নরকের সহস্র তোরণ : ৭

পর্ব-৬

পর্ব-৭

নিঃশ্বাসের জমিন

মানুষের জীবনে ভালোবাসা এমন এক স্বর্গোদ্যান যেখনে একবুক শ্বাস নেওয়ার জন্য পচে যাওয়া দুনিয়ার সব মানুষ এখনো তার তালাশে আকুল হয়ে ফিরে। যন্ত্র সভ্যতা হৃদয়ের বার্তা বুঝে না। তার চাই বেগ, ভোগ। তাই পৃথিবী নামক এই সবুজ গ্রহে মানুষের কত দুঃখ বেদনা, লাঞ্চনা। কোথাও যেন একতিল স্বস্তি নাই, কারো মনে সুখ নাই। সব সাজানো! সব মেকি! সমাজ, সংসার, সভ্যতা সব তাই আধুনিকতা নামক এক গোলক ধাঁধায় খেই হারিয়ে ছুটছেই! ছুটাই কি মানুষের ভবিতব্য?

গোপন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আভা পথে নামে। প্রায় দেড় মাস মৃত্যুর সাথে লড়াই করে সে জিতে গেছে। দুনিয়ার এই ঝলমলে রোদ, ছুটে চলা বাতাসের আমোদ, গাছের পাতার মর্মর গান এসব-ই তো জীবন নামক রঙ্গমঞ্চে ফুর্তির ঘোষণা। তবু আভার মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষের মনে ফুর্তি আছে কি? বড়ো হওয়ার আশা, ভোগ আর অনেক টাকার লোভ মানুষকে করেছে হৃদয়হীন যন্ত্র, কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার সুখ, ভালোবাসা ও ত্যাগের তৃপ্তি।

আভাকে দেখে গলির বুড়ো দোকানদারটা ছুটে আসে, মাস্টান্নি আপা, অ মাস্টান্নি আপা, খাড়ইন।

আভা দাঁড়িয়ে পড়ে। আশপাশের অনেকেই কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঘিন ঘিন করে। তবু সে নিরুপায়। কারো সাতেও নাই, পাঁচেও নাই। ক্লাসে একটু ভালো করে পড়াতে চেষ্টা করে, যেসব মেয়েরা গরিব অথচ মেধাবী তাদের একটু খোঁজ-খবর রাখে এতেই তাকে অনেকে পছন্দ করে, পথে-ঘাটে শ্রদ্ধাটদ্ধা দেখায়, সালামালাইকুম মাস্টান্নি আপা। আফনের বড়ো বিপদ গেছে। আফনের লাইগগ্যা সবাই আল্লার কাছে দোয়া করছে। আমরা সবাই হাসপাতালে দেখতে যাইবার চাইছলাম। রিপন কৈল তোমরা পাগল; উনি পুরুষ রোগী নাকি যে দেশেভাইঙ্গ্যা জোয়ান-বুড়া সব দ্যাখতে যাইবা?


আজ আমি না, জাতীয় সংগীতের সাথে জাতীয় পতাকাটা আমার পক্ষে তুমিই উত্তোলন করো, তোমার প্রিয় ছাত্রীরা খুশি হবে।


আভা নীরবে হাসে। যে বাসাতে সে ভাড়া থাকে তার তিন বাসা পরেই রিপনদের বাসা। সে একটা ভয়ংকর ছেলে। রাজনীতির লেবাস পরে মানব জীবনের প্রায় সকল নীতিই সে ত্যাগ করেছে। সারাদিন ভমভম করে মটরবাইক চালায়, একে মারে, ওকে ধরে। কিন্তু আভার সামনে পড়লেই একেবারে অন্য মানুষ। সালাম দিয়ে বলবে, ম্যাডম, আমরা ত আর মানুষ রইছিনা, তবু আপনেরে কৈ, আপনাদের মতন দুই-চাইরজন আছেন বলেই দেশে অহনও দুই অক্ষর ল্যাহাপড়া আছে।

তারপর আশপাশে রিকশা থাকলে রিপন রিকশাওয়ালেকে চড়া গলায় হুকুম দিবে, এই ম্যাডমরে ইস্কুলে দিয়া আয়। ভাড়া নিছ না কিন্তুক।

বৃষ্টিটিষ্টি না থাকলে আভা রিকশা নেয় না। সারাদিন তো বসেই থাকে। এই এক কিলোমিটার পথ হেঁটে যাওয়া-আসা করলে শরীরের কলকব্জাগুলো ভালো থাকে; রাতে ঘুমটাও গভীর হয়।

‘নায়ার এক নাও,
নিনায়ার শতেক নাও।’

এই প্রবাদ বাক্যের মতো পত্রিকার পাতায় দুর্ঘটনার খবর আর আহতদের সাথে আভার নাম দেখে এই রিপনই সবার আগে গিয়ে হাজির হয়েছিল। তারপর স্কুলের হেডমিস্ট্রেস এবং আরো অনেকেই। এই রিপনই নাকি উপজেলার ক্ষমতাধর এক লোককে দিয়ে হাসপাতালে ফোনও করিয়েছিল। সেই লোকটির ছোট মেয়ে আভার স্কুলের ছাত্রী, সে নাকি সুযোগ পেলেই বাসাতে আভার গুনকিত্তন করে।

এই এক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হাঁটতে আজ আভাকে অন্তত দশবার থামতে হয়, কথা বলতে হয়। তাই স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়ে যায়। প্রাত্যহিক সমাবেশে মেয়েরা সব মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। স্কুলের বড় আপাসহ সব শিক্ষক-শিক্ষিকারাও সামনে এসে লাইন বেঁধে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংগীত শুরু হবে হবে এই টাইমে আভাও এসে দাঁড়ায়। মুহূর্তে মেয়েদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে যায়। সবাই বলতে থাকে, আপা আইছে! অই যে আভা আপা!

হেডমিস্ট্রেস এসে আভার পিঠে হাত রাখে, দেখেছ মেয়েদের অবস্থা। ওরা তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে। তোমার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মেয়েদের কী কান্না! আজ আমি না, জাতীয় সংগীতের সাথে জাতীয় পতাকাটা আমার পক্ষে তুমিই উত্তোলন করো, তোমার প্রিয় ছাত্রীরা খুশি হবে।

মেয়েরা সবাই আভার সাথে কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে দেখে সমাবেশ শেষে প্রধান শিক্ষিকা ঘোষণা করেন, তোমরা সবাই শান্ত হও। আজ আভা ম্যাডাম তোমাদের সাথে কথা বলার জন্য একে একে সব ক্লাসেই যাবেন।

কমন রুমে ফিরতে ফিরতে সকল শিক্ষকরাই আভার খোঁজ-খবর নেয়। রকিব সাহেব আভাকে অপছন্দ করে। বিয়ের আগে লোকটা তার সাথে ভাব জমাতে চেয়েছিল আভা পাত্তা দেয় নি। শেষে আরেক শিক্ষককে দিয়ে আভার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল। আভা অবাক, এইসব কী বলছেন! মা-বাপ, আত্মীয়-এগানাহীন, শেকড়-বাকড়হীন আমাকে বিয়ে করলে উনি শশুরবাড়ির কত কিছু থেকে বঞ্চিত হবেন।

সেই থেকে রকিব সাহেব আভাকে দেখলেই ঘাড় ত্যাড়া করে রাখে। আজ সে আভার পাশের চেয়ারে বসে জানায়, আপনার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সারা স্কুলের সব মেয়েরা বিদ্রোহ ঘোষণা করল, যেভাবেই হোক তারা সব আভা আপাকে দেখতে যাবে। ছোট্ট এই উপজেলা শহরে মানুষের মাঝেও একটা হিড়িক পড়ে গেছিল, চান্দা উঠাও, যত টাকা লাগে আভা ম্যাডামকে বাঁচাও।

রকিব সাহেব মাথা নুয়ে কতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। তারপর আবার আস্তে আস্তে বলতে শুরু করে, এই দুর্ঘটনা না ঘটলে আমরা বুঝতেই পারতাম না এখনো এই সমাজে একজন ভালো আর মহৎ শিক্ষকের কত সম্মান!

সন্ধ্যায় আভার ছাত্রী রুবিনা আসে। আভা দরজা খুলতেই মেয়েটা আপু... বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। নতমুখী রুবিনা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, তোমার কিছু হলে আমি শেষ।

আভা এগিয়ে এসে তার মাথায় মমতার হাত রাখে, আমার কিচ্ছু হয় নি আর আপাতত হচ্ছেও না। ওমা হাতে দেখি আবার টিফিন ক্যারিয়ার!

এই বলে আভা উড়না দিয়ে মেয়েটার চোখ মুছে দেয়। হাতের টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে টেবিলে রাখে, যে দারুণ গন্ধ বেরুচ্ছে রে... নিশ্চয়ই আমার পছন্দের কলমিশাক আর ছোট মাছের চচ্চড়ি।

আভা খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে। সে চেয়ারে বসলে রুবিনা তার খাটে বসবে না তাই মেঝেতে রুবিনাকে সামনে বসিয়ে আলাপ জুড়ে, এবার বল তুর ছোট ভাইটা ভালো আছে?

জি।

আব্বা-আম্মা?

সব ভালো। শুধু আমার মা-বাবা নয়, স্কুলের সব মেয়ের মা-বাবাই তোমার জন্য দোয়া করেছে।

তোর পড়ার কথা বল। কেমেস্ট্রির জারণ-বিজারণ চ্যাপ্টারটা কি শেষ হয়েছে?

হ।

বাংলা ব্যাকরণ?

শেষ।

তোর ছোট ভাই দুইটা পড়ছে তো?

রুবিনা মাথা নেড়ে সায় দেয়। তার কালো কুচকুচা চোখ দুইটাতে আপুর জন্য ভালোবাসা ঝিকঝিক করছে।

রুবিনা যখন সিক্সে এসে প্রথম ভর্তি হয় তখন সে এই লিকলিকে আর ছোট। প্রথম দিন গণিতের ক্লাসে গিয়ে আভার চোখপড়ে রুবিনার উপর। তখনো সে স্কুলের ড্রেস বানায় নি তাই বটপাতার মতো কালো আর ঝলমলে মেয়েটার গায়ে রঙচটা পুরোনো জামা। ক্লাসের এক কোনায় শত অপরাধীর মতো জড়সড় হয়ে একা বসে আছে। এইরকম দৃশ্য আভাকে কষ্ট দেয়। ক্লাসের সুন্দরী কিংবা টাকাওয়ালার মেয়েটার সাথে তুলোতুলো করে আদুরে গলায় সবাই কথা বলে। তত্ত-তালাশ নেয়। আভা এইসব পারে না। তাই স্কুলে রুবিনার মতো মেয়েরাই তার কাছে বেশি গুরুত্ব পায়, এই তোমার নাম কী?

রুবিনা চট করে উঠে দাঁড়ায় এবং নিজের নাম বলেও দাঁড়িয়ে থাকে। এই এত্তটুকু মেয়েটার চোখে ঝকঝক করছে পরবর্তী প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা। সরকারি প্রাইমারি থেকে যারা আসে তাদের অধিকাংশই ঠিকমতো ইংরেজি-বাংলা রিডিং পড়তে পারে না। গণিতের যোগ-বিয়োগের হাতটাও খোলে না। তাই আভা একটু হেসে আবার জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন ক্লাসে ভর্তি হয়েছ?

সিক্সে।

সিক্স বানান করো তো।

এস আই এক্স।

পনেরোর নামতাটা শোনাও দেখি।

রুবিনা এক দমে পনেরোর নামতাটা বলে যায়। এবার আভা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় থেকে প্রশ্ন করে, পরিবার কাকে বলে?

মা-বাবা ভাই-বোনকে নিয়ে একত্রে বসবাস করাকে পরিবার বলে।

তোমার দাদা-দাদি নাই?

আছে।

চাচা-চাচি নাই?

আছে।

আভার কষ্ট লাগে। এই শিশুদের শিখানো পরিবার থেকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ছেঁটে ফেলা হয়েছে! দাদা-দাদি না থাকলে শিশুরা কার কাছ থেকে শুনবে ডালিমকুমারের কিচ্ছা, পরিবারে চাচা না থাকলে কে তাকে কাঁধে করে নিয়ে যাবে বাংলা নববর্ষের মেলায়?
হায়! হায়! আধুনিক বিশ্ব কোনদিকে তোমার গন্তব্য?


তোমাদের মতো যোদ্ধারা মাঠ ছেড়ে দিলে বাংলাদেশের স্কুলগুলা গরু-ছাগলের চারণভূমি হয়ে যাবে।


মনের কষ্ট হৃদয়ে চাপা দিয়ে আভা উঠে পড়ে, রুবিনা খালি টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বাসায় যাবে?

ফ্রিজে সম্ভবত এক পোটলা গরুর মাংস আছে। তার যেমন কলমিশাক, ছোট মাছ পছন্দ তেমনি রুবিনার গরুর মাংস। রুবিনাদের বাড়ি উপজেলা শহরের শেষ দক্ষিণে। বাড়ির ডাইনে নিচু জমি আর বামে ছোট একটা নদী। রুবিনার বাবা আগে রিকশা চালাত এখন মিশুক চালায়। গরিবের মেয়ে পলট্রির মুরগি, ফিশারির রুই-কাতলা মাছের বদলে শাক-শুঁটকি, লতাপাতা আর খাল-বিলের ইচা-চান্দা মাছ খেয়ে চোখে-মুখে, শরীরের কালো চামড়ায় গড়িয়ে পড়ে কলমিশাকের লাবণ্য।

ঢাকায় প্রশিক্ষণে যাওয়ার আগে আভা পাঁচশ তিরিশ টাকা দিয়ে একটা ছাতা কিনেছিল। রুবিনার ছাতাটার শেষ দশা। তাই আভা শোকেসের উপর থেকে নতুন ছাতাটা এনে রুবিনার হাতে দেয়, এটা তোর জন্য। আর আগামীকাল থেকে সন্ধ্যায় আমার কাছে পড়তে আসবি। মাত্র আর সাত মাস আছে ফাইনালের।

রুবিনার চোখে খুশি উপচে ওঠে।

আজ ছুটির পর আভা যখন তার পদত্যাগপত্র হেডমিস্ট্রেসের হাতে দেয় তখন তিনি ওটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে করতে বলেন, এইসব কুচিন্তা ছাড়ো, তোমাদের মতো যোদ্ধারা মাঠ ছেড়ে দিলে বাংলাদেশের স্কুলগুলা গরু-ছাগলের চারণভূমি হয়ে যাবে।

গরুর ভুনামাংস ভরা টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিয়ে রুবিনা বেরিয়ে গেলে দরজার লক লাগাতে লাগাতে আভার চোখ ছলছল করে ওঠে, বন-বাদাড়ের জল-কাদা থেকে আলোর দিকে মুখ তুলতে চাওয়া রুবিনার মতো কলমি ফুলগুলোর জন্যই হয়তো হেডমিস্ট্রেস আভাকে ছাড়তে চাইছেন না।


পর্ব-৮ 

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা