নরকের সহস্র তোরণ : ৮

পর্ব-৭

পর্ব-৮

 

মাৎস্যন্যায়ের শিল্পরূপ

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আভা তার মাথার ফাটা দাগটা দেখছিল। কপালের পেছন থেকে মাঝমাথা পর্যন্ত চৌদ্দটা সেলাই দেওয়া শুকনা ফাটলটাকে উপর থেকে তোলা ভারতের ফারাক্কা বাঁধের মতো লাগছে। এই উপমা মনে আসাতে আভা একলা একলাই হাসে। এই বাসার মালিক এক ইতালি প্রবাসী। বুড়ি শাশুড়ি আর ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে বউটা থাকে দুই রুম নিয়ে। ফ্ল্যাটের সবচে ছোট রুমটাতে হাজার টাকায় ভাড়ায় থাকে আভা। বউটার সংসার ছোট তাই এই রুমটা ফাঁকা পড়ে থাকত। আভা একা এবং নির্ঝঞ্ঝাট দেখে সস্তায় তাকে রুমটা দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত তারা ধরেই নিয়েছে আভার মতো এমন লতা-পাতাহীন মানুষ এই দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নাই। চরিত্রহীন মানুষ বুদ্ধিমান হয় না। কিন্তু সে চতুরতায় শিয়ালের মতো হয়। আভার বাসার মালকিনও তাই। স্বামী ছাড়াও মহিলার একটি উপদেবতা আছে। মাঝে মাঝে গভীর রাতে তিনি আসেন। যেদিন আসবার কথা থাকে সেদিন বিকাল থেকেই মহিলার চোখ-মুখের ধার আর নানান রকম প্রস্তুতি দেখে আভা টের পায়। সেদিন হয় শাশুড়িকে তিন মাইল দূরে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে না হয় প্রেসারের বড়ির সাথে ঘুমের একটা বড়িও বুড়ির হাতে তুলে দিবে। এই সংসারে কোনো সত্যই গোপন থাকে না। এই গরল একদিন না একদিন বউটার জীবনকে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর মতো মরুময় করে দেবে।

আভার ছোট্ট রুমটার সাথে একটা বাথরুম আছে। এত ছোট যে সেখানে একজন মানুষ কোনোমতে তার দরকারটুকু সেরে নিতে পারে। তার সাথে দুই হাত জাগার মাঝে একটা খেইলানি কিচেন। সাথেই পাখির খাঁচার মতো গ্রিলদেওয়া ব্যালকনি। সেখানে দাঁড়ালে দুনিয়াটা অনেক বড় হয়ে চোখে ধরা দেয়। মালকিনির মুখে সে শুনেছে, তার স্বামী মাত্র কুড়ি বছর বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান-ইরান হয়ে একমতো হেঁটে হেঁটেই ইতালিতে চলে গিয়েছিল। জীবনের বিচিত্র ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতায় হৃদ্য মানুষটা কোনো খেয়ালে এরকম একটা অদ্ভুত সাবলেট বানিয়েছিল?


খেজুরের রস যেমন ফোঁটায় ফোঁটায় জমে তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে স্নেহ, মমতায়, বিশ্বস্ততায় দিনে দিনে গড়ে ওঠে।


রাস্তার এক পাশ দিয়ে আভা স্কুলের পথে হাঁটছে। স্কুলে যাওয়ার জন্য পথে নামতেই তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। একটা দুঃখবোধ তার সর্বাঙ্গ জড়িয়ে ধরে। এই অন্ধকার মাটিতে শিক্ষার আলো জ্বালাবার জন্য কত মহৎপ্রাণ শিক্ষকেরা নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। হাজার বছর পরাধীন এই জাতির মনে জ্ঞানের বাতি জ্বালার জন্য নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভুলে নিরন্তর চেষ্টা করেছে। মানব কল্যাণে তাদের ত্যাগ আজ ইতিহাস। প্রকৃত শিক্ষক প্রথমেই শিক্ষার্থী ও তার নিজের মাঝে ভালোবাসার সেতুবন্ধন দিয়ে পরস্পরকে বেঁধে নেয়। এই বন্ধন একদিনে গড়ে ওঠে না। খেজুরের রস যেমন ফোঁটায় ফোঁটায় জমে তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে স্নেহ, মমতায়, বিশ্বস্ততায় দিনে দিনে গড়ে ওঠে। তখন পবিত্র হাসি-আনন্দ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শ্রেণিকক্ষটা হয়ে উঠবে একটা অপার্থিব জগৎ। একজন দিতে উন্মুখ আর বাকিরা নিতে তন্ময়। তখন দেওয়া ও পাওয়ার আকুলতা হয় ক্লান্তিহীন।

স্কুলে গিয়ে আভা হতবাক : কমিটির সভাপতি তার এক নম্বর চেলা রিপনকে সাথে নিয়ে স্কুলে হাজির। আভা সালাম দিয়ে স্টাফ রুমে ঢুকতেই সভাপতির রাগী গলা থেমে যায়, আরে ম্যাডাম যে আপনার শরীরের কী অবস্থা?

জি, এখন অনেক ভালো।

বসেন ম্যাডাম। বসে শুনুন আমার স্কুলের গুণবান শিক্ষকদের কীর্তিকলাপ।

মুকিত সাহেবের দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখেই আভা বুঝে ফেছে ঘটনা তাকে নিয়েই। লোকটার লজ্জা-শরম, ভয়-ঘেন্না কিছুই নাই। সকালে তিনটা, বিকালে দুইটা ব্যাচে কমপক্ষে একশ ছাত্র-ছাত্রী প্রাইভেট পড়ায়। পাঁচতলা ফাউন্ডেশানের উপর একটা দু তলা তুলে চারটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছে তবু তার ক্ষিধার শেষ নাই। যত্তভাবে ছাত্রীদেরকে ঠকানো যায়, শোষণ করা যায় সবগুলো কৌশলই তার রপ্ত করা। আভা নিঃশব্দে একটা চেয়ার টেনে কোনোমতে নিজেকে লুকাতে চায়। কারণ ঘটনা মুকিত সাহেবের হলেও তো লোকটা তার জাত ভাই। তাই ওর গায়ে কালি লাগলে তার শরীরটাও তো মলিন হয়।

সভাপতি আবার শুরু করে, আপনার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। আপনি কেমন শিক্ষক? ক্লাস টেনের ইংরেজি কত গুরুত্বপূর্ণ একটা সাবজেক্ট। প্রায়ই মাথাব্যথার কথা বলে খণ্ডকালীন শিক্ষকদেরকে পাঠিয়ে দেন। তারপর অফিসে বসে বসে দাবারগুটিতে চাল দেন। বিকালে যখন প্রাইভেট পড়ান তখন তো মাথা ব্যথা থাকে না। সব সহ্য করেছি কিন্তু আমার স্কুলের মেয়ের ফোন নাম্বার হাইস্কুলের একটা বখাটে ছেলেকে দিয়ে দিলেন কোন বিবেকে?

এইবার মুকিত সাহেব মাথা তুলেন, বিশ্বাস করুন সব ষড়যন্ত্র।

সভাপতি হা...হা... করে হেসে উঠে বলেন, রিপনকে সেই ছেলেটার কাছে পাঠিয়েছিলাম তার মুখ থেকেই শুনুন।

রিপন সভাপতির চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। সভাপতি আবার উপজেলা চেয়ারম্যানও। তাই তার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকাটা রিপনের জন্য মহা গৌরবের। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলে, সেই ছাগলটা ত আপনার কাছেই প্রাইভেট পড়ে। গত মাসে তার বাবা বিদেশ থেকে আসার সময় তার জন্য একটা দামি মোবাইল সেট আনে। লোকটা আবার বিদেশে চলে যেতেই সেটটা সে আপনাকে উপহার দেয়। যেদিন ফোনটা দেয় তার পরের দিন আপনার কাছে এসে তুতসীর ফোন নাম্বার চাইলে আপনি তাকে দিয়ে দেন। তারপর থেকেই মেয়েটার উপর নেমে আসে গজব। বদমাইশটা দিনে একশবার ফোন দিয়ে খালি খারাপ খারাপ কথা বলে মেয়েটার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। গেছেকাল সন্ধ্যায় মেয়েটার বাবা...

...আমার বাসায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

এই কথা বলে সভাপতি দম লয়। তারপর মুকিত সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন, তুতসী এখন আত্মহত্যা করতে চাইছে। খোদা না করোক যদি এমন কিছু ঘটে যায় তাহলে এর জন্য আমরা আপনাকে দায়ী করব।

এই বলে সভাপতি সাহেব রিপনের অসমাপ্ত বাক্যটা শেষ করেন।

মুকিত সাহেব এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন, সবাই আমার বিরুদ্ধে, সব ষড়যন্ত্র।

সভাপতি সাহেব নির্দয় ভঙ্গিতে আবার হো হো করে হেসে ওঠেন, এইটা রাজনীতির মাঠ না, ইস্কুল। এখানে দলাদলির জন্য, নাকি পড়াতে এসেছেন আপনারা? আর এখন দেখছি আপনারা টাকা পেলে আমার ইস্কুলের মেয়েদেরকেও বিক্রি করে দিবেন!

সভাপতির গণহারে আপনারা! আপনারা! বলাটা আভার একটুও ভালো লাগছি না। তার ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে স্কুল ছেড়ে পালায়। তার নাক-মুখ জ্বলছে। ঘেন্নায় শরীর করছে রি রি।


স্বার্থের পচা গন্ধে ঝিমিয়ে পড়া গ্রুপগুলো একটু একটু করে মাসখানেকের মাঝেই প্রাণ পাবে। এবং আভা এ-ও জানে, সভাপতি সাহেব আর স্কুলে মিটিং করার সময়ই পাবেন না।


সভাপতির ছোট ছোট শীতল চোখ দুইটাতে কুটিলতার নানান ঝিলিক, আমরা রাজনীতির মানুষ, আমাদের লাইনে পুরানা দিনের একটা গল্প চালু আছে : একজন মন্ত্রী শপথ-টপথ করে কাজে যোগ দিলেন। কিছুদিন পরেই তার দপ্তরের অব্যবস্থাপনা ও নানান অসঙ্গতির কথা মিডিয়ায় আসতে থাকে। উপর থেকেও চাপ আসছিল। কিছুতেই তিনি কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। মন্ত্রীর অবস্থা কেরাসিন দেখে তার বুড়া পিয়ন এনে মহোদয়ের হাতে সিলগালা করা গোপন তিনটা চিঠি দেয়। মন্ত্রীমহোদয় প্রথম চিঠিটা খুলেন। চিঠিতে মাত্র একটা লাইন লেখা, ‘সাবেকজনের উপর দায় চাপান।’

প্রেস কনফারেন্স ডেকে বিকালেই তিনি তার দপ্তরের সাবেক মন্ত্রীর উপর সমস্ত দায় চাপিয়ে বিবৃতি দিলেন। ব্যস, এক ডোজেই সব ঠান্ডা । মাস ছয়েক যেতে না যেতেই আবার তার বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকা সরগরম হয়ে ওঠে। তিনি বেদিশা হয়ে আবার দ্বিতীয় চিঠিটা খুলেন, ‘বিরোধী দলের কয়েকটা কূটকৌশলের কথা উল্লেখ করে বলে দাও তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’

প্রেস কনফারেন্স ডেকে মন্ত্রী এবার কাঁদু কাঁদু গলায় বললেন, আমার বিরুদ্ধে গুরুতর ষড়যন্ত্র চলছে।

আবার মুসিবত আসান।

পাঁচ বছরের মেয়াদ প্রায় শেষ শেষ। মন্ত্রীমহোদয় নামে-বেনামে বেশ সুবিধা করে নিয়েছেন। তো আবার তার বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সাথে উপর থেকেও কড়া ধাতানি আসে। নিরুপায় হয়ে তিনি শেষ চিঠিটা খুুলেন, ‘এইরকম তিনটা চিঠি লিখে, পিয়নের হাতে দিয়ে, পদত্যাগ করে হজে চলে যান।’

সভাপতি সাহেব উঠতে উঠতে বলেন, হেড ম্যাডাম, মুকিত সাবের পদত্যাগপত্রটা রেখে দিবেন। দশ তারিখের মিটিংয়ে আমরা রেজুলেশন করে নেব।

এই ঘোষণায় স্কুলের সব শিক্ষকরাই মহাখুশি। এখন আর কোনো গ্রুপ নাই। কোনো দলাদলি নাই।

‘এক গ্রুপ এক দাবি,
মুকিত তুই কবে যাবি।’

আভার অভিজ্ঞতা বলে, যদি একান্তই মুকিত সাহেবকে চলে যেতে হয়। তবে আবার স্বার্থের পচা গন্ধে ঝিমিয়ে পড়া গ্রুপগুলো একটু একটু করে মাসখানেকের মাঝেই প্রাণ পাবে। এবং আভা এ-ও জানে, সভাপতি সাহেব আর স্কুলে মিটিং করার সময়ই পাবেন না। কারণ দুই-তিনদিনের মধ্যেই মুকিত সাহেব রিপনকে হাত করে হাজার টাকা নোটের ডাউস একটা বান্ডিল নিয়ে সভাপতি সাহেবের সাথে দেখা করতে যাবে। কারণ এখন যে আমাদের সোনার বাংলায় মাৎস্যন্যায় চলছে।


পর্ব-৯

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা