নরকের সহস্র তোরণ : ২০

পর্ব-১৯

পর্ব-২০

ও মন শিক্ষা লও অন্তর

‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা আছে দেহকাণ্ডে।’

লালনের যুগে বিজ্ঞান ছিল বালক। তথাকথিত অর্থে লালন নিজেও বিজ্ঞানের কতটুকু জানতেন জানি না। কিন্তু তাঁর মরমি হৃদয় ছিল বিজ্ঞানমনস্ক। বস্তুজ্ঞানের জিজ্ঞাসু চেতনা নিউটনের মতো মানব জমিনের সব কার্যকারণ বিশ্লেষণে তাঁকে নিরন্তন ছুটিয়েছে। তিনি হৃদয়ের আতশিকাচ দিয়ে বস্তুর ভিতর-বাহিরের সবটা দেখতে পেতেন। লালনের এই দর্শন আজ বিজ্ঞান দিয়ে খুব সহজেই প্রমাণ করা যায়। মানব দেহের শুধু সবগুলো স্নায়ুকোষ একটা একটা করে জোড়া দিলে দৈর্ঘ্যে পৃথিবীর পরিধির সমান হয়। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ কে না-জানে, মানব দেহের একেকটি স্নায়ুকোষ নিজেই একেকটি পৃথিবী। তারপর ধর রক্তকোষ, দেহকোষ...

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, কনক তুমি অনেক কিছু না-জেনেও হৃদয়ের হাহাকার থেকে ব্রহ্মাণ্ডের সুর শুনতে পেয়েছ।

আপনি পারলেন না কেন?

দুনিয়ার সব ফুলে ফল হয় না। তাই আমি প্রেমের মধু না পেয়ে পেলাম বিষ।

আমিও মেনে নিয়েছি, দুনিয়ার সব পথ শুধু ঘরের দিকে নয়, কারো কারো জন্য বাহিরের দিকেও। তাই আপনাকে জোড় হাতে মিনতি করছি আর কোনোদিন আমার সামনে আসবেন না।


দুঃখী, পাপী-তাপী, লোভী, ভোগী হাজারো মানুষের মেলা। ঘুরে-ফিরে সবার চাওয়া একটাই। সুখ।


কনকের ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে সে বুঝতেই পারে না কোথায় আছে? তারপর সব একে একে মনে পড়ে। পাশের সেই সাধুজনেরাও নাই। সামনে পুকুরের কালো কালো গজার মাছ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পাখনা নাড়ছে তবু সে যেন মেজরের গলাটা আবার শুনতে পায়।

‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা আছে দেহকাণ্ডে।’

দুপুর পেরিয়ে গেছে। কোমরের পেছনে ব্যাগটা রেখে, দেয়ালে হেলান দিয়ে সে এত লম্বা একটা ঘুম দিয়ে দিল! ব্যাগটা হাতে নিয়ে কনক ওঠে পড়ে। শরীরটা বেশ লাগছে। তার জন্য এই ঘুমটা খুব জরুরি ছিল। পুকুর পাড়, ঝরনার পাড়, সামনের চাতাল মানুষে গিজগিজ করছে। যার দিকেই চোখ পড়ে কনক তার মুখটা দেখে, চোখ দুইটা দেখে, ভুরু আর কুঁচকানো কপাল দেখে দেখে মনটা পড়তে চেষ্টা করে। দুঃখী, পাপী-তাপী, লোভী, ভোগী হাজারো মানুষের মেলা। ঘুরে-ফিরে সবার চাওয়া একটাই। সুখ। দুনিয়াতে কোনো কালে মানুষ কি সুখী ছিল? কী পেলে মানুষ সুখী হয়?

ছাতক পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা নামে। সুরমা নদীর বুকে আলো-ছায়ার তরঙ্গ। দূরে নীল পাহাড়ের বিষণ্ন-গম্ভীর বুক। বান্ধবদেরকে পাওয়া গেল রিকশা-গ্যারেজেই। তার কায়া দেখে মায়ার মানুষ আমজদ ছুটে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে, দূরবীন শাহ কৈয়া গ্যাছুইন, ভাবের দুনিয়ায় বোধ না থাকলে ভাব হয় না। আইয়োক্কা আমার ভাবের বন্ধু।

মাটির সংসারে ধূলাবালির লীলা দেখতে হলে চোখ থাকতে হয়। আমাদের হৃদয়ের সেই চোখ কই বন্ধু?

বলতে বলতে কনক প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে। ঘরটা রিকশার বাতিল টায়ার-টিউব আর যন্ত্রপাতিতে ঠাঁসা। কোনার দিকে একটা টেবিল। পাশেই একটা নড়বড়ে চৌকির উপর বিছানা। টিনের বেড়ার পিছনেই বেগবান সুরমা কলকল করে বইছে। কনক একটু সময় কান পেতে নদীর হৃদয়ের গান শুনে। তারপর ভাবে, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা সবাই আপন আপন গতিতে তার মূলের দিকে ধাবমান। নদী-সমুদ্র, মানব দেহের শ্বাস ও রক্ত সব, সবখানে কেন্দ্রাতিক বেগের লীলা। তাই হয়তো সাইজি বলেছেন, ‘ক্ষেপারে তুই মূল হারালে সব হারাবি।’

সকাল দশটার দিকে কনকরা বেরিয়ে পড়ে। নদী পেরিয়ে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ডান দিকের হাঁটাপথ। দু’পাশে টিলাটালা, সবুজ ঘাসে ঢাকা উপত্যকার মতো উঁচু ভূমি। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর তারা বাঁ দিকে সবুজ ঘাসে ঢাকা একটা চওড়া চাতালে নেমে পড়ে। খুব নিরিবিলি এলাকা। লোকজন নাই বললেই চলে। দুই পাশে অনুচ্চ-পাহাড়ের সারি। ফাঁকে ফাঁকে একটা-দুইটা মাটির ঘর। ঘরের মাটির দেয়াল, উঠান, বাড়ির আশপাশ একদম ঝকঝকে পরিষ্কার। লাউ-শিমের মাচা, কলা গাছের ঝোপ। উঠানের একপাশে গন্ধরাজ কিংবা জবা ফুলের একটা-দুইটা গাছ, হাঁটার মাঝেই কনকের নজর কাড়ে। গ্রাম বাংলার সাধারণ বাড়িগুলোর সাথে কোথায় জানি এদের একটা ফারাক আছে। পাহাড়ের গোড়ায় বলে? খুব পরিচ্ছন্ন আর নির্জন বলে?

আগেও কনক কয়েকবার আমজদদের সাথে এদিকটায় এসেছে। গোটা পাহাড়ি তল্লাটটা সরকারি খাস জমি। বসতিরা চৌদ্দ আনাই ভিনদেশি মানুষ। অধিকাংশই পাথর শ্রমিক। কেউ কেউ রোজ রোজ শহরে গিয়ে রিকশা চালায়। এরা প্রচলিত ধর্মের ভাবধারায় চলে না। সকলেরই মুর্শিদ আছে। ঠিক সরাসরি মুর্শিদ না। কারণ সিলেট-সুনামগঞ্জের বড় বড় মহাজনেরা অনেক আগেই দেহান্তরিত। কিন্তু তাদের ভাবের কথা এই অশিক্ষিত, দীনহীন মানুষগুলোর মরমে এখনো ভাব জাগায়। সংসারের শতেক জ্বালার মাঝেও সেই ভাবের গানে শান্তি পায়, একটু হলেও পথের দিশা পায়। অধিকাংশই শাহ আব্দুল করিমের, কেউ কেউ দূরবীন শাহ’র ভক্ত। উদাসীরও দুই-চাইর ঘর শিষ্য আছে। চারপাশের প্রকৃতির অফুরন্ত বৈভবের মাঝে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোও শ্বাসে-বিশ্বাসে, মরমে-মমতায় প্রকৃতির মতোই।

একটা বাড়ির কাছে এসে আমজদ জোরে হাঁক মারে, কোয়াই (কোথাই) বা মদরিছ?

একটু পরেই মাটি আর ছনবন দিয়ে গড়া পাখির বাসা বাসা টাইপ বাড়িটা থেকে উত্তর আসে, আমজদ ভাই নি। উবায়া (দাঁড়িয়ে) রইছ ক্যা বাড়িত আইয়ো।

বাঁশ-বেতের ছোট্ট দরজা খুলে একজন বেরিয়ে আসে। কালো আর ছোটখাটো গতরের মানুষটার মুখ ভরা নীরব হাসি দেখেই তার সুখী, সরল জীবনের ছাঁচটা কনকের চোখে ধরা পড়ে। লগে দ্যাহি মেমান, আইয়ো আইয়ো, ভিত্তে আইয়ো।

ছনবনের ছোট্ট ঘরটার ছোট্টতর রুমটাতে কোনো আসবাব নাই। তাই অহংকার কিংবা আধুনিকতার বদ গন্ধও নাই। কাঁচা মাটি দিয়ে লেপা রুমটাতে তৃপ্তির নিশ্বাসের মতো শুধু আরাম! শুধু শান্তি!

দেয়ালের পাশ থেকে এনে বাঁশের চাটাইটা বিছিয়ে দেওয়া হয়। কনকরা সব আসন ভিড়িয়ে বসে। মানুষটা হাসি হাসি মুখেই ঘরের ভেতরের মানুষটাকে বলে, পানি দিয়ো।

একটু পরেই দরজার আড়াল থেকে রোগা রোগা কালো একটা হাত প্লাস্টিকের জগ-গ্লাস এগিয়ে দেয়। ঘরের কোনাকানা থেকে ছিলিমের নানান সরঞ্জাম নিয়ে মদরিছ বসে। তারপর গুনগুনিয়ে গাইতে থাকে :

‘কীকব ভাই পরাণ কথা বলিও না যথা-তথা দেলকোরানের আসল কথা...। আমজদ : নতুন বানছনি বা?

মদরিছ : আমি বানবার ক্যাডা, মুর্শিদের ইচ্ছা, অহনও গানটা শেষ করতে পারতাছি না। এক দিকে ভাবে টানে আরেক দিকে বউ-বাচ্চা। সংসার খুব কঠিন জিনিস।

নিপুণ হাতে ছিলিম রেডি হয়ে আসে। মদরিছ আমজদের দিকে এগিয়ে দেয়, সেবা লও বা।

আমজদ : তোমার গুরু আছে বা। আমরা গুরুহীন গরু।

লম্বা লম্বা টানে আশেকের হৃদয়ে মাশুক ঘন হয়। আলই চুপচাপ ছিল। চুপচাপ থাকলেই বুঝি ভালো হতো। কারণ সে-ও প্রায় সব হারানো মানুষ। পিয়ন বাবার পেনশনের সামান্য কয়টা টাকা ছিল তাদের পরিবারের শেষ সম্বল। পাথর ব্যবসার নামে সব হারিয়ে এখন চাখানায় দিনমান গতর খাটায়। সে-ই মালিক, সে-ই বাবুর্চি, সে-ই চা-বয়। তাই মাঝে মাঝে তার ভবনদীতে উথাল-পাথাল ঢেউ উঠে। তখন নিজেকে নিয়ে নানান রং-তামশার পদ রচনা করে। হাস্য-পরিহাসের ছলে নিজেকে তিরস্কার করে।

মদরিছের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার তারা হাঁটতে থাকে। সূর্য ঠিক মাথার উপরে। দুইপাশে সারি সারি পাহাড়। পাহাড়ের শরীর লতা-গুল্ম-ঝোপে ঢাকা। মাঝে-মধ্যে একটা-দুইটা বড় গাছ মানুষের মতো হাত বাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝখানে ফুটবল মাঠের মতো চাওড়া আর কয়েক মাইল লম্বা তুলতুলে-পুরু সবুজ ঘাসে ঢাকা গালিচার মতো এক চাতাল। খুব ছোট ছোট দুই-একটা ঘর নিয়ে পাতলা পাতলা বাড়ি। তা-ও লতা-পাতা কলাগাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে চায়। শুধু সবুজ। শুধু নির্জনতা। ডান দিকের একটা বাড়ির সামনে তরুণ মেহগনি গাছের নিচে ঘন ছায়া। সেখানে বাঁশের চাটাই পেতে বসে আছে উদাসী। এর আগে আরো দুইবার কনকের সাথে দেখা হয়েছে। কালো আর দোহারা গড়নের শক্ত-সামর্থ্য মানুষ। কামনা-বাসনাহীন ঘোলা ঘোলা চোখ দুইটাতে ভাণ্ড আর ব্রহ্মাণ্ডের সার কথা ঘুষঘুষি জ্বলছে; সুন্নত বাবরি আর দাড়ির সাদা জমিনে প্রজ্ঞার ছাপ। উদাসী তাদেরকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। হাত মিলামিলি হয়। তারপর চাটাইয়ে গোল হয়ে বসা। বাড়ির মাঝ বয়সী মানুষটা এসে হাসি হাসি মুখে কনকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, লোহার রডের মতো আঙুলগুলোর হালকা চাপ পাথর শ্রমিক মানুষটার বস্তুজীবনের অনেকখানিই কনকের কাছে বলে দেয়। দুই সারি পাহাড়ের মাঝে রোদে ঝকঝক করছে আসমানের নীল। উত্তর থেকে লিল্লিড় করে আসছে ঠান্ডা বাতাস। বাড়ির ভিতর থেকে জগ-গ্লাসে করে পানি আসে। পাহাড়ের গভীর থেকে টিউবওয়েলে টেনে তোলা পানি। তাই গ্লাসের গায়ে বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা।


অন্ধের মতো বিশ্বাস করাটাই কি আল্লাহ! অন্ধের মতো কতকগুলা কানুন মেনে চলাই কি ধর্ম!


কনক : যতটা জানি, আপনি মাদরাসার ছাত্র ছিলেন। তো গান লিখতে শুরু করলেন কেন?

দাড়ি-গোঁফের আড়াল থেকে উদাসী নিঃশব্দে হাসল। সেই হাসি রহস্যের না বিদ্রূপের? সংসার ছিল। সন্তানও ছিল। একে একে তিন সন্তানের অকাল মৃত্যু হলো। অকালে স্ত্রী গেল। এখন একমাত্র কিশোর পুত্রকে নিয়ে বৈষ্ণব সাধক রাধারমণের ভিটার পাশেই ছয়শ টাকা ভাড়ায় একটা রুমে থাকে। ছেলেটা রিকশা চালায়। তাই বাইরে বাইরেই কাটে তার। রান্না-বান্নায় নানান ঝক্কি। তাই পাশের বাজারে গিয়ে একটা চা আর একটা শুকনা রুটিতে কাটে তার দিনের পর দিন। আয়-রোজগার নাই বললেই চলে। মানুষের তো বুক নাই, চোখ নাই। তাই তীক্ষ্ণদৃষ্টির ভোগী মানুষ আড়ালে-আবডালে রসিকতা করে উদাসীকে বলে, উপাসী।

উদাসী : আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কত আর বয়স। খুব বেশি হলে বারো-তেরো। আমাদের ক্লাসে একটা উর্দু কিতাব ছিল ‘তালিমুল ইসলাম।’ সেখানে একটা প্রশ্ন ছিল, ওয়াজিবুল ওজুদ ক্যায়া মানা হে? ওয়াজিবুল ওজুদ কিসকো কাহ্তে হে?

অর্থাৎ ওয়াজিবুল ওজুদ কী এবং কাকে বলে?

উত্তর : যা নিজে নিজে সৃষ্টি হয়েছে তাই ওয়াজিবুল ওজুদ। ইসলাম এইটাই শিক্ষা দিতেছে যে, আল্লাহ ওয়াজিবুল ওজুদ।

চারপাশে যা কিছু নতুন দেখি, শুনি তার বিষয়ে মনে নানান জাতের প্রশ্ন আনাগোনা করে। তাই আমার মনে এক জিজ্ঞাসা, আল্লা নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়েছে? তার কোনো বাপ-ভাই নাই, স্বজন নাই! দিনটা শুক্রবার। ভাবতে ভাবতে মাদরাসার মসজিদে গেলাম জুম্মার নামাজ আদায়ে। সবাই ঘাটে ওজু করছে। আমাদের মাদরাসার মোহতামিমও ওজু করছেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, হুঁজুর, এই যে তালিমুল ইসলামে একটা কথা আইছে, ওয়াজিবুল ওজুদ। এইটা আমার কাছে যেমন...।

হুজুর চিৎকার দিয়ে উঠলেন, এই, তোমারে এইরকম কথা কে শিখাইছে? তোমার উপর তওবা লাজিম।

আমার উপর তওবা লাজিম? কিন্তু আমি তো জানতে চাইছি আল্লাহ সম্বন্ধে, তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে। আল্লাকে জানতে চাইলেই তওবা লাজিম হয়ে যায়? তবে অন্ধের মতো বিশ্বাস করাটাই কি আল্লাহ! অন্ধের মতো কতকগুলা কানুন মেনে চলাই কি ধর্ম! কোন যুক্তিতে এইটাকে শিক্ষা বলা যায়? শিক্ষা তো আলো।

মাদরাসায় আর গেলাম না। মা-ও ঘোষণা দিলেন, মাদরাসায় না গেলে ভাত পাইবে না।

বুক ভরা অভিমান নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অজানাকে সন্ধানের ইচ্ছা। ‘মান আরাফা নাফছাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু। অর্থাৎ যে নিজেকে চিনেছে, সে তার খোদাকে চিনেছে। কিংবা আরেকটু এগিয়ে বললে, যা আছে ভাণ্ডে, তা-ই ব্রহ্মাণ্ডে। শুনেছি সক্রেটিসও নাকি বলতেন, ‘নিজেকে চিন।’ বাউল ধর্মও নিজেকে চিনে নেওয়ার ধর্ম। সারাজীবন সে এই সাধনাই করে। শাহ ছাবাল আলী বলে গেছেন, ‘অলীরে ডংসিল নাগে ওঝা নাই নগরে, ও মন শিক্ষা লও অন্তর।

উদাসী থামলেন। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। তাই পাহাড়ের ছায়া মায়া হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। দিন-রাত, সকাল-দুপুর পলে পলে স্রষ্টা তার সৃষ্টির অঙ্গে অঙ্গে নানান রঙ্গে দেখা দেয়। দেখার চোখ যার আছে সে দেখে। উদাসী আসন ভিড়িয়ে বসে ছিলেন। মাথা সোজা করে বুক ভরে দম নিলেন। ডুবো ডুবো সুরুজ, আসছে আসছে রাত। বিশ্ব সংসারের এই ব্রহ্ম মুহূর্তটা কি উদাসী চোখ বন্ধ করে ধরতে চাইছেন? কনকেরও কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। তাই সে পাহাড়ের ঢালের সবুজ ঘাসে শরীর এলিয়ে দেয়। চোখের সামনে শুধু অসীম শূন্যতা। সবাই চুপচাপ। সবাই ভবসিন্ধুর বুকে ভাবের তরী ভাসিয়ে দিতে চাইছে।

ছিলিম রেডি হয়ে গেলে রসুল নামের শিষ্যটি তার দীক্ষাগুরুর সামনে কলকিটা ধরে বিনয়ের সুরে বলে, বাবাজি সেবা নেইন।

পাহাড়, গাছ, লাতা-পাতা আর সবুজ ঘাসের এই নিবিড় জগতে প্রকৃতির প্রভাব খুব সহজেই মানুষের স্বভাবে পড়ে। তাই অনেকটা নীরবেই কলকি বারবার হাত বদল হতে থাকে। শেষ দমে তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে উদাসী আবার বলতে শুরু করেন, ইমাম গাজ্জালি তাঁর ‘ইয়াহিয়া উলুম ফিদ্দিন’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, ‘তাফাক্কুরু সায়াতিন’ খাইরুন মিন-ইবাদিতি সিত্তিনা সানাতিন।’ অর্থাৎ স্রষ্টার সৃষ্টিকে যে এক পলক ভাবে তার সত্তর বছর নফল এবাদতের সমান নেক হয়। এই যে পাহাড়ের শীতল ছায়া, এর মধ্যে দ্যায়া আমরা কী স্রষ্টার পরশ পাই না? যে আত্মার এই পরশ অনুভব করার ক্ষমতা আছে তাকে পরমাত্মা বলে। আত্মা পাঁচটি। তার মধ্যে পরমাত্মা প্রবল। পরমাত্মাই পরমঈশ্বর। ইকবাল তার ক্ষুদি দর্শনে বলেছেন, আত্মাই আল্লাহ। এবং আল্লাহকে পাওয়ার মূল ক্ষেত্রই আত্মা। সুরা যারিয়ত’র ২১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘ওয়াফি আনফুসিকুম আ’ফালা তুবসিরুন।’

‘আমি তোমাদের আত্মার মাঝেই বিরাজমান তা কি তোমরা দেখ না?’

প্লাস্টিকের কাপে করে ফিকা চা আর চিনির প্রলেপ জড়ানো টোস্ট আসে। চায়ের কাপে ভিজিয়ে সবাই মুখে দেয়। আলই টুস্ট না ভিজিয়েই কড়মড় করে চিবায়। কেউ কেউ একদমে একগ্লাস পানি খেয়ে তৃপ্তির শ্বাস ছাড়ে। উদাসী সিগারেট ধরিয়ে টান দেয়।

কনক : নামাজ বিষয়ে কিছু বলবেন কি?

উদাসী : উত্তর-দক্ষিণ-পুব-পশ্চিম যে দিকেই যাই খালি নামাজের তাগিদ। নামাজ! নামাজ! নামাজ কায়েম করো। নামাজের এত চাপ যে তা সহ্য করতে না পেরে কেউ কেউ বাস-ট্রাক-রিকশার বডিতেও লিখে রাখে, ‘নামাজ কায়েম করুন।’

আরে বেটা, নামাজ ত কায়েম করমুই। তার আগে খুঁজে দ্যাখ না নামাজ শব্দটা কী? নামাজ শব্দটা ফার্সি। যার অর্থ সালাত। আরবি এই সালাত শব্দের অর্থ চারটা : ১. দোয়া। ২. তাসবিহ। ৩. রহমত। ৪. ইসতিগফার। খালি অঙ্গ সঞ্চালন আর তিলাওয়াতেই নামাজ না। নামাজের সাথে কায়েম কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কায়েম অর্থ : সুদৃঢ়, স্থায়ী, মজবুদ, পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত। তার মানে নামাজের মধ্যেই সৃষ্টি আর স্রষ্টা, পরমাত্মা আর পরমঈশ্বরের মিলন ঘটে। শুধু অঙ্গভঙ্গিতেই না। মননে, মগজে, মজ্জায় নামাজকে ধারন করতে হয়।

উদাসী গভীর নিশ্বাস ছেড়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। কনক দেখেছে কথা বলতে বলতে রেগে গেলে উদাসী ভাই সিলেটি বুলির দিকে ঝুঁকে পড়ে। আবার কখনো ভাবের গভীরে যেতে যেতে তার গলার স্বর অন্যরকম মাত্রা পায়, ভাষা তার অজান্তেই বদলে যেতে যেতে মান ভাষার দিকে হাত বাড়ায়।

কনক : আমাদের মাঝে একটা সহজ প্রচার আছে, ইসলামে গান নিষেধ। আপনার মতামত কী?

উদাসী : গান পাপের কাজ কিন্তু কোন গান?

১. যে গান শুনলে মানুষের কাম জাগে। ২. কাউরে উদ্দেশ্য করে গান গাওয়া হারাম। ৩. বিনা ওজুতে গান গাওয়া মুকরো’এ তাহরিমা। ৪. বিয়ের গান, ঈদের গান, দেশাত্মবোধক গান মুস্তাহাব। ৫. নিজের আত্মশুদ্ধি ও খোদার সন্তুষ্টির জন্য গান গাইতে হয় বিতিরের নামাজের পর।

অথচ হুজুররা এই এক হাদিসের দোহাই দিয়ে কীটনাশ ছিটিয়ে ভালো-মন্দ সব গান মেরে ফেলতে চায়।

কনক : কেন আপনি আঞ্চলিক ভাষায় গান লিখেন?

উদাসী : আমি হাওরবাসীর ভাষা তুলে নিছি। আমি ত হাসন রাজা না। করিম ভাই না। আমি ত নিজে আমি।

কনক : একটা সময় ছিল যখন সুনামগঞ্জ মানে বড় বড় পদককর্তা, বড় বড় মহাজন। এর-ই ধারাবাহিকতায় আজকের তরুণ বাউলদের ব্যাপারে আপনার আশাবাদ কী?

উদাসী : এরা ত বাউল গান গায়। তাই এরা বাউল শিল্পী। বাউল একটা ভাব। ভাবের সাধনা থেকেই সে বাউল রূপ নেয়। এই সাধনা সংসার সহ্য করতে পারে না। তখন সে পথে নামে। গুরুর সন্ধান করে। শেষ পর্যন্ত সে গানের মধ্যে আল্লাহরে খোঁজে। সে যে কথাটা গানে বাঁধে সেই কথা হাজার হাজার মানুষের মনে কথা হয়ে যায়। কারণ বাউল জানে, মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাকে ভালোবাসা হয়। মানুষ ছাড়া আল্লাহর কোনো দলিল নাই।

কনক : তাহলে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক ধর্ম কতটা জরুরি?

উদাসী : ধর্ম ত খালি ফেতনা-ফ্যাসাদ। বাউলদের কোনো সম্প্রদায় নাই। সাম্প্রদায়িকতায় বাউলরা ঘৃণা বোধ করে।

কনক : সিদ্দি কি বাউল সাধনার অনুষঙ্গ?

উদাসী : সিদ্দি মানে সাধন সিদ্দি। যারা সাধনা করে তাদের জন্য সিদ্দি। না হলে ত এইটা গাঞ্জা। (হাসি)

কনক : মরলে পরে আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে বেহেস্ত দিবে, হুর-গেলমান দিবে। এই বিষয়ে বাউলরা কী ভাবে?

উদাসী : এই কথা যদি বলি তবে সবাই আমাকে নাস্তিক বলবে। এই দুনিয়াতেই সব। সবকিছু আল্লাহর বিধানেই হয়। আজ সিংহাসনে, কাল কারাগারে। মানুষের চোখ যদি থাকত, স্রষ্টা আর তার সৃষ্টির লীলা যদি এক পলক বুঝবার চাইত তাহলে দেশে এত দারোগা-পুলিশের দরকার পড়ত না।


সাধনা কই? সাধনা ছাড়া কি বাউল হওয়া যায়?


কনক : পরকাল?

উদাসী : পরকাল পরের কথা। সবকিছুই হে (উপরে আঙুল তুলে আল্লাহকে বুঝায়) কৈরা যায়। ছিল গরিব। চুরি-চামারি করে কিছু পয়সা হইল, ঘুম বাড়ল, খাওয়া বাড়ল, পেট-পাছায়, ঘাড়ে-গর্দনায় খুব সুখ! সুখ! সাইনবোর্ড হইল। তারপর চল্লিশ হইবার আগেই ডায়াবেটিস, হার্টব্লক, কিডনি দুইটা অচল, টাকার গরমে ছেলেটা ভোম ভোম হোন্ডা চাইলাইতে যাইয়া ট্রাকের নিচে। আর পরকাল লাগে? আমি এইটা ভাবি না। আমি আমারে নিয়া ভাবি। আমি ত আমারে দেখছি। (চোখ টলমল করে।)

কনক : আগের কথায় আবার ফিরতে হয়, সুনামগঞ্জের আজকের তরুণ বাউলদের সমস্যাটা কী?

উদাসী : মিডিয়া! মিডিয়া! (মিডিয়া মিডিয়া করে তিনি যেন কাতরে ওঠেন)। আগে বাউলরা থাকছে আড়ালে। কষ্ট করছে। সাধনা করছে। জানার জন্য, সাধনার জন্য দেশের এক প্রান্ত থাইকা আরেক প্রান্তে গেছে। এখন ত ঘরে বইসাই সব। সাধনা কই? সাধনা ছাড়া কি বাউল হওয়া যায়?

কনক : সুনামগঞ্জের কালো, পিচ্ছিল মাটিতে তো এইসব ছিল না!

উদাসী : ফালাওক্কা (ফেলে দেন)। নয় বছর অইছে কোনো কসাইখানাৎ (হাসপাতাল) গেছি না। একটা ট্যাবলেট খাইছি না। সব আমার হে (আল্লাহ) দ্যাখব। আমার দশ টাকা লাগলে, দশ টাকা চাইয়াম। বিশ চাইতাম না। দুই বার সরকার বাড়ি দিবার চাইছে। নিছি না। বাড়ি কি কেউর লগে গ্যাছে?

‘আনন্দে স্বর্গ বাস, নিরানন্দে নরক বাস।’

কনক : এখন সময় কাটে কী করে?

উদাসী তার দরদি গলায় যেন জীবনের শেষ গান গেয়ে ওঠে :

‘জীবন ভরা গান গাইলাম, বাকি রইল আমার গান, গা রে পাখি— নিজেই গা নিজের গান।’ (এই গানটা পরে উদাসী ভাই নতুন ভাবে লিখেছেন)

কনক : সবশেষ কী লিখলেন?

উদাসী : ‘কোন সন্ধানে করিল ভুরুঙ্গা (বাতরের গর্ত) জমিনের পানি ফুরাইল, লাগছে অহন ব্যাঙ্গা। (ঝামেলা) কাঁকড়ারে মারিবার লাগি তুকাই (খুঁজি) লাঠি ঠ্যাঙ্গা। কত মাছ ভাসিয়া গ্যালো, পাইলাম না রুঙ্গা। (মাছ ধরার ফাঁদ) মকদ্দস কয় মরুভূমি হইল আমার গঙ্গা। পিপাসায় বুক শুকাইল কপাল আমার ভাঙ্গা।


পর্ব-২১
শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা