পর্ব-৩৭
বিস্তৃত পরিসরে মনপছন্দ উপন্যাস লিখবার চিন্তা বহুকাল ধরেই আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ উপন্যাসটির ‘আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কার’ প্রাপ্তির লোভে যে বারোটা আমি বাজিয়েছিলাম, সেসব সংশোধনের স্পৃহাও আমাকে কাতর করে তুলছিল। কিন্তু উপন্যাস লেখার জন্য সহসাই দুম করে বসে যাব, তেমন উপায় ছিল না। সাংসারিক সমস্যা ও হাজার কাজের শক্ত-বেড়ি আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখছিল। একটা সেইরকম উপন্যাস লিখবার জন্য যে সময় ও মানসিক স্থিতি দরকার, আমি তা পাচ্ছিলাম না। কিন্তু লিখবার জন্য আমার মন ছিল সদাই আঁকুপাঁকু। হাজারো দায়িত্ব সামলে, বাচ্চাদের পড়াশোনা দেখভাল করেও আমি নিজে পড়ার জন্য বা লিখবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। কিন্তু সাংসারিক কাজের চাপে, আত্মীয়স্বজনদের প্রতি দায়দায়িত্ব পালন করে লেখার-টেবিলে বসার মতো অবসর আমার মোটেও জুটত না।
সেই কবি-যশপ্রার্থী অদেখা-অনতি-তরুণের সাথে আমার স্বপ্নের উপন্যাস লেখবার বিষয়আশয় নিয়েও প্রায়ই আলাপ-আলোচনা হতো। আমি যে কোনো উপন্যাসেই তেমন করে মন-লাগাতে পারছি না, বা পড়ে স্বস্তি পাচ্ছি না—এসব কথা তাকে আমি নির্দ্বিধায় বলতাম। আমার কথা শুনে সে হাসত। আমি বলতাম, হেসো না।
[হেসো না বলতেই তো জয় গোস্বামীর সেই লাইন মনে পড়ে যায়—
হেসো না দোয়েল, আমি বরাবর বাগানের লোক,
আমি নানা রকমের কাজ জানি।
যেমন এই ঘাস তোলা, বীজ রাখা…
একদম হাসবে না। দাঁড়াও, আমি তোমায় লিখে দেখিয়ে দেবো কেমন উপন্যাসের অনুসন্ধান আমি করছি?
ছুড়ে দেয়া এই চ্যালেঞ্জ বুমেরাং করে দিয়ে সেই কবি যশপ্রার্থী পালটা কোনো বজ্র হানবে—এরকমটি কখনই ঘটত না। বরং আমি দেখতাম আমার সবকিছুর প্রতিই তার কেমন যেন একটা মৌন-সমীহ থাকে বা সমীহ ফুটে ওঠে। যদিও তার রূঢ় কন্ঠ বা কর্কশ আচরণে সেসব লুকোবার জন্য সে অনেকটাই মরীয়া হয়ে থাকে।
একান্তভাবে মনপ্রাণ দিয়ে কিছু চাইলে বিধাতা নাকি তা মঞ্জুর করেন—ফলত আমার জন্যও একদিন রূপগঞ্জ যাওয়ার মওকা মিলে গেল।
পোড়া নদীর স্বপনপুরাণ লিখবার পূর্বে আমি আরও দুইটা প্লট নিয়ে উপন্যাস লিখবার কথা ভেবেছিলাম। বহু বছর ধরে একটা উপন্যাসের মাল-মশল্লাও জোগাড় করে রাখছিলাম। কিন্তু লিখব লিখব করেও লিখে উঠতে পারছিলাম না। আমি টাঙ্গাইলের মেয়ে। করটিয়ার জমিদারবাড়ি লাগোয়া আমাদের বাড়ি। আমার চোখের সম্মুখে জমিদার ওয়াজেদ আলি খান পন্নী ওরফে চানমিয়ার নানান কীর্তি। টাঙ্গাইলে পিতৃভিটা হওয়ার সুবাদে স্মৃতির-ঝিনুকের মসৃণ-ঢাকনা মেললেই চানমিয়ার জৌলস-নিভু-নিভু-প্রাসাদ, দিনের উজ্জ্বল আলোর নিচে হেসে-থাকা-ফুলবাগান, লোহার-ঘর, প্রাচীন জলে নিথর হয়ে থাকা পুষ্করিণী, শাদা গোলাপের বাগান আর সাধারণের কৌতূহলের বাইরে থাকা রহস্যঘেরা রোকেয়া মহল। কিন্তু উনার সম্পর্কে বিশদ বইপত্র খুঁজে খুঁজে ক্রমশ হয়রান হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। তেমন কোনো রেফারেন্স জোগাড় করতে না-পেরেও তাঁকে নিয়ে লিখবার জন্য মনে মনে আটঘাট বেঁধে প্রস্তুত হলাম। চানমিয়ার সমসাময়িক মানুষজনদের কেউই আর বেঁচে নাই। এমনকি তাদের হাড়গোড়ও ততদিনে কবরের অন্ধকারে ধুলায় রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। করটিয়াতে যে দুই-চারজন বয়োবৃদ্ধ জীবিত আছেন, তাঁদের অনুসন্ধান করতে করতেই আমার বেশ কিছুটা সময় খরচা হয়ে গেল। কিন্তু এত যে আঞ্জাম-সরঞ্জাম, এত উৎসাহ-উদ্দীপনা সত্ত্বেও কেন যেন কোথাও আমার মন লাগছিল না। কিছুতেই আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। উপন্যাস লেখবার তাগিদে নিজেকে সেভাবে সমর্পণ করতে পারছিলাম না। যেহেতু সেভাবে মন লাগাতে পারছিলাম না, সেহেতু আমার ওই উপন্যাসটি লেখার জোগাড়কৃত মালমশলা, কাগজ-কলম যা কিছু, সমস্তই অধরাই রয়ে গেল!
মিরপুরে আমার শ্বশুরের যে বাড়িতে আমি বসবাস করছিলাম, তা এক্সটেশন করে তিনতলায় উঠে যাব এমন সিদ্ধান্তের পর [যদিও তা আমার জন্য অভিশাপই বয়ে এনেছিল, আজ ভাবি, কারো যদি নিজের সমস্ত জীবন নরকের আগুনে জ্বালিয়েপুড়িয়ে ছারখার করে দেয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সে যেন এরকম কোনো শ্বশুরকুলকে বেছে নেয় সহসা আমি আমার উপন্যাসের পূর্বপরিকল্পিত প্লট বাদ দিয়ে নতুন কিছু একটা ভাবতে লাগলাম। বাড়ির তিনতলার কাজে যিনি কেয়ারটেকার হিসেবে ছিলেন, তিনিই আমার এই প্লট-বদল-ভাবনার জোগানদাতা। শুক্কুর চাচা ছিলেন জোলা, বংশপরম্পরায় জামদানি-শাড়ির কারিগর। শুক্কুর চাচার কন্সট্রাকশন কাজ দেখভালের ফাঁকেফাঁকে তার সাথে আমি নানা বিষয়েই কথা বলতাম। শুক্কুর চাচার মুখেই শুনেছিলাম বয়নকারী তাঁতিদের হাতের আঙুল কেটে নেয়ার কথা। সেই কাটা আঙুলগুলি ফেলে দেয়া হতো একটা নির্দিষ্ট পুকুরে—যার নাম পানামপুকুর। শুক্কুর চাচার মুখ থেকে আমি যখন এসব শুনছিলাম, সেটা খুব সম্ভবত ১৯৯২-৯৩ সাল হয়ে থাকবে। শুক্কুর চাচার মুখে এসব গল্প শুনে শুনেই নিজের ভেতরে রূপগঞ্জে যাওয়ার প্রচণ্ড আর্জি ফিল করছিলাম। এদিকে শুক্কুর চাচাও আমাকে শতোধিকবার নেমন্তন্ন জানিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বারংবার নিমন্ত্রণ করা সত্ত্বেও উনার বাড়ি রূপগঞ্জের মুগরাকুলে যেতে পারছিলাম না। আজ যাই, কাল যাচ্ছি করে করেই কিনা লিখে ফেললাম অন্য একটি উপন্যাস পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ। তাও কিনা পুরস্কার প্রাপ্তির লোভের বশবর্তী হয়ে। অবশ্য সে লোভের দণ্ডও আমাকে হাতেনাতে পেতে হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভাবনা-চিন্তায় রাখা প্লট দুটি নিয়ে কাজ করব করব করেও পিছিয়ে আসতে হচ্ছিল। আমি স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম, ওই দুইটা থেকে যে কোনো একটা বেছে নিয়ে লিখতে শুরু করলে আট-দশ ফর্মার মামলায় কিছুতেই কুলাবে না। নিশ্ছিদ্র-মনোযোগ আর পর্যাপ্ত সময় ছাড়া কিছুতেই লেখা সম্ভব হবে না—আমি যা বলতে চাই বা যেভাবে বা যেমন উপন্যাস লিখতে চাই।
হুট করে একদিন নিঃশব্দে মুগরাকুলে চলে যাব—তাও হচ্ছিল না। আমার তো ফ্যাঁকড়ার আদি-অন্ত নাই। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াতে আমি কোনোদিনই তেমন করে অভ্যস্ত নই, [কোনো কিছুতেই কষ্ট করতে পারি না যে! এদিকে নিজের গাড়িও নাই। নাই-ই বা বলছি কেন? আমার নাই, কিন্তু আমার পার্টনারের তো আছে। তা হোক না খানিকটা পুরতান, লক্করঝক্কর মার্কা—গাড়ি বলে কথা! অফিসের বড়সড় একটা এসইউভি তার আছে। যেটা ফুলটাইমই আমার পার্টনারের এখতিয়ারেই থাকে। সে ওটাতে চড়ে অফিসে আসাযাওয়া করে। পার্টনারের বড়ভাইয়েরও নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট আছে, যেটা আমাদের গ্যারেজ দখল করে রাখে—কিন্তু আমি সঙ্কোচে তাদের কিছুতেই বলতে পারি না যে, আমি একদিন রূপগঞ্জে যেতে চাই। আমার লেখার কাজের জন্যই যেতে চাই। আপনাদের কারো গাড়িটা যদি আমায় একটা দিনের জন্য দিতেন!
একান্তভাবে মনপ্রাণ দিয়ে কিছু চাইলে বিধাতা নাকি তা মঞ্জুর করেন—ফলত আমার জন্যও একদিন রূপগঞ্জ যাওয়ার মওকা মিলে গেল। এবং তা আমার পার্টনারের বড় ভাইয়ের ব্যক্তিগত যানে করেই। [পরে কিন্তু পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চেপেই আরও চার/পাঁচবার গিয়েছি আমি এবং তা উপন্যাস লেখবার তাগিদেই আমিও চুপি চুপি প্রস্তুত হয়েই গেলাম। মানে আমার মিনি-টেপরেকর্ডার, এন্তার ক্যাসেট, নোটপ্যাড, কলম ইত্যাদিতে ব্যাগ বোঝাই করে আমি গেলাম জামদানি তাঁতিদের আখড়ায়। গিয়ে দেখি শুক্কু চাচা অধীর আগ্রহে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে তাঁর হাসি আকর্ণ বিস্তৃত হলো। আর আমি লেগে গেলাম বয়নকারী শিল্পীদের ইন্টারভিউ নিতে। এবং সেসব আমার মিনিরেকর্ডারে ধৈর্য সহকারে ফিতাবন্দিও করে গেলাম।
মুগরাকুলের প্রতিটা পথঘাট ঘুরেঘুরে ভালো করে দেখলাম আমি। যতটা পারলাম দেখে নিলাম প্রায় প্রতিটা গাছলতা। দেখলাম গাছেদের পাতার বিন্যাস। ফুলেদের চেহারা। ঘরের পাশেই এঁদোডোবায় বড়শি ফেলে বসে আছে জোলাকন্যা! তার হাঁটু অব্দি ওঠানো রঙজ্বলা-শাড়ি। তেলজলে উজ্জ্বল মুখায়বব। সেই জোলাকন্যার সাথে পডিঘরে ঢুকে মাকু দিয়ে বুটা তোলার কায়দা শিখলাম। দেখলাম নরত, দক্তি আর সানার ওঠানামা। নাচনিকাঠির অবিশ্রাম লম্ফঝম্প। শুধুমাত্র মাথার ওপরে টিনেরছাউনি দেয়া চারপাশ খোলা একেকটা পডিঘর। সেই ঘরের মেঝেতে দুই হাত গভীর মাটির গর্তে পা ঢুকিয়ে বসে বসে কিভাবে কারিগররা জামদানি শাড়ি প্রস্তুত করে?—দেখে দেখে আমার যেন আর বিস্ময়ের সীমাপরিসীমা রইল না। বিশ করমের লীলার দেখি সীমা-পরিসীমা নাই!
আর মনে মনে বলি—এসবই আমার একলার পথ। একলার গভীর নির্জন পথ। এ পথে আমাকে একা একাই হাঁটতে হবে।
যাই দেখি, থমকে দাঁড়াই। একেকজনের কথা শেষ হলেও ফিরে গিয়ে ফের নতুন করে প্রশ্ন করি। ফের রেকর্ডারের ফিতা ঘুরতে শুরু করে। আমার অবস্থা দেখে আমার পার্টনারের বড় ভাইয়ের স্ত্রীর নাকের পা-টা রাগে-ঈর্ষায় ফুলে ফুলে ওঠে। ওরা জামদানি শাড়ি কিনবে বলে ওদের এই মুগরাকুলে আসা। ফলত আমি প্রায় জোর করেই ওদের ল্যাজ ধরে গিয়েছি। এক্ষণে আমি শাড়ি না কিনে, শাড়ি বাছাই না করে এসব কী করছি? রাগে-জেদে-বিরক্তিতে তাদের নাকের পাটাতন ফুলে উঠবারই কথা! আমিও একসময় লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে রেকর্ডারের বাটন টিপে অফ করে দেই। আর মনে মনে বলি—এসবই আমার একলার পথ। একলার গভীর নির্জন পথ। এ পথে আমাকে একা একাই হাঁটতে হবে।
আমি আনমনে তাকিয়ে দেখি, মুগরাকুলের আধা-কংক্রিটের রাস্তার বিকেলের হলুদাভ আলো এসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ছে। এঁদোডোবার শ্যাওলাজমা-জলে দুই/একটা চেলামাছ নাকি ডানকিনা মাথা উজিয়ে বুড়বুড়ি ছাড়তে ছাড়তে ভুশ করে ডুব দেয় আরেকটু গভীর জলের আশায়। মাছেদের ঘুমের সময় সমাসন্ন। আর আমাদের ফেরার সময়।
গাড়ির দরজা বন্ধ করতে করতে আমি ফের নেমে পড়ি। জোলা শুক্কুর চাচার সাথে ঢালু জমিনের ওপর ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে কত অচেনা মুখ! তাদের মাঝে মুল্লুকচানের উদ্ভ্রান্ত-দৃষ্টিতে আমি বিদায়ের আশঙ্কা দেখি। জোলাকন্যা ঝুম্পাড়ির শাড়িটা এখন হাঁটু থেকে নেমে গোড়ালি ছুঁয়েছে। ডোবায় মাছ ধরার চিহ্ন নিয়ে শাড়িটা কি সামান্য ভিজে ভিজে দেখায়?
সবেদ আলির বিষণ্ন দৃষ্টিতে অনেক অনুক্ত-কথামালারা জমে আছে। সেসব শোনার জন্যই আমি ফের আসব এই জোলাদের গ্রামে। মুগরাকুলের জামদানি তাঁতিদের জীবনকথা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্যই আমাকে যে ফের আসতেই হবে…।