নরকের সহস্র তোরণ : ৩

পর্ব-২

পর্ব-৩


অসাম! অসাম!

মাঝে মাঝে বাসটা গোঁ-গোঁ গর্জন করে ওঠে। যেহেতু কলকব্জাগুলো মানুষেরই চিন্তার ফসল তাই তার স্রষ্টার মতো যন্ত্রেরও একটা ভাষা আছে। হাস্যকর হলেও হয়তো এই সূক্ষ্ম বোধ থেকেই আভা বাসটার মতিগতি কিছুটা ধরতে পারে। ঘামে ভেজা নোংরা আর শুকিয়ে যাওয়া মরা ডালের মতো খ্যাংরা হাতে ড্রাইভারটা স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে। চোখের নজর নেশাখোরের মতো আপাত শীতল আর উদাস হলেও তলে তলে ক্লান্তির বিকারে হিংস্র-লাল। ড্রাইভারটাকে দেখতেই কেমন মতিচ্ছন্ন মতিচ্ছন্ন ভুল মানুষ মনে হয়। পত্রপত্রিকা থেকে আভা যতটুকু জানে, এই ড্রাইভারগুলো টাকার নেশায় সেরিব্রাল কর্টেক্স হারানো কোটিপতি মালিক আর পরিবহন জগতের অতিলোভী ডনদের রেসের ঘোড়া। ওরা যত বেগে ছুটবে তাদের হিস্যা ততই তাগড়া হবে। তাই চালক-হেলপার ক্লান্তিহীন ছুটার জন্য নেশাখোর হতে বাধ্য।


পাছাড় কাপড় একটু তুললেই দগদগে ইতিহাসের দাগ পাওয়া যাবে।


উন্মাদ গতিতে ছুটার জন্য বাসটা বারবার গর্জে ওঠে, হর্স পাওয়ারের আসুরিক শক্তিতে তড়পায়। সেই হুঙ্কার বারবার আভার চিন্তাস্রোত এলোমেলো করে দেয়। সামনে শতশত যানবাহনের কিলবিলানি। সবগুলো গাড়িই আগে ছুটতে চাইছে! পিছন থেকে, পাশ থেকে, এদিক থেকে, সেদিক থেকে নাক উঁচিয়ে সবাইকে পেছনে ফেলে ফুড়ুত করে উড়াল দিতে চাইছে। তাই বাসটা আবার জ্যামে পড়ে। বাস-ট্রাক আর নানান জাতের গাড়ির চিপাচাপা দিয়ে পত্রিকা নিয়ে একজন হকার এসে আভাদের বাসে উঠে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে চুম্বক চুম্বক শিরোনামগুলো বলছে, নূর হোসেন আবার দশদিনের রিমান্ডে...।

লিকলিকে শুকনা, অপুষ্ট আর কোটরে বসা চোখে অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়ে হকারটা ডাকছেই, রিমান্ডে নূর হোসেন মুখ খুলছে...।

হকারটার দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। তারা ষোল ঘণ্টা স্মার্টফোনের ভিতর এই বিশ্বসংসারটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে পেয়েছে একটি মন্ত্র, আমি। জ্ঞানে বলো, গুণে বলো আর হিম্মতের জোরেই বলো আমি ভিন্ন সব অধম। তাই সংসারের সব সুখ, সব ভোগ তাকেও পেতে হবে। সুখ আর ক্ষমতার বাহার তাদের সত্তর-আশি বছরের কালো চকচকে চুল থেকে আঠারো বছরের যৌবনের মতো উছলায় পড়ে। তাই তারা অর্বাচীন মাতালের মতো চলনে-বলনে এতটা বেসামাল হয়ে স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে চরাট করতে পারে। খায় দায়, রাষ্ট্র চালায়, হাসে, পাদে। টেকনাফে পাদ মারলে সেই গন্ধ এক সেকেন্ড পরে তেঁতুলিয়াবাসী অনায়াসে শুঁকতে পারে। সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন। ফেসবুকে গু-গোবর, আলু-অমৃত ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে সকালেই এইসব খবর তারা দেখে ফেলেছে। পত্রিকার কী দরকার? খামাখা দশ টাকা দণ্ডী। বাঙালি এক হাজার বছর পরাধীন ছিল। কত জাত-বেজাতের সাঁটানি খেয়েছে। পাছাড় কাপড় একটু তুললেই দগদগে ইতিহাসের দাগ পাওয়া যাবে। ডিসেকশন স্লাইডে এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে রাখলে দেখতে পাবে দুর্ভাগা বাঙালির করুণ ইতিহাস। দেখতে পাবে কতশত বেজন্মাদের লম্পট রক্ত তাদের শিরায় শিরায়। তাই দণ্ডী কী জিনিস বাঙালি হাড়ে হাড়ে জানে।

স্বাধীনতা কী জিনিস এই খর্বাকৃতির জাতটা কোনো কালেই জানত না। এখনো জানবার দরকার বোধ করে না। বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে সিংহের সাহস আর মানুষের জন্য আজব একটা ভালোবাসা দিয়ে ভুলক্রমে বিধাতা এই বঙ্গদেশে পাঠিয়ে দিলেন। তাই তাঁর তপস্যা আর পরান জুড়ানো ডাকে লাফালাফি আর দলাদলিতে অভ্যস্ত বাঙালিরা সব এক কাতারে চলে এল। স্বাধীনতার পর কিছু কিছু মানুষ লবণ জড়ানো আমড়ার মতো এই দেশটা খুব সহজেই নিজের হাতে পেয়ে গেল। এখন ইচ্ছামতো চিবিয়ে খাও।

আভা ‘প্রথম আলো’ কিনে। সে প্রথমেই রাশি ফলটা দেখে নেয়। রাশিফল বিষয়ে কাওছার আহমদ চৌধুরীর বলার ভঙ্গিটা দারুণ লাগে। দুনিয়ার কোথাও তো আলো নাই, আশা নাই; স্বপ্নদেখার মতো এক চিলতে সবুজ ভূমি নাই। তাই আভা সবার আগে রাশি ফলটা দেখে। সেটা একটা কমন হিসাবের গড় কথাবার্তা জেনেও আভা স্রেফ একটা কৌতূহল মেটায়। মাঝে মাঝে অনেকটা মিলেও যায়। তারপর সে খেলার পাতা থেকে ফ্যাশানের পাতা ঘুরে আন্তর্জাতিকের পাতাটায় চোখ বুলিয়ে পত্রিকাটা রেখে দেয়। সামনের ও পিছনের পাতাগুলো সে কখনো দেখে না। অই পাতাগুলো দেখলে শরীর ঘিন ঘিন করে। মন খারাপ হয়। ঠিক খারাপ না। সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কাজের প্রেরণা হারিয়ে তখন সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদাস হয়ে ভাবে, কোনো এক মন্ত্রবলে উপরের চেয়ারে বসা মানুষগুলোর মনের মধ্যে যদি সত্যিকার মানুষের মন ঢুকিয়ে দেওয়া যেত, বিধাতার মতো ক্ষমতাধর কয়েক শ অন্ধ-দানবের চিন্তাকে যদি হীরক রাজার মতো আমূল ঘুরিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো নেতাদের ফাঁকা আওয়াজ, গনিমতের মালের মতো লুটপাট, নারীহরণ, ধর্ষণ, শিশুধর্ষণ, হত্যার সংবাদে ঠাঁসা পত্রিকার পৃষ্ঠাগুলো অন্যরকম হতো। তখন এই কাগজটা প্রতিদিন লাখ লাখ পাঠকের মনকে বিকারগ্রস্ত না করে এইসব দৈনিকগুলোই আমাদের মননের উচ্চতা, উজ্জ্বলতা বাড়াত।


আভা পত্রিকার এক নিবন্ধে পড়েছে, পৃথিবীকে দ্রুত শেষ করে দেওয়ার জন্য পলিথিন-প্লাস্টিকই যথেষ্ট।


জ্যামে আটকাপড়া অসহিষ্ণু চালকরা শুধু শুধু হর্ন বাজাচ্ছে। এই জিনিসটা আভার কাছে শিকার নিয়ে বিড়ালের খৈল দেওয়ার মতো লাগে। মগবাজারের ফ্লাইওভার থেকে নামতেই বাসটা আবার দীর্ঘ একটা জ্যামে পড়ে। বাঁপাশে একটা বিশাল ভিন। রুচি-বোধ-বিবেকহীন অবৈধ টাকাওয়ালাদের নির্লজ্জ কুকর্মের মতো ভিনটার চারপাশে উপচে পড়ে আছে আবর্জনা। বাসের সবাই নাক চেপে ধরে। রাস্তার জট খুলতেই বাসটা আবার ছোট একটা গর্জন দিয়ে চলতে শুরু করে। পোকা-মাকড় তুল্য ছোট ছোট বাহনগুলো যেন প্রাণ ভয়ে ছিটকে ছিটকে সড়কের দুপাশে সরে যাচ্ছে। বিপরীত দিক থেকে আসা একটা বাস শাঁ করে আভার কানের পাশ দিয়ে ছুটে যায়। মৃত্যু! মৃত্যুর নেশা ধরানো হিম-শীতল একটা আতঙ্ক তার মগজ থেকে শিরশির করে নেমে আসে! চারপাশে ধোঁয়া-দুর্গন্ধ, গলিত আবর্জনা, পলিথিন-প্লাস্টিক এলোমেলো বিচিত্র-বর্ণ দালান, মিল-ফেক্টরি আর শতশত গার্মেন্টস। আভা পত্রিকার এক নিবন্ধে পড়েছে, পৃথিবীকে দ্রুত শেষ করে দেওয়ার জন্য পলিথিন-প্লাস্টিকই যথেষ্ট। কারণ জীবাষ্মজ্বালানির উচ্ছিষ্ট এই কাঁচামাল থেকে প্রায় সত্তর হাজার পণ্য তৈরি হয়! বানানো হয় কৃত্রিম পুরুষাঙ্গ থেকে ডলগার্লের শরীর, স্তন! এখন সব কিছুই পণ্য, সব কিছুই মহামূল্যবান, সবই এক্সক্লুসিভ! শুধু সাধারণ মানুষের জীবন যেন বহুতল ফ্ল্যাট থেকে ছুড়ে ফেলা হাত-পা ভাঙা খেলনা!

ক্লান্ত আভা সিটে কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শক্ত একটা ঝাঁকুনিতে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। বাসটা এখন হাওয়ায় শিস দিয়ে বুলেটের বেগে ছুটছে। এদিকে থাইএলোমেনিয়াম, স্টেইনলেস স্টিল, টাইলস আর মার্কারি গ্লাসের বাহার কম। তার বদলে মাঝে মাঝে গ্রামের সতেজ জীবন লাজুক বউয়ের মতো জড়সড় হয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের জীবন ছুঁয়ে আসা মিষ্টি বাতাসে মন উদাস হয়। নগর আর নাগরিকতা আভার কাছে জটিল সব কেমিক্যালের মতো বিষাক্ত, দূর্গন্ধময়!

গ্রুম করে একটা বিকট শব্দ হয়। বাস দুইটা বদমেজাজি ষাঁড়ের মতো সামনা-সামনি পরস্পরের মাথা ঠুকাঠুকি করে শূন্যে লাফিয়ে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আভার হালকা দেহটাও বড় একটা বাউন্স দিয়ে রকেটের বেগে সামনের দিকে ছুটতে থাকে! মানুষের চিৎকার আর মড়মড় শব্দের মাঝে উড়ন্ত আভার মাথাটা পল্টিখাওয়া বাসের একটা সিটের সাথে ঠোক্কর খায়। অন্ধকার! ব্ল্যাকহোলের নিঝুম অন্ধকার আর সৌর পথের বহুবিধ রঙিন আলোর মাঝ দিয়ে ছুটতে ছুটতে বেচারি আভার দেহটা নিক্ষিপ্ত স্যাটালাইটের মতো নতুন একটা কক্ষপথে এসে একটু জায়গা করে নেয়!

ধানক্ষেতে উল্টেপড়া বাসটাকে মনে হয় ঘাড় মটকানো একটা রাক্ষস! ব্যর্থ আক্রোশে তার চাকাগুলো শোঁ শোঁ করে ঘুরছে!। লোহা-লক্কড়ের কঙ্কালটার ভেতর মরণ-বাঁচন কান্না-কাতরানি। বাসের দলামচা মাথা আর ইঞ্জিনের মাঝে শিয়ালে কামড়ে-ধরা মুরগির মতো ঝুলছে ড্রাইভার বাহাদুর! আভা চিত হয়ে পড়ে আছে। তার গায়ের জামাটা অনেকখানি ছিঁড়ে গেছে। ওড়নার একটা মাথা উপরে আটকে আছে। মাথা থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্ত! একটু দূরে সিটের পায়া থেকে ঝুলছে দাড়িওয়ালা সেই ছেলেটা। ওর ডান পা-টা চুরমার হয়ে গেছে। সে একাই একশজনের শক্তিতে চিৎকার পারছে। তার পেছনে চশমাপড়া সেই কালো ছেলেটার রক্তাক্ত দেহটা আটকা পরেছে সিটের নিচে।


মহাসড়কের পাঁজরে দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটার খুব কাছ থেকে আরো অনেকের সাথে সেই তরুণ-তরুণীও বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে সেলফি তুলছে।


মহাসড়কে ধাবমান বাস-ট্রাক-কারের সারি একতিলের জন্য ব্রেক কষে। কড়া ব্রেক! যানবাহনের জানালায়-জানালায় জেগে উঠেছে শত শত উৎসুক নর-নারীর মুখ। উল্টেপড়া বাসের চাকা ভনভন করে ঘুরছেই! নিত্য দুর্ঘটনা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ জঙ্গীসন্ত্রাস, অগ্নিসন্ত্রাস, প্রাণঘাতী সব সংক্রামক রোগের ত্রাসে অভ্যস্ত, দুনিয়ায় পয়দা হওয়ার পর থেকেই ফরমালিন আর নানান প্রকার ভেজাল মেশানো খাদ্যের বিষক্রিয়ায় অসাড় স্নায়ুর যাত্রীরা হাতে হাতে তুলে ধরে আইফোন-স্মার্টফোন; দুর্ধর্ষ সেলফির তৃষ্ণায় হাইরেঞ্জের ক্যামেরাগুলো বারবার হাহাকার করে ওঠে। ফেসবুকে স্ট্যাটাসের জন্য পলে পলে সমৃদ্ধ হয় ছোট-বড় সকলের মেমরিকার্ড।

একটা চকচকে দামি কার থেকে বিচিত্র পোশাকপরা, চুলে অদ্ভুত কাট দেওয়া একজোড়া মানুষ নেমে আসে! রক্তের নোনা গন্ধ আর আহতদের আর্তনাদ অসংখ্য যন্ত্রযানের গুঞ্জন আর জীবাস্মজ্বালানিপোড়া গ্যাসের ঝাঁঝে তলিয়ে যাচ্ছে! মহাসড়কের পাঁজরে দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটার খুব কাছ থেকে আরো অনেকের সাথে সেই তরুণ-তরুণীও বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে সেলফি তুলছে। বাসটার দলামচা কঙ্কালে ঝুলছে একজন নারীর মৃতদেহ। কিন্তু তার বুকের সাথে এখনো দুহাতে আগলে রেখেছে কোলের শিশুটাকে! সম্পূর্ণ সুস্থ বাচ্চাটা কাঁদছে! মোবাইলের রঙিন স্ক্রিনে এই দৃশ্য দেখে জাপানি রোবট রোবট চেহারার মেয়েটা ‘অসাম! অসাম!’ বলে ছেলেটার কানের কাছে তার মনের আমোদ প্রচার করে!

চালকদের চিৎকার, গালিগালাজ, যাত্রীদের গলাবাজি আর হর্নের তর্জন-গর্জনে স্থবির মহাসড়ক কিছুক্ষণ পর আবার ধীরে ধীরে সচল হয়। তখন দেখা যায় দূরের ক্ষেত-খামারে ছড়িয়ে থাকা ন্যাংটিকাছা কিছু বনিআদম আহতদের আর্তনাদে এদিকেই ছুটে আসছে !


পর্ব-৪

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা