আনিসুজ জামানের দুটো অনুবাদ নিয়ে আমি যে-দুটি লেখা লিখেছিলাম, তাতে আমি মূলের পাশাপাশি তার অনুবাদের ভুলভ্রান্তিগুলো যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম। আমার বক্তব্যে যদি কারো সংশয় থাকে তারা দয়া করে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু ৯ জুলাই ২০২৪ পরস্পর-এ প্রকাশিত অনুবাদক তার ‘আমাদের সমালোচনার রীতি কি তবে এই’ শীর্ষক স্যাঁতস্যাঁতে মিথ্যাচারে ভরা লেখাটিতে ইনিয়ে-বিনিয়ে আর একাডেমিক ডিসিপ্লিনের ধুয়া তুলে আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষের অভিযোগ করেছেন। আমার বিদ্বেষ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ নাকি তিনি লেখাদুটোর শিরোনাম থেকেই টের পেয়েছেন (“শিরোনামের মধ্যেই প্রকাশ পায় আলোচকের পাঠ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”, “আলোচনাকে ব্যক্তি-আক্রমণে রূপান্তর করেছেন”)। কিন্তু আমার লেখায় তার যে-বিষয়গুলোর সমালোচনা করেছিলাম তার কোনোটিই তিনি খণ্ডন না করে শুধু বায়বীয় অভিযোগ তুলেছেন ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে। তিনি আমার সমালোচনাগুলো অসার ও অযৌক্তিক প্রমাণ করতে পারতেন বা খণ্ডন করতে পারতেন, সেটাই ছিল দস্তুর। কিন্তু তিনি ওসবের কিছুই খণ্ডন করেন নি। তবে তা না করলে কী হবে, আত্মরক্ষার জনপ্রিয় ও অকার্যকর ঢাল হিসেবে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ শব্দটিই বেছে নিয়েছেন। এ না করে তার উপায় ছিল না। কারণ যে-সব ভুলের কথা আমি উল্লেখ করেছি সেগুলোকে নির্ভুল বলার কোনো সুযোগই নেই। সেটা তিনিও জানেন।
আমি যে-ধরনের ভুলের উল্লেখ করেছিলাম সেগুলো ছিল এরকম:
● বাংলা বাক্য গঠনে ভুল।
● অনুবাদে প্রায় অংশেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাক্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
● বাক্যবিন্যাস থেকে অর্থ করা কঠিন।
● ভুল অনুবাদ করা হয়েছে।
● মূলের অর্থকে বিকৃত করা হয়েছে।
● ক্রিয়াপদের বিপর্যয়।
● যতিচিহ্নের ক্ষতিসাধন।
● পাত্রপাত্রীর অবস্থান বদল।
মজার ব্যাপার হলো এইসব ভুলের জন্য তিনি পেদ্রো পারামো নামক অনুবাদগ্রন্থের ভূমিকায় মানবেন্দ্র বন্দ্যোপধ্যায়কে অভিযুক্ত করেছিলেন। সেখানে তিনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করার মতো কিছুই খুঁজে পান নি।
এখানে এগুলোর পুনরুক্তি বা প্রমাণ দাখিল করার দরকার নেই, কেননা ওই লেখা দুটোতেই সেগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ আছে। মজার ব্যাপার হলো এইসব ভুলের জন্য তিনি পেদ্রো পারামো নামক অনুবাদগ্রন্থের ভূমিকায় মানবেন্দ্র বন্দ্যোপধ্যায়কে অভিযুক্ত করেছিলেন। সেখানে তিনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করার মতো কিছুই খুঁজে পান নি। কিন্তু আজ যখন তার অনুবাদে আমি প্রশংসনীয় কিছুই খুঁজে পাই না, তখন তিনি ব্যক্তি-আক্রমণের খঞ্জ অভিযোগ তোলেন। আজ তিনি ভোল পাল্টে অন্য সুরে গাইতে শুরু করেছেন। নিচে তার অভিযোগগুলো দেয়া হলো, সঙ্গে আমার উত্তর:
১. কিন্তু সমালোচনা যদি হয়ে ওঠে বিদ্বেষপ্রসূত বা স্তুতিমূলক অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তাহলে পাঠককে বিভ্রান্ত করে ভুল পথে চালিত করবে।
উত্তর: তিনি যখন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেছিলেন সেটাও কি বিদ্বেষপ্রসূত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না? মানবেন্দ্র যে-বইটি অনুবাদ করেছিলেন কয়েক দশক আগে, তিনি সেটাই নিজে অনুবাদ করলেন এবং তা প্রতিষ্ঠা করার আশায় পূর্ববর্তী অনুবাদকের প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিদ্বেষ উগড়ে দিয়েছিলেন—সেটা বললে কি মিথ্যাচার হবে? যদি বিদ্বেষ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে তিনি ইতিবাচক অর্থেই সমালোচনা করেছেন। তাই যদি হয় তাহলে আনিসুজ জামানের প্রতি আমার যে-সমালোচনা সেটা ইতিবাচক না হয়ে কেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ব্যক্তি-আক্রমণ হয়? স্ববিরোধী আচরণের মাধ্যমে তাহলে পাঠককে বিভ্রান্ত করছেন কে?
২. সমালোচনার ভাষা রপ্ত করতে না পারলে যৌক্তিক সমালোচনাও ব্যক্তি-আক্রমণ অথবা ব্যক্তিতোষণে পরিণত হতে পারে।
উত্তর: সমালোচনা যদি যৌক্তিক হয় তাহলে স্বভাবত তা সমালোচনার ভাষাকে রপ্ত করে বলেই সেটি যৌক্তিক। যৌক্তিকই যদি হয় তাহলে সেখানে ব্যক্তি-আক্রমণ অথবা ব্যক্তিতোষণের কোনো প্রশ্নই উঠবে না। যৌক্তিক মানেই নৈর্ব্যক্তিক এবং তা পক্ষপাতহীন। সুতরাং তার এই ভাষ্য অত্যন্ত স্ববিরোধী।
৩. কোনো অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ না, সেই বই সমালোচনার জন্য নির্বাচন করা হলে ভাবতে হবে সমালোচকের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।
উত্তর: হ্যাঁ, সততার সাথেই স্বীকার করি যে তার দুটো অনুবাদের কোনোটিকেই আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি নি। মনে করি নি সমালোচনার ভাষা ও পদ্ধতি মান্য করেই, এবং আমি তা প্রমাণের চেষ্টাও করেছি পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যপ্রমাণসহ। কিন্তু সমালোচনার জন্য তার অনুবাদ নয়, বরং তিনি মূল যে-বই দুটি থেকে অনুবাদ করেছেন, সেই বই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বই দুটো আমার খুবই প্রিয়। অনুবাদে প্রিয় বইদুটোর বিপর্যয় আমাকে ব্যথিত করেছিল বলেই তার অনুবাদ দুটোকে আলোচনার জন্য নির্বাচন করেছি।
৪. ভুলটা দুভাবে ভাগ করতে পারি। একটা হলো মুখ্য ভুল, যেটা মূলের পাঠই বদলে দেয়। মূল বিকৃত হয়। আরেক ধরনের ভুল হলো, নামের উচ্চারণগত ভুল। এটা গৌণ ভুল।
উত্তর: আমি তার গৌণ ভুলগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দিই নি। আমি গুরুত্ব দিয়েছি—ঠিক যেমনভাবে তিনিও দিয়েছিলেন মানবেন্দ্রর ক্ষেত্রে—মুখ্য ভুলগুলো যা মূলের পাঠকে কেবল বদলেই দেয় নি, বিকৃতও করেছে। বিস্তারিত জানার জন্য পাঠকরা আমার লেখাদুটোয় চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। ['পেদ্রো পারামো : আনিসুজ জামানের "অনুবাদ" কিংবা পুষ্পবনে মত্ত হাতি', 'বিমাতার গুণগানের বিমাতাসুলভ অনুবাদ']
উপন্যাস থেকে এপিগ্রাফ ফেলে দেয়াও কি এক ধরনের ‘ইন্টারপ্রেটেশন’?
৫. এখানে এসে ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ করতে হবে। অনুবাদ সব সময় এক ধরনের ‘ইন্টারপ্রেটেশন’। অনূদিত বইয়ের সমালোচনা করার সময় এটি মাথায় রাখা উচিত।
উত্তর: তিনি কিন্তু দুটো বইয়ের ভূমিকাতেই অনুবাদে মূলানুগতার এবং বিশ্বস্ততার পক্ষে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন। মানবেন্দ্রকে যে তিনি সমালোচনা করেছেন, সে তো ওই মূলানুগতার অভাব লক্ষ্য করেই। সেটাকেও কেন তিনি এক ধরনের ‘ইন্টারপ্রেটেশন’ ভাবলেন না? আজকে তিনি অবস্থান বদলে কেন ‘ইন্টারপ্রেটেশন’ নামক নতুন তরিকা হাজির করছেন? কারণ মূল থেকে তার সরে যাওয়ার নমুনা হাজির করেছি বলে? এবং উপন্যাস থেকে এপিগ্রাফ ফেলে দেয়াও কি এক ধরনের ‘ইন্টারপ্রেটেশন’? তিনি মানবেন্দ্রর বেলায় ওই কথাটা মাথায় রাখেন নি কেন? এখন তিনি আমাকে নসিহত করছেন! মোনাফেকি আর কাকে বলে! যখন যেটা সুবিধা হয় তখন সেই আলোয়ান গায়ে চড়াবেন!
৬. সমালোচনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘ক্রিটিক’ করা, ভ্রান্তি ও অপূর্ণতা তুলে ধরা—সেই বিশ্বাস থেকেই বলছি।
উত্তর: এই কথাটা আমি তার চেয়ে কম বুঝি না। এমনকি Criticism এবং Critique যে ভিন্ন দুই অর্থ বহন করে সেই হুঁশ আমার পুরোপুরি আছে। সুতরাং এই বিষয়ে হামাগুড়ি পর্বের শিশুতোষ বাণী না দিয়ে যদি নিজের ভ্রান্তি ও অপূর্ণতা তিনি মেনে নিতেন সেটাই হতে পারত তার সহি বিশ্বাস। কিন্তু তিনি এই কথা আজ প্রকাশ্যে বললেও মনে মনে তা বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না। এখন এটা বলছেন নিজের একটি সাধুমূর্তি বানিয়ে আমার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির অভিসন্ধি থেকে। আমি আমার লেখাদুটোয় বিশ্বস্ততার সাথেই তার ভ্রান্তি ও অপূর্ণতাকে তুলে ধরেছিলাম, পাঠক তার সাক্ষী।
৭. অনুবাদকের “সাহিত্যজ্ঞান অতিশয় নিম্নমানের” উল্লেখ করে তিনি আলোচনাকে ব্যক্তি-আক্রমণে রূপান্তর করেছেন।
উত্তর: হ্যাঁ, আমি তার সাহিত্যজ্ঞানকে অতিশয় নিম্নমানের বলেছি। এখনও বলছি। এটা বলা মানে ব্যক্তি-আক্রমণ নয়। এ হচ্ছে সত্যভাষণ। উচ্চমানের বললে তিনি খুশি হতেন কিন্তু সৎপাঠকরা আমাকে এর জন্য জবাবদিহির টিলায় দাঁড় করাতেন মিথ্যাচারের অভিযোগে। নিম্নমানের না হলে তিনি কিভাবে দাবি করেছিলেন : ইরোটিক উপন্যাসের জন্য “উপযুক্ত ভাষা বাংলা সাহিত্যের তৈরি হয় নি।” এবং দম্ভের সাথে এও বলেছিলেন: “মূলের ভাব ও ব্যঞ্জনার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বাংলা ভাষায় উপযুক্ত যৌনভাষা তৈরি” করছেন। বাংলা ভাষার বিস্তার ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে তার এই বক্তব্যকে স্রেফ আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। আমি তো তার ওই বক্তব্যের বিরুদ্ধে অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছিলাম। তার সাহিত্যজ্ঞান যে নিম্নমানের নয়, সেটা প্রমাণ করার সুযোগ তো তার ছিল। কই, তিনি তো এ বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না! সত্য বললেই কি ব্যক্তি-আক্রমণ হয়ে যায়?
সাহিত্য-সমালোচনায় ইতি-নেতি বলে যদি সত্যিই কিছু না থাকে তাহলে আমার আলোচনাদুটোকে তিনি নেতি বলে ধরে নিলেন কেন?
৮. এখন প্রশ্ন হতে পারে, তিনি যে ভুলগুলো তুলে আনলেন সেগুলো কি ঠিক? আমি সে বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিমত তুলে ধরতাম যদি আলোচনাটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার জন্য রচিত না হতো। সাহিত্য-সমালোচনায় ইতি-নেতি বলে কিছু নেই।
উত্তর: তিনি ভালো করেই জানেন ওটা মোটেই ব্যক্তি-আক্রমণ ছিল না। আমি যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমার আলোচনাকে দাঁড় করিয়েছি। ওসব খণ্ডন করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে আমার লেখাদুটোকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ বলে আখ্যায়িত করছেন। সাহিত্য-সমালোচনায় ইতি-নেতি বলে যদি সত্যিই কিছু না থাকে তাহলে আমার আলোচনাদুটোকে তিনি নেতি বলে ধরে নিলেন কেন? আর এই কথাইবা কোন কিতাবে কোন মহাজন লিখেছেন?
৯. কিন্তু স্বাধীনতা মানে এই না, ব্যক্তিগত বিষোদ্গার উগরে দেওয়া।
উত্তর: বলেছিলাম যে তিনি বাংলা ভাষাটাও ঠিক মতো জানেন না, এই বাক্যটি তারই এক নমুনা। বিষোদ্গার শব্দটির মধ্যেই ‘উগরে’ দেয়ার কথাটি আছে, এরপর আর উগরে দেয়ার দরকার হয় না। স্বাধীনতা? না, আমি স্বাধীনতা নিই নি, সমালোচনাশাস্ত্রের পদ্ধতি অনুসরণ করেই আমি লেখাদুটো লিখেছি। কিন্তু সেগুলোয় তার জন্য প্রশংসনীয় কিছু ছিল না বলেই তার কাছে আমার লেখাদুটো বিষোদ্গার মনে হয়েছে।
১০. অনূদিত বই শব্দ ধরে ধরে সমালোচনা করার রীতিও সব সময় সঠিক সিদ্ধান্তে আমাদের পৌঁছে দেয় না। আমি যদি “মে তিরান দে লোকা"র অনুবাদ করি “আমাকে ফেলে দেয় পাগলে”, তাহলে হবে না। আমাকে বলতে হবে “আমাকে পাগল ঠাউরেছে”। কলোম্বিয়ায় একটা কথা “আমি হলাম মায়ের সসেজ”, অনুবাদের সময় আমাদের পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হবে, যদি বলা হয়: “আমি হলাম মায়ের সর্বশেষ ভরসা”।
উত্তর: আমার নির্দেশিত ভুলগুলোর ধারে কাছে না গিয়ে বা তা খণ্ডন না করে এই যে ভাষিক বুজরুকি জাহির করছেন তিনি, এও তার স্ববিরোধেরই এক উদাহরণ। একই সঙ্গে পাঠকদের মনোযোগকে কৌশলে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। প্রথম কথা হলো আমার আলোচনায় শব্দ ধরে ধরে আলোচনা করা হয় নি, বরং তিনি যে পদ্ধতি অবলম্বন করে মানবেন্দ্রর সমালোচনা করেছেন, আমি ঠিক ওই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছি। দ্বিতীয়ত তিনি যে ইডিয়ম-এর উল্লেখ করেছেন, সেটা স্রেফ ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়, কারণ ইডিয়মকে তার সামগ্রিক ও যথাযথ অভিব্যক্তিসহই বিবেচনা করেছি আমার আলোচনায়, কখনোই এর শব্দ ধরে ধরে আলোচনা করি নি। আমার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য পাঠক আলোচনা দুটো পড়ে দেখতে পারেন। বরং আনিস নিজেই যে কখনো কখনো স্প্যানিশ অভিব্যক্তিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে বাংলা রূপান্তর করেছেন তার একটা নমুনা এখানে তুলে দিচ্ছি। তিনি পেদ্রো পারামো-র অনুবাদে এক জায়গায় লিখেছেন : “তোর দাদার সৎকারে ও গির্জার দশমাংশ দিয়ে হাতে আর কিছুই নেই।”( পৃ ৩২) ‘গির্জার দশমাংশ’ বলে যে শব্দযুগল ব্যবহার করেছেন তা আক্ষরিক এবং অজ্ঞতাপ্রসূত। স্প্যানিশে শব্দটি হচ্ছে Diezmos যার ইংরেজি পরিভাষা Tithe, আক্ষরিক অর্থে দশমাংশই বটে। কিন্তু দশমাংশ বললে আমাদের কাছে এর কোনোই অর্থ দাঁড়ায় না। মানবেন্দ্র এটা ভালো বুঝতেন বলে তিনি লিখেছেন : “কিন্তু তোর দাদুর সৎকারে এত খরচ হয়ে গেল, তারপর চার্চে এত সব প্রণামী দিতে হলো, মনে হয় না বাড়িতে আর কানাকড়িও আছে।” (পৃ ১৮) ‘দশমাংশ’ যে এখানে ‘প্রণামী’ হয়ে যাচ্ছে তা শাব্দিক অর্থে নয়, বরং ভাবার্থে। মানবেন্দ্র কিন্তু ভাবার্থেই তর্জমা করেছেন, কিন্তু যিনি শাব্দিক অনুবাদের বিপক্ষে বলে নিজের এক সন্তমূর্তি প্রদর্শন করছেন, তিনিই করেছেন এর শাব্দিক অনুবাদ।
দুর্নীতিবাজরা যখন অভিযুক্ত হয় তখন নিজেদেরকে নিরপরাধ বোঝাবার জন্য অভিযোগকে খণ্ডন না করে বরং সেটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিদ্বেষপ্রসূত বলে থাকে।
নিজের ভুলগুলো স্বীকার করায় কোনো দোষ নেই। কিন্তু ভুল নিয়ে আত্মতৃপ্তি থাকাটা ভালো নয়। ওতে ক্ষতি হয়। তিনি যে-ভুলগুলো করেছেন তা সংশোধনযোগ্য। তার মধ্যে কাজ করার পরিশ্রমী মন আছে, তার উদ্যমও আছে। তার শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা-র অনুবাদ প্রশংসনীয়ও বটে। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তাকে বিপদাপন্ন করে তুলছে, সেটা বোধহয় তিনি টের পাচ্ছেন না। তিনি সময় নিয়ে, তাড়াহুড়া না করে, ধৈর্য ধরে কাজ করলে আমার বিশ্বাস তিনি আমাদেরকে অনেক মানসম্পন্ন কাজ উপহার দিতে পারবেন। সাহিত্যকে তিনি জামাকাপড় হিসেবে না নিয়ে যদি আত্মার স্পন্দন হিসেবে নেন, তাহলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারবেন। বেশি নয়, অল্প কাজ, কিন্তু তা যেন মানসম্পন্ন হয়। যদিও জানি তিনি এখন মানের তোয়াক্কা আর করেন না, যে কারণে পরবর্তী বইগুলোয় ভুলের প্রশ্রয় দৃষ্টিকটু রকমে বেড়ে গেছে। কিন্তু এ বিষয়ে কেউ মুখ খোলেন না বলে তিনি নিজেকে নির্ভুল মনে করেন। উপরন্তু, দুর্জনদের প্রশংসা শুনে শুনে তার মধ্যে আত্মতৃপ্তি পরিপক্কতা অর্জন করেছে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এই অবস্থার উপমান খুঁজে পেয়েছিলেন আমাদের জাতীয় ফলের মধ্যে—আত্মতৃপ্তির কাঁঠাল, মোতার চারিদিকে দুর্জনেরা কোষে কোষে সুসজ্জিত, আর তারা সুবাস ছড়ায়। এই অবস্থায় তিনি আমার সমালোচনা নিতে পারবেন না, সে আমি জানি। উল্টো আমাকে দুষবেন। তার হয়তো মনে পড়বে—অবশ্য যদি পড়ে থাকেন—মেক্সিকান বিপ্লব নিয়ে রচিত উপন্যাসগুলোর জন্য মারিয়ানো আসুয়েলাকে কতটা হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল। আসুয়েলার স্মৃতিকথাধর্মী লেখা থেকে সামান্য উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি:
আমার বইগুলোতে (বিপ্লবীদের) এই খুঁতগুলো উল্লেখ করার কারণে আমাকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ আখ্যায়িত করায় কতটা বিস্মিত হয়েছিলাম তা আপনি অনুমান করতে পারছেন। ওই শূন্যগর্ভ শব্দ ছাড়া চোর আর গুপ্তঘাতকগুলো আত্মরক্ষার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কোনো উপায় খুঁজে পায় নি।
বিপ্লবের বিজয়ের পরপরই সর্বোচ্চ শক্তি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যখন আমি নতুন ধনিক শ্রেণির উত্থানের বিষয়টি দেখিয়ে দিলাম, তখন উচ্ছিষ্টজীবী পোষা কুকুরগুলো আমাকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে ঘেউ ঘেউ করে উঠল।
(Mariano Azuela, Underdogs, University of Pittsburgh press, 1990, p 161)
আমার আলোচনা নৈর্ব্যক্তিক ও যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও যদি তাকে বিদ্বেষপ্রসূত ও ব্যক্তিগত আক্রমণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করা হয়—আদতে তাই হচ্ছে—আমি তাতে বিস্মিত হব না। কারণ দুর্নীতিবাজরা যখন অভিযুক্ত হয় তখন নিজেদেরকে নিরপরাধ বোঝাবার জন্য অভিযোগকে খণ্ডন না করে বরং সেটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিদ্বেষপ্রসূত বলে থাকে। যে যত অপরাধী সে তত ধার্মিক। তার কাছেই বেশি শোনা যায় নৈতিকতার বাণী। এ আর নতুন কী! তিনিও তাই সমালোচনা-শাস্ত্রের অনেক বাণী আমাকে শুনিয়েছেন।
রাজনীতিবিদদের কাছে জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম হচ্ছে মোক্ষম দুই ভায়াগ্রা যা দিয়ে নেতিয়ে-পড়া জনগণকে জাগিয়ে তোলা যায়। একইভাবে ব্যক্তি-আক্রমণ ও বিদ্বেষ হচ্ছে নির্বোধ ও অসৎ পাঠকদের জন্য এক সস্তা মদ যা বিনামূল্যে বিতরণ করে সহানুভূতি আদায় করা যায়।