ঢাকের শব্দ কানে লাগলেই বুকের অতলে চিনচিন ব্যথা হয়, মনে পড়ে প্রিয়তমা পুতুলের কথা। মনে পড়ে শৈশবের সখা-সখী কালিদাস, ভবতোষ, বাচ্চু, মীরা, শিউলি আরো অনেকের মুখ। প্রিয় সেই মুখগুলো আমার হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থাকলেও পলল মাটির এই সোনার বাঙলায় আর কোনোদিন তাদেরকে আমি খোঁজে পাব না। খরায় পুড়তে থাকা দুনিয়ায় চাতক যেমন হাহাকার করে সারা আকাশ ঢোঁরে ফিরলেও একফোঁটা পানি পায় না, তেমনি সারা বঙ্গমাতার বুক তন্ন তন্ন করে তালাশ করলেও জীবনে আর কোনোদিন তাদেরকে আমি দেখতে পাব না। কারণ তারা হিন্দু। তাই তারা সাধে-অসাধে বাংলা মায়ের শান্তির বুক ছেড়ে হিন্দুস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্লিজ, বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছি এইকথা ভেবে কেউ যদি আমাকে একলা ফেলে চলে যান তাহলে আপনারাও আমাদের পিতৃপুরুষদের মতো নিষ্ঠুর, লোভী আর স্বার্থপর বলে আমি ধরে নেব। যারা শুধুমাত্র সস্তায় হিন্দুদের জমি-বাড়ি কেনার লোভে পা দিয়ে কচলে-মচলে মেচাগার করে দিয়েছিল হাজার বছরের হিন্দু-মুসলসান ভাই ভাই সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক ঐতিহাসিক দলিল।
একদম বুঝ হওয়ার পর দেখেছি গ্রামটাতে হিন্দু-মুসলমান সমানে সমান। হিন্দুরা দক্ষিণে, মুসলমানরা উত্তরে।
জবা দিদি ছিল আমাদের গ্রামের সবচে সুন্দরী আর ভালো মেয়ে। সেই শিশু বয়সেই আমরা ক’জন ধর্ম-নির্বিশেষে সিক্ত হতাম তার স্নেহ-মমতায়। সে-ও ধর্ষিত হয়েছিল পাশের গ্রামের কয়েকজন অসভ্য, নোংরা মুসলমান নামধারী পুরুষের দ্বারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ডাকাতির নামে পরিবারের সবাইকে বেদম পেটালে আর জবা দিদিকে বলাৎকার করলে ওরা পানির দামে জমি-বাড়ি বেচে দিয়ে ভারতে পালাবে। বাস্তবে ঘটেছিলও তাই। দুই মাসের মাথায় জবা দিদিরা ভারতে চলে গেল। বিশাল বাড়ি, বাগবাগিচা, মাঠের জমি সব, সব নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়েছিল সেই বর্বর মানুষগুলো। তারপর বাড়ির সব বড় বড় মহীরুহ বৃক্ষগুলো বেচে দিয়ে খরিদ মূল্যটা রাতারাতি উসুল করে ফেলে! তখন জবা দিদির কথা মনে হলেই আমি আমাদের শিমুলতলার সবচে বড় গাছটার মগডালে বসে সারাদিন দূরের রেলসড়কটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এই লাইন দিয়েই ট্রেনে চড়ে দিদিরা ভারতে চলে গেছে।
প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে গল্পের চেয়েও কঠিন কিছু সত্য লুকানো থাকে, মৃত্যুর মতো ভয়াবহ কিছু স্তব্ধ মুহূর্ত থাকে, যা শুধু সে-ই সারাজীবন দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে বহন করে। লালন করে। এই শারদীয় উৎসবের ঢাকের শব্দে স্মৃতির সেই কষ্ট ভরা ছোট্ট, নীল তোরঙ্গটা আজ আমি একটু খুলব।
এই মাটিতে হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই প্রায় হাজার বছর। তাই নানান দিক থেকে তারা বাঁধা ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। তার মধ্যে ভাব-বিশ্বাস, ভালোবাসার বাঁধনটা ছিল সবচে মজবুত। সেই বাঁধনেই আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের দিনগুলো এই মাটিতে বাঁধা পড়েছিল। একদম বুঝ হওয়ার পর দেখেছি গ্রামটাতে হিন্দু-মুসলমান সমানে সমান। হিন্দুরা দক্ষিণে, মুসলমানরা উত্তরে। গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কালের একমাত্র নীরব সাক্ষী ছোট নদী সুতিয়া।
গ্রামের একমাত্র আখড়াটা মাঝখানে। তার একদিকে হিন্দু, অন্যদিকে মুসলমান। আখড়ার উত্তরে তিন-চারটা ক্ষেত পেরোলেই আমাদের বাড়ি। গ্রামের মসজিদটাও আমাদের বাড়িতে এবং মসজিদের সামনে চার-পাঁচটা পাড়ার একমাত্র টিউবওয়েলটাও। সেই ভোর থেকেই হিন্দুরা মাটির কলস নিয়ে খাওয়ার পানি নিতে আসত। আমাদের বয়সীরাও কেউ কেউ আসত ছোট হাড়ি কাঁখে কিংবা ঘাড়ে ফেলে। তাই ন্যাংটা বয়স থেকেই তাদের অনেকের সাথে আমাদের চিন-পরিচয়, আলাপ-সালাপ। ওরা পানি নিতে এলেই আমরা টিউবওয়েলের একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকি। তারা কল টিপে টিপে ছোট কলসিতে পানি ভরে। ভরা শেষ হলে আমার তাদের হাড়ি ছোঁয়ে দেই। মুসলমানরা ছোঁয়ে দিলে ওদের সবকিছু নাকি ছুঁচি হয়ে যায়। তাই তারা রাগ করে। কেউ কেউ গালি দিয়ে হাড়ি ফেলে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়। আমরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখে পাল্টা গালি দেই। এইভাবে রাগারাগি, গালাগালিতে আমাদের কচি মনের নরম মাটিতে ভাবের অঙ্কুর শুরু হয়। তারপর ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর যখন দেখি হিন্দুপাড়ার রেখা আছে, কানন আছে, সুবল আছে তখন গলায় গলায় ভাব হতে আর কয়দিন লাগে?
হিন্দু বন্ধুদের কাছ থেকেই দুর্গাপূজার মূর্তি বানানোর খবর পেতাম। খবর পেতাম চক্ষুদান অনুষ্ঠানের। সেইদিন থেকে খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে সারাদিন আখড়াতেই কাটত। মন্দিরের সামনের বিরাট চত্বরটা তখন আমাদের খেলার মাঠ। কে হিন্দু, কে মুসলমান এই প্রশ্ন আমাদের কারো মনেই আসত না। খেলায় বাটপারি করে একে অন্যকে ঠকানোর জন্য আমরা কিরা কাটতাম, বিদ্যা! মা-কালি! তারাও আমাদের এই শপথকে বিশ্বাস করত।
সত্তর থেকে আশি। এই দশ বছরে আমার বালক জীবন থেকে চিরদিনের মতো ইন্ডিয়া নামক একটা অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল অন্তত কুড়িজন বন্ধু। কালিদাস নামে আমাদের দুই জন বন্ধু ছিল। তাই আমরা একজনকে ডাকতাম বাবা কালি। বাবা কালি কথা শুরু করার আগে বা... বা করে কয়বার তোতলাত। প্রাণ উচ্ছল এই ছেলেটার সাথে আমার ছিল হৃদয়ে হৃদয়ে ভাব। কালি দাস, দীলিপ, ভবতোষ, বাচ্চু, মীরা, শিউলি একেকটা নাম এখন আমার কাছে একেকটা দীর্ঘশ্বাস। গভীর রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় কষ্ট জর্জর, ক্লান্ত পৃথিবী যেন নিঃস্বের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। মনে পড়ে দেশত্যাগী আমার প্রিয় বন্ধুদের কথা। বাইরে টুপটাপ করে ঝরে পড়া শিশির কিংবা বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হয় এই মাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া আমার বন্ধুদের চোখের পানি। জানি না আমার প্রিয় মুখগুলো আজ বেঁচে থাকার জন্য কোথায়, কোন জনপদে ঘামে ফেনা ফেনা হয়ে ছুটছে। কারণ বলতে গেলে তারা একরকম নিঃস্ব হয়ে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। তাই দুর্গাপূজার ঢাকের শব্দ কানে লাগলে আমার বুকটা হাহাকার করে ওঠে।
বুক কেঁপে ওঠার আরেকটা কারণ হলো পুতুল। বিএসসি’তে আমরা ক্লাসমেট ছিলাম। দুই-আড়াইশ ছেলে-মেয়ের মধ্যে আমরা বিশ-পঁচিশজন সামনের দিকে বসার জন্য রীতিমতো লড়াই করতাম। সামনে বসার সরাসরি ফজিলত দুইটা :
১.বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। ২.মেয়েদেরকে খুব কাছ থেকে মন ভরে দেখা যায়।
ওদের ওড়নার একটু নড়াচাড়া, শরীরের একটু মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়ার জন্য আমার ক্লাস-মেটদের কেউ কেউ জানবাজি রাখতে রাজি ছিল।
প্রাইমারি থেকে বিজ্ঞান আমার প্রিয় বিষয়। তাই আমার মন থাকত স্যার আর বোর্ডের দিকে। আমি, মানিক আর স্বপন; আমরা তিন বন্ধু বসতাম এক বেঞ্চে। আমি স্যারের পুরু লেকচারটা মন দিয়ে নোট করতাম। তিন-চার মাস পর স্বপন একদিন বললে, এই লুৎফর তুই কিছু বুঝতারছত?
কী?
সত্যি কিছু দেখছত না?
না।
সামনের ঘণ্টায় পুতুলের দিকে একটু খেয়াল রাখিস।
ঘণ্টা পড়তেই আমরা দু’তলার একশ তিন নাম্বার রুমের দিকে ছুটতে থাকি। এক পাশে মেয়েরাও। জাপানি পুতুলের মতো ঝলমলে হলুদ, লিকলিকে পুতুল সবার আগে। মেয়েদের সারির প্রথম বেঞ্চের ডানদিকের প্রথম সিটটা তার সিলমারা। আমরা সবাই জানতাম পুতুল এই শহরের নামকরা এক সোনা ব্যবসায়ীর মেয়ে। গুণবাচক এই শব্দগুটির জন্য ক্লাসের ছেলে-মেয়ে সবাই তাকে একটু ছাড় দিত। মোস্তাফিজ স্যারের ক্লাস। (আমরা পাস করে চলে আসার দুই বছর পর তিনি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে সেখানেই শিক্ষক হিসাবে থেকে যান।) ছেলেদের সারির সামনের বেঞ্চের মাঝের সিটে আমি। আমার এক পাশে মানিক অন্য পাশে স্বপন। পশ্চিমের সারিতে মেয়েরা। ক্লাস শুরু হতেই স্বপন আমাকে চিমটি কাটতে শুরু করে। ওর দিকে তাকাতেই সে পুতুলের দিকে তাকাবার জন্য আমাকে ইশারা করে। আমি চেয়ে দেখি পুতুল আমার দিকে বড় বড় উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। প্রথম ভাবলাম ভুল। আবার তাকাতেই আমাদের চোখাচোখি হয়। পুতুলের ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে ওঠে। আমিও লজ্জা পাই। তারপর আরো কয়বার চোখ তুলতেই এক-ই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেছে দেখে আমি আর তাকাই না।
প্রেম-পিরিতির এইসব চোখ টিপাটিপিতে আমার মন ছিল না। আমি তখন দুই হাতে আধুনিক বাংলা গান লিখছি। গান লিখতে বসলেই আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার আব্দুল হাই আল হাদী সাহেব। তিনি আমাদের পাশের গ্রামের মানুষ। তো আমার গানের সংখ্যা তখন তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কবিতার পাণ্ডুলিপিও বেশ কয়টা। ইতিমধ্যেই ঢাকা বেতারের নিয়মিত গীতিকার হওয়ার পরীক্ষায় আমি দুই-দুইবার ফেল করেছি। বুকে ব্যর্থতার আগুন। আবার বিএসসিতে সেরা ফল পাওয়ার স্বপ্নে চোখ দুইটা সবসময় চকচক করে। তাই মেসের সবার পরে ঘুমাতে যাই। উঠি সবার আগে। অন্ধকার থাকতেই ট্রাকস্যুট আর ক্যাডস পরে তিন মাইল দৌড়ে এসে ব্যায়াম করি। তারপর গোসল সেরে এক মুঠ ভেজা ছোলা আর একদলা গুড় খাই। খেতে খেতেই পড়া শুরু করি। সকাল আটটায় প্রাণিবিজ্ঞানের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যাই। দশটায় কলেজের ক্লাস। বিকালে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের স্যারের কাছে প্রাইভেট। সন্ধ্যায় ছাত্র ইউনিয়নের অফিসে রাজনীতির আড্ডা। মনের মতো গান লিখতে পারছি না এই দুঃখে মাঝে মাঝে ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে গিয়ে একা একা বসে থাকি। আর কী পুতুলের কথা মনে থাকে?
দিনে দিনে আমার গানের নদীটা শুকিয়ে মরল। কবিতাও পালিয়েছে। ভোরের ব্যায়ামটাও ছেড়ে দিলাম।
অক্টোবরের বাইশ তারিখ দ্বিতীয় ঘণ্টায় দুর্গাপূজার ছুটির নোটিশ হয়ে গেল। তৃতীয় ঘণ্টায় গ্যাপ। আমি, স্বপন, মানিক পুকুরপারের মেহগনিতলায় আড্ডা দিচ্ছি। তো পুতুল মেয়েদের কমনরুম থেকে ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। রাজকন্যার ওড়নার গন্ধ পেয়েই আমরা তিন জন উঠে দাঁড়াই। স্বপন আর মানিক পুতুলের আজন্ম বন্ধু। তারা যেমন পুতুলের নিকট-প্রতিবেশী তেমনি প্রাইমারি, হাইস্কুল এক সাথে পড়ে এই কলেজে থেকে ইন্টার করে এখন বিএসসি’তে। আমি এই কলেজে বিএসসি পড়তে এসেছি অন্য একটা কলেজ থেকে। পুতুল আমাদের সামনে এসে ডান হাতের হলুদ আর চিকন আঙুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে সোজা হুকুমের সুরে বললে, এই তোমাদের তিনজনের পূজার নিমন্ত্রণ। আগামীকাল সন্ধ্যায় আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব।
ফিরে যাবার আগে আমার চোখে চোখ রেখে আস্তে করে বললে, এই তোমার কিন্তু মিসকরা চলবে না।
পরেরদিন সন্ধ্যায় আমরা তিনজন গুটি গুটি পায়ে শহরের সেই আলো ঝলমলে বিশাল বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। সম্ভবত সে অপেক্ষায় ছিল। তাই মুহূর্তে দেবী এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। আজ সে আকাশি রঙের একটা শাড়ি পরেছে, স্বর্ণাভ ঘাড়ে আলতোভাবে ঝুলছে মস্ত একটা খোঁপা, কপালে লাল টিপ, টানা টানা কাজল চোখ দুইটা আবেগে কাঁপছে। বাড়ির ভেতরে পূজামণ্ডপ, মানুষের ভিড়। প্রাচীন কালের বিশাল বাড়িটার উত্তর কোনার দিকে একটা মস্ত বাগানের সামনে আমরা। তিনদিকেই এরিকা পামের ঝোপ আর দেবদারু গাছ। তার নির্জন-কালচে ছায়ায় আমরা চারজন মুখোমুখি। মানিক সিগারেট ধরাবার উছিলা করে সরে গেল। স্বপন বললে, এই তরা কথা বল আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।
কিছু বুঝে উঠার আগেই পুতুল আমার দুই হাত আঁকড়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলে, তুমি যে কী অন্ধ! কী আজব! আজ কতটা মাস ধরে আমি মরমে মরছি। এখন আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে... হায়!
পুতুল ফাৎ ফাৎ করে কাঁদতেই থাকে। আমাকে পরশু স্বপন বলেছে, পুতুলের বর ইন্ডিয়ার শিলিগুড়িতে থাকে। ওরা এই দেশেরই মানুষ ছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় এই দেশও যখন অস্থির হয়ে ওঠে তখন ওরা ভারতে চলে গেছিল। শিলিগুড়ি শহরে ওদের সোনার ব্যবসা আছে। সেখানে পুতুলের এক জ্যাঠামশায়ও বাড়ি কিনে বসত করছেন অনেক বছর আগে থেকেই। তিনিই এই বিয়ের ঘটকালিতে জড়িত। নেত্রকোণা শহরের পুরোনো বাড়িতে ছেলের বৃদ্ধ পিতা-মাতা এখনো বাস করে। আপাতত পুতুল সেখানেই থাকবে।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে পুতুল আমার গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে বলে, তোমাকে তো আমি সারা জীবনের জন্য হারালাম। হায় ভগমান! আমি যে কী নিয়ে বাঁচব!
বলতে বলতে অবুঝ, অজ্ঞানের মতো পুতুল আমার পায়ের কাছে বসে পড়ে। ভয়ে আমার শরীর কাঠ! তবু তাকে জোর করে টেনে উঠাই। তালু-জিব শুকিয়ে মরুভূমি! তাই আমার গলা দিয়ে কথা আসছে না। হায় খোদা! এ কেমন বিপদ। আমি তো তাকে একটুও ভালোবাসি না। এইভাবে দুইদিনের আলাপে যে ভালোবাসা পাওয়া যায় তাকে আমি ভালোবাসা বলতে পারি না। ভালোবাসা যে কী আর এর ভয়াবহতা কত সুদূরপ্রসারী সেই সবক নেওয়া ছিল বলেই আমি পুতুলের কাছ থেকে পালাতে চাইছিলাম।
শরতের মেঘের মতো নরম আর হালকা পুতুল তখনো আমারকে জড়িয়ে ধরে বুকে ঝুলছিল। তার দেহের ভার, চুলের মিষ্টি গন্ধ, নিশ্বাসের গরম, চোখের পানির ভেজা স্যাঁতসেঁতে অনুভূতির কোনো মানেই ছিল না আমার কাছে। এত আতঙ্কের মাঝেও আমার ভয়তটস্থ শরীরে বারবার শুধু একটা বিজাতীয় শিহরন বয়ে যাচ্ছিল। ইচ্ছা করছিল ওকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসাহীন, কামান্ধ কয়টা চুমু খাই। প্রেম তো আর গাছের ফল না যে একটু নাড়া দিলেই টপ্পৎ করে আঁচলে পড়ে যাবে?
স্বপনের ফিরে আসার শব্দে পুতুল নিজেকে সামলে নেয়। মানিকও ফিরে আসে। আমরা এখন চারজন পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি, সামনাসামনি। পুতুল সবার অলক্ষ্যে পায়ের জুতা খুলে পালকের মতো মসৃণ আর তুলতুলে একটা পা আমার পায়ের উপর চেপে রাখে, একটু ট্যাকনিক্যাল অসুবিধার জন্য তোমাকে আপ্যায়ন করতে পারলাম না লুৎফর। পূজার পর থেকে আমি আর কলেজে যাব না। কিছু বলার থাকলে স্বপন কিংবা মানিকের কাছে... হুড়মুড় কান্নার চাপে পুতুলের কথা থেমে যায়।
মানিক আর স্বপন আমাকে একলা ফেলে হাঁটতে থাকে। পুতুল চট করে আমার কাছে এসে গাল পেতে দাঁড়ায়, প্লিজ, একটা চুমু খাও। অন্তত বুকে একটা স্মৃতি থাকুক।
আমি নিরাবেগ গলায় তাকে পষ্ট করে জানিয়ে দেই, জোড় হাতে মিনতি করছি, নিষ্প্রেম হৃদয়ে চুমা খাওয়া আমার কাছে পাপের শামিল। আজ তাই তোমার কপালে চুমু খাব। আর যদি ভবিষ্যতে তোমার প্রেম আমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গি হয়ে ওঠে তাহলে গাল পেতে দিয়ো, নিজেকে নিঃশেষে দেবো।
আমার কথা শেষ হতেই পুতুল ঝংকার দিয়ে ওঠে, কবিতা হচ্ছে?
এই বলে পুতুল আমাকে জাপটে ধরে নিজেই একটা চুমু খেয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ে পালায়।
পুতুল চলে যেতেই আমার বুকটা ধড়াস করে কেঁপে ওঠে কেমন জানি খালি! খালি! হয়ে যায়। আমি ঘোরগ্রস্তের মতো ধীরে ধীরে মেসে ফিরে আসি। কিন্তু সেই আমি আর আসি না; মুখে হাসি নাই, গলায় গান নাই, বুকের ভিতরে কেমন কাঁটা কাঁটা ভাব।
দিনে দিনে আমার গানের নদীটা শুকিয়ে মরল। কবিতাও পালিয়েছে। ভোরের ব্যায়ামটাও ছেড়ে দিলাম। খাবার সময় গরুর শুকনা খড় চিবানোর মতো স্বাদহীন ভাত চিবাই। আর পড়ি। শৈশব থেকেই শত দুঃখেও আমি পড়তে পারি। তাই লেখাপড়া বেড়ে গেল। বাড়ল সিগারেটও। মাঝে মাঝে মরা ব্রহ্মপুত্রের চরে গিয়ে একলা একলা হাঁটি। মটর ক্ষেত, খেসারি কলাইয়ের ক্ষেত, চিনাবাদামের ক্ষেত দেখতে দেখতে নির্জন চরে মাইলের পর মাইল হাঁটি। একদিন দেখি ছোট্ট একটা জলার কিনারে দুইটা গুইসাপ পরস্পরকে আট হাত-পায়ে জড়িয়ে ধরে পানির মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর আদর করছে। অর্থাৎ তারা সং করছে! আমার হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে গলার গাছে চলে আসে। নাকে পাই পুতুলের শরীরের সুগন্ধ, বুকে পাই তার ছোট ছোট, শক্ত ও পেলব বুক দুইটার ওম ওম পরশ। হায় আমার আল্লা! আমি সেই নির্জন, খাঁ খাঁ বালুচরে একলা একলাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। মাথার মাঝে ঝিলিক দিয়ে উঠে কবিতার লাইন :
‘কৈ গ্যালো পান, পানি, পরান তামাক তালুডা যে পদ্মার চর! ক্যাডা যে কৈছিন এইরহম কালা পানির দ্যাশে আইতাম?’
রাতে আর এক লাইনও পড়তে পারলাম না। বাকি কবিতার একটা শব্দও নেমে এল না। ঘুমও আসছে না। মাথার যন্ত্রণায় রাত বারোটার দিকে রুমে তালা দিয়ে পাগলের মতো বেরিয়ে পড়ি। বাইরে বসন্তের একটু একটু শীত। যে কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে বিছানায় মরার মতো পড়ে ছিলাম সেইটা দিয়েই শরীর-মাথা ঢেকে নেই। ঠোঁটের সিগারেট কখন যে কাঁথায় পড়ে গেছে খেয়াল ছিল না। বড় রাস্তায় উঠতেই কাঁথায় দপ করে আগুন ধরে যায়। আমি ভরকে গিয়ে কাঁথায় গা থেকে খুলে পাশের ড্রেনে ফেলে হাঁটতে থাকি। শনি যেভাবে মানুষ নামের শিকারকে টেনে টেনে চরম সর্বনাশের দিকে নিয়ে যায় আমিও সেইভাবে হাঁটতে হাঁটতে মাছবাজারে মদ-গাঁজার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। ভেতরে গ্লাসের শব্দ, বোতল থেকে তরল ঢালার ওপ...ওপ...শব্দ। বাংলা মদের দুর্গন্ধে আমার আঁত-নাড়ি উল্টে আসছে! জীবনে এইসব চোখেও দেখি নি। তবু মরিয়া হয়ে কাউন্টারের ছোট্ট গর্তে মুখ রেখে বাইরে থেকে বলি, দুই টাকার এক পোটলা গাঞ্জা দেন।
আমার গলার শব্দে কী ছিল জানি না। ভেতর থেকে সাথে সাথে একজন বেরিয়ে আসে। আধো অন্ধকারে তাকে দেখে আমি চমকে উঠি। কালো চিতার মতো চমৎকার গড়ন-গাড়নের দীর্ঘদেহী সুপুরুষ সে। তাকে কোনোদিন শহরের রাস্তায় হাঁটতে দেখি নি। সবসময় ক্লিনশেভ। সবসময় ফিটফাট। দিল্লির বাদশাদের মতো হেলান দিয়ে রিকশায় বসে থাকে, রিকশা ধীর গতিতে চলছে। মালে টাল হয়ে গেছে বলে মাথাটা একটু সামনের দিকে ঝুকে আছে। সে এই শহরের শ্রেষ্ঠ মাতাল, শ্রেষ্ঠ বিলাসী পুরুষ এবং সম্ভবত কিছুটা ধনবানও। টলতে টলতে লোকটা আমার সামনে এসে ঝুঁকে আমার মুখের কাছে মুখ এনে এক নজর দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে, হায় বাপ! তুমি এই মুখ, এই সুন্দর গোঁফ লইয়া দুই টাকার গাঞ্জা কিনতে আইছ? হায় বাপ! এই লও জুতা, আমার নসিবে মার, কেন আমি মদ খাই?
মাতাল লোকটা তার পায়ের জুতা খুলে আমার হাতে জোর করে ধরিয়ে দিতে চাইছে আর কাঁদছেই, হায় বাপ! যৌবনের দুঃখ বেশিদিন থাকে না। ঘোর কেটে গেলে শুধু পস্তাবা। যাও, যাও বাপ, এই নরক থেকে পালায়া যাও।
সাথের জনেরা এসে ধরাধরি করে লোকটাকে নিয়ে গেল। আমি গাঞ্জাটাঞ্জা ছাড়াই ঠ্যাং ভাঙা, কান কাটা চুরের মতো কোনোরকম রুমে ফিরে আসি।
আবার শরৎ এসেছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে চরে সাদা ফুলের বাহার। আকাশের অনেক উঁচুতে কিছু কিছু সাদা মেঘ খুশিতে ঘুরাফিরা করে। কিন্তু বৃষ্টি হয় না। আমার বুকের ভিতরে কী যে নড়াচড়া করে, কী যে অপেক্ষা করে! একদিন ক্লাস শেষে স্বপন আমার কানে কানে বললে, নেত্রকোণা থেকে পুতুল আজ আসবে।
কেউ আমাকে না বললেও আমি জানতাম। শহরের সাহাবাড়ির ঢাকের শব্দ শুনতেই আমার হৃদয় বলছিল, সে আসবে।
আমি হু-হা করি না। গত এক বছরের মাঝে আমি একবারও স্বপন কিংবা মানিকের কাছে পুতুল বিষয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করি নি। মাঝে মাঝে ওরা পুতুলের শ্বশুর বাড়ির খবর কিংবা তার শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতির খবর বলত। তো আমার কোনো সাড়া-শব্দ নাই দেখে স্বপনও আর কথা বাড়ায় না।
গান, কবিতা বিদায় নিলেও খরখরা বুকে তখন কথাসাহিত্যের বাতাসে উপন্যাস নামক বৃক্ষের পাতা মর্মর ধ্বনি তুলছে। কারণ আমি তখন ‘রোদন উপাখ্যান’ নামে একটা উপন্যাস লিখছি। ভয়াবহ প্রেমের উপন্যাস। পরীক্ষার পড়া শেষ করে গভীর রাতে লেখতে বসে যতটা না উপন্যাস লিখি, নায়কের কষ্টে তারচে বেশি কাঁদি। কারণ উপন্যাসের পরিকল্পনা মতো শেষমেষ নায়ক ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করে প্রেমের জ্বালা জুড়াবে।
আমরা আগামী পরশু ভারতে চলে যাব। একবার মনে হলো এই টাকা নিয়ে তোমার সাথে পালিয়ে যাই।
পুতুল বাড়িতে এসেই স্বপনের মারফত এইবারও পূজার দাওয়াত দিল। আমিও মনে মনে অপেক্ষায় ছিলাম। সেই সন্ধ্যা। সেই এরিকা পামের ঝোপ। আমি কিছুই জানতাম না। স্বপন উত্তরের কোনায় আর মানিক দক্ষিণের ছোট পথটার পাশে। এইদিকে কারো আসার সম্ভাবনা নাই। তবু তারা পাহারায় দাঁড়িয়ে গেছে! বুঝলাম দেবী চৌধুরানির নির্দেশে আজ তার বাল্যবন্ধুরা বুক দিয়ে তার নিকুঞ্জ বিলাসে নিরাপত্তা দিবে। স্বপন না হউক মানিকের অন্তত তাই করা উচিত। কারণ আমি গত দেড় বছর ধরে রাত একটার পর মানিকের পিরিতিকালীন নিরাপত্তার জন্য রড হাতে একটা কাঁঠাল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতেছি। তো একদিন রাতে মানিকরা দুইজনই মেয়ের মায়ের হাতে ধরা পড়ে আর মেয়ের বাপ এই মোটা বাঁশ দিয়ে আমার পিঠে মারে এক লাঠি। আমি দিশাবিশা না পেয়ে পিঠ বাঁচাবার জন্য পাশের কাঁচা ড্রেনেই লাফিয়ে পড়ে কোনোমতে রক্ষা পাই।
সেই এক-ই ভঙ্গি, দেবী দেবী এক-ই ভাব নিয়ে পুতুল আসে। এসেই আমার গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে, লুৎফর আমি সুখী হই নি। ও একটা মাতাল, লম্পট!
গত এক বছরে পুতুলের প্রতি আমার প্রেম একটু একটু করে বনস্পতির মতো অনেক উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তাই আমিও সেই গুইসাপটার মতো পতুলকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে ঝরছে পুতুলের প্রেম।
অনেকক্ষণ পর পুতুল বললে, আজ বাবা ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা তুলে এনে ঘরে রেখেছে। আমরা আগামী পরশু ভারতে চলে যাব। একবার মনে হলো এই টাকা নিয়ে তোমার সাথে পালিয়ে যাই। অনেক ভেবে দেখলাম এই করে শুধু আমরা আমাদের প্রেমকেই গলাটিপে হত্যা করব... বলতে বলতে পুতুল জ্ঞান হারিয়ে আমার বুকের মাঝে ঢলে পড়ে।
অবশ, অনুভবশূন্য মগজে অনেক রাতে রুমে ফিরে আসি। বুকের মাঝে জহরের জ্বালা, কষ্টের চিনচিনানি। কী একটা যেন বেরিয়ে আসার জন্য ভেতরে উথালপাথাল করছে। আমি দ্রুত হাতে কলম নিয়ে কবিতার খাতা খুলে বসি :
‘যেদিকে চোখ যায় মসজিদের মিনারের মতন আমার প্রেম, লাখে লাখে পুতুলের মুখ বাসনার কবরে আজ শুধু কথা কয় পুষ্পের আগুন নরকে আমি নিঃসঙ্গ গুনাগার! কৈ গ্যালো পিতৃসম বৈরাম খাঁ কোথায় মিলায়া গ্যাছে আমার নবরত্ন, জেনানা মহল? কৈ গ্যালো পান, পানি, পরান তামাক তালুডা যে পদ্মার চর, ক্যাডা যে কৈছিন এইরহম কালা পানির দ্যাশে আইতাম?’