আমার একলা পথের সাথি : ১০

পর্ব- ৯


পর্ব- ১০

বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের কোর্স চলাকালীন দিনরাতগুলো রঙিন ঘুড়ির মতো উড়ে যেতে লাগল। যার নাটাই বা সুতো কিচ্ছুটি আমাদের হাতে নাই, কিন্তু আমরা মহানন্দে উড়ছি! সমস্ত আকাশ জুড়ে উড়ছি। প্রবল হাওয়ার টানে উড়ছি।

আর উড়তে উড়তে যখন ক্লান্ত হয়ে মাটিতে নেমে আসছি—নিজেদের বড় অবসন্ন লাগছে! নিজেদের বড় ক্ষুদ্র আর অসহায় লাগছে। যেন আমরা বহুদূর থেকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে আসা কোনো সামুদ্রিক-ঝিনুক। বালিয়াড়িতে এতটাই নির্জীব হয়ে খোলসের ভেতরে ঢুকে আছি যে, দেখে ভেতরে প্রাণ আছে কি নাই বোঝা মুশকিল! কিংবা আমরা হয়তো নতুন কোনো উদ্দাম-ঢেউয়ের আশায় অপেক্ষারত। যেন সেই বিশাল ঢেউ এলেই আমরা ভেসে যেতে পারব আমাদের কাঙ্ক্ষিত সলিল-জীবনে!

এরকম ভাবার যথেষ্ট কারণও ছিল। আমাদের যাঁরা ক্লাস নিতে আসতেন তাঁরা একেকজন মহাসমুদ্র। তাঁদের জ্ঞানের ভাণ্ডার বা ব্যাপ্তি আমাদের এরকম ভাবাতে বাধ্য করত।

সাহিত্যের প্রায় সব শাখার বিষয়-আশয় নিয়ে আমাদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল। এমনকি কম্পিউটার শিক্ষাও বাধ্যতামূলক ছিল।

আমাদের যাঁরা পড়াতে আসতেন, তাঁদের সবার নাম আমরা আগে থেকেই জানতাম। যখন তাঁরা আমাদের কাছাকাছি আসতেন, আমরা যেন কোনো নক্ষত্রের আলোকে কাছ থেকে দেখবার আনন্দ পেতাম।

আমাদের শিক্ষাদানের জন্য আসতেন সরদার ফজলুল করিম, ড. আমিনুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, ড. আনিসুজ্জামান, শওকত আলী, রফিক আজাদ, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, ড.বিশ্বজিৎ ঘোষ, ড. স্বরোচিষ সরকার প্রমুখ।

আমরা ক্লাস করতাম একটা বড়সড় রুমে ডিম্বাকৃতি কনফারেন্স টেবিলের চারপাশের চেয়ারগুলোতে বসে। কখনোবা বাংলা একাডেমির সেমিনার রুমে।


আমি যা লিখব তাতে যেন আমার সিগনেচার রেখে যেতে পারি। আমার লেখাটা যেন একান্তভাবে আমারই মতো হয়।


‘তরুণ লেখক প্রকল্পে’ যোগদানের পর আমার মাথা থেকে ক্রমশ ‘কবিতার ভূত’ নেমে যেতে লাগল। যদিও আমি কবিতার শিক্ষানবিশ হিসেবেই সিলেক্টেড হয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হতে লাগল যে, এত কবির ভিড়ে আমি নতুন কোনো কবি হতে চাইলে তা হবে সবচাইতে বোকামি। ইতঃপূর্বে অনেক কবিই এত এত ভালো কাজ করে গিয়েছেন যে আমার স্বতন্ত্র-স্বর অন্যদের শোনাতে চাইলে নির্ঘাত আমি ব্যর্থ হবো। কিন্ত আমি চাইছি, আমি যা লিখব তাতে যেন আমার সিগনেচার রেখে যেতে পারি। আমার লেখাটা যেন একান্তভাবে আমারই মতো হয়।

কবিতা বাদ দিয়ে গল্পে কাজ করার ইচ্ছাটা বাংলা একাডেমি প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটরকে জানানোর আগে আমি নাসির ভাই আর সাজ্জাদ ভাইয়ের সাথে কথা বলে নিলাম। সাজ্জাদ ভাই বললেন—

ঠিক আছে, গল্পেই কাজ করুন। সমস্যা তো কিছু নাই।

আর নাসির ভাই বললেল—

কবিতার পাশাপাশি গল্পও চলুক না। আর আপনার জন্য ছয় মাসে ১০টি গল্প লেখা কোনো ব্যাপারই না।

গল্প নিয়ে যারা কাজ করবে আমাদের ব্যাচে এরকম আরও তিন-চারজন ছিল। এদের মাঝে কুমিল্লার ছেলে কাজী মোহাম্মদ আলমগীরের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে লাগল। এর কারণ হিসেবে নানান কিছুই ছিল। কুমিল্লার ‘মুন্সেফ বাড়িতে’ আমার আপন ফুপুর বিয়ে হয়েছে। ফুপাজানের ছোটভাই আ.ক.ম. বাহাউদ্দিন বাহার আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক নেতা [বর্তমানে কুমিল্লা সদর আসনের এমপি হবার সুবাদে সকলেই তাঁকে চেনে। তাছাড়া ‘মুন্সেফ বাড়ি’ কুমিল্লার খুবই নামকরা বাড়ি। আলমগীর কুমিল্লার টানে আমাকে বলত—

বাহার ভাই তগো আত্মীয় নি? আর কইচ্চা, আঁ-রি বুঝতাম পারছি তুই কাগো আত্মীয়?

আমি ‘মুন্সেফ বাড়ির’ আত্মীয়—এ নিয়ে আলমগীরের আলাদা সম্ভ্রম ছিল আমার প্রতি। কিন্তু এইগুলা কিছুই তার সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার মতো বিশেষ কোনো সূত্রধর হিসেবে ছিল না। সূত্রধর ছিল আমাদের দুইজনেরই পাঠের প্রতি ভীষণ রকম আকর্ষণ আর সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিতে পড়ে থাকা। আমরা দুইজনই যখন নিজেদের পড়া বই নিয়ে কথা বলতাম, দেখতাম আমার আর আলমগীরের বইয়ের সিলেকশন বা পঠনপাঠন প্রায় একই সমতলে। আলমগীর যে বইটার কথা বলত, আমার সেই বইটা হয়তো আগেই পড়া হয়ে গিয়েছে। আলমগীর হাসতে হাসতে আমাকে বলত—

তরে দেইক্যা তো মনে করছি বড়লোকের সুন্দরী মাইয়া—রঙঢঙ করতে আইছিস। শখে দেখতে আইছিস লেখালেখি জিনিসটা কী? রঙঢঙ শ্যাষ অইলে কোমর দুলাইয়া যাইবি গা। অহন দেখতাছি তুই তো তা না। আঁ-রি তোর দেহি ভালো পড়ালেখা!

আমি আর আলমগীর বহুগ্রন্থ নিয়ে কথা বলতে ইমোশনাল হয়ে পড়তাম। আমরা দুজনেই তখন আবুল বাশার পড়তে অত্যন্ত ভালোবাসতাম। আর শহীদুল জহির। সঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও। এঁদের ছাড়াও আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, নাজমুল আলম, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, পাবলো নেরুদা, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ,  রাইনার মারিয়া রিলকে, সুবিমল মিশ্র, শার্ল বোদলেয়ার, এমিলি ডিকিনসন, সিলভিয়া প্লাথ, টেড হিউজ, ভার্জিনিয়া উলফ, বোর্হেস, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, লোরকা, কাহলিল জিবরান, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, বাৎস্যায়নসহ অন্য লেখকদের নিয়েও আমাদের দুইজনের মাঝে আলাপসালাপ চলত।

আলমগীরের কল্যাণে আমার আজিজ মার্কেটে যাওয়া কমে গিয়েছিল। তরুণ লেখক প্রকল্পের ক্লাসের পরে ও প্রতিদিনই আজিজে যেত। বই কিনে নিয়ে ওর মেসে চলে যেত। আর কিছু কিছু বই পড়া শেষ হলে আমার কাছে বিক্রি করে দিত। আমিও বইয়ের গায়ের দামেই সেসব বই কিনে নিতাম।

কোনো কোনোদিন আমরা দুইজন মিলেও আজিজে যেতাম বই কেনার জন্য। আলমগীরকে আমার নানা কারণেই ভালো লাগত। ও ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল-আন্তরিক-নম্র আর পড়ুয়া একজন মানুষ। বই ছাড়া ও কিচ্ছু বুঝত না। আমিও তেমনই ছিলাম। স্তূপ বই কিনে নিয়ে রাতভর পড়ে শেষ করে পরদিন মাতালের মতো ঢুলতে ঢুলতে ক্লাসে আসত। আমি ওর রক্তজবা চোখ দেখে বলতাম—

মদ খাইছ নাকি?

ও হাসতে হাসতে বলত—

আঁ-রি নাহ, কী কইস এইগুলা? মদ পামু কই?

খুব অকপটে বলত—

আমি হইলাম চাষার পুত, আমার হাতে দেখছস নি ধানের ক্ষেতের মাটিকাদা লাইগ্যা রইছে।

ও চাষার পুত হোক আর যাই হোক, ওর একাগ্র-পাঠ আমাকে প্রভূত আনন্দ দিত। আমরা একই বই পড়া শেষ করে আলোচনার জন্য দুইজন-ই মুখিয়ে থাকতাম। আজও ফোনে একবার আলাপ জমে উঠলে দুইজনের ব্যালেন্সের টাকাই তলানিতে গিয়ে পৌঁছায়। আফসার আমেদ থেকে শুরু করে তা কলিম খানে গিয়ে ঠেকে।


আলমগীরের সাথে আমার খুব ঝগড়াবিবাদও লেগে যেত।


কোর্স শুরুর প্রথম দিকে একদিন আলমগীর আর আমি বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে বসে দুইটা বইতে ডুবে আছি। আলমগীর উঠে বাইরে গেল সিগারেট খাবে বলে। ফিরে এসে আমাকে ছোট্ট একটা জুসের বোতল এগিয়ে দিলে আমি অবাক হয়ে বললাম—

এইটা কী?

আলমগীর লজ্জিত হাসি দিয়ে বলল—

ক্যান আমি যে সিগারেট খাইছি তুই কিছু খাইবি না? আমার জন্য সিগারেট আর তোর জন্য জুস।

আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এই ছেলেটার পকেটে প্রায়ই টাকা-পয়সা থাকে না। বাংলা একাডেমি থেকে মাসের তিন হাজার টাকা ভাতা পেয়েই সে চলে যায় আজিজে। রাজ্যির বই কিনে পকেট খালি করে মেসে ফেরে। তারপর সারা মাসজুড়ে চলে তার ধারদেনা আর খাওয়া নিয়ে কিপ্টামি। তার দুপুরের লাঞ্চের বিল একসাথে খেতে গিয়ে হয়তো আমিই মিটিয়ে দেই। নয়তো অন্য কেউ। [কিন্ত পকেটে টাকা থাকলে সে তখন আমাদের খাওয়াতে এতটুকুও কার্পণ্য করে না

মনের দিক থেকে সে এত বড় যে, ভাবা যায় না। আমি অন্তত ভাবতে পারি না। আমি বরাবরই সবকিছুতেই অতিরিক্ত হিসেব করা চলা মানুষ দুইচক্ষে দেখতে পারি না।

আমার কথা হলো, পকেটে টাকা না-থাকলে চুপচাপ থাকো। টাকা নাই টাকা নাই করে দুনিয়াকে জানানোর কোনো মানে হয় না। টাকা অনেকদিন আমার ব্যাগেও থাকে না। কিন্তু আমি কাউকে বুঝতেই দিই না যে আমার ব্যাগে টাকা আজ কিছু কম আছে।

আলমগীরের সাথে আমার খুব ঝগড়াবিবাদও লেগে যেত। নানা বইয়ের আলোচনায় করতে করতে মতপার্থক্যও ঘটত। কিন্তু তাতে বন্ধুত্ব মুছে যেত না।

অনেক অগোছালো থাকত ও। জামাকাপড়ের কোনোকিছুই ঠিকঠাক ছিল না তার। আমি মাঝেসাঝেই রেগে যেতাম। আরে গোসলটা তো ভালো করে করবা? মুখটা তো ভালো করে ধোবা? কিরকম দেখায় তোমাকে আলমগীর? আমার কথাকে সে পাত্তাই দিত না। বই পড়ার নেশার কাছে তার সবকিছুই এলেমেলো হয়ে থাকত।

সেবারের শীতে তার হাত-মুখের ত্বক ফেটে শাদা হয়ে থাকে দেখে আমি একটা নিভিয়া কোল্ডক্রিম আর টুথব্রাশ কিনে উপহার দিলাম। কিন্তু কিসে কী?

আলমগীরকে কিছুতেই তেলতেলে দেখায় না!

তার আগের মতোই উস্কোখুস্কো চেহারা দেখে বললাম—

এই এত যে শীত পড়ছে ক্রিমটা মাখতে পারো না?

সে অবাক হয়ে বলল—

আমি তো অইটা আমার রুমমেটরে দিয়া দিছি।

আমি রাগ সামলে বললাম—

টুথব্রাশটা কারে দিছ?

আলমগীর কী যেন ভেবেটেবে বলল—

আঁ-রি তুই যে দিছিলি আমি তো ভুইল্যাই গেছি। আজকে গিয়াই নতুন ব্রাশ ওপেন করমু।

আমি রাগ ভুলে হাসতে লাগলাম। এই চাষার পুতের লগে আমি পারব কেন? আর আমি কেনই বা তাকে নাগরিক বানাতে চাইছি?

সে আছে তার ভালো গল্প লিখবার ধ্যান নিয়ে। জ্ঞানচর্চা নিয়ে। একটা মামুলি কোল্ডক্রিম আলমগীরের ত্বকের ফাটা সারাই করবে হয়তো, কিন্তু মন কভু নয়। মন সারাই করতে সে তো নিজের পকেট উজাড় করে সেইসবই খরিদ করে চলেছে। নইলে নিত্য আজিজ মার্কেটে গিয়ে ধারদেনার-টাকায় বই কেনার মতো পাগল কয়জন আছে?


তুমি গল্প-দৌড় দিতে বলছিলা দৌড় দিছি। আর সেই দৌড়ে আমি ফার্স্টও হইছি।


আমি যখন সিরিয়াসলি গল্প লিখতে শুরু করলাম আলমগীর হয়তো ভেতরে ভেতরে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল। অথচ এই আলমগীরই আমাকে প্রায়ই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মতো করে বলত—লিখতে হইলে গল্পে আসো। কিসব কবিতাফবিতা নিয়া বইসা আছো। [আমি নিজেও তখন কবিতা লেখা ছেড়ে দেবো, এমন সিদ্ধান্তেই ছিলাম

আমার গল্পগুলো যখন সত্যিই গল্প হয়ে উঠতে লাগল, আলমগীর খানিকটা বিষণ্ণ স্বরে বলল—তোর কলমে অন্যরকম গদ্য ফোটে।

আমি আলমগীরের ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ বুমেরাং করে হাসতে হাসতে বললাম—

দেখছ, তুমি গল্প-দৌড় দিতে বলছিলা দৌড় দিছি। আর সেই দৌড়ে আমি ফার্স্টও হইছি। এখন কোনো কথা বলো না কেন তুমি? এখন তুমি আসো, আইস্যা আমার গল্পের সাথে নিজের গল্প নিয়া ফাইট দেও।

আলমগীরের আত্মমর্যাদা বোধ এতটাই প্রখর ছিল যে, নিজে যেচে কাউকেই গল্প ছাপার জন্য দিত না। আজও ও তেমনই রয়ে গেছে—কেউ চাইলে গল্প পাঠায়, নইলে ওই দূর মফস্বলে বসে পিসির স্ক্রিনে চোখ রেখে নিজের লেখা গল্পের পাঠক  ও নিজেই বনে যায়।


পর্ব- ১১

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা