এই প্রেম অবহেলা যদি সে বন্ধনের

এই প্রেম অবহেলা যদি সে বন্ধনের ❑❑

সুভদ্রা জানে এইসব বিচ্ছেদের মানে

দৃশ্যত অনেক দূরে, ‍কিন্তু তার সবচেয়ে কাছাকাছি আছি। কারণ তার অবহেলা নিয়েছে আমাকে তার কাছে। সেও আছে এই ঘন উপেক্ষার উর্বর ভূমি জুড়ে যতটা বাড়ন্ত-প্রবণ হতে পারে। উপেক্ষার আলিঙ্গনে তুমিই তো সবচেয়ে বেশি আজ হানা দাও সময়াসময়ে। কিভাবে উড়াব আমি তোমাকে প্রেমের ঘূর্ণিতে? ডানায় শেকড় গোঁজা দিগভ্রান্ত পাতাদের মতো? কিংবা যেমন করে প্রেমিক উড়িয়ে দেয় নিজেরই করোটিখানি সত্যিকার অবহেলা ভালোবেসে ফেলে? তুমি যদি অস্ত যাও সেও এক নতুন উদয় হয়ে আমাকে তা নবায়ন করে। তোমার প্রয়াণ নেই তবে? তুমি কি অমর হয়ে বেঁচে রবে ঘাতকের মতো? স্তনের করাঘাত আর প্রিয় যোনির ঝিঁঝিঁতে সারারাত আমাদের প্রেম খেলা করেছিল বিশুদ্ধ রোমশ জ্যোৎস্নায়। ভালোবাসা, তুমি এত প্রেমময় নিষ্ঠুরতা দিয়ে কেন গড়েছ আমাকে— আমার এখন সব ভালো লাগে : এই হত্যা, এই প্রেম, প্রগাঢ় স্নেহের স্বর্ণাভা। কোথায়ও তেমন কোনো পাঁজরের নিচে নেই আলোর গরিমা, সব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে ভেসে ওঠে স্নায়ুর স্বাধীন কল্লোল। হে সাধু, হে সন্ত, হে চোর, হে মহাজন—আপনারা একে অপরের সহোদর হয়ে আর কত ফুল ভাসাবেন সভ্যতার নোনা জলে নৈবেদ্য রূপে? চারিদিকে যত ভোর—সব যেন আমারই ভুলের মাশুল হয়ে উদিত হয়েছে গৈরিকে। এসো, আজ পান করি একে অপরের রক্ত প্রেম পুঁজ আর যোনির জ্যোৎস্না পশ্চিমের হেলানো মিনার থেকে নেমে আসে ওইসব হুংকার যারা কোনোদিন জানতে পারে নি রক্ত কেন এত বেশি প্রেমের বন্ধনে হিংস্র হয়ে ওঠে, যারা কোনোদিন জানবে না ভালোবাসা মূলত ঘৃণা, ভালোবাসা আসলে অনেক বেশি নিষ্ঠুর। প্রিয়তমা, তুমি, শুধু তুমি, আমার নিকটতম প্রিয় জন্মভূমি— তোমাকে উপেক্ষা করে যদি এ-জীবন নক্ষত্রের আগুনে উদ্ভাসিত হয় তবে কি আমাকে মেনে নেবে? এইসব আগুনের কঙ্কাল জেগে থাকে হৃদয়ের গভীর কিনারে, আমি আজও তোমার শহিদ হয়ে বেঁচে থাকি সভ্যতার বিষাক্ত অভিজ্ঞান রূপে। কিন্তু তুমি? তুমি কি আমাকে ছেড়ে আরও দূর অভিমন্যু পাহাড়ে গড়াবে?


তুমি আমার ইহকালের অমূল্য রতন ❑❑

যেমন আছ, তেমনই তোমায় ভালোবাসব নারী, নরের কাছে এরচে বেশি আর কীবা দরকারি! রমণী তুমি—এটাই হলো বড় আকর্ষণ তুমি আমার ইহকালের অমূল্য রতন।


নিজেকে উপেক্ষা করো না, প্রিয়তমা ❑❑

মেক্সিকোয় থাকাকালে সুন্দরী এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—নিছক আলাপ জমাবার ফিকিরে—কবিতা কি তোমার পছন্দ? সে একেবারে নারীসুলভ সকল কমনীয়তা ঝেড়ে ফেলে অনেকটা রুক্ষভাবেই—যেন ওকে বিষাক্ত কিছু খাওয়ার প্রস্তাব করেছি আর তারই প্রতিক্রিয়ায় বলল, “নাহ, কবিতা আমার একদমই ভালো লাগে না।” এই মেয়েটির চেয়েও আরেক কাঠি সরেস অন্য এক সুন্দরী মেয়েকেও জিজ্ঞেস করে পেয়েছিলাম অদ্ভুত এক উত্তর। বললাম, “কী, তুমি কি কবিতা পড়ো?” আমার এই প্রশ্নে সে এতই কৌতুক অনুভব করেছিল যে আমি প্রচণ্ড কৌতূহলী হয়ে অপেক্ষা করছিলাম ওর উত্তরের জন্য। মেয়েটি অট্টহাস্যে প্রায় বিস্ফোরিত হওয়ার মতো। ওর হাসির অনুবাদ করে বুঝেছিলাম, “কবিতা? ও আবার কেউ পড়ে নাকি? এত তুচ্ছ জিনিসের কথাও কেউ তুলতে পারে!”—এই ছিল মূলের ইশারা। ইশারাই আসলে, কারণ হাসি ছাড়া সে আর কিছুই বলে নি। সে অবাক হয়েছিল আমার প্রশ্নের মূর্খতায়। বছর কয়েক পরে লক্ষ করলাম ফেসবুকে তার টাইম লাইনে একের পর এক বিখ্যাত সব কবিদের প্রেমের কবিতার উদ্ধৃতির ধুম। বুঝলাম মেয়েটি প্রেমে পড়েছে। প্রেম ওকে কবিতার কাছে নিয়ে গেছে। প্রেম ওকে মাতাল করে তুলেছে। কিন্তু কিভাবে এই মাতাল অবস্থার অনুভূতিকে সে ব্যক্ত করবে, যেহেতু সে বসবাস করে ভাষার দারিদ্র্যসীমার অতি নিচে? ও যাকে উপেক্ষা করে এসেছে এত কাল—এখন এই প্রেমের মুহূর্তে—সেই উপেক্ষিতের সাহায্যই ওর দরকার হয়ে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। কেননা কবিতা ছাড়া তার এই অনন্য ও অনির্বচনীয় অনুভূতি প্রকাশের আর কোনো উপায় নেই। তার প্রেমিকের কাছে আত্মোন্মোচনের ভাষা তার নেই, ফলে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিশেবে উপেক্ষিত কবিতাই হয়ে ওঠে তার একমাত্র সহায়, পরম আদরণীয়। কোনো নারী যে কারণে প্রসাধনে সুশ্রী হয়ে তারপর অন্যের মুখোমুখি হতে চায়, ঠিক তেমনিভাবে প্রেমিকের কাছে তার অভিব্যক্তির সুশ্রীতার প্রয়োজনে কবিতা নামক প্রসাধন সামগ্রীকে বেছে নেয়। তবে শুধু প্রেমের জন্য কবিতাকে অল্প কিছুদিনের ‍মুখোশ না করে, বরং, হে নারী, তোমার অমূল্য জীবনেরই মুখ করে তোলো। কবিতা মুখোশ হতে চায় না, সে চায় তুমি ওর মুখপাত্র হয়ে ওঠো। মেয়ে, কবিতা ছাড়া তুমি বাঁচবে কিভাবে, বলো তো। উপেক্ষা নয়, প্রেমিকের মতোই তাকে আলিঙ্গন করো, করো সঙ্গম তার সাথে যখন ইচ্ছে হয়। তুমি হয়ে ওঠো আরও প্রেমময়, কেবল প্রেমিকের কাছেই নয়, অন্য সবার কাছে। এখন তো তুমি ভালো করেই জানো, কবিতা তোমার ইন্দ্রিয়কে করে তোলে তীক্ষ্ণ ও শাণিত, সংবেদনশীল ও সংরক্ত। এমন মুহূর্তে বলো, হে অনুত্তমা, তুমিই কি কবিতা নও? তাহলে কাকে তুমি, না বুঝে, উপেক্ষা করেছিলে? নিজেকে উপেক্ষা করো না, প্রিয়তমা।


শিল্পী

[উৎসর্গ : শিমুল সালাহ্উদ্দিন

❑❑

মরতে মরতে বাঁচে এবং বাঁচতে বাঁচতে মরে, ফিনিক্স পাখির নিয়তি তার তাবৎ সত্তা জুড়ে।


যে-আস্তিক নাস্তিক ❑❑

আমাকে হত্যার আগে শুধু জানতে চাই কেন তুমি হত্যা করতে চাও? —কারণ তুমি নাস্তিক। তুমি আস্তিক, অথচ তোমাকে আমি হত্যা করতে চাই নি কখনো। কী তোমাকে হত্যায় প্ররোচিত করে? —আমার পবিত্র ধর্ম যাতে তোমার কোনো আস্থা নেই। আমার আস্থাবান বাবা-মা আমাকে সহ্য করতে পারে, আর তোমার মহান আল্লাহ আমাকে সহ্য করবে না—তা কী করে হয়! তিনি তার সৃষ্টির চেয়ে হীন আর কম সহনশীল নাকি? —না, তিনি মহান। কোনো কিছুর সঙ্গে তার তুলনা শেরেকি। কিন্তু তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন শাস্তি দিতে চাও তখন তা জঘন্য শেরেকি, কারণ তুমি নিজেকে তার সমান ক্ষমতায় বসিয়ে দিচ্ছ। —না, আমি আল্লাহর হুকুম তামিল করছি কেবল। ঐ যে অম্বর জুড়ে ভাসমান মেঘ, ঐ যে দূরের মরু, জলজঙ্গল, সমুদ্রের ঢেউ, পশুপাখি—তারাও তোমার ধর্মে আস্থা রাখে নি কোনোদিন। তারা কেউ যদি শক্র নয়, আমি কেন তোমার শক্র হয়ে উঠি? —কারণ তুমি অনাস্থা ছড়িয়ে দিতে পার, ওরা তা পারে না। তাতে কী ক্ষতি তোমার? —তুমি আমার ধর্মের ক্ষতি করছ। সে ক্ষতি কি তোমার আল্লাহ সামলাতে পারবে না বলে মনে হয়? —ধার্মিক হিশেবে ধর্ম রক্ষা করা আমার ঈমানি দায়িত্ব। কিন্তু তোমার ধর্ম কি কাউকে হত্যা করতে বলে? —অবশ্যই বলে, যারা ধর্মের ক্ষতি করে তাদেরকে হত্যা করা জায়েজ। রাসুল কিংবা আল্লাহ তো সে কথা বলে নি কোনোখানে। —তুমি তো নাস্তিক, তুমি ধর্মের কিছুই জানো না। নাস্তিক আমি নই, তুমিই নাস্তিক, কারণ তুমি ধর্মের আদেশ নিষেধ কিছুই মানো না। আর এসব না-মানার অর্থ আল্লাহকে অস্বীকার করা। সেই অর্থে তুমিই নাস্তিক। —ঠিক এই কারণেই তোমাকে হত্যা করা হবে। দাঁড়াও, আমার মৃত্যুর আগে আরেকটি সত্য বলবার আছে। —যা বলার সংক্ষেপে বলো, আমার সময় নেই। তুমি তোমার আল্লাহর অনুসারী নও, তুমি এক ভণ্ড, প্রতারক। তোমার পবিত্র আত্মাকে কলুষিত করে গেছে ক্ষমতালোভীরা...


সময় ছিল না ❑❑

সময় ছিল না বলে ভালোভাবে ভালোবাসা হলো না তোমাকে, সন্তান স্বজন আর দেশকে তুচ্ছ করে যে-প্রেম তোমার জন্য গড়ে উঠেছিল সময়ের অভাবে তা ফিরে গেছে তাদের কাছেই।

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা