটা মহাদেশের ভাষা ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষা। এমনকি এই দেশগুলোর সংস্কৃতিতেও রয়েছে সেই প্রভুদের স্পষ্ট ছাপ। পশ্চিমবঙ্গে কি হিন্দু ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে গোটা জনগোষ্ঠী খৃষ্টান হয়ে গেছে? কিংবা বিত্তবৈভব ও আভিজাত্যের লোভে বাংলা ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজিকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে? পৃথিবীর অন্য প্রান্তে উপনিবেশিত দেশগুলোয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ভাষা, ধর্ম, ও সংস্কৃতিকে যেভাবে মুছে দিয়েছে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, সেটা তারা করতে পারে নি। না পারার প্রধান কারণ সম্ভবত এই যে, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ধর্ম ও সংস্কৃতির দীর্ঘ শক্তিশালী ঐতিহ্য। ইউরোপের অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তি কর্তৃক উপনিবেশিত অন্য দেশগুলো থেকে ভারত এই ক্ষেত্রে আলাদা। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উচ্চশ্রেণির মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক ইংরেজি ভাষা ও আদবকায়দা রপ্ত করলেও, নিজের ভাষা ও ধর্মকে তারা ত্যাগ করে নি। দরিদ্রশ্রেণির একটা অংশ খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে বটে, কিন্তু তা গোটা জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। পৃথিবীর অন্যান্য উপনিবেশগুলোর সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর মতো তারা বিজয়ীর খৃষ্টান (রোমান ক্যাথলিক) ধর্ম গ্রহণ করে নি। তাহলে কী করে পশ্চিমবঙ্গ বেশি কলোনিয়াল হলো? এটা সত্য যে তারা কলোনিয়াল হয়েছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য কি পুরোপুরি বিসর্জন দিয়েছে? কলোনি হওয়ার কারণে ইংরেজি সংস্কৃতির একটা প্রভাব নিশ্চয়ই পড়েছে তাদের উপর, কিন্তু এর ফলে কিছু ইতিবাচক ঘটনাও কি ঘটে নি? এই সূত্রে কবি ও প্রাবন্ধিক সোহেল হাসান গালিবের একটি খুতবা উদ্ধৃত করতে চাই প্রাসঙ্গিক বিবেচনায়:
কলোনিয়াল বেদনা
বাংলার কলোনিয়াল বেদনা একটি কাল্পনিক অসুখ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বাধিক শ্রীবৃদ্ধি, যাকে বিস্ফোরণ বলা যায়, তা ঘটেছে কলোনিয়াল যুগে। ফ্রান্স ফানো, নগুগে, সেজেয়ার—এইসব নেগ্রিচুড দিয়ে বাংলার গোমর ফাঁস করার ধস্তাধস্তি নিতান্তই হাস্যকর। নিরেট আহাম্মকি।
বকধার্মিকতার জন্য পল্লীকবি ভালো, পরকীয়ার জন্য নির্জনতার কবি। নকশি কাঁথা গায়ে জড়ায়া বিছানায় পড়ে থাকা মন্দ নয়, কিন্তু হাতে তুলে নেবার জন্য একটা ধূসর পাণ্ডুলিপি চাই। (পৃ ১১৮)
উদ্ধৃত এই লেখাটিতে শ্লেষ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু শ্লেষে মোড়ানো এক ক্ষুব্ধ সত্যও আছে। সত্য এই যে, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির সংস্পর্শে আমাদের সংস্কৃতির বহু অচলায়ন ভেঙে গেছে, অন্য সংস্কৃতির উচ্চতর মূল্যবোধ ও শিল্পরুচি আত্তীকরণের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। এই সূত্রে আমাদের মনে পড়বে মেক্সিকোর লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসের প্রবাদপ্রতিম সেই উক্তি: Cultura aislada es cultura muerta. Solo el contacto vivifica. ( Personas, Carlos Fuentes, Alfaguara, 2012,P 234) অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি মানে মৃত সংস্কৃতি। শুধুমাত্র সংযোগেই সে বেঁচে থাকে। কিন্তু এই কথা বলে আমি ঔপনিবেশিকায়নকে বৈধতা দিচ্ছি না। উপনিবেশের কুফল ছিল। সেই কুফল সম্পর্কে আমাদের নিশ্চয়ই সচেতন হওয়া উচিত। তবে এর ফলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু সুফলও যে ঘটেছে সেটা অস্বীকার করলে সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোই অস্বীকার করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ কম করে হলেও পোনে দুশো বছর ধরে শেক্সপিয়ার-চর্চার সাথে জড়িত
সুতরাং, সলিমুল্লাহ খান পশ্চিমবঙ্গকে যে-কারণে গালমন্দ করছেন তার পেছন যদি রাজনৈতিক ঘটনার উল্লেখ থাকতে তাহলে দ্বিমত করার কিছু থাকত না। কিন্তু তিনি কলোনিয়াল বলে বিরূপ মন্তব্য করার কারণ হিসেবে বলেছেন তারা শেক্সপিয়ারের নামে সড়ক রেখেছেন, কিন্তু তারা নাকি শেক্সপিয়ারের রচনাবলি অনুবাদ করতে পারে নি। সলিমুল্লাহ খান তার বক্তৃতায় ইতিহাসের বহু গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেন। সহজেই অনুমেয় তিনি ইতিহাসের বই প্রচুর পড়েন। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শেক্সপিয়ার অনুবাদ ও চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে জানেন না? পশ্চিমবঙ্গ কম করে হলেও পোনে দুশো বছর ধরে শেক্সপিয়ার-চর্চার সাথে জড়িত। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হরচন্দ্র ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চন্দ্রকালী ঘোষ, রাধামাধব কর, বেণীমাধক ঘোষ, হরলাল রায়, তারকনাথ মুখোপাধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ বসু, প্যারীলাল মুখোপাধ্যায়, যোগেন্দ্র নারায়ণ দাস, পশুপতি ভট্টাচার্য, চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নীলরতন মুখোপাধ্যায়, তারিণীচরণ পাল, চণ্ডীপ্রসাদ ঘোস অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, ললিতমোহন অধিকারী, অন্নদাপ্রসাদ বসু, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, প্রমথনাথ বসু—এরা ছিলেন উনিশ শতকের সেই প্রাতস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব যারা শেক্সপিয়ারের লেখা অনুবাদ, রূপান্তর কিংবা ভাবানুবাদের সঙ্গে জড়িত। যদিও এই তালিকাও খুবই সংক্ষিপ্ত। আর বিশ শতকে শেক্সপিয়ার-চর্চা ও অনুবাদে দেখা দিয়েছে অন্য এক ঢেউ যা শেক্সপিয়রকে আরও বেশি পরিশীলিত রূপে গ্রহণ করেছিলেন বাংলা ভাষার পরিণত ও পরিপক্ক কাঠামো ও অভিব্যক্তিতে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, নীরেন্দ্রনাথ রায়, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, মুনীন্দ্রনাথ ঘোষ, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, দেবেন্দ্রনাথ বসু, সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, মানস ঘোষ, সমরেশ মৈত্র, অজিত গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, মনীন্দ্র রায়, হরপ্রসাদ মিত্র, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত প্রমুখের হাতে শেক্সপিয়ার শুধু সফলভাবে অনূদিতই হয় নি, এদের মধ্যে কেউ শেক্সপিয়ার সম্পর্কে অসাধারণ প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থও লিখেছেন। এমনকি, ওই পশ্চিমবঙ্গের একাধিক প্রকাশনালয় থেকে বেরিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদক ও সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে শেক্সপিয়ার রচনাবলী। তুলি-কলম প্রকাশনী থেকে সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ পাঁচ খণ্ডে শেক্সপিয়ার রচনাবলী অনুবাদ করেছেন। যদিও এই অনুবাদের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন আছে বিচ্ছিন্নভাবে অন্য কোনো কোনো অনুবাদকের শেক্সপিয়ারের অনুবাদ নিয়েও। যেমন রণজিৎ গুহ প্রশ্ন তুলেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ রায়ের অনুবাদে ম্যাকবেথ প্রসঙ্গে। ওই অনুবাদটি যে কতটা ব্যর্থ তা তিনি ‘বাংলায় “ম্যাকবেথ”’ (রচনাসংগ্রহ ২, রণজিৎ গুহ, আনন্দ, ২০২০, পৃ ১-২২) শীর্ষক দীর্ঘ আলোচনায় তুলে ধরেছেন। সন্দেহ নেই যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সব অনুবাদই মানসম্পন্ন হয় নি। অনেক ব্যর্থ, ত্রুটিপূর্ণ, অমূলানুগ অনুবাদ বেরিয়েছে। সার্থক অনুবাদের সংখ্যা করমেয় অবশ্যই—সেটা অনুবাদকের সক্ষমতার অভাবে যেমন, তেমনি শেক্সপিয়ারের ভাষার দুরূহতা ও সুদূরতার কারণেও। ফলে দীর্ঘকাল শেক্সপিয়ার-চর্চার কারণে পশ্চিমবঙ্গে ভালোমন্দ দুটোই হয়েছে।

তেমনই ভালো উদাহরণের একটি হচ্ছে জ্যোতি প্রকাশন থেকে বাংলা ১৩৮০ সালে প্রকাশিত শেকস্পীয়র সমগ্র রচনা সংগ্রহ, যাতে অনুবাদক হিসেবে ছিলেন উৎপল দত্ত, মানস ঘোষ, সমরেশ মৈত্র, অজিত গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, মণীন্দ্র রায়, হরপ্রসাদ মিত্রের মতো সর্বজন-শ্রদ্ধেয় অনুবাদকেরা। এবং তাদের অনুবাদের মান মুগ্ধ করার মতো। তাছাড়া, সুনীল কুমার চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে মার্চেন্ট অব ভেনিস, অ্যাজ ইউ লাইক ইট কিংবা ওথেলো অনুবাদ স্বয়ং বিষ্ণু দে’র কাছে ‘বিস্ময়কর অনুবাদ’ বলে মনে হয়েছে। সলিমুল্লাহ যদি শেক্সপিয়ারের সমগ্র রচনার অনুবাদের কথা বুঝিয়ে থাকেন তাহলে সেটা ওই কলোনিয়াল শহর কোলকাতাতেই হয়েছিল এবং এখনও হচ্ছে। আর যদি গুণগত মানের কথা বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে সেটাও বহু আগেই ওই দেশটিতেই ঘটেছে এবং এখনও সেই ধারা অব্যাহত। অনুবাদের মান নিয়ে তিনি হয়তো কুটিল প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে স্মরণ করা ভালো যে, সবচেয়ে যোগ্য হাতে অনূদিত হওয়ার পরও মানের প্রশ্নটি থেকেই যাবে, কারণ শেক্সপিয়ারের ব্যবহৃত সেই কালের ভাষা, অভিব্যক্তি ও ব্যঞ্জনা থেকে ইংরেজি ভাষা বিবর্তিত হয়ে শব্দ ও অভিব্যক্তির অর্থান্তরের এক ধূসর জগতে প্রবেশ করেছে। তারপরও অনুবাদকেরা সেই ধূসরতা কাটিয়ে অর্থ ও অভিব্যক্তির মূলে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। পশ্চিমবঙ্গের অনুবাদকেরা সেটা সফলভাবে করেছেন বলে আমার ধারণা। আর যদি মান ও গুণের প্রশ্ন এড়িয়ে শেক্সপিয়ার অনুবাদের পূর্ণাঙ্গতা ও প্রাচুর্যের কথা বলতে হয় তাহলে পশ্চিমবঙ্গই সেক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। এমনকি শেক্সপিয়ার সম্পর্কে সেরা রচনাগুলোও এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে। উৎপল দত্তের শেক্সপিয়রের সমাজচেতনা ইংরেজি ভাষায় ইংরেজদের রচিত যে-কোনো গবেষণার সাথে পাল্লা দিতে পারে। তাছাড়া, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, স্বপন চক্রবর্তী, জ্যোতি ভট্টাচার্য, সুবোধ চন্দ্র সেনগুপ্ত বা সুকান্ত চৌধুরীর মতো বিশেষজ্ঞর কথা না হয় বাদই দিলাম। এরপরও তিনি তাদেরকে ‘গর্দভ’ বলে গালি দিচ্ছেন। খুবই দুঃখজনক এবং আপত্তিকর এই মন্তব্য। সাহিত্য বিষয়ক সলিমুল্লাহ খানের যে-কোনো মূল্যায়ন, প্রশংসা কিংবা অভিমতকে আমি সবসময়ই সন্দেহের চোখে দেখে এসেছি তার সাহিত্য বিষয়ে অজ্ঞতা ও অগভীরতার কারণে। তিনি জীবিত ও মৃত এমন কোনো কোনো লেখক সম্পর্কে প্রশংসা করেছেন, যাদের তা প্রাপ্য নয়। ফলে সলিমুল্লাহ খানের প্রশংসা দিয়েই আমি বুঝতে পারি কাকে পড়তে হবে না। তিনি আমার কাছে এখন বিপরীত মানদণ্ড।
সলিমুল্লাহ খান অনেক বেশি কথা বলেন এবং অনেক কিছু নিয়েই বলেন, কিন্তু অনেকটাই না-জেনে। সলিমুল্লাহ খানকে এখন একটা কথাই বলার আছে: “Me gustas cuando callas...” (I like you when you are silent)—নেরুদা।