আমার একলা পথের সাথি : ১২

পর্ব- ১১

পর্ব- ১২

বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের কোর্সের সাথে সাথে চলল আমার গল্প লেখবার কসরত। ওই ব্যাচের সবার সঙ্গেই আমার মোটামুটি সহজ-সম্পর্ক তৈরি হলো। কিন্তু তাদের মাঝ থেকেও দুই-চারজনের সাথে আমার হার্দিক বন্ধুত্ব হলো। আলমগীর তো ছিলই। আরও ছিল শাহ তোফায়েল, কামালউদ্দিন কবির, মানিক লাল সরকার [পরে হয়েছে মানিক মানবিক, শামসুল বারী উৎপল, আসিফ নূর, মোর্শেদ মিলন—এরা। এদের মাঝে মঞ্চনাটকে পারফর্ম করা মোর্শেদ মিলন ছিল দুষ্টের-শিরোমণি। ক্লাস চলাকালীন সময়ে টেবিলের অন্যপ্রান্ত থেকে সে আমাদের [মানে  মেয়েদের উইঙ্ক করেই যেত। আমি একবার নোটপ্যাডে টিক চিহ্ন দিয়ে কাউন্ট করতে শুরু করলাম—মিলন আমাকে দুইঘণ্টার ক্লাসে একুশবার উইঙ্ক করেছে!


নারীবাদী হতে গেলে অশ্লীল পোশাক পরতে হবে এমন ধারণা আমার মনে কোনোদিনই ঠাঁই পায় নি।


শুধু আমাকে নয়, ও আমাদের ব্যাচের দশজন মেয়েকেই উইঙ্ক করত। আমাদের ব্যাচমেট নাজমা মমতাজ বলত—

কিরিচ দিয়ে মিলনের চোখ তুলে নেয়া দরকার।

নাজমার কথা শুনে আমরা সকলেই হেসে গড়িয়ে পড়তাম।

মাঈন উদ্দিন জাহেদ, নাসির মাহমুদ এই ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী হলেও আমার সঙ্গে হাই-হ্যালো ছাড়া তেমন খায়-খাতির হলো না। মাঈন, নাসির মিশত তখন আরেকটা গ্রুপের সাথে। সেই গ্রুপে অত্যন্ত ওপিনিওনেটেড একজন মেয়ে ছিল বলে মাঈন আমাদের-মুখো হতে পারত না। মাঈনদের গ্রুপের ওই মেয়ের ছিল অতি সস্তা ও উগ্র সাজসজ্জা আর অশ্লীল পোশাকআশাক। একদিন সে একটা ফিনফিনে কাপড়ের ব্লাউজ পরে এল—ভেতরে কোনোরকম লাইনিঙ ছাড়া। আমরা অন্য মেয়েরা এতে খানিকটা বিব্রত হলাম। কিন্তু যিনি পরেছেন তিনি নির্বিকার। নারীবাদী হতে গেলে অশ্লীল পোশাক পরতে হবে এমন ধারণা আমার মনে কোনোদিনই ঠাঁই পায় নি। ওই মেয়ের অপছন্দ সত্ত্বেও আমি মাঈনের সাথেও ঠিকই দুষ্টুমি করতাম।

আমি আদতে এইসব গ্রুপিং ট্রপিংয়ের ধার ধারতাম না। সবার সাথেই কমবেশি মিশতাম। কিন্তু সমস্যা ছিল, যখন ক্লাসের পরে বিরতি হতো—দেখতাম যে যার মতো দল করে চলে যাচ্ছে। আলমগীরেরও দল ছিল—শিমুল, মুজিব এরা। আমার কোনো দল নাই! আর অন্য মেয়েরা যারা ছিল, সবাই একেকজনের সাথে জোড় বেধে গেল। নাজমা মমতাজ আর আমার কোনো জোড় হলো না। আমরা দলছুট দোয়েলের মতো, নিঃসঙ্গ শালিকের মতো ঘাসের উপর একা একা হাঁটতে লাগলাম।

দেখা যেত আলমগীর আর নাজমা মমতাজের হয়তো একই টাইমে কম্পিউটার শেখার ক্লাস শেষ হচ্ছে—তখন আমি গিয়ে বসতাম কম্পিউটারের কি-বোর্ডে। ফলত আলমগীর লাঞ্চ খেতে যেত না, আমার জন্য অপেক্ষা করত। নাজমা মমতাজ ওকে ডাক দিত লাঞ্চে যাওয়ার জন্য। অতি ভদ্র আলমগীর বলত—

তুমি খেয়ে আসো। আমি পরে খাব।

নাজমা সরলভাবে বলত—

ও বুঝছি, তুমি পাপড়ির জন্য অপেক্ষা করতেছ!

আলমগীর হেসে বলত—

তাইলে তুমিও অপেক্ষা কর, একসাথে খাব তিনজনে।

আলমগীর আমাদের সাথে লাঞ্চ করত বলে ওর দলও প্রায়ই মনঃক্ষুণ্ন হতো।

এই স্বল্পকালীন মেয়াদি কোর্সেও অনেক ওলট-পালট ঘটতে লাগল। ঘটতে লাগল প্রণয় ও বিবাদ। ঘটতে লাগল প্রেম-বিরহ, মনকষাকষি। আমাদের চল্লিশ জনের মাঝ থেকে দুইজন প্রণয়-ঘটিত কারণে লিভটুগেদার করতে শুরু করল। এবং তারা তা করল একেবারে ঘোষণা দিয়ে। এমনকি এই দুই জন ‘বাংলাবাজার’ পত্রিকায় এই নিয়ে ইন্টারভিউও দিল। এই লিভটুগেদার কাপলের নারীটিকে দেখতাম এক ডিরেক্টরের রুমে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছে। পরে ওই ডিরেক্টরের সঙ্গে সে কক্সবাজারে প্রমোদ ভ্রমণেও গিয়েছিল। ফিরে এসে হাসতে হাসতে আমাদের কাছে সেই ভ্রমণ-বিষয়ক নানা গল্পও করেছিল।

এইসবের মাঝে আমি আর আলমগীর ছিলাম একেবারে এলিয়েন বা ভিনগ্রহের মানুষ। কিংবা ছিলাম একেবারে গ্রাম্য-খ্যাত টাইপের—যাদের আধুনিক পৃথিবী সম্বন্ধে একেবারেই কোনো ধারণা নাই! যাকে বলে নাখাস্তা ভেজিটেরিয়ান—যারা বইপড়া ছাড়া কিছুই বুঝত না। শীতের ম্যান্দামারা-দুপুরে বাংলা একাডেমির বিশাল বটের বিস্তৃত-ছায়া-ফেলা বেদীতে বসে আলমগীর আমাকে তার নতুন লেখা গল্প পড়ে শোনাত। আমিও কদাচিৎ শোনাতাম। আমার লেখা কোনোকিছুই অন্য কাউকে পড়ে শোনাতে ভালো লাগত না। আজও যেমন লাগে না।

এর মাঝে একদিন শাহ তোফায়েল [আমরা ডাকতাম ‘তোফা’ আমাকে বলল—

তুমি বাংলা একাডেমির পত্রিকা ‘উত্তরাধিকারে’ লেখা দাও।

আমি বললাম—

কার কাছে লেখা দিব? আমি তো কাউকে চিনি না।


পাপড়ি আপা, আপনে কী গল্প লিখছেন সুব্রত বড়ুয়া আপনারে খুঁজতেছে!


পরের দিন তোফা আমাকে ‘উত্তরাধিকারের’ নির্বাহী সম্পাদক হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের কাছে নিয়ে গেল। হাবিবুল্লাহ ভাই তখন বাংলা একাডেমির প্রেসের অফিসের কোনায় একটা ছোট্ট রুমে বসেন। ওই রুমে উনার চেয়ার ছাড়া আর দুইটা চেয়ার কোনো রকমে পেতে রাখা। হাবিবুল্লাহ ভাই অত্যন্ত অমায়িক ভদ্রলোক। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কোথায় কোথায় আমার গল্প ছাপা হয়েছে?

আমি সংকোচ নিয়ে বললাম—

লিটলম্যাগ রোদ্দুর, সহবাস [পাঠক ফোরাম, সিলেট থেকে প্রকাশিত লিটলম্যাগ, শৈলী আর খোলাজানালায়।

উনি শৈলীর কয়েকটা সংখ্যা বের করে টেবিলে ছড়িয়ে দিলেন। আমাকে বললেন—

কোনটায় আপনার লেখা গেছে দেখান।

যে সংখ্যায় আমার ‘উৎসব’ গল্পটা ছাপা হয়েছে আমি টেনে নিয়ে উনার সামনে খুলে দিলাম।

হাবিবুল্লাহ ভাই পড়ে দেখে বললেন—আপনার ঠিক এইরকম একটা গল্প চাই। অন্যরকম হলে কিন্তু আমি ছাপব না। জানেন বোধহয় আমি খুব কড়া সম্পাদক।

বলেই হাসতে লাগলেন। আমি আর তোফা উঠে এলাম। [এই তোফা পরেও আমার ভালো বন্ধু ছিল, এখনও আছে। ওর কাছে আমার ঋণের শেষ নাই।

হাবিবুল্লাহ ভাই তো বলে দিলেন, কিন্তু আমি পড়লাম বিপদে! ওই স্ট্রাকচারের গল্প লেখা খুবই কঠিন। আর গল্পের জন্য ভালো থিম পাওয়া আরও কঠিন। ততদিনে কবিতা আমায় ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছে।

আমি অনেক সময় নিয়ে, প্রচণ্ড খেটেখুটে একটা গল্প লিখলাম উত্তরাধিকারের জন্য। নাম দিলাম ‘ঘুম ও স্বপ্নের মাছরাঙা পাখি’ [এটাও আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা গল্প ও একাধিকবার রি-প্রিন্ট হওয়া এবং গল্পটা ছাপা হলো উত্তরাধিকারে।

ছাপা হওয়ার দিন কয়েক বাদে তরুণ লেখক প্রকল্পের জিয়া ভাই [জিয়াউল হক, অফিস সহকারী আমাকে বললেন—পাপড়ি আপা, আপনে কী গল্প লিখছেন সুব্রত বড়ুয়া আপনারে খুঁজতেছে!

শুনে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। সুব্রত বড়ুয়ার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। তিনি আমায় ডেকেছেন?

সুব্রত বড়ুয়া তখন ডিরেক্টর। আছেন বাংলা একাডেমির লাইব্রেরির ইনচার্জ হয়ে। আমি দ্বিধা নিয়ে উনার দরজার হাজির হয়ে নিজের নাম বললাম। উনি সরল হেসে বললেন—

পাপড়ি আসুন আসুন। উত্তরাধিকারে আপনার অত্যন্ত ভালো একটি গল্প পড়লাম।

আমি মাথা নিচু করে ঝরে পড়া অশ্রু আড়াল করার চেষ্টা চালালাম। [বাংলা সিনেমার ট্র্যাজেডি কুইন নায়িকা শাবানার মতো ফ্যাতকান্দুনি আমি ছিলাম না, কিন্তু আমার লেখা বিষয়ক যে কোনো সাফল্যেই আমি কেঁদে ফেলতাম বা এখনও সেই স্রোতস্বিনী আগের মতোই প্রবহমান!

ওইদিনের পর থেকে আমি প্রায়ই সুব্রতদার সঙ্গে সাহিত্যের নানান বিষয়েই  আলাপ করতাম। উনি এত বড় মাপের একজন সাহিত্যিক হয়েও আমাকে এই অ্যাক্সেস দিয়েছিলেন। তখনই সেলিনা হোসেনের সঙ্গেও আমার পরিচয় হয়। আপাও আমাকে আশকারাই দিয়েছিলেন বলা যায়। একজন দলহীন, গোত্রহীন, গড-প্যারেন্টহীন, অখ্যাত অথচ স্বপ্নবাজ লেখককে এঁরা যে অভয় দিয়েছিলেন, তার তুলনা হয় না। এঁরা দুইজনই বলেছিলেন—তুমি পারবে পাপড়ি, তোমাকে পারতেই হবে।


কোর্স শেষ হওয়ার প্রাক্কালে আলমগীরের সাথে আমার প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল একদিন।


আমাদের এসব সাহিত্য-আড্ডায় আলমগীরও যোগ দিত মাঝে মাঝে। বা অন্যরাও।  ক্রমশ আমাদের সুখের দিনগুলো ডানা গুটাতে শুরু করল। আমরা যে যার পাণ্ডুলিপি দ্রুত গোছাতে শুরু করলাম। দশটা গল্প জড়ো করে আমি আমার গল্পগ্রন্থের নাম দিলাম ‘সকল অন্ধকার হে আমার’। এই নামে আমার একটা গল্পও ছিল ওই বইতে। কিন্তু বাংলা একাডেমির নানা জটিলতায় তরুণ লেখক প্রকল্পের ইতি ঘটল। যার ফলে আমার প্রথম গল্পের বইটা কোনোদিনই আর প্রকাশিত হলো না। আমি পরে ওই পাণ্ডুলিপির কিছু কিছু গল্প অন্য বইতে দিয়ে দিয়েছিলাম।

তরুণ লেখক প্রকল্পের কোনো কিছুই আমরা ইজি-ওয়েতে পাই নি। যা-কিছুই পেয়েছি সেজন্য আমাদের অনেক শ্রম আর মেধা দিতে হয়েছে। প্রচণ্ড কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের সকলের পাণ্ডুলিপি চলে গেল ইভ্যালুয়েটারদের হাতে। এবং অবশ্যই তা অত্যন্ত গোপনীয়তা রেখেই। আমরা কেউ-ই জানতে পারলাম না আমাদের পাণ্ডুলিপির  ইভ্যালুয়েটার কে? বা কোথায় কার কাছে গিয়েছে তা?

কোর্স শেষ হওয়ার প্রাক্কালে আলমগীরের সাথে আমার প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল একদিন। আলমগীর তর্কে হেরে গিয়ে কাঁদতে লাগল। আর আমাদের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে গেল!

আমরা যে যার নিলয়ে ফিরে এলাম। আমাদের পুনরায় সেই মোনোটনাস দিনরাত্রি! আর অপেক্ষা—কবে আমরা জানতে পারব—আমাদের জমা দেয়া পাণ্ডুলিপি প্রকাশের যোগ্য নাকি অযোগ্য? বাংলা একাডেমির মতো অত বড় প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের বই আদৌ প্রকাশিত হবে নাকি হবে না?


‘পর্ব- ১৩’ প্রকাশিত হবে আগামী বুধবার

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা