পর্ব-৯
কনকের মনের কথা
আকাশের যেমন সাতটা স্তর আছে তেমনি মাটিরও অনেকগুলো পরত আছে। কতটা পরত নিয়ে মানুষের জীবন? কতটা আবরণ দিয়ে মানুষ তার সাড়ে তিন হাত দেহটাকে সব সময় আড়াল করে রাখতে চায়? কনক চুপ করে বসে থাকে। মনে অসংখ্য প্রশ্নের তোলপাড়। মনপুরার চরে ছয় ফুট লম্বা ডিঙ্গির মতো এক অস্ট্রেলিয়ান আধা বুড়ির সাথে তার দেখা হয়েছিল। মহিলার বিস্তর টাকা। স্বামী নাই, সন্তান নাই। মানুষটার প্রাণখোলা হাসি দেখে বুঝা যায় জীবনে এইসবের খুব বেশি দরকারও নাই। তো মহিলা সারা দুনিয়াটা চরাট করে শেষে বাংলাদেশে এসে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছেন। তাই বছরে দুইবার ব্যাগ বোঝাই করে ডলার নিয়ে এসে ছোট্ট একটা এনজিওর মারফত কাঙাল-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে যান। মহিলা তাকে নিজের ছেলের মতো মায়া করত। মাঝে মাঝে দেখাটেখা হলে হেসে হেসে বলত, নেভার মাইন্ড মাই বয়, লাইফ ইজ নাথিং বাট ওয়ার্ক ইজ লাইফ।
কষ্টের কথায় কী আর রং চড়ানো যায়? তাই এইসব লেখা যত ছোট হয় পাঠক ততই আলোড়িত হয়।
এটা তো সুশীল পৃথিবীর একজন সভ্য মানুষের কথা। কিন্তু আমাদের এই জনপদ? কনক চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। অনেকক্ষণ পর তার মনে হয়, এই সমাজের মানুষকে দেখে দেখে কেন জানি তার বারবার মনে হয় :
‘জীবন যার যার, পৃথিবীতে কে কার।’
তাই আধুনিক মানুষের মনে কষ্টের কোনো অন্ত নাই। কষ্টের বদলে শান্তির তালাশ না করে মানুষ জনমভর সুখ সুখ করে ঘোড়ার মতো দৌড়ায়। শান্তির জন্য পয়সা খরচ করতে হয় না। তাই শান্তি মাঠের সবুজ, বিলের স্বচ্ছ-নীল পানির মতো খোলা আকাশের নিচে অবহেলায় পড়ে থাকে। কেউ ফিরেও দেখে না। কিন্তু সুখের জন্য চড়া দাম দিতে হয়। চকচকে সুখকে উচ্চ মূল্যে খরিদ করে দালান-কোঠায়, লোহার লকারে লুকিয়ে রাখতে হয়। সুখটাকে নিরাপদ করে রাখার জন্য কত টেনশন! কত আয়োজন! ব্যস্ততার ঘূর্ণিতে মুখে ফেনা ওঠে! কে কার মনের কথা শুনবে? কারো কাছে হৃদয় খুলে একটু কথা বলতে পারলে কত শান্তি লাগে। সেই নিঃসঙ্গ জেনারেলের কথা প্রায়ই কনকের মনে পড়ে। লোকটা বুকে কত কথার পাষাণ ভার নিয়ে পরবাসে গিয়ে আত্মাহুতি দিল! এই বোধ থেকেই কনক একটা ওয়েভ ম্যাগ চালায়। ‘আমার মনের কথা’ শিরোনামে সপ্তাহে একটি মাত্র সংস্করণ বের করে। সবার মনে পাহাড় পরিমাণ কথা চাপা থাকলেও খুলে বলার মতো সাহসী মানুষ খুব কম। তাই লেখাও আসে কম। মাঝে মাঝে একটা লেখাও আসে না। তখন ছদ্মনামে কনকই তার মনের কথা লিখে ছেপে দেয়। এইভাবে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারলে বুক থেকে পাথর নামানোর মতো শান্তি পাওয়া যায়। এই পোড়া সংসারে শান্তির বড়ো অভাব।
ইশরাত জাহান আভা নামে একজন ‘আমার মনের কথা’ পাঠিয়েছে। লেখাটা ছোট। ছোট তো হবেই। সুখের আলাপ রসিয়ে রসিয়ে করতে সবাই ভালোবাসে। তাই প্রেম-পিরিতির আগডুম-বাগডুম লিখতে লিখতে শেষ হয় না। কষ্টের কথায় কী আর রং চড়ানো যায়? তাই এইসব লেখা যত ছোট হয় পাঠক ততই আলোড়িত হয়। ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর ভাবে। একটা মানুষের মনের কথা মানে তার অশ্রুভেজা ইতিহাস, দীর্ঘশ্বাসের আগুনে ঝলসানো জীবন দর্শন। গত চার বছর ধরে দুর্গম চরাঞ্চলে দুঃখী, দুর্ধর্ষ, নিষ্ঠুর আর চরম গরিব মানুষের মাঝে কাজ করতে করতে কনক বাংলাদেশটাকে একটু একটু করে বুঝতে চেয়েছে। আগে তো আর সে মানুষ ছিল না। দেহটা বাংলাদেশে থাকলেও, মদ-রুটি-মাংস আর বাঙালি মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করলেও মনটা পড়ে থাকত উন্নত বিশ্বের চোখ ধাঁধানো নগরিগুলোতে। কবে জঞ্জালের, দুর্গন্ধের এই নর্দমা থেকে সে পালাবে? কিন্তু এখন সে দিনে দিনে নিজের জীবনের কুৎসিত ও বেদনাময় অতীত থেকে বুঝতে পেরেছে, মানুষের মনের কথা কী জিনিস। তাই প্রত্যেকটা লেখা পড়ার আগে হালকা একটা স্ট্রিক টেনে হৃদয়টাকে সে শুদ্ধ করে লয়। কারো মনের কথা শুনতে হলে যে হৃদয়ে কানপেতে বসতে হয়।
তরমুজের একটা বিচি পরিমাণ জিনিস আস্ত একটা সিগারেটে ভরে সে নিঃশব্দে ব্যালকনিতে চলে আসে। পাশের রুম দুইটাতে সবাই ফেসবুকে জীবনের স্বর্গ খুঁজছে। ইউনিয়ন পরিষদের পাশে দু’তালার এই ব্যালকনি থেকে প্রায় সারাটা চর দেখা যায়। কনক সিগারেটটা ধরায়। জিনিস খুব সামান্য পরিমাণ তাই ধোঁয়ায় কোনো বাজে গন্ধ নাই। প্রতিটা টানে মিষ্টি মিষ্টি একটা স্বাদে তার মুখটা ভরে উঠছে। চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র একটা সিগারেট। গল্পের মতো তার নতুন এই জীবনটা কনক সাধকের মতো শাসনে রাখে, শুধু ঘুমের সময়টুকু বাদে কাজে ডুবে থাকে। তা না হলে কবে সে পাগল হয়ে যেত।
থানা-ইনচার্জ মাকে শাসায়, যাও যাও এইসব শোনার সময় নাই।
আয়েশি ভঙ্গিতে সিগারেটটা টানতে টানতে কনক দেখে সারা চর জুড়ে হারিকেনের বিন্দু বিন্দু আলো। এবার চরে তরমুজ-ভাঙ্গির ফলন খুব ভালো হয়েছে। বাজার দরও ভালো। তাই চাষিদের খুব আনন্দ। ফসল পাহারা দিতে আসা লোকগুলো খড়ের আগুন জ্বালিয়ে, থালা আর সিলভারের কলসি বাজিয়ে গাইছে :
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসমালমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম। আগে কী সুন্দর...’
কোথায় সুনামগঞ্চের কোন অতল হাওড়ের শাহ আব্দুল করিম আর কোনখানে গফরগাঁওয়ের চরালগীর চর। বিজ্ঞানের এই হাজার হাজার অবাক আবিষ্কার, আধুনিকতার এই চোখ ঝলসানো জৌলুশ কোনো কিছুই আজ মানুষের দুঃখী মনকে তৃপ্ত করতে পারছে না। তাই তারা অনাবিল সুখ ও সুন্দরের তৃষ্ণায় প্রায় শত বছর আগের সহজ জীবনের বন্দনা গাইছে, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...
মুখে একটা নির্লিপ্ত স্বাদ নিয়ে কনক ল্যাপটপে আভার পাঠানো ফাইলটা ওপেন করে।
আমার মনের কথা ইশরাত জাহান আভা
১. আমাদের বাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ শব্দটা শোনার সাথে সাথে নিশ্চয়ই আপনাদের চোখে দুইটা ছবি ভেসে ওঠেছে :
ক. শীতলক্ষ্যা নদীতে নামিদামি সাতজন মানুষের লাশ ভাসছে।
খ. সেভেন মাডারার্স নূর হোসেন এবং তার গডফাদার নামের সেই দানবটির চেহারা মনে ঝলকে উঠছে।
তো আমার কোনো ভাই-বোন ছিল না। অভাব অনটনের মাঝেও আমাদের ছিল সোনার সংসার মানে সুখের সংসার। আমার বাবা ছিল মাছ চাষি। নিজের পাঁচ-ছটা পুকুরে শিং-কই-তেলাপিয়া চাষ করত। সব খরচটরচ বাদ দিয়ে বছরে একটা ভালো টাকা আয় হতো। আমার দশ বছর বয়সের সময় বাবা শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবিতে মারা যায়। শেষতক নিরুপায় মা সংসারের হাল ধরে। আমাদের গ্রামের মেম্বারটা ছিল নূর হোসেনের চেলার চেলা। রাজনীতির খোলসপরা রাক্ষসটার চোখ পড়ে আমার সুন্দরী মা আর পুকুর-বাড়ির উপর। নানা ভাবে সে মাকে ফুসলাতে থাকে। মা কিছুতেই পাত্তা দিচ্ছে না দেখে সে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। এইবার মা খুব রাগ করে। রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে ঘটক হয়ে আসা লোকটাকে ইচ্ছামতো কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেয়। তার তিনদিন পরে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের পাঁচটা পুকুরের সব মাছ মরে ভেসে উঠেছে। পানিতে বিষাক্ত গন্ধ!
মা কাঁদতে কাঁদতে থানায় ছুটে যায়। থানা-ইনচার্জ মাকে শাসায়, যাও যাও এইসব শোনার সময় নাই। কত মানুষ মরে পথে-ঘাটে পড়ে আছে আর তুমি আসছ তোমার মাছের...। যাও যাও, তোমার গ্রামের মেম্বারের কাছে যাও।
এবার মা গ্রামের মুরুব্বিদের কাছে ছুটে যায়, আত্মীয়দের কাছে সাহায্য চায় কিন্তু কেউ নাকের শ্বাসটাও ফেলে না; বাঁশের লাঠি নিয়ে রাক্ষসের গুহায় ঢুকবার সাহস এই দেশে কার আছে?
আভার মার বাড়িতে ডাকাতি হইছে গ...। ডাকাইতরা মা-মেয়েরে সারা রাইত বলাৎকার করছে।
সেই লোকটা আবার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, দ্যাখলাত? কেউরে পাইবা না। অহনও সময় আছে রাজি হইয়া যাও।
মা ঠান্ডা গলায় লোকটার কাছে জানতে চাইল, আফনে বাহির হইয়া যাইবাইন না আমি মানুষ ডাহাম?
লোকটা মুখ কালো করে বেরিয়ে গেল।
সেই রাতেই দরজা ভেঙে মেম্বার আমাদের ঘরে ঢুকে, সাথে আরো তিনজন। আমার হাত-পা, মুখ বেঁধে বাইরের বারান্দায় ফেলে রাখে। তারপর মায়ের উপর চলে নির্যাতন। চার-পাঁচটা পশুর দাপাদাপিতে মা জ্ঞান হায়। দরজা ভাঙার শব্দে প্রতিবেশীরা টু শব্দটাও করল না। সবাই জানে, বাড়াবাড়ি করলে নূর হোসেনের চেলার চেলা কাউকে ছাড়বে না। পরদিন এলাকায় প্রচার হয়, আভার মার বাড়িতে ডাকাতি হইছে গ...। ডাকাইতরা মা-মেয়েরে সারা রাইত বলাৎকার করছে।
তিনদিন হাসপাতালে কাটিয়ে মা থানায় গেল মামলা করতে। মামলা তো নিলই না উল্টো মাকে অশ্লীল গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দিল। আমাদের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় নারায়ণগঞ্জ শহরের এক ধনী ব্যবসায়ী। মা আমাদের জমি, বাড়ি, পুকুর সব গোপনে তার কাছে পানির দামে বেচে দেয়। তারপর সব টাকা ব্যাংকে আমার নামে আমানত রাখে। শুধু মাসে মাসে লাভের টাকাটা আমি পাব। তারপর রাতের অন্ধকারে মা আমাকে নিয়ে চলে আসে জামালপুরের ইসলামপুরে। এখানে আমার ছোট খালার বাড়ি। মা আমাকে খালার হাতে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সেই রাতেই সিলিং ফেনের সাথে গলায় ফাঁসি দিয়ে আমার মা জীবন নামক জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পায়।