আমার একলা পথের সাথি : ৩৮

পর্ব-৩৭

পর্ব-৩৮

বাংলা একাডেমির বর্ধমান ভবনে একদিন কাকতালীয়ভাবে আমার দেখা হয়ে যায় মোহাম্মদ সাইদুরের সঙ্গে। সবকিছুতেই অপার কৌতূহল, অপরিচিতের সঙ্গেও দিব্যি জমিয়ে আড্ডা দেয়ার সহজাত স্বভাবে আমি সহসা তাঁকে আবিষ্কার করি। অত্যন্ত মিতভাষী একজন মানুষ—প্রশ্ন না করলে কথাই বলতে চান না। আমি শুনে চমকিত হই যে, জামদানি শাড়ি নিয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে, রয়েছে একটি গ্রন্থও। কিন্তু গবেষণাগ্রন্থটি দুষ্প্রাপ্য। বইটা উনার কাছে নেই জেনেও আমি সাইদুর ভাইয়ের পিছু ছাড়ি না। বলি—

আচ্ছা, আপনার গ্রন্থটি না-হয় নাই-ই পেলাম। আপনার কাছ থেকেই আমি শুনতে চাই জামদানি তাঁতিদের ইতিবৃত্ত।

মিতভাষী সাইদুর ভাই মৃদু-মৃদু হাসতে থাকেন।

একদিন বলেন যে, মুগরাকুল, বরাবো, তারাবো, দিঘীবরাবর তাঁতিদের যত হাট বসে উনি প্রায় সবকয়টিতেই সরেজমিনে গিয়েছেন।


ফ্যামিলি চায় না ওই মেয়েটির বিয়ে হোক। তারা চায় মেয়েটি অনূঢ়াই থাকুক।


ওইদিনের মতো কথা অসমাপ্ত রেখেই উনি চলে যান। সাইদুর ভাইয়ের কী এক জরুরি কাজ যেন রয়েছে! কিন্তু আমি সাইদুর ভাইকে ফের ফোন করি, মনে ক্ষীণ আশা, নতুন কোনো তথ্য যদি আমি উনার কাছ থেকে পেয়ে যাই? ফলত আমার আর সাইদুর ভাইয়ের বেশ ঘনঘনই মিটিং হতে থাকে। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের লাইব্রেরিতে বসে মৃদু-স্বরে আমরা গল্প করি।

একদিন আমার কাঙ্ক্ষিত একটি সূত্র পেয়ে যাই। সাইদুর ভাই বলেন—

‘জানো পাপড়ি, আমি গবেষণা করতে গিয়ে এমন দেখেছি, যদি কোনো মেয়ের হাতের কাজ নিখুঁত হয়, যদি সে নিখুঁত শাড়ি বোনে তাহলে তার ফ্যামিলি চায় না ওই মেয়েটির বিয়ে হোক। তারা চায় মেয়েটি অনূঢ়াই থাকুক। নিজেদের ঘরেই থাকুক।‘

আমি সাইদুর ভাইয়ের কথার সূত্র ধরে উপন্যাসের একটা চরিত্র মনে মনে স্থির করে রাখি। পরবর্তীতে যখন বয়ন উপন্যাসটি লিখি তখন সাইদুর ভাইয়ের কথার সূত্র ধরে আমি ‘ফরিদার’ ক্যারেকটার তৈরি করেছিলাম।

জামদানি তাঁত বা তাঁতি বিষয়ক কোনো বই-ই আমি কোনো লাইব্রেরিতে খুঁজে পাই না। বহু খোঁজাখুঁজির পর বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে আমি একটা বই পাই, বইটার নাম ‘ঢাকাই মসলিন’। লেখক আব্দুল করিম। ওই বইটিতেই আমি পেয়ে যাই শুক্কুর চাচার বলা সেই ‘পানামপুকুরের’ কথা। পেয়ে যাই তাঁতিদের আঙুল কেটে ফেলার সত্যাসত্য। কিন্তু জামদানি বিষয়ক কোনো সূত্রই বইয়ের কোথাও খুঁজে পাই না। ফলত আমি বুঝে যাই উপন্যাসটি লিখতে হলে আমাকে নিজের ফিল্ড-ওর্য়াকের উপরই নির্ভর করতে হবে। আমি যখন উপন্যাসটি লিখবার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যাই, তখনই আমার পার্টনারের কূপমণ্ডূকতার সাথে ফের যেন নতুন করে পরিচয় ঘটে। আমার মিনি-টেপরেকর্ডারটি আমি ঘরের কোথাও খুঁজে পাই না। আমি বুঝে যাই, আমার কাজে বিঘ্ন-ঘটানোর উদ্দেশ্যে পার্টনার আমার রেকর্ডারটি কৌশলে সরিয়ে নিয়েছে।

নতুন বিড়ম্বনায় আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি! আমার অবস্থা এমন দাঁড়ায়, কোনো বালিকার হাত থেকে তার সখের খেলনাটি যেন কেউ হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়েছে! হাতের খেলনা খোয়া যাওয়ার দুঃখ-বেদনায় সে যেমন আহত-অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, আমিও ঘরের সর্বত্র তেমনিভাবে তাকাতে থাকি। কিন্তু আমি তাকাতে তাকাতে চোখ দুটি অন্ধ করে ফেললেই কী কিংবা মাথা দেয়ালে ঠুকে রক্তাক্ত করে ফেললেই কী—আমার টেপরেকর্ডারের দেখা তো আর মেলে না! মিলবে না! মনে মনে প্রচণ্ডভাবে মুষড়ে পড়লেও আমি বাহ্যিকভাবে কঠোর থাকি। কিছুতেই মুখ ফসকেও বলি না বা ঘুণাক্ষরেও প্রতিপক্ষকে টের পেতে দেই না, রেকর্ডারটি আমার অত্যন্ত দরকার এবং তা এই মুহূর্তে! পার্টনারের এই অভব্য-আচরণ আমাকে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ করে তোলে—জামদানি তাঁতিদের নিয়ে এই উপন্যাস আমাকে লিখতেই হবে এবং আমি তা অবশ্যই লিখব। লিখবই।

ভাগ্য কিছুটা প্রসন্নই ছিল আমার, নইলে আমি মুগরাকুলে তাঁতিদের সাক্ষাৎকার ধারণকৃত মিনি ক্যাসেটগুলি অন্যত্র সরিয়ে রাখব কেন? যদি রেকর্ডারের সাথেই রাখতাম ,তাহলে সেগুলিও হাপিস হয়ে যেত। কিন্তু ক্যাসেটগুলির এক্ষণে তো কোনোই মূল্য নাই! রেকর্ডার ছাড়া আমি ক্যাসেটগুলি বাজাব কী করে? আমি বোবাচোখে তাকিয়ে তাকিয়ে ক্যাসেটগুলির শাদাটে কভার দেখতে থাকি। ক্রমশ কভারগুলির রং বদলে কেমন ধোঁয়াটে হতে শুরু করে! যেমন করে আকাশে দুধ-শাদা-মেঘের-চাঙারি জল ভারে নত হতে হতে ধূসর হয়ে ওঠে।


সত্যিই বিধাতা আমাকে দিয়েছিলেনবয়ন লিখবার কালে এক বড়সড় পুরস্কার।


এই মহুর্তে নতুন একটা মিনি রেকর্ডার কেনার মতো টাকা আমার হাতে নাই। একটা মিনির দাম শ পাঁচেক বা হাজার টাকা হলেও আমি হয়তো কিনে ফেলতে পারতাম। কিন্তু ভালো একটা মিনি রেকর্ডারের দাম আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। মাত্র তিন হাজার টাকার মামলায় ধরা খেয়ে আমি বেকায়দায় পড়ে যাই।

লাইব্রেরিতে কাজের জন্য বা অন্য কাজের সুবাদে বাংলা একাডেমিতে গেলে আমি মোবারক ভাইকে সব খুলে বলি। মোবরক ভাই পাংশু-মুখে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন সে আমার কথার এক বর্ণও কিছু বুঝতে পারেন নাই। যেন আমি এতক্ষণ হিব্রু ভাষায় কথা বলেছি! কিংবা সম্প্রতি যেন তিনি বোবা-কালা হয়ে যাওয়ার কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন! তাই তিনি কিছুই শুনতে পান না বা বলতে পারেন না! [আদতে এইসব খাপছাড়া ঘটনাবলিতে তিনি অত্যন্ত আহত বোধ করেন বলে এরকম বোবা-কালার ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন।

আমি অশ্রুজল গোপন করতে করতে বাসায় ফিরে আসি।

কয়েক-মাস ধুমিয়ে লিখি। বাংলা একাডেমির পত্রিকাগুলিতেও লেখা দেই। কিন্তু ওসব পত্রিকার সব সংখ্যাতেই তো আর আমার লেখা ছাপা হবে না। যদি হয়ও, লেখার বিল পেতে পেতে সেই ছয় মাসের ঝক্কি! লেখার চেক রেডি হতে হতে পাক্বা ছয়মাসের ব্যাপারস্যাপার। যাই হোক। লেখার বিল থেকে আমি কষ্ট করে করে তিন হাজার টাকা জমিয়ে ফেলি। জমিয়েই মোবারক ভাইকে ফোন করি—

মোবারক ভাই, আগামীকাল লাঞ্চ-আওয়ারে আমার সাথে যদি একটু বাইতুল মোকাররম যেতেন!

মোবারক ভাই হাসতে হাসতে দুষ্টুমির কণ্ঠে বলেন,

পাড়ফি আপা, আফনে আইসুন, যামুনে।

আমি আর মোবারক ভাই অনেক ঘুরেটুরে বেছে কালো রঙের সনিব্র্যান্ডের একটা মিনি-রেকর্ডার কিনি। আহ! শান্তি! কী শান্তি! আমার নিজের রোজগারের টাকায় কেনা আমার নিজের জিনিস! বহুদিন ধরে ভেবে রাখা আমার কাঙ্ক্ষিত লেখাটি এক্ষণে লিখতে বসতে পারব! মুগরাকুলের তাঁতিদের রেকর্ডকৃত কথামালা শুনতে আর কোনো বাঁধা নাই। বয়ন লিখতে শুরু করার আর কোনো বিলম্ব নাই! কিন্তু বিধাতা তো সব জানেন, সব দেখেন—তিনি আমাকে এত ভোগাচ্ছিলেন হয়তো বড়সড় কোনো পুরস্কার দেবেন বলে। এবং সত্যিই বিধাতা আমাকে দিয়েছিলেন বয়ন লিখবার কালে এক বড়সড় পুরস্কার। তিনি আচানক এক বাওকুড়ানির ঘূর্ণিতে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে ফেলেছিলেন অভয়ারণ্যে। সেই অরণ্যের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি জীবনের প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলাম! দুই-নয়ন মেলে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখেছিলাম, এই রাজধানী শহরের মানুষেরা অবিশ্রাম গতিতে ছুটে চলেছে! তাদের ছুটে চলাতে যেন কোনো অবসাদ নাই! ক্লান্তি নাই! প্রায় সকলেই কী দারুণ কৌশলী! এঁদের বেশির ভাগই শুধু উপরে উঠার সিঁড়িগুলি টপকাতে ব্যস্ত।

আমার বিধাতার দেয়া বনপথে হাঁটতে হাঁটতে দেখেছিলাম, শত-সহস্র পক্ষী আর পক্ষিণী কত স্বাধীনভাবে এই পৃথিবীতে উড়ে বেড়ায়! ডানায় ডানা লাগিয়ে নিজেদের ওমে কেমন নির্ভার হয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ে! জেনেছিলাম, খবরদারি, নজরদারি আর দুঃশাসনের বাইরেও অন্য এক পৃথিবী আছে। অন্য কোনো জীবন আছে! জেনেছিলাম, কোনো মানুষকে খাঁচায় বন্দি করে রাখলে সে বেঁচে থাকে ঠিকই, কিন্তু তার সমস্ত মন ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে! সবকিছুতেই মাপা-রেশনে জীবন কতই না অসহ্য হয়ে ওঠে! আরও জেনেছিলাম, নিরন্তর অপমান আর অবহেলার জীবনের বাইরেও কত শত স্বাভাবিক-জীবন রয়েছে! যে জীবনের পাশ দিয়ে এক পাহাড়ি-ঝিরি নিরবধি বয়ে যায়! বহু দূর থেকেই তার জলকল্লোল শ্রুত হয়। ঝিরির স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের মতোই জীবন কখনো-বা মধুর হতে পারে। বেগবান হতে পারে। একাকী হতে হতেও তা হীরক দ্যুতিতে বাঙ্ময় হতে পারে!


বনহংসীর নির্ভার জীবন! হায়! যদি পেতাম! যদি পেতাম? মাত্র একটিবার?


উড়িবার মতো অবারিত ও স্বচ্ছনীল আসমান দেখতে দেখতে আমার বহু পূর্বে দেখা এক আশ্চর্য-সুন্দর দৃশ্যের কথা বারংবারই মনে পড়ছিল—

জলপথে কোথাও যাওয়ার প্রাক্কালে ভাসমান-কাঠখণ্ডের উপর বিশ্রামরত সেই বনহংসমিথুনের দারুণ প্রেমময় মুহুর্তটি! ক্লান্ত-শ্রান্ত হংসীর বিশ্রামে ছায়া-মায়া হয়ে হংসের একটি ডানা ছাতার মতো ছড়িয়ে আছে। যেন সেই বিস্তৃত ডানা বলতে চাইছে—এই যে ভেব না তো। কিচ্ছুটি আর ভেব না তুমি! এত পথ সাঁতরে, জলভেজা ক্লান্ত পথিক—তুমি এইবার নিশ্চিন্তে ঘুমাও।  আমি আছি, আমি তোমার ছায়া হয়ে আছি! আছি তোমার পাশটিতে ভরসা হয়ে!

বনহংসী অঘোরে ঘুমাচ্ছিল নিজের পালকে মুখ গুঁজে দিয়ে। যেন এই পৃথিবীর কোনো দুশ্চিন্তাই তাকে এখন আর স্পর্শ করতে পারবে না! যেন বনহংসের ডানার ছায়া তাকে কোনো অমরাবতীতে পৌঁছে দিয়েছে। যেখানে কোনোদিন কোনো শিকারির ছররা তাকে আর বিদ্ধ করতে পারবে না!

হায়! আমি যদি কোনোদিন পেতাম অমন চরের বালিয়াড়ি আর অবিশ্রাম ভেসে আসা? যদি পেতাম জলভাসা কোনো কাঠখণ্ডের নিশ্ছিদ্র-আশ্রয়? কিংবা শুধুই পেতাম যদি আমার সমস্ত দেহ ঢেকে রাখা কোনো মমতাময় ডানার-ছায়া? অথবা সেই বনহংসীর নির্ভার জীবন! হায়! যদি পেতাম! যদি পেতাম? মাত্র একটিবার?


পর্ব-৩৯

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা