আমার একলা পথের সাথি : ১৪

  পর্ব-১৩

 পর্ব-১৪

জিয়া ভাইয়ের কাছ থেকে ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে আমি বশীর আল হেলালকে একদিন ফোন করলাম। ফোন করে উনার সাথে দেখা করার অভিপ্রায় জানালাম। উনি একটা নির্দিষ্ট তারিখে সকালের দিকে আমাকে দেখা করার অনুমতি দিলেন। ফের বাংলা একাডেমি। সেই অতি পরিচিত পিচঢালা প্রশস্ত পথের উপর সেগুনের বড় বড় শুকনোপাতার মর্মর আর বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের ছোট্ট চেম্বার। যে চেম্বারে হাবিবুল্লাহ ভাই বসার পর টেবিলের উল্টাদিকে রাখা দুইটা চেয়ারে শুধুমাত্র দুই জন মানুষ কোনোমতে বসা যায়। দুই জনের চাইতে বেশি মানুষ এলেই তাদের গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

বশীর আল হেলালকে আমি সেদিনই প্রথম সামনাসামনি দেখলাম। তাঁর মতো সৌম্য-শান্ত-সুদর্শন-মৃদুভাষী মানুষ আমি এ জীবনে খুব কমই দেখেছি। আমি উনাকে সালাম দিয়ে নিজের নাম বললাম। প্রাথমিক পরিচয়ের পরে উনার কাছ থেকে আমার গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়ে নানান বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনে নিলাম। কিভাবে আরও ভালো গল্প লেখা যাবে সেসব নিয়েও বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হলো। হাবিবুল্লাহ ভাই পুরো সময় ধরে আমাদের কনভার্সেশন শুনলেন। মাঝেসাঝে নিজের বক্তব্য জুড়ে দিলেন এবং আমাদের চা-বিস্কুট খাওয়ালেন।


নিজের দেশকে তুমি কোনোদিন ভুলে যেও না, পাপড়ি। নিজের দেশের কথা চিরকাল স্মরণ রেখো।


আমাদের কথা প্রায় ফুরিয়ে এলে আমি বশীর ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম—

আমার জন্য আপনার উপদেশ কী? কোনো উপদেশ থাকলে আমি সেটা শুনতে চাই।

বশীর ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভেবে নিয়ে বললেন—

তুমি যদি আমার কোনো কথা রাখতেই চাও, তাহলে আমি তোমাকে একটা কথাই বলব—

নিজের দেশকে তুমি কোনোদিন ভুলে যেও না, পাপড়ি। নিজের দেশের কথা চিরকাল স্মরণ রেখো।

আমি বশীর ভাইয়ের পা স্পর্শ করার জন্য নত হলাম। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন।

[আমি জানি না বশীর ভাইয়ের কথা আমি সেভাবে রাখতে পেরেছি কিনা? কিন্তু আমি তো চিরকাল আমার দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শেকড় সুলুক-সন্ধান করেই চলেছি

বশীর আল হেলালের ওই উপদেশের কথা আমি সেলিনা আপাকে জানালে তিনিও একই কথা বললেন আমাকে। আপাও বললেন—

পাপড়ি, আগে তো দেশ, তার পরে অন্যকিছু।

সেলিনা হোসেন এমন একজন মানুষ, খুব কাছ থেকে যাঁকে না-দেখলে সত্যিকার তাঁকে উপলব্ধি করা যায় না, যাবে না। সেলিনা আপার কাছে আমার ঋণের শেষ নাই। সে-ঋণের বোঝা এতটাই ভারী যে, আমি সেসব বলে বোঝাতে অপারগ। আজ শুধু এতটুকু বলছি—তিনি হয়তো আমার বায়োলজিক্যাল মাদার নন, তিনি হয়তো আমায় গর্ভে ধরেন নি—কিন্তু তিনিই আমার সত্যিকারের মা। সেলিনা আপার অপার-স্নেহ-ভালোবাসা আর সহমর্মিতা না-পেলে আমার মতো নামহীন, গোত্রহীন, সহায়হীন এক প্রান্তিক-লেখক ঠিক বানের জলে আবর্জনার মতো ভেসে যেত। আর সে-যাওয়া চিরতরের জন্যই ভেসে যাওয়া হতো। তদুপরি আমি এতটাই সেলফ-রেসপেক্ট আগলিয়ে চলা এক মানুষ যে—সম্পাদকদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্না দিয়ে পড়ে থেকে, খায়-খাতির করে, ক্রমাগত নিজেকে সস্তা-পণ্য করে তুলে—টিকে থাকার ইঁদুর-দৌড়ে কোনোদিনই রত হতে পারতাম না। বা আমাদের সাহিত্যের চোরাগুপ্তা-পথে আমি কোনোদিনই হাঁটতাম না।

একেবারেই নামহীন, গোত্রহীন তদুপুরি প্রান্তিক এক লেখককে সেলিনা হোসেন আলো-জল-হাওয়া-মাটি দিয়ে গভীর মমতায় বাঁচিয়ে রাখলেন। তাঁর সাথে অনেক কাজ করবার সুযোগ আমাকে করে দিলেন। আমি সেই নব্বইয়ের শেষের দিকেই আপার সাথে ‘সাহিত্য কোষে’ কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘সাহিত্য কোষে’ আমি কম সে কম ৩০/৪০টা গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের এনট্রি দিয়েছিলাম। আপা আমাকে দিয়ে ছোটদের জন্যও কিছু লেখা লিখিয়ে নিয়েছিলেন। সেসব লেখা ছোটদের পত্রিকা ‘ধানশালিকের দেশে’ প্রকাশিত হয়েছিল। সেলিনা আপা আমাকে তাঁর সম্পাদিত ‘জেন্ডার কোষেও’ কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এইসব কাজ থেকে আমি মোটা অঙ্কের অর্থকড়িও পেতাম। যা দিয়ে অন্তত আমার নিজের হাতখরচটা চালাতে পারতাম। তথাকথিত নিকটজনেরা আমাকে চিরকাল বেকার রাখার অভিপ্রায়ে যে ফাঁদ পেতে রেখেছিল—আমি তাতে সর্বাংশেই পতিত হয়েছিলাম। ফলত টাকা-পয়সার ক্রাইসিস আমাকে কখনোই ছেড়ে যায় নাই। নিজের ইনকাম করা টাকা ব্যতীত সামান্যতম শখ-আহ্লাদ পূরণ করার অন্য কোনো সোর্স আমার ছিল না।

আমি যখন আমার ব্যক্তিগত জীবনে ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গিয়েছি, উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়েছি—আপা আমাকে যত্ন করে দুই হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। যেন আমি কোনো অবোধ শিশু! মায়ের উপর নির্ভর করা ছাড়া যে শিশুর আর কোনো গতান্তর নাই।


পাপড়ি, তোমার মতো মেয়ের এমন জীবন? আমি সত্যি ভাবতেও পারি না!


ক্রমাগত নেগেটিভিটি আর টক্সিসিটি প্রসেস করতে করতে আমি মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছিলাম। আমি উন্মাদের মতো এদিকসেদিক ছুটে বেরিয়েছি সামান্য সান্ত্বনা পাওয়ার আশায়। একটুখানি ছায়া পাওয়ার আশায়। আমি যে একটা  দুর্বিষহ-জীবনে কালাতিপাত করছি সেকথাও আমি অন্যদের বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না! এরকম বৈরী পরিবেশে থেকে আমি মানুষ থেকে মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছি। ছুটে গিয়েছি একটুখানি ভরসা পাওয়ার ইচ্ছায় বা শুধুমাত্র দুই-একটা মিষ্টি কথা শোনার আশায়—কিন্তু হায়! আমার সমস্ত আশার গুড়-ই কিরকিরে বালিতে পরিপূর্ণ ছিল। আমি কোথাও একজন দরদিও খুঁজে পাই নাই। কেউ আমাকে একফোঁটা সান্ত্বনাও দেয় নাই, সাহারা দূরে থাকুক। আদতে কেউ বুঝতেই পারে নাই কতটা কৌশলে আমাকে ডেস্ট্রয় করা হচ্ছিল! কতদিন তীব্র অপমান আর গ্লানিতে নিজের হাতের ভেইনে আমি অকাতরে ধারাল ছুরি চালিয়ে দিয়েছি—পথ খুঁজে পাবার আশায় আমি হয়তো আপাকে সময়-অসময়ে সেসব শেয়ারও করেছি। আপা শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে বলেছেন

পাপড়ি, তোমার মতো মেয়ের এমন জীবন? আমি সত্যি ভাবতেও পারি না!

ব্যক্তিগত মর্সিয়াতে আমি এতটাই উন্মাদগ্রস্ত ছিলাম যে, আপাকে জ্বালিয়ে একশেষ করেছি। আপাকে ফোন করলেই তখন বলতেন—

কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা না থাকলে বল। আমি কাজের কথা শুনতে চাই। কোনো ব্যক্তিগত হাহাকার আমি শুনতে চাই না।

আদতে আপাও আর সেসব শোনার মতো অবস্থায় ছিলেন না। কারণ আপাকেও সেইসব নারকীয় ঘটনাবলি হয়তো বেদনার্ত করে তুলছিল।

আপার সাথে আমার নানান অনুষ্ঠানেই দেখা হয়ে যেত। বাংলা একাডেমিতে, জাদুঘরে বা অন্য কোথাও। আপা হয়তো আমার সাজসজ্জার জৌলুসের আড়ালে ভেতরের রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত আর ভেঙেপড়া আমাকে দেখতে পেতেন। ডান হাত বাড়িয়ে আমার সাথে হ্যান্ডসেক করে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলতেন—

শোনো মেয়ে, যুদ্ধ করে টিকে থাকার নামই জীবন। যুদ্ধ করে টিকে থাকো।

কখনও বা বলতেন—

এই মেয়ে যুদ্ধ করতে শেখো। এত ভেঙে পড়লে চলবে কেন? এত নরম হলে চলবে কেন?

আমার বেহাল-অবস্থা আমি কাউকেই বোঝাতে পারতাম না। আবার আমার ওইরকম ভেঙে-পড়া-দশা কারও সাথে শেয়ার করতেও চাইতাম না। আমার পরিবারকে তো নয়ই। আব্বাকে সবকিছুই লুকিয়ে যেতে হতো। কারণ আব্বা কিছুতেই আমার এরকম উদ্ভট ও অপমানের জীবন মানতে পারতেন না। ফলত আমাকে সেজেগুজে, খামাখাই হেসে হেসে সবকিছুই আড়াল করে চলতে হতো। ভেতরে বিষের বালির স্তূপ রেখে মুখ বুজে মুক্তো ফলিয়ে যেতে হতো। কিন্তু আমার প্রখর মেধার অধিকারী ও দূরদর্শী আব্বা ঠিকই আমার অভিনয় বুঝে ফেলত। শাড়ি পরে, সেজেগুজে আমার সুখী থাকার ভান ঠিকই ধরে ফেলত আব্বা।

আমার মাথায় স্নেহের হাত রেখে বলত—

সব জায়গাতেই সাকসেসফুল, শুধু নিজের সংসারে আনসাকসেসফুল উইমেন!

আমার যে কোনো বিপর্যয়ে সেলিনা আপা আমাকে মা-পাখির মতো ডানা বিস্তার করে বাঁচাতে চেয়েছেন। অভয় দিয়েছেন। এবং আমি যে নিজের মাথা উঁচু করে চলতে চাওয়া নারী—আপা তা বুঝেছেন। ফলত আমাকে সেসব কাজই করতে দিয়েছেন, যাতে আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত না-লাগে। কতদিন এমনও হয়েছে—আমি হয়তো সারাদিন ভাতও খেতে পাই নাই। আপা ঠিকই বুঝতে পেরে বলেছেন—

পাপড়ি, ভাত খাবে? ভাত-তরকারি সবই রেডি আছে কিন্তু।

আপাকে আমার কখনো কখনো মনে হতো দেবী-অন্নপূর্ণা। একদিন আমি আর আরেকটা ছেলে সারাদিন লারা ফাউন্ডেশনে কম্পিউটারে কাজ করেছি। খাবার কিনে খাওয়ার মতো টাকাও আমার ব্যাগে নাই। ওই ছেলেটির অবস্থাও হয়তো আমার মতোই। আপা কী যে বুঝলেন কে জানে?

তখন সদ্য সন্ধ্যা উতরে গিয়েছে। দিনের আলোক রশ্মি তার শেষ ছাপ এঁকে যাচ্ছে চরাচরে। আপা আমাদের দুইজনকে ধরে জোর করে ডাইনিং চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। আমরা দুজনই চোখের জল আড়াল করতে করতে ভাত খেতে লাগলাম।


নেমকহারামি না-করা পর্যন্ত হয়তো ‘বড়-লেখক’ বা ‘স্মার্ট-লেখক’ হওয়া যায় না!


সেলিনা আপা হলেন সমস্ত অসহায় মানুষের বাবা-মা। দীনদুঃখীদের আশা-ভরসার জায়গা। আমি আপার সব অবদান পই-পই করে স্মরণে রাখার চেষ্টা করেছি। বড় গাছের আশ্রয়ে থাকা ছোট গাছও জল-হাওয়া পেয়ে ধীরে ধীরে একদিন বড় হয়। সে নিজেও হয়তো একদিন আরেকটা বনস্পতি হয়ে ওঠে, কিন্তু বড় গাছেদের ছায়ামায়া ভুলে গিয়ে তাঁর সঙ্গে গাদ্দারি করতে হবে—এমন শিক্ষায় আমি কোনোদিন শিক্ষিত হই নাই। কারণ আমি জানি, যে গাছে যত ফল ধরে সে ততটাই মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর যে যত বড় মানুষ তাকে ততোটাই বিনয়ী হতে হয়। আজ ভি জামানা খারাপ হো গ্যায়া—বড়দের সাথে বেয়াদবি না করে, সাহারাদাতার সাথে নেমকহারামি না-করা পর্যন্ত হয়তো ‘বড়-লেখক’ বা ‘স্মার্ট-লেখক’ হওয়া যায় না!

সেলিনা আপার সাথে আমার শত-সহস্র মূল্যবান স্মৃতি জমা হয়ে আছে জাদুকর সময়ের আশ্চর্য থলেতে। এক বানভাসী, প্রান্তিক-লেখকের জন্য আপা যথাসাধ্য করেছেন। বিনিময়ে আমি আপাকে কিছুই দিতে পারি নাই। আপা আমার কাছ থেকে কিছু নেয়ার জন্য কোনোদিন লালায়িতও হন নাই। আর আমি অতি-ক্ষুদ্র, নগণ্য-তৃণমূ্ল এক লেখক, একবিন্দু শিশিরের মতন যার কোনোরকমে বেঁচে থাকা—ওই বিস্তীর্ণ জলনিধিকে সে কী দেবে?

Thousands of candles can be lighted from a single candle, and the life of the candle will not be shortened. Happiness never decreases by being shared.  [Buddha


পরবর্তী পর্ব আগামী বুধবার

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা