পর্ব-১৮
পর্ব-১৯
ব্রহ্ম আর আমি অভিন্ন
সোহম ধ্বনিছে নিত্য...
সোহম মানে আমিই সে অর্থাৎ আমিই ব্রহ্ম, ব্রহ্ম আর আমি অভিন্ন। তাই ব্রহ্মাত্মা আর পরমাত্মা এক সূত্রে, এক মন্ত্রে। সাগরে ঢেউ উঠলে নদীতে আসে বান। ভাবতে ভাবতে কনক চেয়ে দেখে আকাশে সূর্যটা নাই। শূন্যের মহারাজ অসীম শূন্যতায় মিলিয়ে গেছে। দক্ষিণ দিগন্তের শেষ দুর্গ থেকে থরে থরে মেঘ উঠে এসে দখলে নিয়ে যাচ্ছে তামাম দুনিয়া। এখন তারা আকবরশাহী ফৌজের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যাচ্ছে উত্তর দিকে। এতক্ষণ মাটির পৃথিবী হাসছিল, খেলছিল, এখন বুকে অন্ধকার নিয়ে বিষাদে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
কী এক উপলক্ষে শুক্র, শনির সাথে আরো দুই দিনের ছুটি পাওয়া গেল তাই শূন্য বাড়িটাও হয়ে গেল ব্রহ্মের হৃদয়ের মতো রহস্যের আকর। গাছে একটা পাখি ডাকলে, মোবাইলে রিংটোন বাজলে শূন্য বাড়িটার বদ্ধ বাতাসে বাড়ি খেয়ে খেয়ে নানান ধরনের সংকেতময় শব্দ হয়ে কনকের কানে বাজে। সে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে আমজদ। ছাতকের আমজদ। কালো, দোহারা গড়নের মানুষ। মাথায় কুঁকড়া কুঁকড়া চুল। মুখে হাসি, চোখ দুইটা রঙ্গে যায় ভাসি।
হ্যালো...?
আমজদ : কিতা বা, আমগরে ভুইলল্যা গ্যাছু নি?
তার কথাবার্তা শুনলেই মনে হবে সাড়ে তিন হাজার বছরের জীবনাভিজ্ঞতা নিয়ে সে দুনিয়াতে বিরাজমান।
আমজদের গলায় সিলেটি বুলি শুনেই কনকের মনটা খুশি হয়ে ওঠে। শব্দগুলোর মিষ্টি উচ্চারণের সুরে তার কান, মন, হৃদয় অনেকদিন পর আনচান করে ওঠে। ইচ্ছা করছে সিলেটি ভাষাতেই কথা বলে কিন্তু অসাধারণ হৃদমের এই ভাষা শুনতে যতটা মধুর আর আপন মনে হয় বলতে গেলে ততটাই অসম্ভব কঠিন আর দূরের লাগে। তাই সে নিজের জবানে, নিজের মনের কথা গানের মতো করে বলতে চেষ্টা করে।
‘কি চাইলাম, কি পাইলাম, কিযে এক ধাঁধা,
ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি এক গাধা।’
আমজদ : বুচ্ছি বা, বুচ্ছি। আমগর করিম ভাই কৈয়া গ্যাছে,
‘এই ভবের বাজারে আইলায়
হয়ে দোকানদার
কেউ হাসে কেউ কাঁদে
পাগলের বাজার...’
অরে বু, আমি আর মাত্তাম (আলাপ) না। অনকু (এখন) তুমি বশরের লগে মাতু।
বশর হলো এক কাঠমিস্ত্রি। ছোটখাটো গতরের মানুষ। লম্বাটে গড়নের মুখ। কথা বলে বিজ্ঞ মানুষের মতো ভেবেচিন্তে। তাই বন্ধুরা তাকে ঠাট্টা করে গুরু ডাকে। বশর এতে দুঃখিত না। বরং জিনিসটা সে উপভোগ করে। একদিন কাম পাইলে তিনদিন বেকার। কোনো চিন্তা নাই, আক্ষেপ নাই। তার কথাবার্তা শুনলেই মনে হবে সাড়ে তিন হাজার বছরের জীবনাভিজ্ঞতা নিয়ে সে দুনিয়াতে বিরাজমান। আলাপ-টালাপ বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে তার ভরাট কণ্ঠটা অহির মতো হুকুমের কাছাকাছি চলে যায়, হ্যালো, ভালা আছু নি বা? কতদিন দ্যাহি না! হুন বা, কুমারদানি গাঁওত উদাসী ভাই আইছে। তিন-চাইরদিন থাকব। আইয়ো একদিন গ্যায়া গপসপ করাম নে।
বাউল উদাসীর নাম শুনে কনক নিজের অজান্তেই কিছুটা আবেগ তাড়িত হয়। তাই বহুদিন পর সে-ও জোরে জোরে চেঁচিয়ে কথা বলে, বশর! তুমি, আলই, তোমরা সব কেমন আছ?
বশর : আইলে দ্যাখবা। অনকু আলইয়ের লগে মাতু।
আলই মানুষটা তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছরের লম্বা-ঢ্যাঙ্গা একটা মানুষ। পাথরের ব্যবসায় পুঞ্জিপাট্টা যা ছিল ঢাকার ব্যবসায়ী নামের এক রাক্ষসের পেটে সব হারিয়ে এখন একটা চাখানা চালায়। তার হাসি মুখটা দেখলে কেউ বুঝবে না বুকে কত জ্বালা।
আলই : আমি আর কী কৈয়াম বা, জানইত্ত তুমি শাহ আব্দুল করিমে কৈয়া গ্যাছে :
‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনি
আমারে কেউ ছুঁইও না গো সজনি।’
আজকু রাইতেই বাসে চড়। সারারাইতে আইবা।
কনক : আমি একটু পরে জানাইতাছি।
আলই : আইচ্ছ্যা...বলে ফোন কেটে দেয়।
কনক চোখ বন্ধ করে ভাবে, সুনামগঞ্জ মানেই বাউল। তবে বড় বড় মহাজনেরা আজ বিগত। বয়োবৃদ্ধ সাধকদের মধ্যে এখন শুধু উদাসী। যদি এই বিদগ্ধ বাউলের একটু সঙ্গ ও ‘আামার মনের কথা’র জন্য ছোট একটা সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়!
আবেগে-আনন্দে অস্থির কনক সাথে সাথেই কল দেয়। ওপাশ থেকে ভেসে আসে আমজদের গলা, হ্যালো... কওকা (বলো)।
কনক : সত্যি সত্যি উদাসী ভাইয়ের দেখা মিলবে তো?
আমজদ : হ।
দেড়দিনের জীবনের জন্য মানুষ কত আবরণ পরে। কত বেশ ধরে। কত আস্ফালন করে।
কনক চোখ বন্ধ করে পাহাড়ি মেয়ে সুরমার কলকল সুর শুনতে পায়। চোখের সুরমার মতো পানির রং। তাই সে সুরমা নদী। ভাটির দিকে তরতর করে বইছে, বুকে উত্তরের নীল পাহাড়ের ছায়া। কনক আবার চেঁচিয়ে ওঠে, সুরমায় পানি হইছে?
আমজদ : হ বা। মাধান রাইতে গ্যাজে বইয়া শুনা যায়, হে কলকল কৈরা যাইতাছে।
আনন্দে কনক ডগমগ। এবার সুনামগঞ্জের হাওরের কথা মনে পড়ে। খুশিতে তার বুকটা ধক করে ওঠে। পলকে সে টের পায় হাওরের আত্মা শনশন বাতাসে তার পরমাত্মায় ডুগডুগি বাজাচ্ছে :
‘মানুষের মাঝে আল্লা-ঈশ্বর নামে তাঁহার বসত
চন্দ্র-সুরুজ পহাড়-নদী বিধাতার সদয় সিফত।’
জীবনে এই প্রথম কনকের পঞ্চাত্মা আবেগে থরথর করে কেঁপে ওঠে। সে একটু জোরেই সিলেটি জবানে চেঁচিয়ে ওঠে, অরে বু... আলই, আমি আজকুই আইতাছি।
রাতের অন্ধকার চিরে বাস সিলেটের দিকে ছুটছে। কনক চোখ বন্ধ করে বসে বসে ভাবে : নীল পাহাড়ের বুক থেকে নির্মল পানি অপরূপ সুধার মতো নেমে আসছে। পৃথিবীর মানুষ তাকে ঝরনা ডাকে। পর্বতের উপত্যকা পেরিয়ে জনপদে নামতেই নদী। তারপর সহস্র যোজন পথ পেরিয়ে তার শরীরে, সর্বাঙ্গে, রক্তের কণায় কণায় নির্মম পৃথিবীর পাপ-তাপ, দূষণ, কর্দম-কলঙ্কে সে মরিয়া হয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের বিলুপ্তি ঘটায়। এই কি মানব জীবন নয়?
বাস শাহজালাল (রা.) মাজারের সামনেই থামল। ফাঁকা রাস্তা পেরিয়ে সে মাজারে ঢুকে। গণশৌচাগার থেকে সাফসোফ হয়ে কনক প্রথমেই অজু করে। তারপর সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মূল মাজার। ভোর বলে লোকজন নাই। বাটপার, পকেটমার, ভাবের পাগল, পেটের পাগল সব ঘুমিয়ে। মাজারের মসজিদে ফজরের জামাত শুরু হয়েছে। মারফতের মাজারে শরিয়তের ভোগের কারবারিরা এখন সেজদায় পড়ে বলছে, সোবহানা রাব্বিয়াল আলা, আপনি পূতপবিত্র ও সুমহান।
কনকের টুপি নাই। কোনোদিন দরকারও পড়ে নি। টুপি মানে মাথার আবরণ। শিরস্ত্রাণ। মানে আড়াল। পাপী-তাপী কনক আড়াল চায় না। মানুষ যখন জমিনে আসে তখন তার কোনো আড়াল থাকে না। শরিয়ত বলে, হাশরের ময়দানে মানুষ যখন আল্লার সামনে দাঁড়াবে তখনো তার কোনো আড়াল থাকবে না। মাঝের এই দেড়দিনের জীবনের জন্য মানুষ কত আবরণ পরে। কত বেশ ধরে। কত আস্ফালন করে।
বাবার পৈথানের দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে কনক চোখ বুজে বসে থাকে। আত্মীয়-আপনজন, সুখ-দুঃখ, কামনা-বাসনাহীন স্তব্ধ হৃদয়ে সে বসেই থাকে।
মাথা ভরতি চুলগুলো উলুঙ্গাজুলুঙ্গা। পরনে ময়লা কালো জিন্স। গায়ের টি-শার্টটাও কালো কিন্তু নতুন। কনকের জন্য কালো পোশাক সুবিধার। একটু সময় আর নির্জনতা পেলে প্রকৃতির কোলে যেখানে-সেখানে আসন ভিড়িয়ে বসে পড়ে। শেষ বিকালে যখন দিগন্তে আলো-অন্ধকারের যোজন-বিয়োজন শুরু হয় তখন তাকে প্রায়ই দেখা যায় মাঠে-ময়দানে শুয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। যতই অশিক্ষিত হোক, ইতর হোক, এই দৃশ্য দেখলে চরালগীর চরের কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আহ্... পোলাডার মা-বাপ-ভাই নাই, সংসার নাই।
কনক চোখ খুলে দেখে চারপাশে রোদের বাহার। মাজারের চারপাশের গাছের ফাঁকফোক দিয়ে চাকা চাকা সোনা নেমে আসছে। সে চোখটোখ মুছে নিচে নেমে আসে। ছাতক চলে যাওয়ার জন্য রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই নাকে লাগে গরম গরম তান্দুরি রুটি আর ছানার ডালের ঘ্রাণ। মুহূর্তে মদনের পঞ্চবাণ তাকে ভাবের জগৎ থেকে কাম-রিপু-রুটির দুনিয়াতে টেনে নামায়। সে পাশের হোটেলে ঢুকে যায়। কাউন্টার টেবিলের কোনায় আগড়বাতি পুড়ছে। ক্যাশে বসা মানুষটার হাতে তজবি, মাথায় টুপি, মোবাইলে পৃথিবী বিখ্যাত ক্বারির কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে, তা’তাদু ইন্নালাহা লাইউহিব্বুল মু’তাদ্দিন : তোমরা সীমা লঙ্গন করো না, সীমা লঙ্গনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করে না।
ভিতরের ইতর মানুষটা এখনো বেঁচে আছে! হায় খোদা!
দুইটা রুটি আর ছানার ডাল। এক কাপ ফিকা চা।
এই কথা বলে কনক পেছনের দিকের একটা টেবিলে গিয়ে বসে। লোকজন কম। একপাশে ছোট্ট একটা পরিবার কলিজা ভুনা আর নানরুটি দিয়ে ভুঁড়িভোজন করছে। এই ঠান্ডা ঠান্ডা সকাল বেলাতেই ফ্রিজিং করা পানির বোতল, ডিমপোজ, সালাদ, কাঁচামরিচ নানান সুখাদ্যে টেবিলটা উপচে পড়ছে। ছোট ছোট বাচ্চা দুইটাই হাতির বাচ্চার মতো নাদুস-নুদুস আর বিশাল বপুর। ইটচাপা দেওয়া ঘাসের মতো রূপ-লাবণ্যহীন ফ্যাকাশে মহিলাটি রীতিমতো হস্তিনী। কনকের একবার ইচ্ছা করে মহিলাকে কানে কানে জিগায়, আপনি যে ম্যাডাম হস্তিনী হলেন, আপনার পতিবাবুর রাইফেলটা কি হাতিরটার মতো বড় আর লম্বা হতে পেরেছে?
বেসিনে হাত ধোয়ার সময় এইসব ভাবতে ভাবতে কনক হেসে ফেলে। তারপরই মন খারাপ হয়ে যায়। শরীর ঘিনঘিন করে। ইচ্ছা করে এক দৌড়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে যায়। তার ভিতরের ইতর মানুষটা এখনো বেঁচে আছে! হায় খোদা! এখনো তার রক্তে ঘুমিয়ে থাকা পশুটা একটু ফাঁক পেলেই শ্বাস ফেলে পাশ ফিরতে চায়!
হোটেল থেকে বেরিয়ে সে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। যেতে ইচ্ছা করছে না। মন চাইছে মাজারে গিয়ে নিরিবিলি কোথাও চুপচাপ বসে থাকতে। কনক আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসে। কবুতরের বসত ঘরটা পেরিয়ে, পানিতে তালের মতো কালো কালো মাথা ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য গজার মাছের পুকুরপার ধরে, সোজা গিয়ে সে উত্তরের খোলা বারান্দার মতো ঘরে ওঠে। এদিকটায় তেমন কেউ নাই। পুকুরের পুবপারে সারি সারি শৌচাগার। তাই এদিকের বাতাসে বাজে গন্ধ। এসব গন্ধ এখন আর কনকের খারাপ লাগে না। তিন দিক খোলা ঘরটার একমাত্র দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে একজন। তারপাশে আরেকজন বাটাল দিয়ে সিদ্দির ছিলিম রেডি করছে। তাদের দুইজনের মাঝে বসে আরেকজন বাটালের দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে। সবারই কালো কাঠ-কয়লার মতন গতর। পরনে সালু কাপড়ের সেলাইবিহীন লুঙ্গি, গলায় নানান জাতের জপমালা, মাথায় জটা।
কনকের পায়ের শব্দে একজন মুখ তোলে, সিদ্ধির আগুনেপোড়া তেজি, লাল নজর যেন ব্রহ্মাণ্ডের অতল থেকে চোখ তোলে তার দিকে তাকিয়েছে। কনক আস্তে করে বলে, বসতে পারি বাবা?
লোকটা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। কনক একশ টাকার একটা নোট দলামচা করে তার পায়ের সামনে রেখে বসে। তার পাশেরজন সিদ্ধির গুটিটা হাতের তালুতে ঢলতে ঢলতে গুন গুন করে গাইছে,
‘কাঠ পুড়ালে ছাই হয়, লোহা পোড়ে সোনা,
নিজেরে পোড়াও অদম, আখেরে পাবে দোনা।’