পর্ব-২১
পর্ব-২২
মন রে, গাছের নামটি আদম শহর
মানুষ তার চিন্তা ও জ্ঞানের জগৎজয়ী স্পর্ধা দিয়ে পৃথিবীর সভ্যতাকে যেমন একান্ত নিজের মতো করে নির্মাণ, বিনির্মাণ করে চলেছে তেমনি একদল উদ্ভট মানুষ জীবন সৃষ্টির সেই আঁতুড়ঘর থেকেই বিশ্ববিধাতার সন্ধানে নীরবে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অনুসন্ধান কর্ম। ঈশ্বর, খোদা, ভগবান নামে নয় তারা তাঁকে ডাকে সাঁই কিংবা মুর্শিদ নামে।
যে জীবনে জিজ্ঞাসার আকুলতা নাই, সৃজনের মুখরতা নাই সে-তো আগাছা ভরা একটা পতিত ভূঁই। এই চেতনা থেকেই দুর্বিন শাহ বলেছেন :
‘দেহ জমিন পতিত রইল
আবাদ কেন করলে না,
খাসমহলের খাজনা বাকি
উসল কেন দিলে না।’
এইসব ভাবতে ভাবতে কনক হোটেল থেকে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে চলে আসে। গেটের কাছে সেই দুই অন্ধ বুড়াকে পাওয়া গেল। এদিকে মানুষের চলাচল নাই বললেই চলে। পড়ন্ত বিকালের লাল আলোয় দিনের অন্তিমকাল দুই বুড়ার চোখেমুখে জ্বলছে। তারা অলস গল্প করে, মনে কয় টেরেইন আর আইত না।
জটাওয়ালার থালায় পড়ে একটা এক টাকার কয়েন। টুপিওয়ালার থালায় পড়ে পাঁচ টাকার নোট।
এই কথা বলে মাথায় টুপিপড়া বুড়ো সাথের জনের দিকে তাকায়। যার দিকে তাকায় তার মস্তবড় দাড়িতে লম্বা একটা জট, বিড়ির ধোঁয়ায় ঝুলেপড়া বিশাল গোঁফটার পাকা চুলগুলো কটকটা লাল, গলায় বড় একটা তবজির মালা। সে-দিনের হিসাবটা নানান রঙের তালিমারা ছেঁড়া পাঞ্জাবির পকেটে রাখতে রাখতে বলে, আগে একটা বিড়ি ধরা।
এই কথায় দ্বিতীয় বুড়া হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে। ভাবটা এই, তুমি ধরাও। জটওয়ালা বুড়া বলে, দুফুরেও ত তুই আমার একটা বিড়ি খাইছসৎ অহন তুই ধরা।
এর আগে তুমি ত আমারটা খাইছ।
অন্ধ, দন্তহীন খিলিপড়া বুড়া পিডিপিডি হাসে, আমি খাইবার ক্যাডা? আল্লায় খাওয়ায়।
কিবায়?
এই কথা বলে দ্বিতীয় বুড়া প্রথম বুড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হেই কতাডায় আছে না :
‘মানুষে মানুষেরে খায়
জোঁকে চায় রক্ত,
আদম হাওয়ারে চায়
হাওয়া চায় দুনিয়ার তক্ত।
গোস্তাকি মাফ কর খোদা
নাদান গরিব তোমার ভক্ত।’
বুড়া মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে গাইছিল। এইসময় চার-পাঁচজনের একটা পরিবার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে স্টেশনের দিকে আসছে দেখে বুড়া গান থামিয়ে গুটিয়ে আনা টিনের থালাটা সামনের দিকে ঠেলে দেয় :
‘আল্লা ডাকিল ফাতেমাকে মা,
ইস্তীরি হইয়া সে শেরে আলীর ঘরে যা।
তারপরেই দুই বুড়া এক সাথে সুর তুলে:
আমার আল্লা-নবীর নাম...
জটাওয়ালার থালায় পড়ে একটা এক টাকার কয়েন। টুপিওয়ালার থালায় পড়ে পাঁচ টাকার নোট।
কনক একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব-ই দেখছিল। এই নিয়ে তিন বার সে দেখল, টুপিওয়ালার ভাগে বেশি পড়ে। জটাওয়ালার থালা প্রায়-ই পতিত পড়ে থাকে। এইটা কিসের লক্ষণ?
প্রশ্নটা বুঝি কনক নিজে নিজেকেই করে। তাই সে এক পলকের জন্য চোখ বন্ধ করে দুনিয়াটা আরেকবার দেখে, ধর্ম! ধর্ম! আজকে মানুষের কাছে ধর্ম এত ফ্যাশানেবল! এত বহির্মুখী! ভিক্ষা দিতে গেলেও মানুষ চালশে ধরা চোখে ভিক্ষুকের খোলসটাকেই গুরুত্ব দেয়। তাই টুপিওয়ালা বেশি ভিক্ষা পায়।
জায়গাটা ছাড়তে কনকের মন চায় না। জীবনে স্থানের মাহিত্ব অশেষ। ধানমন্ডিতে জন্মেছিল বলেই কুকুরের মতো শুধু দুনিয়ার বাইরটাই দেখেছে। লোভে-কামে ভোগে শুধু ঘেউ ঘেউ করে দুনিয়াটা তোলপাড় করে বেড়িয়েছে। কনক একটা সিগারেট ধরিয়ে দুই বুড়ার দিকে মন দেয়। টুপি-পাঞ্জাবি পরা দুই জন তরুণ হুজুর আসছিল। পায়ের শব্দে জটাদারী পাশের জনকে ফিসফিস করে জিগায়, কিরকম?
পাশের জন পুরা অন্ধ না। এখনো দুনিয়াটা আবছা আবছা দেখে। তাই সে অন্ধের কানে ফিসফিসায়, দুই হুজুর।
গরিবদরিব না জাঁকজমকের?
জুতা, টুপি-পাঞ্জাবি অনেক দামি দামি।
অন্ধ বুড়াটা আরেকবার পিডিপিডি হাসে, তাইলে আর তর কপালে নাই।
স্টেশনটা সত্যিই ফাঁকা! এই শতশত অবোধ আদম গেল কোথায়? আত্মসর্বস্ব মানুষ পিঁপড়ার অদম।
তরুণতর হুজুর বুড়াদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধান অফিসের জানালার কাচে নিজের চেহারাছুরত দেখতে থাকে। বুকটানা দিয়ে, ব্লাউজের মতো টাইট পাঞ্জাবি টেনেটুনে দেহে একটা ফিটফাট ভঙ্গি আনতে চাইছে। গায়ে আকাশি রঙের ঝলমলে দামি পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় শ’পাঁচেক টাকা দামের একটা টুপি। সে-টুপিটা মাথা থেকে নামিয়ে বাঁ হাত দিয়ে একটু লম্বা চুলগুলো পিছন দিকে বারবার ঠেলে দিয়ে দিয়ে সামনের দিকে নিয়ে আসে। তারপর ঘোড়ার মতো চুলগুলো কপালের উপর রেখেই টুপিটা মাথার একটু পেছন দিকে বসিয়ে দিয়ে চলে যায়। বুড়ারা থালার দিকে কান পেতে বসে ছিল। তরুণ চলে যেতেই দাড়ির জট নাড়তে নাড়তে অন্ধবুড়া বলে, কী বুঝলে?
কিচ্ছু না।
তুই হাচা হাচাই অন্ধ রে...।
বলে জটাদারী ফোকলা মুখে শিশুর মতো হাসে। অন্যজন গলা উঁচিয়ে, আধাকানা চোখ পিটপিট করে বলে, একটু বোঝায়া কও।
কী কৈতাম, এরা খালি বাইরেটা দ্যাহে। এগর ভিত্তে ধর্মের জ্যোতি আর সুগন্ধ নাই। হেই জন্যেই দামি দামি টুপি-পাঞ্জাবি লাগে। হাজার টাকা দামের আতর লাগে। যাহ আমি আর পরের প্যাঁচাল পাড়তাম না। অহন বিড়ি ধরা।
বারবার বিড়ি ধরাতে টুপিওয়ালার বুকে লাগে। একটা বিড়ি মানে এক টাকা। বিড়ি ধরাতে দেরি দেখে জটাদারী দুই টাকার একটা কয়েন দিয়ে বলে, দুইডা বিড়ি ল।
বিড়িতে দম দিয়ে দাড়ির জট হাতড়ে হাতড়ে অন্ধ গায় :
‘রুনা মেরি কিসমত মে হোময় ইনকা তলবগার।
রোতে রহঃ জব না মিলে দিদারে নবীকা।’
আমার ভাগ্য তাঁহার (রাসুলে করিম সা.) সন্ধানে কান্না। কাঁদিতে থাক যতক্ষণ না মিলে তাঁর দিদার।
কনক স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটেত ভাবতে থাকে,
‘যেখানে দেখিবে ছাই,
উড়াইয়া দেখিবে তাই।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে মনে মনে অবাক হয়, আমাদের বুড়ো ঠাকুর কী জিনিস ছিল রে বাপ! তার কী অমর সৃষ্টি!
বলতে গেলে স্টেশনটা ফাঁকা। যারা একেবারে নিরুপায় তারা ভবসিন্ধুর এই তীরে অধম এতিম হয়ে বসে আছে। স্টেশনের অনুসন্ধান রুমের সামনে এসে সে থমকে দাঁড়ায়। একজন নারী ভেতরের লোকটাকে জিজ্ঞেস করছে, এই যে ভাই ট্রেন আসার কোনো সম্ভাবনা আছে?
ঠিক বলতে পারছি না। দুই জাগায় লাইন উপড়ে ফেলছে। ট্রেনের ড্রাইভারকে নিয়ে স্টেশন ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
কনক আবার হাঁটতে শুরু করে। স্টেশনে একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে সে বসে পড়ে। সাথে একটা বই আছে। এই ফাঁকে পড়া হয়ে যাক। আজকাল সে প্রচুর পড়তে চেষ্টা করে। আউল-বাউল-ফকিরদের নিয়ে ‘সুধীর চক্রবর্তী’র গভীর নির্জন পথে বাইটা ব্যাগ থেকে বের করে। কয়েক বার পড়েছে। তাই একটু উল্টেপাল্টে দেখে, নাকের কাছে নিয়ে বইটার একটু ঘ্রাণ নেয়। তারপর ব্যাগে রেখে দেয়। এবার বের করে মুন্সী মোহাম্মদ আশ্রফউদ্দিনের লেখা আর মোস্তাক আহমাদ দীনের সম্পাদনায় ‘ছহি ফকির বিলাশ অর্থাৎ মারফতি ভেদ’ বইটা। সম্পাদকের বিশ্লেষণধর্মী ভূমিকাটা কনককে বার বার পড়তে হয়। বলতে গেলে সে এখন এই লাইনে শিশু শ্রেণির ছাত্র, অ, আ, ক, খ পড়ছে। পড়ার সাথে সাথে তাই ভাবতেও হয় প্রচুর।
স্টেশনটা সত্যিই ফাঁকা! এই শতশত অবোধ আদম গেল কোথায়? আত্মসর্বস্ব মানুষ পিঁপড়ার অদম। এমনিতেই পিঁপড়া দলবদ্ধ জীব। আপদকালে তাদের একতাবদ্ধতা চূড়ান্ত রূপ নেয়। হাজার হাজার পিঁপড়া এক সাথে একটা লাল পিণ্ড হয়ে বন্যার পানিতে ভাসতে ভাসতে শতশত মাইল পাড়ি দেয়। পথে পানির প্রবল স্রোত কিংবা প্রচণ্ড ঢেউয়ে একটা পিঁপড়াও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। অথচ শতশত মানুষ চল্লিশ-পাঁচচল্লিশটা মানুষের গর্জনে পালিয়ে গেল! কারণ দেশের কোটি কোটি মানুষের সাথে কেউ নাই। যে চল্লিশ জন এসেছিল তাদের পেছনে আছে লিডার। লিডারের পেছন মন্ত্রী। মন্ত্রীর পেছনে রাষ্ট্র।
ভাল্লাগে না! বলে কনক শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা ফেলে দিয়ে উঠে পড়ে। এখানে মন দিয়ে কিছু পড়া সম্ভব না। স্টেশনটা যতই ফাঁকা লাগুক। আসলে অত ফাঁকা না। পথেঘাটে পা বাড়ালেই যে দেশে হাজার হাজার মানুষ কদমে কদমে মিলে সেখানে ফাঁকা শব্দটা শুধু ফাঁকা না। কিছুটা মিথ্যাও। তাই মন দিয়ে পড়ার তৃষ্ণা উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে তাকে স্টেশনের ওভারব্রিজে নিয়ে যায়। পকেটমার-বাটপার আর গাঁজাখোররা ছোট ছোট দলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। এইসব দেখে দেখে কনকের অভ্যাস হয়ে গেছে।
আপনার বারিধারার সেই সাত তলা বাড়িটা কি কবরে নিয়ে যেতে পেরেছেন?
কনকও ফাঁকমতো বসে পড়ে। জুতা দুইটা খুলে ব্যাগের নিচে রেখে, ব্যাগটা শিথান দিয়ে কনক চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। জুতা পায়ে দিয়ে শুয়ে থাকলে টোকাইরা পা থেকে জুতা নিয়ে দৌড় দেয়। অনেকক্ষণ ধরে দেহটা একটু আরাম চাইছিল। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়তেই ঝিমঝিম করে দেহের আরাম মনের বাসনার সাথে ভাব বিনিময় করে। বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে বিশেষ একটা সিগারেট ধরায়। প্রথম দমেই হালকা, মিষ্টি মিষ্টি স্বাদে মুখটা ভরে যায়।
হায়! কনক তুমি একেবারে ফুটপাতে নেমে গেলে?
কনকের দেহটা কেঁপে ওঠে তার হাত থেকে জিনিস ভরা সিগারেটটা পড়ে যায়। সেই লোকটা বহুদিন পর আজ আবার পিতৃত্ব ফলাতে এসেছে! কনক আজকাল আর রাগ করে না। তাই সে খুব ঠান্ডা গলায় জেনারেলের কাছে জানতে চায়, কোথাই ঘুমাব, ধানমণ্ডি-গুলশানের অট্টালিকায়? আপনার বারিধারার সেই সাত তলা বাড়িটা কি কবরে নিয়ে যেতে পেরেছেন?
না।
তাহলে শাহ ছাবাল আলী’র একটা গানের কয়টা লাইন শুনুন :
‘মন রে, গাছের নামটি আদম শহর
আকাশে মেলিয়াছে জর
দুই ডাল তার অধিক সুন্দর
এক ডালে অমৃত ফল আরেক ডালে জহর।’
কনক শুয়ে শুয়েই জেনারেলের কাছে জানতে চায়, কিছু বুঝছেন?
না।
তবে চলে যান। কোনোদিন যদি এই গানের অর্থ খোঁজে পান তাহলে আসবেন।