অক্লান্ত স্রষ্টার বিভ্রান্ত জীবনীকার

বহুদিক থেকেই নজরুল এক দুর্ভাগা কবি। তার দুখু মিয়া নামটার বাস্তবতা দিকে দিকে এতই ফলিত যে এখন আর এর জন্য প্রমাণ তলব করতে হয় না। তাকে নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়া উচিত ছিল ততটা হয় নি ইউরোপীয় আধুনিকতা ও নান্দনিকতায় স্নাত কবি ও সাহিত্য-সমালোচকদের উপেক্ষার কারণে। পরাধীন ভারতবর্ষে তার লড়াইয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বকেও খুব একটা আমলে নিয়ে রচিত হয় নি কোনো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণসমৃদ্ধ বই; যা হয়েছে তা হয় খণ্ডিত, নয়তো সংক্ষিপ্ত। তার সাহিত্যকর্মের প্রতি আমাদের তিরিশোত্তর প্রধান কবি-লেখকদের কেউ কেউ আলোচনা করেছেন বটে, তবে তা স্তুতিনিন্দার পরস্পরবিরোধী মনোভাব থেকে। আবার এপার বাংলায় তাকে নিয়ে গ্রন্থ রচিত হলেও তা উচ্ছ্বাস ও আবেগের তরল রূপ হওয়ায় নজরুলের প্রকৃত প্রতিভার মূল্যায়ন থেকে রয়ে গেছে দূরবর্তী। তার অসংখ্য জীবনী লেখা হলেও, তা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে নানা কারণে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের ঘটনাপঞ্জির উপাত্ত যেভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, নজরুলের ক্ষেত্রে তা হয় নি। এমনকি তার কোনো কোনো বইয়ের প্রথম সংস্করণও নাকি কোলকাতার বড় গ্রন্থাগারগুলোতেও অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় নি। বেহিসেবি ও বোহেমিয়ান নজরুলের জীবনী রচনা তাই সহজ নয়। তারপরও কেউ কেউ—কঠিন হবে জেনেও—নজরুল-জীবনী লেখায় এগিয়ে এসেছেন।


এই গ্রন্থের প্রধান ত্রুটি এর শিরোনাম: 'বিদ্রোহী রণক্লান্ত'।


 নজরুলকে নিয়ে সর্বশেষ জীবনীটি লিখেছেন গবেষক গোলাম মুরশিদ। প্রায় সাড়ে ৫শ পৃষ্ঠার এক বিপুল গ্রন্থ তিনি লিখেছেন। গোলাম মুরশিদ উনিশ শতকের বেশ কয়েকজন লেখক/লেখিকা ও সমাজ-সংস্কারককে নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন। মাইকেল-জীবনী তার এক অসামান্য কীর্তি। এটি তার বহু পরিশ্রম ও গবেষণার ফল। এই জীবনীগ্রন্থে তিনি অনেক নতুন তথ্য যুক্ত করেছেন। উনিশ শতকের প্রধান কবি মাইকেল-এর পর এবার তিনি বিশ শতকের আরেক প্রধান কবি নজরুলকে নিয়ে জীবনী লিখেছেন। এই গ্রন্থেও নজরুল সম্পর্কে কিছু কিছু নতুন তথ্য সংযোজন করেছেন। কিন্তু এই গ্রন্থের প্রধান ত্রুটি এর শিরোনাম: 'বিদ্রোহী রণক্লান্ত'। যাকে নিয়ে তিনি এই জীবনী রচনা করেছেন তাকে ক্লান্ত হিসেবে, তাকে রণেভঙ্গ দিয়ে পলাতক ও পরাজিত হিসেবে বিবেচনা করে এই জীবনী রচনা করেছেন। ফলে এটি বিদ্রোহীর নয়, এক রণক্লান্ত পরাজিত মানুষের জীবনী হয়ে উঠেছে। তিনি এক ভুল প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন এই গোটা বইটিতে। এই বিষয়ে আলোচনার আগে আমরা নজরুল নিয়ে পূর্ববর্তী লেখকদের তথ্য সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ মাঝেমধ্যে যে সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সে-সম্পর্কে দুএকটি বিষয় আমরা তুলে ধরব।

এই বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে নজরুল-এর ‘কাজী’ পদবি নিয়ে তিনি বলেছেন: “নজরুলের পূর্বপুরুষদের কেউ ‘কাজী’ ছিলেন বলে ধারণা করি। তাই তাঁর পরিবারিক পদবী সম্ভবত ‘কাজী’ ছিলো।” (পৃ ১৯) কাজী পদবি নিয়ে তার এই ধারণা এবং সম্ভবত—এ নিছকই অনুমান। এর পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ বা তথ্য উপাত্ত যুক্ত করেন নি। কিন্তু তিনি নিজেই যখন অন্যদের অনুমাননির্ভর কথা দেখতে পেয়ে তাদের বিরোধিতা করছেন তখন তা হয়ে ওঠে স্ববিরোধী । একই অধ্যায়ে তিনি কিছু দূরে এগিয়ে লিখছেন: “সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না-থাকায় জীবনীকারেরা অনুমানের উপর ভিত্তি করে ঢালাওভাবে তাঁর এসব কাজে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।” (পৃ ২১) পরের পৃষ্ঠায় গিয়ে তিনি বলছেন: “এসব প্রশ্নের উত্তর আজ আর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মনে হয় যে, জীবনীকারদের বর্ণনা ঢালাও এবং অতিরঞ্জিত।” (পৃ ২২)


তিনি নিজে যে-পদ্ধতিতে নজরুল-সম্পর্কিত কোনো কোনো ঘটনাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছেন তা ‘বানানো’ বা ‘শোনাকথা’রই প্রকারান্তর ছাড়া আর কিছু নয়।


হতেই পারে যে নজরুল বিষয়ক অনেক ঘটনা তথ্যপ্রমাণের অভাবে নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না। কিন্তু যা বলা যায় না সে-সম্পর্কে অন্যের বর্ণনাকে ‘ঢালাও’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ বলার আগে তার নিজেরও কি যথেষ্ট যুক্তিপ্রমাণ থাকা উচিত নয়? তা নাহলে ওসব বর্ণনাকে ‘ঢালাও’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ বললে সেই একই দোষে নিজেও যে দুষ্ট বলে প্রতিপন্ন হবেন। কারণ তিনিও তো ‘মনে হয়’ ও  ‘সম্ভবত’-নির্ভর কথা বলেছেন এই বইয়ের বহু জায়গায়। অন্য জীবনীকারদের বিরুদ্ধে যথাযথতার অভাবের যে-অভিযোগ তিনি তুলেছেন তার সবটুকু তার নিজের মধ্যেও পরিপূর্ণ মাত্রায় আছে। যেমন এই অংশটুকুতে চোখ বুলিয়ে নিলেই তা বোঝা যাবে: “জীবনীকারদের বিবরণ থেকে বোঝা যায় না যে তিনি আগে রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন, না রেলওয়ে গার্ডের বাড়িতে। মনে হয়, তিনি গার্ডের বাড়িতে প্রথমে কাজ করেন; তারপর রুটির দোকানে।” তিনি তাহলে কিসের ভিত্তিতে মনে করছেন যে গার্ডের বাড়িতে প্রথমে কাজ করেছেন? আবার দুই পঙ্‌ক্তি পরেই তিনি বলছেন: “খুব স্পষ্ট নয়, কিন্তু মনে হয় তিনি ছোটোখাটো একাধিক কাজ করেছেন রানীগঞ্জ আর আসানসোলে।” ( পৃ ৩৩) যা স্পষ্ট নয়, যে-ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না সে-বিষয়ের সমালোচনা করে তিনি নিজে বারবার সেই পথেই এগিয়ে গেছেন। তিনি নিজে এই বইয়ের ভূমিকায় অভিযোগ তুলেছেন এই বলে যে: “এ ধরনের বানানো কথা এবং শোনাকথা-নির্ভর রচনা কবির মিথ্যে ও বিকৃত ভাবমূর্তি অঙ্কন করে।” (পৃ ৯) কিন্তু তিনি নিজে যে-পদ্ধতিতে নজরুল-সম্পর্কিত কোনো কোনো ঘটনাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছেন তা ‘বানানো’ বা ‘শোনাকথা’রই প্রকারান্তর ছাড়া আর কিছু নয়। যে-সম্পর্কে আমরা ‘স্পষ্ট’ নই, যা আমাদের কেবলই ‘মনে হয়’ তাকে সত্য বলে প্রতিপন্ন করা মুশকিল। ফলে নজরুলের ভাবমূর্তি বিকৃত করার দায় তার নিজের ঘাড়েও বর্তায়।

এবার আসা যাক কেন তিনি নজরুলকে ‘রণক্লান্ত’ ও ‘পরাজিত’ বলে মনে করছেন। এই বইয়ের শিরোনামেই তিনি ক্লান্ত ও পরাজিত এক লেখকের জীবনী রচনার আভাস দিয়ে রেখেছেন। এবং এই প্রকল্পকে সাজানো ও বৈধতা দেয়ার জন্য তিনি ‘রণক্লান্ত’ নামে একটি দীর্ঘ অধ্যায় যুক্ত করেছেন। নজরুল কেন রণক্লান্ত? দারিদ্র্যের কারণে। পরাজয়টা কেন? সেও এই দারিদ্র্যের কারণে। গোলাম মুরশিদ এই প্রকল্প কিভাবে সাজিয়েছেন সেটা এবার দেখা যাক।

এই প্রকল্প সাজানোর প্রধান উপাদান হিসেবে তিনি নজরুলের দারিদ্র্যকে বেছে নিয়েছেন। কত সালে তিনি পরাজয় বরণ করলেন? গোলাম মুরশিদের ভাষায় সেটা ১৯২৬ সাল থেকে। এই সময় তিনি চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হন। দারিদ্র্য থেকে বেরুনোর উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি “বঙ্গবাণী পত্রিকার সঙ্গে নিয়মিত লেখা দেওয়ার” প্রস্তাবে রাজি হন। এটি তার পরাজয়ের একটি বলে গোলাম মুরশিদ মনে করেছেন। ১৯৩৫ সালে ‘আনন্দবাজার’ ও ‘দেশ’ পত্রিকার পক্ষ থেকে পুজো সংখ্যায় লেখা দেবার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ‘একশো টাকা বায়না’ দেওয়া হয়। ঘটনাটির উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৫ সালের ২৯ আগস্ট শান্তিনিকেতন থেকে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখেন “এখানকার বন্যাপীড়িতদের সাহায্যার্থে অর্থসংগ্রহ-চেষ্টায় ছিলুম। ব্যক্তিগতভাবে আমারও দুঃসময়। কিছু দিতে পারছিলুম না বলে মন নিতান্ত ক্ষুব্ধ ছিল। এমন সময় দেশ ও আনন্দবাজারের দুই সম্পাদক পূজার সংখ্যার দুটি কবিতার জন্যে একশো টাকা বায়না দিয়ে যান, সেই টাকাটা বন্যার তহবিলে গিয়েছে। আগেকার মতো অনায়াসে লেখবার ক্ষমতা এখন নেই। সেইজন্যে ‘বিস্ময়’ কবিতাটি দিয়ে ওদের ঋণশোধ করব বলে স্থির করেছি। ক্লান্ত কলম নতুন লেখায় প্রবৃত্ত হতে অসম্মত।” এরকম চুক্তিবদ্ধ হওয়াকে পরাজয় বা রণক্লান্ত হওয়া বলে বিবেচনা করা মোটেই যৌক্তিক নয়। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, দেশে বিদেশে বহু লেখকই এরকম চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন এবং হচ্ছেন। টি এস এলিয়ট সহ আরও বহু লেখক ইংল্যান্ডের ফেবার এন্ড ফেবার প্রকাশনীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদের বইয়ের প্রকাশ করেছেন। তাই বলে একে পরাজয় বলে গণ্য করতে হবে? তাহলে নজরুলের বেলায় তিনি কেন এমন করে ভাবলেন? প্রশ্ন আরও আছে: ২৬ সালের আগে কি নজরুল দরিদ্র ছিলেন না?  যিনি লেখক, লেখাতেই যার আনন্দ, তিনি যদি কোনো পত্রিকায় লেখার বিনিময়-অর্থের আশায় চুক্তিবদ্ধ হন সেটাকে কী করে রণক্লান্ত বা পরাজয় বলে মনে করা সম্ভব? এমন যদি হতো যে ওই চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তিনি সরকার বা ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতি আনুগত্যসূচক কবিতা বা প্রবন্ধ কিংবা কথাসাহিত্য রচনা করে যাচ্ছেন, তখন না হয় তাকে পরাজয় বা রণেভঙ্গ বলে অভিহিত করা যেত। নজরুল কি তার কোনো লেখায় তেমন করেছিলেন? তাহলে পরাজয়টা কোথায়? দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে শুধু নিয়মিত লেখার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়াতেই? এই চুক্তি যদি নজরুলকে নৈতিকতা কিংবা তার অঙ্গীকার থেকে সরিয়ে বিপরীত কিছু লিখিয়ে নিতে রাজী করাতো তাহলে সেটাকে পরাজয় বলতে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু তেমন কিছু কি ঘটেছে? লেখক নিজেই বলছেন, “ডিসেম্বর মাসে (১৯২৬) জ্বরের প্রচণ্ড থাবাকে অগ্রাহ্য করেই ‘খালেদ’-এর মতো দীর্ঘ এবং তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখেছেন।” (পৃ ২৬৫) এর পরের বাক্যেই বলছেন, “কিন্তু যে-লড়াইতে তিনি কখনো পুরোপুরি জয়ী হতে পারেননি, বরং যার আক্রমণে স্বাধীনতা-প্রিয় কবি নিজের স্বাধীনতা এবং স্বকীয়তা পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে আপোস করতে বাধ্য হয়েছেন, সে হলো দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম।” (পৃ ২৬৮) লেখার ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ হওয়াটা তার কাছে ‘আপোস’, ‘স্বধীনতা এবং স্বকীয়তা’.. বিসর্জন’, বলে মনে হয়েছে। এটি অত্যন্ত মনগড়া এবং অযৌক্তিক এক ব্যাখ্যা, অন্তত নজরুলের ক্ষেত্রে।


দারিদ্র্যের মানদণ্ডে কেবল লেখককে কেন, একজন সাধারণ মানুষকেও পরাজিত ও আপোসমূলক মনে হওয়াটা একটা ইতরোচিত সামন্ত দৃষ্টিভঙ্গি।


উপরের ব্যাখ্যাটি যে পাঠক গিলবে না সেটা ভেবে পরক্ষণেই একটি চালাকিপূর্ণ বিশ্লেষণ হাজির করে বলেন: “সেই অপরাজেয় নজরুল আলোচ্য পর্বে এসে পরাজয় স্বীকার করে নেন এবং নিতান্ত অপমানজনক কাজ করতে রাজি হয়ে যান। তবে সে কাজটা রুটির দোকানের কাজ অথবা গৃহভৃত্যের কাজের মতো প্রত্যক্ষভাবে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ নয়। এমন কি, বাহ্যত তা আদৌ অপমানজনকও নয়—পরাধীনতা বলে মনে হয় না তাকে। কিন্তু সুক্ষ্ণভাবে দেখলে বোঝা যাবে, দুটো কাজই ‘পরাধীনতা’র। কেবল প্রথম কাজটা তিনি করেছেন শরীর দিয়ে, দ্বিতীয় কাজটা করেছেন কলম আর কণ্ঠ দিয়ে। নিজের মেধা দিয়ে, মনন দিয়ে। বাইরে থেকে সেটাকে ভৃত্যের কাজ মোটেই মনে হয়নি—অন্যদের কাছে তো নয়ই, তাঁর নিজের কাছেও হয়তো মনে হয়নি।” (পৃ ২৬৫) অর্থাৎ রুটি বানানো আর রেলওয়ে গার্ডের বাড়িতে গৃহভৃত্যের শারীরিক পরিশ্রমের কাজকে তিনি অপমানজনক এবং স্বাধীনতা বিসর্জনমূলক বলে মনে করছেন। নজরুল কবেইবা জমিদার ছিলেন? তার কোন লেখা সেই জমিদার পর্বের? যদি ধরেও নেই যে তিনি বিদ্রোহী বা অন্যান্য দ্রোহমূলক কবিতা ২৬ সালের আগে রচনা করেছেন, সেগুলোও কি নজরুলের দারিদ্র্যের সাথে লড়াই পর্বেরই রচনা নয়? আর ২৬-পরবর্তী কবিতা বা গানে তিনি আপোস করেছেন এমন নজিরই-বা কোথায়? গোলাম মুরশিদ কি তাহলে একথা বলবেন যে রচনায় নয়, জীবনে তিনি এই আপোস করেছেন? যে-কোনো কায়িক শ্রমকে তিনি আপোস, পরাজয় বা অপমানজনক বলেইবা অভিহিত করবেন কোন যুক্তিতে? এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই উচ্চশ্রেণিসঞ্জাত এবং তা গর্হিত, অধিকন্তু নিম্নরুচির পরিচায়ক। শুধু নজরুল নয়, যে-কোনো লেখককে এইভাবে মূল্যায়ন করাটা অপমানজক। এইসব শারীরিক কাজকে পরাজয় ও অপমানজনক মনে করার সঙ্গে তিনি শেষ পর্যন্ত যুক্ত করেছেন তার গান রচনায় নিয়োজিত হওয়াকেও। সেই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে এই বই থেকে আরেকটি উক্তি আমরা উদ্ধৃত করব তার মনোভাব বুঝবার লক্ষ্যে। তিনি নিজের যুক্তি ও ব্যাখ্যার পক্ষে সাফাই হিসেবে বলেছেন: “এ জন্যই আমি বলছি, প্রতিকূল পরিবেশে, বিশেষ করে অর্থকষ্টের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিধ্বস্ত হয়ে, বিদ্রোহী কবির মনে রণক্লান্তি দেখা দিয়েছিল। অতঃপর তিনি পরাজয় স্বীকার করে আপোসের পথ বেছে নেন।” (পৃ ২৭৮-২৭৯)

দারিদ্র্যের মানদণ্ডে কেবল লেখককে কেন, একজন সাধারণ মানুষকেও পরাজিত ও আপোসমূলক মনে হওয়াটা একটা ইতরোচিত সামন্ত দৃষ্টিভঙ্গি। তাছাড়া, নজরুলের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত আপত্তিকরও বটে। কারণ নজরুল দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন বটে, কিন্তু লড়াইয়ের পরিবর্তে আপোস করেছেন বা রণক্লান্ত হয়েছেন বলা যায় কি? তিনি দারিদ্র্যমুক্তির আশায় লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন? কিংবা তার লেখা গণমুখীনতা ছেড়ে প্রভুমুখী ও প্রভুতোষণে নিয়োজিত হয়েছিল? তাহলে আপোস ও পরাজয়টা কোথায় পেলেন তিনি?

গোলাম মুরশিদ অন্য একটি দৃষ্টান্ত এনে তার অপমানজনক প্রকল্পকে বিস্তৃত করতে শুরু করলেন। এই পর্যায়ে তার বক্তব্য হচ্ছে আফজালুল হক নজরুলের দারিদ্র্য লাঘবের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে রাজি হলেন এই প্রস্তাবে যে নজরুল তার পত্রিকা ছাড়া আর কোথাও লিখতে পারবেন না। এ প্রসঙ্গে গোলাম মুরশিদ বলছেন: “এবারেও সে রকম প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটি সহজ—তিনি কবিকে মাসে মাসে একশো টাকা দেবেন, আর তার বিনিময়ে তিনি কবির তাবৎ রচনা প্রকাশ করার একচ্ছত্র অধিকার লাভ করবেন। ফলে কবি অন্য কোনো পত্রিকাকে তাঁর লেখা দিতে পারবেন না; বরং প্রায় ক্রীতদাসের মতো কেবল এক-মনিবের ঘানি টানবেন।” (পৃ ২৭৯) এই রকম নিম্নরুচির বর্ণনা অন্য কারোর জীবনীতে আমি পড়ি নি।  দারিদ্র্যের সূত্রে তিনি নজরুলকে ক্রীতদাস ও ভৃত্যের ভূমিকায় চিত্রায়িত করেছেন কালো অক্ষরের কালিমায়। যদিও নজরুল খুব অল্প সময়ই কেবল একটি মাত্র পত্রিকায় লেখার শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। ২৬ সালের পর তিনি আফজালুল হকের পত্রিকা ছাড়াও আরও অন্যান্য পত্রিকায় লিখেছেন। এসব তো তার অজানা নয়। তার বইতেও এসব তথ্য আছে। কিন্তু নজরুল সম্পর্কে গোলাম মুরশিদের এই মনোভাবই এই গ্রন্থের একমাত্র সমস্যা নয়। আরও এক গভীরতম সমস্যা আছে, সেটা নজরুলের গানকে এই দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যে।


তার স্ববিরোধগুলো খেয়াল করুন: একবার গান লেখাকে তিনি মনে করেছেন গুহায় নেমে যাওয়া, আবার এই গানকেই তিনি অভিহিত করছেন শ্রেষ্ঠ ও অনন্য কীর্তি হিসেবে।


তিনি লিখেছেন: “তাঁর এই স্বেচ্ছাবন্দিত্বের পথে যাত্রা করার প্রথম ধাপ ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ এবং অনন্য কীর্তি—গজল রচনা; আর-একটু বিস্তৃত করে বললে, কেবল গজল নয়, সামগ্রিকভাবে তাঁর গান। টেরও পাননি যে, গানের সিঁড়ি বেয়ে তিনি যে-গুহায় নামছেন, সেই গুহার এক কোণা থেকে আর-এক কোণায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে পারছেন, কিন্তু সেই গুহা থেকে তিনি আর কোনো দিন বেরিয়ে আসতে পারবেন না।” (পৃ ২৬৬) 

তার ব্যাখ্যাগুলো একটু খেয়াল করুন। তার এই বক্তব্য থেকে যেটা প্রতীয়মান হয় তা হলো, নজরুল এতদিন কবিতা লিখেছেন, সেটা গুহা ছিল না। কিন্তু গান রচনাটা নজরুলের জন্য গুহা হয়ে দাঁড়ালো। এখানে গানকে তিনি সাহিত্যের মর্যাদায় দেখছেন না। গান যেন সাহিত্যের তুলনায় নিম্নমানের কিছু। অথচ এর আগে তিনিই বলেছেন “তাঁর শ্রেষ্ঠ এবং অনন্য কীর্তি—গজল রচনা; আর-একটু বিস্তৃত করে বললে, কেবল গজল নয়, সামগ্রিকভাবে তাঁর গান।” (পৃ ২৬৬)  স্বেচ্ছাবন্দিত্বের ‘গুহায়’ বসে নজরুল শ্রেষ্ঠ এবং অনন্য কীর্তি যদি রচনা করে থাকেন তাহলে সেটা কী করে পরাজয়, আপোস ও ভৃত্যস্বরূপ কর্ম বলে অভিহিত হতে পারে? তিনি নজরুলের গানের তারিফ করতে গিয়ে বলেছেন: “আগের বছর নভেম্বর মাসের (১৯২৬) শেষে তিনি যে হঠাৎ করে একটি গজল রচনা করেছিলেন, সত্যিকারভাবে তা ছিল তাঁর কবিজীবনের একটি মাইল-ফলক।” (পৃ ২৮১) তার স্ববিরোধগুলো খেয়াল করুন: একবার গান লেখাকে তিনি মনে করেছেন গুহায় নেমে যাওয়া, আবার এই গানকেই তিনি অভিহিত করছেন শ্রেষ্ঠ ও অনন্য কীর্তি হিসেবে। তিনি ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ নামক এই বইয়ের অষ্টম অধ্যায়েও গানের ক্ষেত্রে নজরুলের অনন্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে প্রায় পুনরুক্তি করে বলেছেন: “এই গান রচনা তাঁর জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইল-ফলক।” (পৃ ৩৪৯) তাহলে যে-লোকটি গুহায় বসে গুরুত্বপূর্ণ মাইল-ফলক রচনা করে যাচ্ছেন, তাকে কিভাবে পরাজিত বলা যায়? দ্বিতীয়ত, নজরুলের সাহিত্যিক পর্ব, অর্থাৎ কবিতা রচনার কালকে আপোস, পরাজয় ও গুহাবাস হিসেবে তিনি আখ্যায়িত করেন নি। যেই তিনি গান রচনা করতে শুরু করলেন সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যিক নজরুলের পতন হয়ে গেল—এমনই কি তিনি বোঝাতে চাইছেন না? গানকে তিনি প্রকান্তরে সাহিত্যকর্ম বলে গণ্য করেন নি। কিন্তু উপরের এই উদ্ধৃতিতে গজল রচনাকে ‘কবিজীবনের একটি মাইল-ফলক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মানে গজল বা গান এখন তার কাছে কবিতা বলেই বিবেচিত হচ্ছে, তা নাহলে ‘কবিজীবনের’ বলার কী অর্থ? স্ববিরোধের এখানেই শেষ নয়। তিনি বলছেন: “সত্য বটে, ‘খালেদ’ কবিতাটি ছিল ফরমায়েশি কবিতা—সম্পাদকের অনুরোধে প্রথম বছর বার্ষিক সওগাতের জন্যে লেখা।… ‘খালেদ’ বস্তুত নজরুলের প্রায়-বিস্মৃত কাব্যধারার পুনরুজ্জীবনকারী সৃষ্টিকর্ম।” (পৃ ২৮১-২৮২) তিনিই জানাচ্ছেন যে  “এই গজল লেখার দুসপ্তাহের মধ্যে লিখেছিলেন খালেদ’ কবিতা।” (পৃ২৮১) তাহলে দেখা যাচ্ছে যে তিনি কেবল গানের ‘গুহা’তেই বন্দি ছিলেন না, ওই গুহাবাসে লিখেছেন কবিতাও, তাও যে-সে কবিতা নয়, ‘খালেদ’-এর মতো ‘পুনরুজ্জীবনকারী সৃষ্টিকর্ম’।


নজরুল সম্পর্কে অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং একই সাথে তথ্য ও ঘটনার অপব্যাখ্যামূলক একটি গ্রন্থ বিদ্রোহী রণক্লান্ত


সর্বশেষ আরেকটি উক্তি দিয়েই আমি আলোচনার ঘানি টানা শেষ করব। তিনি লিখেছেন “নির্বাচনে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু গজলের মাধ্যমে সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি নতুন বিজয়-নিশান উড়িয়েছিলেন।” (পৃ২৮৩) যদি ধরেও নেই যে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে নজরুলের প্রতিকূল শর্তে আবদ্ধ হওয়াকে তিনি স্রেফ আলংকারিক অর্থে পরাজয়, রণক্লান্ত, আপোস ও ভৃত্যগিরি হিসেবে অভিহিত করছেন, তাহলে গুহাবাসী রচনাকে তিনি ‘পুনরুজ্জীবনকারী সৃষ্টিকর্ম’, ‘বিজয়-নিশান’, ‘শ্রেষ্ঠ ও অনন্য’ বলে তারিফ করাটা কি করুণ স্ববিরোধে পরিণত হয় না? গোলাম মুরশিদের এই স্ববিরোধই বরং প্রমাণ করে নজরুল দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করেছেন বটে, কিন্তু জীবনের আদর্শ পালনে ও  রচনার স্বেচ্ছাচারে কোনো আপোস করেন নি, পরাজিতও হন নি, রণেভঙ্গও দেন নি। তার সৃজনীসত্তা সর্বাবস্থায় ছিল ‘চিরউন্নত শির’। দারিদ্র্য ও অর্থাভাবের পরিস্থিতি যে কোনো লেখকের চরিত্র নির্ধারণে মাপকাঠি হতে পারে না গোলাম মুরশিদ এই প্রধান ও প্রাথমিক বোধ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। সেই কারণেই তিনি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে এরকম রুচিহীন, ধনদাম্ভিক ও ইতরোচিত একটি জীবনী লিখতে পেরেছেন। নজরুল সম্পর্কে অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং একই সাথে তথ্য ও ঘটনার অপব্যাখ্যামূলক একটি গ্রন্থ বিদ্রোহী রণক্লান্ত। নজরুলের সৃষ্টিসম্ভার সম্পর্কে তার ধারণা অত্যন্ত নিম্নপর্যারের। সাহিত্যিক নজরুল সম্পর্কে গোলাম মুরশিদের ধারণার দারিদ্র্যই বরং এই গ্রন্থে প্রকট ও সর্বব্যাপী। ২৬ সালে দারিদ্র্যের কারণে ‘আপোস’-করা, গানের ‘গুহা’ থেকে উঠতে না-পারা মানুষটিকেই মাত্র তিন বছর পর, ১৯২৯ সালে ১৫ই ডিসেম্বরে ‘পরাজয়’ ও ‘রণক্লান্তির’ জন্য কোলকাতার এলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউজ) বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে সর্বভারতীয়/জাতীয় সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। 

পরিহাস হচ্ছে এই যে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর মতো বাংলা ভাষার সৃষ্টিশীল প্রধান লেখক যখন নজরুল নিয়ে বই লেখেন তখন সে বইয়ের নাম হয় 'জৈষ্ঠ্যের ঝড়', আর গোলাম মুরশিদের মতো সাহিত্যবোধবর্জিত ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির জীবনীকার যখন লেখেন তখন তার নাম হয় 'বিদ্রোহী রণক্লান্ত'। গোলাম মুরশিদ নজরুলকে একদমই বুঝতে পারেন নি। এই বই নজরুলের কঙ্কাল, এখানে রক্ত মাংসের নজরুল নেই, নেই তাঁর তেজদীপ্ত পৌরুষ কিংবা শিল্পিত আলোকরেখা। এটি গোলাম মুরশিদের অন্ধত্বে মোড়ানো এক নজরুল। 

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা