আমার একলা পথের সাথি : ১৬

পর্ব-১৫

পর্ব-১৬

পূর্বেই বলেছি দৈনিক সংবাদের ‘সাহিত্য সাময়িকী’ পাতাটি তখন সাহিত্য সম্পাদকদের জন্য ‘রোল-মডেল’ বিশেষ। এবং ওই পাতাটির জাঁদরেল সম্পাদক যখন আবুল হাসনাত। অত্যন্ত সাহিত্যবোদ্ধা, স্বল্পভাষী, বিচক্ষণ এই মানুষটি কিছুটা নিভৃতচারীও বটে। আজকের অনেক বড় বড় স্টারলেখকদের উপরে উঠার সিঁড়ি ছিল সংবাদের এই সাহিত্য-পাতাটি। হাসনাত ভাই ছিলেন চিরকালই নারীপক্ষের মানুষ। কোনো নারীর মাঝে সামান্য স্ফুলিঙ্গ দেখলেই উনি তা আলোতে রূপান্তরিত করে দিতে চাইতেন। হাসনাত ভাইয়ের এগিয়ে দেয়া সিঁড়ি বেয়েই শাহীন আখতার, অদিতি ফাল্গুনী গায়েন প্রমুখের ঝটাঝট উত্থান হয়েছিল। এবং হাসনাত ভাইয়ের দেখানো পথ ধরে তখন অনেক বড় বড় হাউসের সাহিত্য সম্পাদকেরাও হাঁটতেন। আমি অবশ্য এই গুমোরের খবর অনেক পরে জেনেছিলাম। ততদিনে শৈলী, উত্তরাধিকার, জনকণ্ঠ, খোলাজানালা, তরুণ লেখক প্রকল্প, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি বৈতরণী পার হয়ে নিজের গল্প বলবার ভঙ্গিটি মোটামুটি হয়তো আয়ত্ত করতে পেরেছি। তবুও আমি ভাবছিলাম হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে একদিন অন্তত সৌজন্য সাক্ষাৎ করা দরকার। কিন্তু পার্টনারের আমার জন্য কিছুতেই সময় হচ্ছিল না। [বরাবরই আমার জন্য তার কোনো সময় বরাদ্দ ছিল না। আমি খুব অনুনয় বিনয় করার পর হয়তো তাকে কোথাও আমার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারতাম। এদিকে আমি যে একা একা কোথাও যাব, তেমন অনুমতিও তার কাছ থেকে মিলত না যার ফলে যাব, যাচ্ছি করে হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার আর দেখা করা হয়ে উঠছিল না।


একদিন ঠিক মধ্যাহ্নে মিষ্টি-সুরেলা এক সুকণ্ঠী আমাকে জানালেন যে, সংবাদ থেকে হাসনাত ভাই কথা বলবেন।


কিন্তু আমার ভেতরে সারাক্ষণই ছটফটানি ছিল উনার সঙ্গে দেখা করবার। বহুপ্রজ লেখক আমি কোনোদিনই নই। প্রতি বছর চার/পাঁচটা করে বই প্রকাশের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনোটাই আমার কোনোদিনই হয় নাই। বহু কষ্টে হয়তো দুই-তিন বছর পর পর কোনো পাণ্ডুলিপি আমি গোছাতে পেরেছি। লেখালেখির একেবারে শুরু থেকেই কোনো লেখাই আমার হাতে জমা করে রাখতে পারি নাই। এমন না যে, অপ্রকাশিত লেখার স্তূপ সামনে রেখে আমি বসে বসে সেসব নিয়ে ভেরেণ্ডা ভেজেছি! লেখা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই তা কোথাও না কোথাও পাবলিশড হয়ে গিয়েছে। ফলত সংবাদের সাহিত্য পাতায় গল্প দেয়ার মতো কোনো গল্প আমি লিখে উঠলেও পাঠাতে পারছিলাম না। কেউ না কেউ হয়তো সে-গল্পটা চেয়ে নিয়ে ছেপে দিচ্ছিলেন। তখন অবশ্য গল্প নিয়ে আমার নানান এক্সপেরিমেন্টের ঝোঁক চেপেছিল। আমি ক্রমাগতই নতুন নতুন বিষয় অনুসন্ধান করে চলছিলাম। এদিকে নিজের প্রচণ্ড ‘ছুঁতমার্গের’ বাজে স্বভাব একেবারে আটপৌরে জামাকাপড়ের মতো আমার শরীর আঁকড়ে ধরে ছিল। এজন্য কেউ কেউ হয়তো আমাকে স্নবিশ ভাবতে পারেন, কিন্তু বাস্তবিকই আমার ওইসব থেকে পরিত্রাণ ছিল না। যেমন, অন্য কেউ যেসব বিষয় নিয়ে লিখবে, আমি তার ধারেকাছেও যাব না। কেউ হয়তো আদিবাসীদের নিয়ে গল্প লিখেছে, আমি কস্মিনকালেও আদিবাসীদের নিয়ে লিখব না এবং লিখিও নাই। বা আমাদের মুসলিম-মিথ নিয়ে কেউ লিখছে, আমি সেসব মিথ নিয়ে লিখব দূরে থাকুক, তার ধারেকাছে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারতাম না।

আমার ছিল অন্বেষণ। ক্রমাগত নিত্যনতুন অন্বেষণ। এরই মাঝে আমি ‘মঙ্গলকাব্য’ ও ‘ময়মনসিংহ গীতিকার’ অংশবিশেষ প্যারালাল করে দুই-তিনটা গল্প লিখে ফেলেছি। একটা ছাপা হয়েছে ‘উত্তরাধিকারে’। এরই মাঝে আরেকটা গল্প লিখলাম—‘ফুল্লরা মঙ্গল কথা’ নামে। ‘মঙ্গলকাব্যের’ বর্মের নিচে এই ক্লেদাক্ত রাজধানীর নাগরিক জীবনের জলজ্যান্ত গল্প। হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে তখনো আমার দেখা করার সৌভাগ্য হয় নাই। কী আর করা? তখন চলছে মাহে-রমজান। আমি রোজা রেখেই গেলাম কুরিয়ার করতে। এবং সংবাদের ঠিকানায় তা পাঠিয়ে দিলাম। বাসার ফিরে হাসনাত ভাইকে ফোন করে বললাম যে, হাসনাত ভাই, আমি তো আসতে পারছি না, আপনার সংবাদের ঠিকানায় একটা গল্প পাঠিয়ে দিয়েছি। হাসনাত ভাই আগাগোড়াই বাড়তি কোনো কথা একদমই বলতে চান না। ফলত যথারীতি আচ্ছা, আচ্ছা বলে তড়িঘড়ি করে ফোন রেখে দিলেন। আসন্ন ঈদের প্রস্তুতিতে আমিও সংসার নিয়ে বিজি হয়ে গেলাম। সংবাদে আমি গল্প পাঠিয়েছি ঈদের ঠিক সাত কি আটদিন আগে। আর মনে মনে ভেবেছি, যদি ছাপাও হয় এই গল্প, তাহলেও তা ঈদের পরে হলেও হতে পারে।

যে কোনো সংবাদপত্র অফিস থেকে ফোন এলেই আমি তখন বুঝতে পারতাম। কারণ অপারেটর আগেভাগেই আমাকে জানিয়ে দিত কে কথা বলবেন।

একদিন ঠিক মধ্যাহ্নে মিষ্টি-সুরেলা এক সুকণ্ঠী আমাকে জানালেন যে, সংবাদ থেকে হাসনাত ভাই কথা বলবেন। আজও স্পষ্ট মনে আছে—ফোনের এ প্রান্তে আমি রিসিভার কানে নিয়ে কম্পিত বক্ষে অপেক্ষা করছি, কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেয়া সেই গল্প নিয়ে আজ আমাকে না জানি কী না কী শুনতে হয়? বুঝিবা আমি এক্ষুনি শুনব—পাপড়ি, দুঃখিত, আপনার গল্পটা আমরা সংবাদে ছাপতে পারছি না। অথবা হয়তো কুয়াত ভাইয়ের মতো করে গম্ভীর গলা করে তিনি বলবেন—

পাপড়ি, আরেকবার কাটাছেঁড়া করলে এই গল্পটাই অন্য একটা নতুন কিছুতে দাঁড়াতে পারবে বোধহয়!

কিন্তু না, বিধি আমার বামে নয়, ডানেই ছিল। হয়তো ভাগ্যদেবী প্রসন্ন চিত্তে আমার অদূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছিলেন। তাই হয়তো হাসনাত ভাই ফোন ধরেই বললেন—পাপড়ি, আমি হাসনাত। আপনার গল্পটা আমরা ঈদসংখ্যায় ছেপে দিচ্ছি। ইলাস্ট্রেশন ছাড়াই ছাপতে হচ্ছে। কারণ আগামীকালই আমাদের পত্রিকা প্রেসে যাচ্ছে। ইলাস্ট্রেশন করার সময় হাতে নাই।


সম্পাদক আবুল হাসনাতের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা ও ঋণের সীমা পরিসীমা নাই।


আমি জি আচ্ছা, জি আচ্ছা বলতে না বলতেই, হাসনাত ভাই আমার কথা শুনলেন কী শুনলেন না—ঘটাং শব্দে ফোন রেখে দিলেন।

তিন কি চারদিন বাদে সংবাদের ‘ঈদসংখ্যা’ আমার হাতে এল। এবং ভেতরের পাতায় এক পৃষ্ঠা জুড়ে ‘ফুল্লরা মঙ্গলকথা’ ছাপা হয়েছে, কোনোরকম ইলাস্ট্রেশন ছাড়াই! কিন্তু অন্য লেখাগুলোর বুক-পিঠ জুড়ে ইলাস্ট্রেশনের নান্দনিক স্পর্শ। একটা লেখারই শুধু এরকম করুণ-হাল। কিন্তু এতে আমি মোটেও মনঃক্ষুণ্ন হলাম না। হাসনাত ভাই আমার গল্প অত্যন্ত পছন্দ করেছেন, এবং দ্রুতই সে-গল্প তিনি ছেপেছেন, তাও আবার ‘ঈদসংখ্যার’ স্পেশাল ইস্যুতে—সেটাই ছিল আমার কাছে সব চাইতে বড় পাওয়া।

সম্পাদক আবুল হাসনাতের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা ও ঋণের সীমা পরিসীমা নাই। পূর্বেই বহুবার বলেছি, গুটিকয় মানুষের জন্যই আমি আজও লিখে চলেছি। তাঁদের অনুপ্রেরণাকে পাথেয় জ্ঞান করেছি। তাঁরা পাশে আছেন বলেই হয়তো সুস্থ মাথায় এই জীবন-নদীর উজান বেয়ে চলতে পারছি। তাঁরা না থাকলে আমার মতো প্রান্তিক-লেখক কবে মরে যেত। শুধু মরেই যেত না, তার হাড়-মাংসও এতদিনে মাটির সঙ্গে মিশে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। এই অগ্রজরা আমাকে ছায়ামায়া দিয়ে বাঁচিয়ে রাখলেন। একটা চারাগাছকে তারা ক্রমান্বয়ে যত্ন করে বৃক্ষ করে তুললেন।

হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার হয়তো সারাবছরই কথা হয় না, যোগাযোগ হয় না—কিন্তু তিনি আমাকে ঠিকই স্মরণে রেখে বিশেষ সংখ্যায় লিখবার জন্য আমন্ত্রণপত্র পাঠান। আমি তখন মরমে মরে যেতে থাকি—এইসব উজ্জ্বল নক্ষত্রদের সামনে, আলোক স্তম্ভের কাছে— আমি কতই না ক্ষুদ্র, কতই না তুচ্ছ আর নাদান এক লেখক! যে কোনো ভালো কিছুর সঙ্গেই হাসনাত ভাই আমাকে যুক্ত করে নেন। আমাকে বড় স্নেহ-মমতায় ডাক দেন। এই পুরুষতান্ত্রিক-সমাজে একজন নারীর জন্য লেখালেখি করা যে প্রায় অসম্ভব, সেকথা হাসনাত ভাই খুব ভালো করেই ওয়াকিবহাল আছেন।

প্রায় ১০/১২টা গল্প নানান পত্রপত্রিকার স্পেশাল ইস্যুতে ছাপা ও প্রশংসিত হওয়াতে আমি ভাবতে লাগলাম, এইবার হয়তো একটা বই করা যায়। গল্পগুলো  অন্তত এক কম্পাইলেশনে থাকুক। মনে মনে গোছাতে লাগলাম বইয়ের নাম কী দেয়া যায় বা কোন প্রকাশককে দেয়া যায়? এরকম ভাবতে ভাবতেই ‘মাওলা ব্রাদার্সে’র মাহমুদ ভাইকে একদিন ফোন করে বললাম, মাহমুদ ভাই, আমি একটা গল্পগ্রন্থ করতে চাই।

মাহমুদ ভাই ভান-ভণিতা না করেই বললেন, আগে পাণ্ডুলিপি পাঠান। আমি দেখে-বুঝে সিদ্ধান্ত জানাব।

মাওলা ব্রাদার্সের সঙ্গে আমার এই প্রাথমিক আলাপ নিয়ে আমি কারো কাছেই টুঁ শব্দও করি নাই। আর তা না-করার কারণও রয়েছে—মাওলা ব্রাদার্স আমাকে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে বলেছে—বই যে করবে, এরকম কিছু তো কনফার্ম বলে নাই।

‘ভোরের কাগজ’ ততদিনে ‘প্রথম আলো’ হয়েছে। আর আমরাও গিয়াসকে ভালোবেসে মতি ভাইয়ের চামচামি করার জন্য ‘প্রথম আলোর বন্ধুসভায়’ যোগ দিয়েছি। একটা নতুন পত্রিকার প্রচার ও প্রসারের জন্য আমরা গ্রামে-গঞ্জে দৌড়ে বেড়াচ্ছি। এতসব কিছু করার পরও মতি ভাই বা তার একান্ত সাহাবীদের আমাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সামান্যতম রদবদল ঘটেছে এমন নয়। আমরা পূর্ববত ‘নমঃশূদ্রই’ রয়ে গিয়েছি। আর নিজেদের খেয়েপরে মতিউর রহমানের বন রক্ষার্থে মোষ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছি।

সেরকমই একদিন মোষ তাড়ানোর লক্ষ্যে গিয়েছি কারওয়ান বাজার, সিএ ভবনে। সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হলেই তিনি কুশল জানতে চাইতেন। আমিও জানতে চাইতাম। সাজ্জাদ ভাই আচানক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—

মাওলা ব্রাদার্স আপনার বই করছে নাকি, পাপড়ি?

এমনতর প্রশ্নে আমি একেবারে থতমত খেয়ে গেলাম। আমি শুধু একদিন মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, কিছুই কনফার্ম হয় নাই। এমনকি আমার পাণ্ডুলিপিও গোছানো হয় নাই—সাজ্জাদ ভাই জানলেন কী করে যে আমি বই করতে চাচ্ছি?

আমি লজ্জিত হয়ে মুখচোখ লাল করে বললাম, না না এখনো কিছুই ঠিক হয় নাই, সাজ্জাদ ভাই।

সাজ্জাদ ভাই নিজেই বললেন, করলে দিয়ে দেন। মাওলা তো অত্যন্ত উন্নত মানের প্রকাশনা।


মাহমুদ ভাই-ই হয়তো আমার লেখাপত্র নিয়ে সাজ্জাদ ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু জানতে চেয়েছেন।


বাসায় ফিরেও আমি চিন্তা করতে লাগলাম, মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপের কথা আমি তো কাউকেই বলি নি, আমি আর আমার ঈশ্বর ছাড়া একথা তৃতীয় কেউ-ই জানে না। কিন্তু সাজ্জাদ ভাই জানলেন কী করে যে আমি মাওলা ব্রাদার্স থেকে বই করতে চাচ্ছি?

আন্দাজ করলাম, মাহমুদ ভাই-ই হয়তো বলে থাকবেন। মাহমুদ ভাই-ই হয়তো আমার লেখাপত্র নিয়ে সাজ্জাদ ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু জানতে চেয়েছেন। কারণ ‘মাওলা ব্রাদার্সের’ মতো বড়, বনেদী ও স্বনামধন্য প্রকাশনা হুট করেই যারতার বই প্রকাশ করবে না। মাহমুদ ভাই নিজেও যথেষ্টই সাহিত্যবোদ্ধা। একটা বইয়ের পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টিয়েই তিনি বুঝতে পারেন ভেতরের মালমশলার কী দশা? তা খাদ্য নাকি অখাদ্য? তাঁর প্রকাশনা থেকে ওই পাণ্ডুলিপি প্রকাশযোগ্য নাকি অযোগ্য? মাহমুদ ভাই হলেন সেইরকম অভিজ্ঞ প্রকাশক, যাঁর সাহিত্য বিবেচনার পদ্ধতি অত্যন্ত উন্নত। যিনি খুব ভালো করেই জানেন ভাত রান্নার কারিকুরি। উনুনে হাঁড়ি বসিয়ে সমস্ত চাল টিপে টিপে না দেখে, একটা দানা হাতে তুলে নিয়েই বুঝে যান—চাল ফুটে ভাত হতে আর কতটা বিলম্ব হবে?


পর্ব-১৭

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা