পর্ব-৩৫
পর্ব-৩৬
মার্চ মাস এলেই গাঁথার প্রতি জন্মদিনেই নিয়াজ আপার নিঃশব্দে কেক আনা চলতে লাগল। আমরাও প্রতি মাসে এটাসেটা নানান কিছু, নানান অনুষ্ঠান নিয়ে মেতে রইলাম। এর মাঝেই আনোয়ারা সৈয়দ হক আপা আরেকটি ভিন্ন সংগঠন করলেন ‘অশ্রুপাত’ নামে। হক ভাই ও আনোয়ারা আপার আন্তরিক আহ্বান সত্ত্বেও আমি ওই সংগঠনের নিয়মিত সদস্য হতে পারি নাই। এর পেছনে বহু কারণ ছিল। এক. অশ্রুপাতের মিটিংয়ের সময়সূচি আমার জন্য অনুকূল ছিল না। দুই. মিরপুর থেকে গুলশান আসা-যাওয়ার পর্যাপ্ত টাইম আমার ছিল না, আমার নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট নেই বিধায় আসা-যাওয়ার হ্যাপা সহ্য করা মুশকিল ছিল। তিন. অশ্রুপাতেও স্বরচিত পাঠের বিষয়টি ছিল। যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় নাই।
স্বরচিত পাঠ যদি হয় একজন লেখকের লেখার উত্তরণের লক্ষ্যে, কিন্তু ওইসব সভায় কোনোদিনই সমালোচনামূলক আলোচনা হতে দেখি নি। আর যদি তা হতোও, কেউ-ই তা গ্রহণ করত কি? বা পজিটিভভাবে দেখত কি?
ওখানে যাঁরা যেতেন, তাঁদের প্রায় সকলেই লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাছাড়া আরেকটা বিষয় ছিল, আনোয়ারা আপা ‘অশ্রুপাতের’ সভাগুলিতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য যাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি কেন যেন চাইতেন না আমি অশ্রুপাতের সভাগুলিতে যাই। এজন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো থেকে তিনি বিরতই থাকতেন। কিংবা এমনও হতে পারে যে, তিনি হয়তো সত্যি সত্যিই ভুলেই যেতেন।
একজন পাকিস্তানি সর্বদাই আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে যাবে, আদতে এমন ক্ষুদ্র চিন্তা আমি মনেও আনতে পারি নি।
আনোয়ারা আপা মাঝেমাঝে অবাক হয়ে জানতে চাইতেন—
পাপড়ি, তুমি আসো নাই কেন?
আমিও ততোধিক অবাক হয়েই বলতাম—
আপা, আমি তো জানিই না যে অশ্রুপাতের সভা ছিল।
আপা দ্বিধান্বিত হয়ে বলতেন—
কেন ‘অমুক’ তোমাকে জানায় নি?
আমি বলতাম—না তো, আপা।
এটা জেনে আনোয়ারা আপাই হয়তো পরের সভাতে আমায় নিমন্ত্রণ জানাতেন। আমি গিয়ে তাঁর অপ্রস্তুত চেহারা দেখে নিজেই বিব্রত হতাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিতাম—‘অশ্রুপাতের’ সভাতে আর আসব না আমি। কারণ কারো সাথে ইঁদুর দৌড়ে রত হতে চাই না আমি। আর পরশ্রীকাতর লোকজনদের কাছ থেকে আমি শত হস্তে দূরে থাকতে চাই। আদতে হিংসুটে ও ক্ষুদ্র মনোভাবাপন্ন নারীদের আমি বরাবরই এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করেছি বা করি। একথাটা বলতে অত্যন্ত লজ্জা লাগলেও বলছি, আমাদের বেশিরভাগ নারীলেখকরাই কিন্তু এমন। তাঁরা বেশভূষায় অত্যন্ত আধুনিক, কিন্তু তাঁদের মনোজগৎ হিংসা আর পরশ্রীকাতরতায় পরিপূর্ণ। কে কাকে কতভাবে ল্যাং মেরে ধরাশায়ী করবে সে-চিন্তাতেই হয়তো নিজেদের লেখাটি এরা লিখতেই পারে না।
যদিও ‘অশ্রুপাতের’ সভা ওইসব কূপমণ্ডূকদের তোষামোদিতে ম্লান হতে পারে নাই কোনোদিনই। বরং তোষামোদকারীদের ম্লান করে দিয়ে আনোয়ারা আপার সারল্য ও মমতা, হক ভাইয়ের উজ্জ্বল উপস্থিতি দ্বারা সদাই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
আনোয়ারা আপা ও হক ভাইয়ের ‘অশ্রুপাতের’ সভা তদারককারী ব্যক্তিটি নিয়াজ জামানের গাঁথারও মেম্বার ছিলেন। আনোয়ারা আপা ও হক ভাইয়ের ‘অশ্রুপাতের’ পর তিনিও আলাদা করে নিজের বাসায়, নিজের একটা সংগঠন খুলে বসেন। এতে আমরা কিছুটা অবাক ও আহত হই। গাঁথার সদস্যদের নিয়েই আলাদা করে সংগঠন করার কোনো তাগিদ আমি কোনোদিনই অনুভব করি নি। নিয়াজ আপা কাজ করার এতটাই স্বাধীনতা দিতেন যে, নিয়াজ আপাকে ছেড়ে আলাদা করে নিজের জন্য কিছু করা আমি দুঃস্বপ্নেও মনে স্থান দিতে পারি নি। [অবশ্য নিয়াজ জামান গাঁথা হস্তান্তর করার পর আমরা তাঁর অন্য চেহারা দেখেছিলাম
নিয়াজ আপা দুই হাতে অনুবাদের কাজ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে নারীলেখকদের গল্প নিয়ে। গাঁথা থেকেও কাজ হচ্ছিল। দশ জন নারীলেখকের সাক্ষাৎকার গ্রন্থ ‘লেখকের কথা’ সম্পাদনা করতে গিয়ে আমি জানতে পারি যে, নিয়াজ আপা জন্মসূত্রে পাকিস্তানি। কিন্তু আমি এ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেই নাই। একজন পাকিস্তানি সর্বদাই আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে যাবে, আদতে এমন ক্ষুদ্র চিন্তা আমি মনেও আনতে পারি নি।
নিয়াজ আপা বাংলাদেশের নারীলেখকদের বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। তাঁদের লেখাপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে সুসম্পাদনা দ্বারা গ্রন্থকারে প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। নিয়াজ আপার এই কর্মস্পৃহা দেখে আমার মনে হচ্ছিল, উনাকে অনুবাদের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়া যেতে পারে। সেলিনা আপার সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ তুললে তিনিও সহমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু আমি বা সেলিনা আপা তখন অব্দি নিয়াজ আপার রাজনৈতিক-ভিউ সম্পর্কে তেমন কিছুই অবগত ছিলাম না। অবগত থাকার কথাও নয়। কারণ একজন সাহিত্য-অন্তঃপ্রাণ মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান জানা আমাদের জন্য কখনই জরুরি মনে হয় নাই।
এদিকে ‘গাঁথার’ এক দশক পূর্তি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সন্নিকট হয়ে এলে আমি নিয়াজ আপাকে বললাম, আপনি এইবার চুপ করে বসে থাকেন। আমি দেখছি এবারে গাঁথার জন্মদিনে কী করা যায়?
নিয়াজ আপা কথা না-বাড়িয়ে আমার উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। আমিও কোমর বেঁধে লেগে গেলাম প্রায় মহোৎসব করার লক্ষ্যে। গাঁথার প্রায় প্রতিটি সদস্যের সাথে যোগাযোগ করে অনুষ্ঠানের যাবতীয় চক-আউট করে ফেললাম।
ইতোমধ্যে আমি কলকাতা গেলাম ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ আনার জন্য। আর নিয়াজ আপা পেলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার তাঁর অনুবাদ কর্মের জন্য। আপার পুরস্কার প্রাপ্তির সময়ে আমি রইলাম দেশের বাইরে। ফিরে এসে দেখি নিয়াজ আপাকে নিয়ে চারপাশে নানান বাকবিতণ্ডা শুরু হয়েছে। ‘হলি ডে’ পত্রিকায় প্রকাশিত আপার এক আর্টিক্যালকে কেন্দ্র করে বেশ একটা ল্যাজেগোবরে অবস্থা। এক্ষণে আমিও পড়লাম বিপাকে। আপার সাথে আমি প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছি, কিন্তু আমি তো জানতেও চাই নি নিয়াজ আপার জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক-মনোভাব কী? এসব নিয়ে আমাদের মাঝে কোনোদিন কোনো কথা হয় নাই বা মনের ভুলেও এসব নিয়ে আমার মাঝে কোনো জিজ্ঞাসা তৈরি হয় নাই। এদিকে গাঁথার একদশক পূর্তি অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা ক্লাবের সিনহা-লাউঞ্জ বুকিং দেয়া হয়েছে। আমাদের সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। সমস্যা আরও বাড়ল যখন ওই অনুষ্ঠানে যাঁরা যাঁরা আসবেন বলে প্রায় নিশ্চিন্ত ছিলাম, তাঁদের কেউ-ই আর আসার কোনো আগ্রহই দেখালেন না। গাঁথার বেশিরভাগ সদস্যই আমাকে বলল, এ অনুষ্ঠান পিছিয়ে দিতে। কিন্তু মার্চেই তো গাঁথার জন্মদিন, আমি কঠোরভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম, কিছুতেই সমস্ত কিছু গুছিয়ে ফেলা একটা প্রোগ্রাম পেছানো যাবে না। আর এটাই আমার গাঁথায় শেষ প্রোগ্রাম, নিয়াজ আপা যদি সত্য সত্যই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে কিছু লিখে থাকেন, তাঁর সঙ্গে আমার কিছুতেই কাজ করা সম্ভব হবে না।
নিয়াজ জামানের ‘এলিটত্বের’ কাছে আমরা সকলেই যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ। বানের জলে ভেসে আসা কচুরিপানার-দঙ্গল।
অতিথিদের মাঝে যাঁদের যোগদান প্রায় নিশ্চিত ছিল, তাঁদের কেউ-ই এলেন না। নিয়াজ আপার পরিচিত সার্কেল ও আমাকে বিশেষ স্নেহ করেন এমন কয়েকজনকে দিয়ে কেক কাটিয়ে আমরা গাঁথার এক দশক পূর্তি অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলাম।
এক দশক পূর্তি অনুষ্ঠানে অতিথিদের অনুপস্থিতি দেখে নিয়াজ আপাও হয়তো কিছুটা আঁচ করলেন—সামনের সময় আর উনার জন্য অনুকূলে নাও থাকতে পারে। এবং তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী বিধায়, গাঁথার দায়িত্ব আমাকে আর জ্যাকী কবীরকে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি একবার ভাবলাম না করে দিব, পরে আবার মত পাল্টালাম এই ভেবে যে, উনার যত্নে গড়া প্রতিষ্ঠান ‘গাঁথা’ নামটি অন্তত টিকে থাকুক। [এই মানবিকতাকে প্রশ্রয় দেয়াও ছিল আমার জন্য মহা ভুল।
আমি আর জ্যাকী মিলে ১৮ সদস্যের এক নাতিদীর্ঘ কমিটির কথা ভাবলাম। এবং টাইম টু টাইম নিয়াজ আপাকে আপডেট দিতে থাকলাম।
কিন্তু কমিটি ঘোষণার দিন আমি আর জ্যাকী পড়ে গেলাম ভয়ানক বিপাকে। নিয়াজ আপা বেমালুম অস্বীকার করে বললেন যে, এই কমিটি বিষয়ে উনি কিছুই জানেন না! তার মানে দাঁড়াল, নিয়াজ জামান কিছুই জানেন না, আমি আর জ্যাকী উনার সংগঠন জোর করেই ছিনিয়ে নিচ্ছি! নিয়াজ আপার এহেন আচরণে আমরা যেন বিস্মিত হতেও ভুলে গেলাম! ওই হতচকিত মুহুর্তে জ্যাকী কবীর অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আমার পাশে এসে দাঁড়াল [ওই ক্ষণটির জন্য জ্যাকী কবীরকে সারাজীবন স্মরণ রাখব আমি। এবং তা কৃতজ্ঞচিত্তে। নিয়াজ জামানের এমন হঠকারিতায় আমরা পিছিয়ে গেলাম না। ত্বরিত সিদ্ধান্তে নিয়াজ জামানকে করা ই-মেইল থেকে আমরা কমিটির জন্য নির্বাচিত নামগুলি পড়ে গেলাম। নিয়াজ জামান কিছুতেই কমিটির একটি সদস্যেরও নাম ঘোষণা করতে এলেন না। নিয়াজ জামানের এমত আচরণে আমার ধারণা পালটে মনে হলো, নিয়াজ জামানের হৃদয়ে বাংলাদেশিদের ঘৃণা করাসহ বিপাকে ফেলবার বিষয়টিও সুপ্ত ও প্রকাশ্য দুই অবস্থাতেই বিরাজমান।
নিয়াজ জামানের রাগে-দুঃখে-অপমানে লাল-টকটকে মুখাবয়ব দেখে এটাও বুঝে গেলাম যে, উনার গাঁথার দায়িত্ব নেয়াটা আমার জন্য মারাত্মক একটা ভুল হলো। এই গাঁধার বোঝা আমি খামাখাই বহন করার জন্য রাজি হয়ে গেলাম। [চারপাশে যে অবস্থা বিরাজমান ছিল, নিয়াজ জামানের ডাকে আগের মতো কেউ আর আসবে না ভেবে, ‘গাঁথাকে’ বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে, নিয়াজ জামানের জন্য কিছু করার সরল অভিপ্রায়ে আমি আদতে মারাত্মক ভুলের গহ্বরে পতিত হলাম।
১৮ সদস্যের মাঝে যে যার পদ নিয়ে আনন্দিত চিত্তে [আমি প্রেসিডেন্ট আর জ্যাকী কবীর সেক্রেটারি শুরু হলো ‘কমিটি সম্পন্ন গাঁথার’ অভিযাত্রা। আগাগোড়াই আমি নিয়াজ জামানের সাথে আলোচনা করে প্রতিটা কাজ করে যাচ্ছিলাম। যা কিছুই করছিলাম উনাকে জানিয়েই করছিলাম। এর মাঝে আমি নিয়াজ জামানের সংগঠন গাঁথার কার্যক্রম স্থায়ীভাবে ধরে রাখার লক্ষ্যে ৪৫ মিনিটের একটা ডকুমেন্টরি নির্মাণ করালাম। এবং গাঁথার একাদশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তা প্রদর্শনের বন্দোবস্তও হলো।
একেবারে বিনয়ের অবতার হয়ে, এত এত কাজ করে যাওয়ার পরও নিয়াজ জামান যেন কিছুতেই সন্তুষ্ট নন, কিছুতেই যেন প্রফুল্ল নন। বরং খানিকটা বিরক্ত আমাদের উপর। [এবং বিরক্তিটা উনি আমাদের সামনে স্পষ্ট প্রকাশও করেন। গাঁথার অন্যান্য মেম্বারদের সঙ্গে উনার যেন শাসক আর শোষিতের সম্পর্ক। নিয়াজ জামানের ‘এলিটত্বের’ কাছে আমরা সকলেই যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ। বানের জলে ভেসে আসা কচুরিপানার-দঙ্গল। অগ্রজদের সঙ্গে বেয়াদবি না-করার লক্ষ্যে আমি মুখ বুজে সমস্তই মেনে নিচ্ছিলাম।
দুই বছর মেয়াদি গাঁথা চলতে শুরু করল নব উদ্যমে। কিন্তু কমিটি বিষয়ে নিয়াজ জামান একদিন জানালেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে উনি ইলেকশন করতে চান। শুনে আমরা ভারি অবাক হলাম, সাকুল্যে পনেরো জন মেম্বার আসে না মান্থলি-মিটিংয়ে, সেখানে উনি কার বিপক্ষে কাকে দাঁড় করাবেন? এমত উদ্ভট চিন্তা উনার মাথায় আসে কী করে? গাঁথা কি অনেক বড়সড় কোনো প্রতিষ্ঠান? অনেক সদস্যদের আনাগোনা এইখানে?
প্রায় বিশটার মতো সফল প্রোগ্রাম করার পরও দেখি নিয়াজ জামান কোনো কিছুতেই খুশি নন আমাদের উপর! আমাদের এক্সিকিউটিভ মিটিংগুলি হতো এক একজন সদস্যদের বাসায়। প্রতিটা সদস্য তাঁদের সাধ্যমতো শ্রমে সেসব আয়োজন সম্পন্ন করত। আন্তরিক ভালোবাসায় খানাখাদ্যের কমতি কোথাও তারা রাখত না। কিন্তু নিয়াজ জামানের তাদের প্রতিও আচরণ ছিল প্রায় শাসকের মতো। ঔদ্ধত্য ও অমানবিক।
যেন আমরা সেই একাত্তরের পূর্বের দলিত কর্মীরা উনার ‘গাঁথা’ হাতে পেয়ে বিশাল কিছু পেয়ে গিয়েছি। এসব কারণে সদস্যরা ‘গাঁথায়’ আর থাকতে চাইছিল না। আমি তবুও দাঁতে দাঁত চেপে নীরবে গাঁধার বোঝা টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছুতেই শেষ রক্ষা হলো না। হলো না ঠিক নয়, শেষ রক্ষা করতে অপারগ হলাম!
যারা আমাকে মন থেকে ভালোবাসে বা ভালো চায় তাদের মাঝে কিছু কট্টর আওয়ামীপন্থীরাও ছিল। ফলত তাঁদের কাছ থেকেও জবাবদিহিমূলক প্রশ্ন আসছিল—
আমি কেন নিয়াজ জামানের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছি?
এ প্রশ্নের উত্তর সত্যিই আমার কাছে ছিল না। আর আমার মনও আর সায় দিচ্ছিল না। কারণ আমার শ্রদ্ধা, মানবতা বা উদারতা উপলব্ধি করার মতো মানসিকতা নিয়াজ জামানের অন্তত ছিল না। উনি ভাবছিলেন ‘গাঁথা’ হ্যান্ডওভার করে উনি হয়তো ‘কাশ্মির’-ই দান করে দিয়েছেন আমাদের।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমরা ডেকে নিয়ে আসব উদীয়মান নারীলেখকটিকে—তাঁর প্রতিভায় প্রতিভাত হতে।
আমি যে কোনোদিনই কোনোকিছুর জন্যই লালায়িত নই, এটা বুঝার মতো ক্ষমতা অনেকেরই থাকার কথা নয়। ফলত নতুন কোনো সংগঠনের চিন্তাও আমার মনে স্থান পায় নাই। কিন্তু যাঁরা আমার সঙ্গে কাজ করছিলেন, তাঁরা চাইছিলেন নিয়াজ জামানের ডিক্টেটরশিপের বাইরে গিয়ে কিছু একটা করতে।
সেলিনা আপা, আনোয়ারা আপার সাথে এ বিষয়ে আলাপকালে তাঁরাও একই অভিমত দিলেন—
আমাদের নিজেদের কিছু একটা তো থাকা চাই, থাকতে হবে, পাপড়ি।
সত্যিই তো আমাদের নিজের স্বাধীন দেশের মতো একান্ত নিজস্ব একটা সংগঠন। যে সংগঠনে কেউ প্রভু নন, কেউ শাসক নন। কাউকে যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্যের হুল বিদ্ধ না করে। যেখানে সব সদস্যদের সমান অধিকার এবং সমান দাবি যেন থাকে।
সমস্ত ধান্ধাবাজিকে উপেক্ষা করে যেখানে প্রতিটা সদস্যকে সমান মর্যাদা দেবো আমরা। কোনো শাসকের রাঙাচোখ যেখানে আমাদের সংকুচিত করে তুলবে না। মফস্বলের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমরা ডেকে নিয়ে আসব উদীয়মান নারীলেখকটিকে—তাঁর প্রতিভায় প্রতিভাত হতে।
সমস্ত সদস্যদের মতামত নিয়ে, সেলিনা হোসেন ও আনোয়ারা সৈয়দ হককে উপদেষ্টা করে শুরু হলো ‘কালির’ যাত্রা। আমরা যা-ই করেছি, অত্যন্ত ভালোবেসেই করেছি। আমরা চেয়েছি আমাদের নয়নের কাজলের মতোই উজ্জ্বলতা পাক এই সংগঠনের প্রতিটা কার্যাবলি।