নরকের সহস্র তোরণ : শেষ পর্ব

পর্ব-২৪

শেষ পর্ব

জনমের স্বাদ

পুলশের গাড়িটা একটানে এসে থানার সামনে দাঁড়ায়। আসামি দুই জনকে টেনে-হিঁচড়ে নামানো হয়। ড্রাইভিং সিটের পাশ থেকে প্রজাতন্ত্রের পোশাকধারী সেই লোকটা নেমে এসে কনকের সামনে দাঁড়ায়, কত টাকা রফা করে এই জিনিস ভাড়া করছত?

কনক আবার গর্জে ওঠে, মুখ খারাপ করবে না।

ঠাস করে পঞ্চাশ কেজি ওজনের একটা থাপ্পড় পড়ে কনকের গালে। তারপর টানতে টানতে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় থানা-ভবনের ভিতরে। তিনদিকেই অফিস কক্ষ। এক পাশে লোহার গ্রিল-ঘেরা লকার। খাঁচাটা অপরাধীতে ঠাঁসা। ইয়াবাখেকু, মাদক কারবারি আর দুই জন নারী। সম্ভবত ওরা দেহপসারিণী। কর্তা পুলিশটা এসে আভার সামনে দাঁড়ায়, এই খানকি, তর নাম কী? আগে ত এই শহরে দেখছি না।

এর মাঝেই আভার সমস্ত বোধ শক্তি লুপ্ত হয়ে গেছে। এইসব শব্দকে সে চিরজীবন ঘৃণা করে এসেছে। এইসব শব্দের বিরুদ্ধেই তার জেহাদ। একজন বিবেকবান শিক্ষক হিসাবে, একজন হৃদয়বান মানুষ হিসাবে জীবনের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার যে ভূমিতে সে তার স্বপ্নগুলো এতকাল লালন করে এসেছে, আজ সন্ধ্যা থেকে জীবনের যে-রূপ সে দেখেছে তারপর আর কার বাঁচার সাধ থাকে? তাই আভা আর কথা বলার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না।


আভা কনককে আরো জোরে বুকের সাথে চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে ওঠে, আমাদেরকে হত্যা কর, খুন কর নরপিচাশের দল!


ওরা সব লোভী কুকুরের চোখে আভার দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো উত্তর না পেয়ে কর্তার কাছ থেকে হুকুম আসে, মাদারচুদটাকে লকারে ঢুকায়া, মাগগিটারে লইয়া।

একজন কনকে সামনের দিকে ধাক্কা মারে, চল শালা।

কনক পাথরের পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দেখে আরেকজন হাতের রুল দিয়ে কনকের বুকে জোরে ধাক্কা মারে, যাস না শালা। চুদানি খেলতে যাবে না?

কনক আভার হাতটা প্রাণপণ শক্তিতে চেপে ধরে দাঁড়িয়েই আছে দেখে দুই জন দুই জন করে দুই দিকে আভাকে আর কনককে টানতে শুরু করে। চার জন কনস্টেবল টেনে-হিঁচড়ে ওদেরকে কাস্টরির সামনে নিয়ে আসে তবু কনক আভার হাত ছাড়ে না। এই দেখে সেই কর্তাটি হাতে একটা মোটা রুল নিয়ে এসে যে হাতে কনক আভাকে ধরে রেখেছে, সেই হাতটায় জোরে জোরে পিটাতে থাকে। তবু কনক আভার হাতটা ছাড়ে না। যে-হৃদয়ে মানুষের জন্য পবিত্র ভালোবাসার সুগন্ধ আছে, যে-মানুষকে লালন বলেছেন ‘যে মুর্শিদ সে-ই ত খোদা’, মাটির যে-পিঞ্জিরায় পরমাত্মার বাস, যেখানে পরমাত্মা আর পরমেশ্বরে নিত নিত খেলা চলে সেই দেহে কুুৎসিত কয়টা জন্তুর আঘাতে কী হয়? ওরা কনকের হাতে পিটাতেই থাকে। হাতের হাড়ে রুলের আঘাত লেগে শব্দ উঠছে ঠাস! ঠাস! এক, দুই, তিন বারের সাথে সাথে আভা কনকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। সাথে সাথে রুলের শেষ আঘাতটা গুপ্পুত শব্দে আভার কোমরে পড়ে। আভা কনককে আরো জোরে বুকের সাথে চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে ওঠে, আমাদেরকে হত্যা কর, খুন কর নরপিচাশের দল!

ওরা অবাক! স্তম্ভিত! থানা ইনচার্জ পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। এবার সে এগিয়ে আসে, ওদেরকে আমার পাশের রুমে আটকে রাখ।

সেই কর্তাটি বিড় বিড় করে, জিনিসটা বুঝলাম না। এইডা দ্যাহি লাইলি-মজনু!

আসামি নামক চিকা-ইঁদুর ধরা পড়েছে অনেক। তাই রাত একটু বাড়তেই থানাতে মানুষ নামক বিড়ালদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। প্রথমেই আসে দেহপসারিণী ও তাদের খদ্দেরদের প্রতিপালক। ইনচার্জের রুম থেকে দড় কষাকষি, কাকুতি-মিনুতির শব্দ ভেসে আসে। তারপর লকারের তালা-শিকলের ঝনঝনানি। তারপর সব চুপচাপ। একটু পরেই সিগারেট টানতে টানতে ইনচার্জ আভাদের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। কনক রুমের দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝে বসে আছে। চোখ দুইটা ছাদের দিকে। পাশে বসে আভা কনকের আহত হাতটায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রুলের আঘাতে আঘাতে তার হাতটা ফুলে বাচ্চাদের বালিশ। জানালার পাশে পায়ের শব্দে আভা মুখ ফেরায়। তার দুই চোখ থেকে গাল, থুতনি বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ইনচার্জকে দেখে আভা মুখ ফিরিয়ে নেয়। লোকটা জানালার সামনে থেকে গলা খাকারি দিয়ে বলে, আপনাদের অভিভাবকদের নাম্বারটা দেন তো।

কনক ঘিন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। আভা উঠে দাঁড়ায়, আমাদের কোনো অভিভাবক নাই।

বাপ-ভাই নাই?

না।

বেজন্মা নাকি রে বাবা! বলতে বলতে লোকটা জানালা থেকে সরে যায়।

একটু পরেই তিনটা হোন্ডা আর একটা চকচকে কালো নোয়া গাড়ি এসে থানার সামনে দাঁড়ায়। একটা পুলিশ ছুটতে ছুটতে এসে ইনচার্জের ঘরে ঢুকে, লিডার আইতাছে স্যার!

তার গলার আতঙ্ক দুই দেওয়াল পেরিয়ে এসে আভাদের কানে লাগে। একটু পরেই হুড়মুড় করে কারা যেন আসতে থাকে। যারা আসছে তাদের মধ্যে একজন চরম অসন্তোষে খিস্তি ঝারছে, মাদারচুদের কত সাহস? আমার মানুষ ধরে নিয়ে আসে!

ইনচার্জ পায়ের শব্দ শুনেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। এবার লিডার তার রুমে ঢুকতেই কপালে হাত তুলে সালাম দেয়।

মাদারচুদ তর সালাম রাখ। আমার মানুষ কৈ?

জি স্যার, আপনি বললে তো ছাড়বই। কিন্তু পাঁচ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেটসহ তাদের ছবি তুলেছে সাংবাদিকরা, মিডিয়ার লোকজন রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছে তাদের অফিসে অফিসে।

বান্দির বাচ্চা রাখ তর মিডিয়া। দেড় টাকার সাংবাদিক আর তিন টাকার মিডিয়া। মিডিয়ার মায়রে চুদি।

ইনচার্জ অসহায়ের মতো আমতা আমতা করে, স্যার, আইন বলে একটা কথা...

ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়ে ইনচার্জের গালে, মাদারচুদ, আমরা আইন বানাই আর আমার সামনে তুই আইন চুদছ?

একটু পরেই তালা-শিকলের ঝনঝনানি শোনা যায়। শোনা যায় অনেকগুলো গলার হাসাহাসি, থানা ভবন থেকে বিজয় উল্লাসে বেরিয়ে যাওয়ার ধুপধাপ শব্দ।


নারীই তো পদ্মিনী। সাধন সঙ্গিনী হিসাবে পদ্মিনী নারী পেলে বাউল জনম সার্থক হয়।


রাত ফুরিয়ে আসছে। কনক যেভাবে বসেছিল সেই ভাবেই বসে আছে। তার পাশে আভাও দেয়ালে হেলান দিয়ে, সামনে পা ছড়িয়ে বসে আছে। বালিশের মতো ফুলে ওঠা কনকের হাতটা আভা তার ঊরুর উপর রেখে, মা যেমন করে ছেলের কষ্ট ভুলিয়ে দেবার জন্য হাত বুলায় আভা তেমনি ভঙ্গিতে হাত বুলাচ্ছে। দুই জনই পরস্পরের নিশ্চুপ অস্তিত্বটুকু হৃদয়ে হৃদয়ে অনুভব করছে। সেই পরম চেতনার নাম লোভ-কামহীন প্রেমের পবিত্র সঙ্গ।

একটু পরেই এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের আকাশ-বাতাস মাইকের ‘আল্লাহু আকবর’ উচ্চরবে বারবার কেঁপে ওঠে। ইনচার্জ তার রুম থেকে বের হয়। তার ডান গালে পাঁচ আঙুলের কালশিটে দাগ। মুখটা বেজার বেজার। মানুষের সন্তান হয়ে একদিন চাকরিতে ঢুকেছিল। সেই থেকে ডাইনে-বাঁয়ে, সামনে-পিছে পশুদের সাথে ছুটতে ছুটতে মানুষের মনটা মরে গিয়ে কবে যে বোঁটকা গন্ধওয়ালা একটা মাংসাশি জন্তু হয়ে গেছে সেকথা সে ভুলেই গেছিল। আজ তারচে আরো অনেক বড়, অনেক লোভী, অনেক অনেক বেশি হিংস্র আরেকটা পশুর থাপ্পড় খেয়ে ক্ষণিকের জন্য একটু যেন মানুষ মানুষ ভাবটা ফিরে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে-ও তো প্রেমে পড়েছিল। এটা যে কী আগুন যার গায়ে আঁচ লেগেছে সে-ই শুধু জানে। আর সত্যিকারের অপরাধীরা তো সব ছিনতাই হয়ে গেল। শুধু কয়েক হাজার টাকার জন্য এই রোমিও-জুলিয়েটকে আটকে রাখতে তার মন মানছে না।

থাপ্পড় খাওয়া গালটায় হাত বুলাতে বুলাতে ইনচার্জ এসে জানালার সামনে দাঁড়ায়, সরি, আপনারা তো ম্যাচুড মানুষ। দুই জন পালিয়ে এসেছেন এই কথাটা আগে বললেই পারতেন। ছেড়ে দিচ্ছি। চলে যান। উত্তর দিকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই সামনে বড় বাজার জামে মসজিদ পাবেন। ইমাম সাহেবকে বলবেন, আপনাদের বিয়েটা পড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমি পাঠিয়েছি।

কোনো বিশেষ দিকে নয়। আভাদের কাছে আজ দুনিয়ার সবদিক সমান হয়ে গেছে, সব আলো এসে কালোতে হারিয়ে গেছে। তাই তারা উত্তরে নয়। থানা থেকে বেরিয়ে দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই হাঁটতে থাকে। কনক তার ভালো হাতটা দিয়ে আভার একটা হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার পায়ে জুতা নাই। সম্ভবত তার জুতার দরকার ফুরিয়ে গেছে বলে থানাতেই ফেলে এসেছে। মুখটা আগের মতোই নির্বিকার। চোখ দুইটা ফোলা ফোলা। কনক কখন কাঁদল? আভার বুকটা হাহাকার করে ওঠে। ইচ্ছা করে মানুষটার মুখ নিজের বুকের আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিতে। আভার অপমানে অপমানিত, রক্তাক্ত কনকের ভেতরটা বুঝি সে স্পষ্ট দেখছে। কিন্তু বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নাই। তাই আভা ভাবে, মরমের চোখ খুলে গেলে কি মানুষ সর্বংসহা হয়ে যায়?

রাস্তার ডান পাশে একটা নোংরা, বদ্ধ জলাশয়। আভা তার শরীরে জড়ানো ওড়নাটা খুলে ফেলে দেয়। তারপর ছুড়ে মারে হাতের ব্যাগটাও। সংসারের সব প্রয়োজন যার ফুরিয়ে যায় তার কাছে ছোট্ট একটা পাস্টও হাজার টনের সমান ভার হয়ে ওঠে। পানির শব্দে কনক চেয়ে দেখে আভার ব্যাগটা হেলেঞ্চা ভরা ডুবাতে ভাসছে। কনকের মাথাটা নুয়ে পড়ে। এক জীবনে সে নারীর কত রূপ দেখেছে। কিন্তু আভা যেন তার সকল অভিজ্ঞতার অতীত, অদেখা এক সত্যিকারের নারী। আজ সন্ধ্যা থেকে সে আভার মাঝে কখনো দেখেছে মায়ের মুখ, কখনো বোনের, কখনো প্রিয়তমার। এই মতো নারীই তো পদ্মিনী। সাধন সঙ্গিনী হিসাবে পদ্মিনী নারী পেলে বাউল জনম সার্থক হয়।

পাট গুদাম পেরিয়ে, পুরান হাসপাতাল ছাড়িয়ে তারা ডান দিকে মোড় লয়। এই শহরের কোনো কিছুই তারা চিনে না। তবু সবকিছু চেনা-জানা মানুষের মতো সহজ ভঙ্গিতে হাঁটতেই থাকে। অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোরের মিষ্টি আভায় দুনিয়াটা একটু একটু পরিচত হয়ে উঠলে আভা দেখে তারা রেললাইন ধরে দক্ষিণের দিকে হাঁটছে। এখন কনক প্রার্থনার সুরে গুনগুন করে গাইছে :

মাটির অ পিঞ্জিরার ভিতর বন্দী হইয়া রে কান্দে, হাসন রাজার মন ময় না রে...

এই প্রথম আভা দেখল কনকের চোখের পাতা ভেজা ভেজা। সে হাঁটার মাঝে গুনগুন করতে করতে তার কাঁধের ব্যাগটা পাশের খালে ফেলে দেয়। বই ভরা ব্যাগটা ডুপ্পুত করে পানিতে ঢুবে গেলে আভা সেদিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। পেছন দিক থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইসেল, চাকার ঝুক্কুর ঝুক্কুর শব্দ। তারা হাঁটতেই থাকে। কনক গান থামিয়ে ভাবতে থাকে, পরকাল পরের কথা। মানুষ জীবনে যত অন্যায় করে, অনাচার করে, তার দায় এই দেহ দিয়ে, এই সংসারেই তাকে মিটিয়ে যেতে হয়, এই তো স্রষ্টার বিধান। আজ কি সেই দিনটাই তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে?

আভার মনে পড়ছে তার মায়ের মুখ, পত্রিকার পাতায় পাতায় দেখা অসংখ্য নির্যাতিত নারীর মুখ। আজ সবার মুখ, এই বাংলার কোটি কোটি নির্যাতিত নারীর অসহায় মুখ দেখতে দেখতে যেন আভার নিজের মুখ হয়ে যাচ্ছে আর তার মা যেন তাকে ডাকছে, আয়। আমার বুকে আয় মা। যে দেশে নারীর ইজ্জত কচু পাতার পানি, যে দেশে মানুষের জীবন কুত্তার অধম। আয় মা। সেই দেশ ছাইড়া শান্তির দেশে আয়।

ট্রেনটা পায়ের তলার পৃথিবী কাঁপিয়ে ছুটে আসছে। এর-ই মাঝে তাদেরকে সর্তক করে দেবার জন্য কড়া একটা হুইসেলও বাজিয়েছে। আভা কনকের দিকে তাকায়, নির্বিকার। সে কনকের হাতটা ছেড়ে দেয়। এখন ইচ্ছা করলে কনক রেলপথ থেকে নেমে যেতে পারে। কনক বুঝি একটু হাসল? তার মাথার লম্বা লম্বা চুল, গাল ঢেকে ফেলা দাড়ি, চোখের অতলান্তিক দৃষ্টি বলে দেয়, এই কনক লালন-হাসনের স্বজাতী।

কনক মুচকি হাসতে হাসতেই বলে, জানেন, বাউলরা এই দেহটাকে বলে ঘর। এই ঘরে থাকে পরমাত্মা। পরমাত্মা মানে খোদা। তাই ঘরটা যখন রোগ জর্জর হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। কিংবা ঘরটার প্রয়োজন যখন ফুরিয়ে যায় তখন পরমাত্মা এই পচা খোলসটা ফেলে পরমেশ্বরের কাছে চলে যায়। এই চলে যাওয়াতেই সবচে বেশি সুখ।

মুহূর্তে দপ করে আভার সব আবেগ নিভে যায়। মনে জাগে অজস্র যুক্তি। কোনো যুক্তিতেই এই মাটিতে সে আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন দেখে না। তার সব শেষ হয়ে গেছে। শত চাইলেও সে আর সেই বিবি আতুয়াজান বিদ্যালয়ের আভা ম্যাডাম হতে পারবে না। দুনিয়ার সব পথ ফুরিয়ে গেছে। সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই কনকের কথায় আর পেছনে ছুটে আসা দানবের শব্দে সে-ও যেন জীবনের নতুন একটা অর্থ খুঁজে পায়। তার মনে পড়ে সক্রেটিসের কথা। সক্রেটিস ইচ্ছা করলেই পালাতে পারত। তার শিষ্যরা এবং যারা তার প্রাণদণ্ড দিয়েছিল তাদের অনেকেই মনে মনে চাইছিল সক্রেটিস পালিয়ে যাক। পলায়ন তো পরাজয়। তাই সক্রেটিস সত্যের জন্য, তাঁর আদর্শের জন্য হেমলকের গ্লাস হাতে তুলে নিয়েছিল।


সব ক্ষমতাধর পশুর মুখ দেখতে এখন একরকম লাগছে! এদের পায়ের তলায় আজ দলিত এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গমাইল।


কনক ভাবছিল : সে ইচ্ছা করলেই তো রেলপথ থেকে নেমে যেতে পারে। কিন্তু এই মেয়েটি? পৃথিবীর মতো অপরূপ আর গুণবতী এই মেয়েটির একজন সুপুরুষ স্বামী থাকতে পারত, শান্তির সংসার থাকতে পারত। হায়! রাষ্ট্র তাকে এইসব দেওয়ার পরিবর্তে সামান্য যা ছিল তাও কেড়ে নিয়েছে। আর কনক তুমি? জীবনের স্বাদ বলে যদি কিছু থাকে, জগতে নারীর প্রেম বলে যদি কিছু থাকে, তা তো তুমি এই প্রথম তার কাছ থেকেই পেয়েছ, নারীত্বের আলো দেখেছ, প্রেমের দীক্ষা নিয়েছ। এই দিক থেকে তো সে তোমার দীক্ষাগুরু। এই ভাবতে ভাবতে কনক আভাকে আড়াল করে একবার চোখ মুছে।

কনক আভার হাতটা আবার ধরে। এক পলকের জন্য তাদের চোখাচোখি হয়। কী শান্তি! কী নিবিড় আশ্রয়! ট্রেনটা বোধ হয় চূড়ান্ত হুইসেল দিল? শব্দটাও তাদের ঘাড়ের উপর। কনক থমকে দাঁড়ায়। এই দেহের পাপ সে দেহ দিয়েই মোচন করবে। জীবনের সব কুৎসিত কামনার পাপ সে প্রেমের মহত্ত্ব দিয়ে মুছে যাবে। সে কিছুতেই আভার কাছে হেরে যেতে পারে না, আভাকে হারিয়ে বোধ হয় বাঁচতেও পারবে না।

পাষাণের মতো! পাহাড়ের মতো শক্ত আর অটল তার দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখেই আভা চোখ বন্ধ করে কনককে জড়িয়ে ধরে। এক সেকেন্ড পরেই তারা পিষে যাবে ছুটন্ত ট্রেনের চাকায়। আভার মনে পরে তাদের গ্রামের সেই মেম্বারটার কথা, পুলিশের সেই কর্তাটার কথা, ভয়ংকর অপরাধীদেরকে থানা থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সেই লিডারের কথা, লিডার! লিডার! নামধারী এই রাষ্ট্রের অসংখ্য দানবদের কথা। ঘাটে ঘাটে ফাঁদ পেতে বসে থাকা সব, সব ক্ষমতাধর পশুর মুখ দেখতে এখন একরকম লাগছে! এদের পায়ের তলায় আজ দলিত এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গমাইল। এই নরকে মানুষ কি মানুষের মতো বাঁচতে পারে?

আভা তার অপমানিত, লাঞ্ছিত মুখ কনকের বুকে লুকিয়ে সক্রেটিসের মতো শান্ত গলায় আওড়াতে থাকে, ‘...আই টু ডাই, অ্যান্ড ইউ টু লিভ। হুইচ ইজ বেটার গড অনলি নউজ।

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা