সোহেল হাসান গালিবের দীর্ঘকবিতা : কাউন্টার ফ্ল্যাশ

যেদিন ঘরের এ মসৃণ আয়নাটিও প্রতারণা করবে প্রত্যাহার করবে সব প্রতিধ্বনি                            শৈলবালা ঐ দিগন্তের যেদিন অখিল-সমুদ্রের জল তুলে নেবে মেঘ অথচ আকাশ             করুণা বর্ষণ করবে না আর সেদিনের সেই ভাসমান জলরাশির শপথ শপথ সে বিম্বহারা মুকুরের               এবং নিষ্ঠুরতম পর্বতমালার—                                প্রতিটি রমণোন্মুখ মুহূর্তের কাছে                                             যারা নতজানু হয়ে আছে                        হয়ে আছে মূর্ছাহত—খণ্ডবুক—তবু যারা নয়                                                     ব্যর্থ-পরাঙ্মুখ                                                             আত্মদহনের চুল্লিশীর্ষে— যারা আসে বেদনার খরস্রোতে         খড়কুটো-চেপে                    পিপীলিকা হয়ে                                জীবনের শেষবিন্দু মধুটির                                            কৃপাকণা তুলে নিতে—       হে অন্তিম প্রয়াস—উদ্যম-ভাঙা নির্জন কার্নিশে তুমি                        অবলীন ডানার ধুনুরি—                                    তোমারও শপথ তারাই বুঝবে ভাষা—বক্রোক্তি—ইঙ্গিত ও সংকেত                                          বোবা-বধিরের—                   নিখিলের নাভিমুখে তারা                                 বংশীবাদক—তারাই                                                পঙ্কিল পালঙ্কে ফোটা দুষ্ট পারিজাত—                                                               প্রেমের গন্ধ-ঘাতক। একটি দুটি তিনটি শতাব্দী লুণ্ঠন করে           এখন চলেছে যারা সহস্রাব্দ লুণ্ঠনের দিকে                            চলেছে উন্মাদ                  নৈঃশব্দ্যের চক্রবালে উড়ন্ত ঘোড়ার ছায়া                                          হ্রেষাঙ্কিত ক’রে      অকস্মাৎ ছিঁড়ে ফেলে গগনমলাট                                পার হয়ে ইন্দ্রজাল—সাইবারধনু                     চন্দ্রলুপ্ত কোনো সাম্রাজ্যের                                    অশোকের—কিংশুকের                                                  এবং চলেছে       নিশীথের নাচঘর থেকে শয়নকক্ষের                    দূরত্ব কি নৈকট্য সতর্ক পায়ে                               মাপতে মাপতে তাদের ঘুমের ছক-আঁকা সব লকারের নিচে                স্বপ্নে ও শিথানে                               নয় কোনো বিস্ফোরক—মারণাস্ত্র                                       কিংবা মারিজুয়ানা—       হৃদয়-করোটি দীর্ণ-করা                     শুধু আলপিন—বর্ণহীন—শূন্য অবিশ্বাস                               ভ্রাতৃছলনার মারীবীজ                 রেখে যাবে বলে যারা আজ                                       হয়েছে গেরিলা, গুপ্তচর                                                   পায়রা ও ভ্রমর          জতুগৃহপরিচারিকার বেশে নিরুদ্দেশ                                               বিমলা—বিশাখা—                      যাদের পায়ের তলে                               দৃষ্টি ও দিগন্ত অবলীঢ় কেবল তাদেরই জন্যে রৌদ্রকার্পাসের সুতো বোনা          এই জুম্ম-নিরালায়—                      মরণ, তোমার টুকরো-ছিন্ন গানের                                   কঠিন চীবরদান               কে করবে তবে—কে নেবে সে দায়                     তরঙ্গচূড়ায় বসে তপোমন্ত্রপাতে— তখনই তো সুর আসে নিষ্ফলের—ঘুরে ঘুরে—                চূর্ণ চূর্ণ কাচের হাওয়ায় ওড়ে যেন উড়নি                                আলোর সংঘাতে—       অন্ধের হৃদয়ে ফোটে                         কয়েকটি অলীক মাছির মধু-গুঞ্জরন।

* * *

কুঞ্জবন, তুমি আজ খুলে দাও নৈশগ্রন্থি,                              ডাকো অভিসারে যত প্রেত-নিশাচর;              এই অর্ধপ্রকাশ জ্যোৎস্নায়                                        শিরশ্ছিন্ন বাতাসের বুকে     তুলে রাখো শিখণ্ডিত অন্ধকারের গোপন মুদ্রাগুলি                     করোটিমালার ছায়ানৃত্যে                               পৃথিবীর নিঃশব্দ আলেখ্য। প্রহরান্তে, জানি, প্রহরীই একমাত্র পার্শ্বচর,                              বার্তা-বাহকেই পাবে শেষ বার্তা। তাই হবে                  কোনো ভগ্নদূতিকার সাথেই বিশ্রম্ভালাপ।          তবুও যে কারণে এ প্রত্যাখ্যান                          তবুও যে করণের ফল এই নিখিলবঞ্চনা— সেই কারণ ও করণের একাকী গুহায়                 গুম হয়ে আছি—আছি প্রতিমাবিলাসে                                    পাথুরে ভাষায় লীন।          ঝাউবনে এসে তবু কেউ গান শোনে                    শোনে আজও সমুদ্রের স্বর—                              ‘তারায় তারায় যা হারায়,                                           আমি তার অন্বেষণ                                                    হে নশ্বর...’            ‘ক্ষুধার পার্বণ পার হয়ে এসে                               উলুধ্বনিতে জ্বেলেছ যে উলগুলান,                বলো তাকে,                                তুমি হোম শুধু!                                             নও হুতাশন?’ মেঘ ঠিকই খুলে রাখছে তার অঙ্গগুলি                পাহাড়ের আলনায়। গিরিবালা পড়ে আছে                               কাত হয়ে গিরিখাতে।          উদ্বাস্তুরা দিগন্তরেখায়, সমুদ্রের ঢেউয়ে লিখছে যে দিনপঞ্জি, সেইখানে তার নাম মুছে দিতে                    এল কোন গিরিধারী! ‘হস্তিনাপুরের থেকে এতদূর এই                হস্তিনাশ অরণ্যের ধারে                               বৃংহণ, কিভাবে বেজে ওঠো তুমি?’ পাহাড়ের নিচে ওইখানে                ওই পোড়োবাড়ির ভিতর                               মূর্তিগুলি সব জেগে উঠে জানতে চায়,                ‘শিঙা বেজে উঠেছে কি?’          গুলিবিদ্ধ বক উড়ে এসে পড়ে                     ভোরের আকাশচ্যুত হয়ে                                              বিস্তীর্ণ কহ্লার-বিলে। মৃত নদীটির কোন গহন সংকেতে                কে তুমি ডাঙায় এসে ডিঙা বাও? বৃন্তমুক্ত জারুলের ফুল—বটফলরাশি—ঝরাপাতা—                        অস্ফুট নিরুদ্ধ শ্বাস—         এর বেশি কী আশ্বাস তুমি পেলে                                   শতাব্দীর অন্তিম আলাপে?

* * *

জানা নেই ব্যাসার্ধের পরিমাপ, বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছি—          চলেছি একটি বৃত্ত এঁকে                         একা একা                                      যতদূর দেখা যায়। কতদূর চলে আসে             পরিধির ভেতরে, কে জানে! এও কি মারীচ, মরীচিকা—উটহত্যার আজানে                         ওঠে রক্তে ফোয়ারাফটিক শিখা             মরুজ্বর-পিপাসায়? পিপাসারও জানা নেই পবিত্র জলের কথা।             নীরবতা দিতে পারে সব প্রশ্নের জবাব—                         সবচে সুন্দর। কলহমুখর হতে চায় বটে পাখি             বাতাসের ডান হাতে                         পরিয়ে সুরের রাখি। আড়ি পেতে বসে থাকা নদীটি কি শুনবে না             ঢেউ হতে চায় ফেনা? জলের কল্লোল পার হয়ে             ক্রমশ জাহাজগুলি                         চায় ভিড়তে                                     ঝিঁঝিট-বন্দর— যেখানে পূজারী-পসারিনি             রাত্রিসারাদিনই                     অন্তরের খবর খরিদ করে নিয়ে যায় গোল্লাছুট আর কানামাছি             সব একভাবে খেলা হয়                         সেই এক গহিন গোল্লায়। জানতে চাই তবু—আত্মবিক্রয়ের এই ত্বরা—             কোথায় সে ম্যাজিকলন্ঠন,                         যার মায়াবী আলোয় ঝরা অযুত-নিযুত-কোটি সোনালি সোনালু ফুলে             আত্মার বিশুদ্ধতম ভুলে দেখবো চেয়ে : উল্টো চলে পৃথিবীর ঘড়ি,                         পাল্টে দেয় ইতিবৃত্ত,                                     বাজিয়ে টুংকারে অন্ধ সময়-সন্তুর। কার কাছে পাবো সেই বিদ্যা ধন্বন্তরি—             হৃদয়ের সব ব্যাধি                         আধিতেই হয়ে যায় দূর! কবে এই তর্জনী-তরাসে নাচে সমুদ্র-তুফান—             হ্লাদিনী-উল্লাসে মেতে                         পিশাচের পায়ে গিয়ে ফেরেস্তা লুটান; এমনই তাণ্ডবকাণ্ড—জন্মান্ধ রাজার হাতে             তুলে দিয়ে ভিক্ষাভাণ্ড                         পর্বতফাটল বেয়ে নেমে আসে কবে                                     রাশি রাশি অভ্র সোনা—             কী সৌভাগ্য তাতে গড়া হবে,                         কোন পরিণাম পাবে জীবনের আলপনা! ফুরাবে কি ঐ সিংহাসনের তলায়                                     লক্ষ হৃদয়ের অক্ষক্রীড়া?             থেমে যাবে সাম্রাজ্যের শঙ্খনাদ, ভেঙে হবে চুর রণনবিধুর জুমপাহাড়ের ধনুর্বাণ,             প্ররোচনাপাপীদের                         সুর-অফুরান                                     পাঞ্চজন্য?             এখনো হাওয়ায় ওড়ে                         হেলেনের হাসি ও শীৎকার— পাতালপাঁজর মুচড়ে ওঠে ঢেউ,             বলে ফেনিল মর্মরে:                                     এসো, ফিরে এসো... আজ তার নেই কোনো রেশও,             তবু মনে মনে                         পরাকাশচারী ঐ প্যারিসেরই মতো                                     সন্তর্পণে একটি চুম্বন চেয়ে পৃথিবীর রাত্রি কাঁদে,             কাঁপে বৃক্ষবন্য                         স্পার্টার উদার উপকূলে। আমি দেখি তাই             কেবলই গড়ন ভেঙে                         গড়িয়ে গড়িয়ে—মুক্তবেণী             মেঘে মেঘে ভেসে চলে মধ্যযুগ—                                     মহুয়া বেদেনী। মেদিনী, তোমার দিগ-বলয়ের ক্ষুণ্ন অধিকারে             জেগেছে এ ক্ষীণদৃষ্টি। জানা নেই ব্যাসার্ধের পরিমাপ,                         বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছি। চেয়ে আছি মাটি থেকে আকাশ অবধি—             যেন আজ হেরেছি বাজিতে                         ঝাড়েবংশে, দিগন্ত-দ্রৌপদী। এখন হঠাৎ যদি এই ভাদ্রে, অয়ি ভদ্রে,             মেঘহীন, বায়ুবাষ্পলীন ঐ                         নীলিমাপালিত রৌদ্রে             নেমে আসে বৃষ্টি—                         নক্ষত্রের, স্ফুলিঙ্গের                                     কিংবা আকাশগঙ্গার             নেমে আসে যত সব                         জ্বলন্ত অঙ্গার;             অঞ্জনশলাকা যদি                         বিঁধে দেয় ইডিপাস                                     জ্ঞাননেত্রে কুরূপে-অরূপে             তুরুপের তাশ-ফেলা                         এই কুরুক্ষেত্রে তখন কীসের বৃত্ত, কীইবা ব্যাসার্ধ—             সপ্তাশ্ব রথের, বলো, কে হবে সারথি,                         কোথায় পালাবে পার্থ!—

* * *

ফসিলের থেকে একদিন                         ফুঁসে উঠবে ডাইনোসর— থাকবে না সুপ্ত কোনো ক্ষোভ             অতৃপ্ত আত্মার গান                         ধাঁধালুপ্ত বিকেলের অবসর। জেব্রা এসে শান্ত শস্পবনের মাথায়             নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা                                    সিংহশাবকের চোখে                         ডোরাকাটা গায়ের দেখাবে নীল-নকশা তার—

তুই বল, কী চাইবি রে জানতে?             তোর আর্তনাদ                         গুহাচিত্র থেকে নেমে                                     এক অন্ধ ওরাংওটাং— ভুলে যাবে এই হেলে-পড়া দুপুরের             ময়ূর-বীজন-ঘুম কারে বলে,                         কারে বলে নিশীথের শিউলি-ফোটা                                     তারার আলাপ। বন্দিশয়নের ঝিমধরা এক পাতাল-চাতালে             কিছু না শিখতে চাওয়া                         মাতাল দানব সে তো,             এঁকে যাবে শুধু নিরর্থের শব্দরেখা—                                     দ্রিমিকি দ্রিমিকি দ্রাং। ‘কত হনুমানদিবসের কত পর্ব পার হলে                         কত চাপ তাপ আর ঠাপে অভিশাপে             আমাদের হাড় হবে তেলের তরল—                                  পাবে কয়লামূল্য? বল দেখি, কত জ্বালা সয়ে ভূ-পৃষ্ঠের                         ভূ-তলে নেমে সে হবে জগদ-জ্বালানি?’ —যেন কোন পিশাচেরা ডাকে                                 ডাকসিদ্ধ ডাকাতের মাকে।             এও কি সম্ভবে?                         বলি, শোন তবে— একদিন দুর্বাসা-যতীর রতি-কোপন গোপন বনে                          ভাটার নদীর ঘাটে ঘাটে কালরাত্রিবেলা      পৃথিবীর তামসতমালতীরে আমরা কজনে                   শ্মশানবন্ধু, খেলবো শ্মশানযাত্রীর খেলা— ছড়াবো বাতাসে উল্কারেণুকার ভস্মত্রাস—হুহুল্লাস— আয় ভাই, তার আগে, মরে শেষ হয়ে যাই—             অন্ধ ন্যাড়া পাকুড় গাছের নিচে                                     ভাঙাচোরা এই দাঁতমুখ খিঁচে                          নিজেকেই পুঁতে রাখি।             ছেঁড়া ফতুয়ায় ধ’রে নিয়ে হাওয়াপাখি                                    ছিন্নপালক তার মেঘেতে ওড়াই। দিক তালি করতালি দিগ্বিদিক—আকাশ-বন্দিরা—             শৃগালের নাচ-তালে                                     আড়ালে-আবডালে                         বাজুক আমার এই হাড়ের মন্দিরা।।
সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা