পর্ব-৩৩
কথাসাহিত্যিক শাহীন আকতারের নাম আমি প্রথম শুনি লেখক অদিতি ফাল্গুনী গায়েনের কাছে। ইতঃপূর্বে শাহীন আকতারের লেখাপত্র আমি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখেছিলাম, কিন্তু পড়ার সময় করে উঠতে পারছিলাম না। অদিতি ফাল্গুনী গায়েনের কাছ থেকে উনার নাম শুনে আমার শাহীনকে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। অদিতি আমাকে বলেছিল যে, শাহীন আকতারই তাঁর লেখা সম্পাদক আবুল হাসনাতকে বলে ‘দৈনিক সংবাদে’ ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেয়। একথা বলবার সাথে সাথে অদিতি তাঁর উষ্মাও প্রকাশ করেছিল—আমার চাইতে অনেক খারাপ লেখার পরও শাহীন আকতারের অবস্থান আমার চাইতে অনেক ভালো!
এরই মাঝে কী এক অনুষ্ঠানে কিংবা আজিজ মার্কেটে শাহীন আখতারের সাথে আমার চিনপরিচয় হয়। ফোনেও যোগাযোগ হতে থাকে। শাহীন আমাকে একদিন জানায়, উনি জেন্ডার ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে কী একটা সম্পাদনা করছেন—উনার সঙ্গে আমি কাজ করতে রাজি আছি কিনা? আমি তাঁর প্রস্তাবের আগপাশতলা কোনোকিছু চিন্তা না-করেই রাজি হয়ে যাই। ইতঃপূর্বে আমি বহুবার বলেছি যে, বরাবরই আমাকে টাকাপয়সার টানাটানিতে থাকতে হয়। আয় রোজগারের জন্য হন্যে হয়ে কাজের তালাশ করতে হয়। অন্তত নিজের খরচের টাকাটা হাতে থাকলে কিছুদিন নির্ভার হয়ে লেখার কাজটা করা যায়।
[আহারে! নিজের আয়রোজগারের জন্য কত কাজই না আমাকে করতে হয়েছে এ জীবনে! ‘বুটিক’ শপও করতে হয়েছে! একজনের কাছ থেকে মালামাল এনে মাত্র ১০০/১৫০ টাকা লাভে সেসব বিক্রি করতে হয়েছে!
সম্পাদনার সঙ্গে কবি ও গল্পকার সুমন রহমান যুক্ত ছিলেন, কিন্তু শাহীন আকতারের সাথে কী এক খটমট বাঁধাতে সে নিজেকে সরিয়ে নেন।
শাহীন আকতারের সাথে আমি একটা চুক্তিনামাতেও সই করি—মধ্যযুগের পুরোটা [সাহিত্যের এই অংশটাই সবচাইতে দুর্বোধ্য ও পরিশ্রম সাধ্য কাজ ও আধুনিক যুগের কিছু অংশ থেকে আমি জেন্ডার ইক্যুইভেলেন্ট চিহ্নিত করে এন্টি করে দেবো। [যদি মধ্যযুগের পুরোটা ও আধুনিক যুগের চার আনা থেকেও আমিই সিলেকশন দেই তাহলে আর বাকি থাকে কী? বিনিময়ে আমি পাব তিরিশ হাজার টাকার সম্মানি।
আমি মনে মনে সামান্য দ্বিধান্বিত হই—এত পরিশ্রমের কাজ আমি মাত্র তিরিশ হাজার টাকাতে করে দেয়ার জন্য রাজি হলাম! পরক্ষণেই ভাবি, নাই মামার চাইতে কানামামা ভালো। আপাতত কিছুদিন চলার মতো টাকাটা আমার হাতে আসুক তো! তবে শাহীন আকতারকে আমি এটাও বলে দিই—সহযোগী সম্পাদক হিসেবে যাঁদের নাম যাবে, তাঁদের সবার উপরে আমার নাম দিতে হবে। শাহীন আকতারও আমার এই মৌখিক প্রপোজালে রাজি হয়ে যান।
আমি পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করি। বাংলা একাডেমির লাইব্রেরি আমি নব্বই দশকের গোড়া থেকেই ব্যবহার করে আসছিলাম। যার ফলে লাইব্রেরির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে আমার অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে আমি মধ্যযুগের পুঁথির বেশির ভাগ ফটোকপি করে নিয়ে আসি ও তা থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষ মার্কিং করে শাহীনকে হস্তান্তর করতে থাকি। বাংলা একাডেমিতে যে এ্ররকম ঋদ্ধ একটা লাইব্রেরি আছে, সে-সম্পর্কে শাহীন আপা ইতঃপূর্বে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। আমি যখন এন্তার পুঁথির ফটোকপি উনার কাছে জমা দিতে শুরু করি, উনি বেশ বিস্ময় নিয়েই সেসব হস্তগত করেন।
আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নানান গুরুত্বপূর্ণ বই থেকেও এন্ট্রি দিতে শুরু করি। [সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া আমার চিরকালই পছন্দের অংশ।
শাহীন আকতারের দেয়া বইয়ের দীর্ঘ লিস্ট ধরে ধরে সব বই খুঁজে পেতে বের করি এবং উনার লিস্টের বাইরেও নিজের পড়াশোনা থেকেই সিলেকশন শুরু করি।
আমার স্বতঃস্ফূর্তার নমুনা দেই—
যেমন শাহীন আপাকে একদিন বলি—মৃত্যক্ষুধা থেকে মেঝ বউয়ের চরিত্রের কিছু অংশ দেবো শাহীন আপা?
শাহীন আপা অবাক হয়ে জানতে চান—মৃত্যুক্ষুধা কী পাপড়ি?
আমি তখন বলি—নজরুলের উপন্যাস।
শাহীন আপা হেসে বলেন—
আচ্ছা দাও।
উন্মাদের মতো ভুক্তি দিতে থাকি আমি [আমার স্বভাবের বদগুণ, যাই করি ডেডিকেশনের সাথে করি, কিছুতেই ফাঁকি দিতে পারি না কোনো কাজে।
মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে শুরু করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা থেকেও নির্বাচিত অংশের ফটোকপি আমি শাহীন আপার কাছে পৌছে দেই। মানে ভুতের বেগার খাটা যাকে বলে। কাজের যখন প্রায় ৯০% জমা দিয়ে ফেলেছি তখন কিভাবে যেন শুনতে পাই—এই সম্পাদনার সঙ্গে কবি ও গল্পকার সুমন রহমান যুক্ত ছিলেন, কিন্তু শাহীন আকতারের সাথে কী এক খটমট বাঁধাতে সে নিজেকে সরিয়ে নেন। শুনে আমার সন্দেহের আকাশে কালো মেঘ ঘনায়। কারণ যতদূর জানি, সামান্য কোনোকিছুতে পিঠটান দেয়ার পাবলিক সুমন রহমান নন। ফলত আমি সুমন রহমানকে ফোন করে যা জানতে পারি, সেজন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। সুমন রহমান জানান, এই সম্পাদনার সমস্ত পরিকল্পনা তাঁর। সুমনই শাহীনকে দিয়ে এই প্রপোজাল অ্যাকশন এইডকে দেয়ায়।
শাহীনের যে এসব ছলচাতুরি ছিল, সুমন তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেন নাই। সুমন রহমান সরল বিশ্বাসে শাহীনের কথা মেনে নেন।
অ্যাকশন এইড এই প্রজেক্ট বাবদ পনেরো লক্ষ টাকা মঞ্জুর করেন। প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট হওয়ার পরে শাহীন আকতার সম্পাদক হিসেবে সুমন রহমানের নাম দিতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী সুমনের নামই আগে ছিল, যেহেতু আইডিয়াটা তার। কিন্তু অ্যাকশন এইড কোনো এক অজ্ঞাত কারণে শাহীনের নাম আগে বসিয়ে তাকে প্রজেক্টের প্রধান করতে প্রস্তাব করে। সুমন রহমান তাতে অস্বীকৃতি জানান। অ্যাকশন এইড জানায়, যেহেতু জেন্ডার বিষয়ক প্রজেক্ট—এর প্রধান হিসেবে নারী থাকলে ভালো হয়। এ সময়ে শাহীন সুমনকে অনুরোধ করতে থাকেন বিষয়টা মেনে নেয়ার জন্য। বলেন, ব্যাপারটা যেহেতু তাদের দুজনের, কাজেই তাদের মধ্যে মিল থাকলে সম্পাদকের নাম আগে-পরে যাওয়াটা ম্যাটার করবে না। সুমন আমাকে জানান, শাহীনের যে এসব ছলচাতুরি ছিল, সুমন তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেন নাই। সুমন রহমান সরল বিশ্বাসে শাহীনের কথা মেনে নেন। কিন্তু প্রজেক্টের প্রধান হওয়ার পরই নাকি শাহীনের আচরণ ভীষণভাবে বদলে যায়। সুমন রহমান তখন এই প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ান। অর্থাৎ সুমন রহমান ওই সম্পাদনা থেকে নিজেকে উইথড্র করে নেন।
এক্ষণে আমি জানতে পারি, সহযোগী সম্পাদকের জন্য বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। এবং তিনবার কলকাতা যাওয়া-আসা-থাকার খরচসহ ওখানের লাইব্রেরিগুলি ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা। সুমন রহমানের কাছ থেকে এ তথ্য জানার পরে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভাবতে থাকি, কোথায় তিরিশ হাজার টাকা আর কোথায় সাড়ে তিন লাখ টাকা? সাহিত্যের এরকম বিপুল যজ্ঞ করে দেয়ার জন্য আমি মাত্র তিরিশ হাজার টাকার জন্য নিজের মেধা আর শ্রমকে বিক্রি করে দিলাম? হায়! বোকা কুমির! নিজের বোকামির জন্য তখন নিজের মাথার সমস্ত কেশরাজি উৎপাটন করলেও কি কিছুই ফেরত আসবে?
এসব জানার পরও আমি শাহীনকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে থাকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির রেয়ার সেকশনে ঢুকে পড়ে দুর্লভ পুঁথিগুলি খুঁজে পেতে এনে দিতে থাকি। সেই সময়টাতেই সেই কবি যশোপ্রার্থীর পত্রবিষয়ক জটিলতায় আমার পার্টনার আমাকে প্রায় পঙ্গু করে দেয় এবং বাসায় আবদ্ধ করে রাখে। আমি দিন পনেরো শাহীনের কাজ থেকে বিরতি নিই। কিন্তু শাহীন ক্রমাগত তাগাদা দিতেই থাকে ও আমার সাথে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে। সবচাইতে ন্যাক্কারজনক ঘটনা যেটা ঘটে সেটা হলো, শাহীন একদিন আমার সাথে বাসবী বড়ুয়া নামে একজনকে পাঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেয়ার সেকশনে পুঁথি খুঁজে আনার জন্য। আমি বাসা থেকে কোনোরকমে লুকিয়ে বের হয়ে তার সাথে যাই। বাসবীর হাতে ধরা পুঁথির লিস্ট দেখে আমি প্রচণ্ডভাবে আহত ও বিস্মিত হয়ে পড়ি—যে পুঁথিগুলি আমি বারংবার খুঁজেও পাই নি সেসবের লিস্ট নিয়ে এসেছে এই বাসবী বড়ুয়া! কিন্তু আমি তো শাহীনকে বারংবার জানিয়েছি যে, সেসব নেই এই রেয়ার সেকশনেও। আমি তখন বাসবীকেই বলি—আপনি খুঁজে দেখুন পান কিনা? আমি তো ইতঃপূর্বে খুঁজে গিয়েছি। বলা বাহুল্য, বাসবীও সেসব খুঁজে পায় না। আমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়, আমি যে নিরন্তর ভুতের বেগার খেটে মরছি তা শাহীনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় নাই। তাহলে শাহীন আকতারের সাথে আর কাজ করা যায় কিভাবে? কিন্তু তখন অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে, আমি প্রায় ৯৯% কাজ জমা দিয়ে ফেলেছি শাহীনের হাতে। আমার কাছে তখন আরও স্পষ্ট হয়, সুমন রহমান কেন এই প্রজেক্ট থেকে সরে গিয়েছেন? অন্যকে যে অবলীলায় অসম্মান করতে পারে তার সাথে কাজ করা কিভাবেই বা সম্ভব? আমি বাসবীকে তখন সহযোগী সম্পাদকের পাওনা সাড়ে তিন লাখ টাকার বিষয়টা জানিয়ে দেই।
তারপরই শুরু হয় শাহীন আকতারের আসল খেলা। সে আমাকে কোথাও দেখা মাত্রই পালাতে শুরু করে। আমি পত্রিকা মারফত দেখতে পাই—সতী ও স্বতন্তরা বইয়ের বিজ্ঞাপন। এরই মাঝে বইমেলা শুরু হয়ে যায়। বইটি নিয়ে খুব হইচই পড়লে আমি একদিন ফোন করলে শাহীন আকতার বলেন, পাপড়ি, মোড়ক উন্মোচনের আগে তোমায় জানাব।
শাহীন আকতারের সাথে এর পরেও চোর-পুলিশ খেলা চলতেই থাকে। শাহীন আমাকে দেখলেই পালিয়ে যায় আর আমি হাসতে থাকি।
এরই দিন সাতেক পর পত্রিকার পাতায় দেখি সতী ও স্বতন্তরার মোড়ক উন্মোচন করেছেন সাহিত্যের কয়েকজন রথী-মহারথী। হায়! কোথায় আমার নেমতন্ন! ভুতের বেগার খেটে মরার জন্য আমার কিছুটা অনুতাপ হয়তো হয়। কিন্তু শাহীনের এই পলায়নপরতা দেখে আমি হাসতে হাসতে একশেষ হয়ে যাই।
কয়েকদিন বাদে আমি পুনরায় শাহীনকে ফোন করি আমার প্রাপ্ত সৌজন্য সংখ্যাটির জন্য। শাহীন আমাকে জানায়—
তুমি আমার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে বেল বাজালে আমার কাজের বুয়া তোমাকে বই দুটি পৌঁছে দেবে।
আমি প্রতিউত্তরে জানাই—ওই এক হাজার টাকার বই কেনার মতো সামর্থ্য আমার আছে। আপনার ওই বই আমার লাগবে না।
মেলা থেকে বইটি কিনে এনে দেখি শাহীন আকতার তাঁর অন্যান্য কথার মতো আমাকে দেয়া মৌখিক প্রতিজ্ঞারও বরখেলাপ করেছেন। তাঁর সম্পাদনা সহযোগী হিসেবে আরও ৬/৭ জনের নাম যুক্ত করেছেন। এবং আমার নামটি যেন দিতে না-পারলেই বাঁচেন, এমনি করে দিয়েছেন। [গোলাপ তো চিরদিন গোলাপ হয়েই থাকবে গোলাপকেই যে নামে ডাকো। এখানে একটা জিভ বের করা এক চোখের উইঙ্ক হবে।
শাহীন আকতারের সাথে এর পরেও চোর-পুলিশ খেলা চলতেই থাকে। শাহীন আমাকে দেখলেই পালিয়ে যায় আর আমি হাসতে থাকি। এবং বলাই বাহুল্য ওই বইয়ের সৌজন্য সংখ্যা আজও আমার হাতে পৌঁছায় নাই! সম্পাদক শাহীন আকতার ওই বই তাঁর সহযোগীকে পৌঁছানোর গরজ বোধ করেন নাই।
সতী ও স্বতন্তরা, বাংলা সাহিত্যে নারী
বইটির প্রকাশকাল: ফাল্গুন ১৪১৩, ফেব্রুয়ারি ২০০৭
প্রকাশক : দিব্যপ্রকাশ ও ওয়াটার লিলি।
অতি কৌতূহলী কেউ আমার কথায় বিন্দুমাত্র সন্দেহ প্রকাশ করলে বইটা খুলে আমার করা ভুক্তিগুলি গণনা করে দেখতে পারেন। দেখতে পারেন, বইয়ের কতগুলো ভুক্তি শুধুমাত্র আমারই করা!