নরকের সহস্র তোরণ : ১৩

পর্ব-১২

পর্ব-১৩

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে

আজব এক অন্ধকার চেপে বসেছে তিরিশ লাখ শহিদের রক্তে ভেজা এই পলল উপত্যকায় আর তারই প্রেত ছায়ারা চারপাশ থেকে চেপে ধরছে আভা নামক স্পর্শকাতর আর দুঃখী মেয়েটাকে। আলো নাই! দিশা নাই! যেদিকেই চোখ যায় নষ্টদের উন্মাদনা! মূর্খ, পেশিবাজ অশিষ্টদের উত্তেজনা, ক্ষমতার হাঁকডাক, অবৈধ অর্থের ঝনঝনানি। কী করবে সে একা? একটা স্কুল মানে হাজার হাজার সুমানুষ উৎপাদনের মৌলিক কারখানা। সেখানেও এত অন্ধকার! কালো কালো হাতের এত চাপ! আভা ছাতা মাথায় নুয়ে নুয়ে স্কুলের পথে হাঁটছিল। সে বোরকা-হিজাব পরে না। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সাথে ম্যাচ করে বড়ো একটা উড়নায় মাথাটাথা ঢেকে নেয়। রোদ ও বদ মানুষের নজর থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য সারা বছর ছাতা ব্যবহার করে। রোজ রোজ পায়ে হেঁটে স্কুলে যায় বলে এই পথটাও তাকে ভাবায়। ক্ষতাধরদের স্নেহভাজন এক ঠিকাধার রাস্তাটা বানিয়েছে ছ’মাসও হয় নি। এরই মাঝে ফুটপাতের স্লাভ খসে পড়েছে, খানাখন্দে ভরে গেছে রাস্তার বুক। একটু পরে পরেই ময়লার স্তূপ। রাস্তার গর্তগুলোতে জল-কাদা, এলোমেলো জটপাকানো যান-বাহনের অবিরাম উৎপাত, কয়দিকে চোখ রেখে নিরাপদে চলবে আভা? তাই ঘর থেকে বেরুবার কথা মনে হলেই তার মন খারাপ হয়ে যায়।


মূর্খ, রুচিহীন টাকাওয়ালা কোটি কোটি মানুষের দেশে মারুফারা দুই অক্ষর না পড়লেও সুখে-সম্পদে গা ভাসিয়েই জীবন কাটাতে পারবে।


ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে আভা স্টাফরুমের বারান্দায় ওঠে। ক্লাস নাইনের ফার্স্টগার্ল দীপালি এসে আভার পাশে দাঁড়ায়, ম্যাডাম আপনার শরীর কি খারাপ?

আভা হেসে ফেলে। এই মেয়েগুলোকে নিয়ে হয়েছে তার যত জ্বালা, একটু মন খারাপ দেখলেই এটা-সেটার উছিলা করে কাছে এসে মায়া দেখাবে।

না। ভালো আছি রে...।

বলতে বলতে আভা স্টাফরুমে ঢুকে। শুধু জলিল উদ্দিন মৌলানা সাহেব এসেছে। তার প্রাইভেট-টাইভেট নাই তাই সবার আগে স্কুলে আসে। এবং আভাদের বিদ্যালয়ে গ্রুপকালচারের শীর্ষগুরু তিনি। যেখানে যে রকম তেল ও ঘি দরকার তিনি সেখানে সেই মতো প্রয়োগে সিদ্ধপুরুষ। তাই শোনা যায় এলাকার ক্ষমতাবানদের সাথেও নাকি তার একটা ভালো যোগাযোগ আছে। সবসময় তিনি একটু আগেভাগে এসে অফিসের কোনাকানার ঘ্রাণ নেন। এখন স্কুলের শিক্ষকদের কাছে প্রশিক্ষণ একটা বিরাট ব্যাপার। তাই সেই দিকেও নজর রাখতে হয়। তার চেলাদেরকে বশে রাখার জন্য প্রশিক্ষণ নামের মন্ত্রটা বেশ ফলদায়ক। আজকাল প্রশিক্ষণ মানে টাকা। টাকার গন্ধে দেবতারাও টলে। আমরা তো আখেরি জামানার উম্মত। এস্তাগফিরুল্লাহ! আল্লা মাফ করো।

প্রশিক্ষণের ডাক এসেছে কি? প্রথম কিস্তিতে কার কার নাম যাচ্ছে?

কেরানি সাহেব সালাম দিয়ে বসতে বলে। পান বিনিময় হয়। পানের বিনিময়ে কেরানির সাথে মন-মকসুদেরও কিঞ্চিৎ বিনিময় ঘটে। তাই মৌলানা সাহেব সবার আগে আসে এবং যায়ও সবার শেষে। কেরানির সাথে নানান দিক দিয়ে সে সম্পর্কটা সারা বছর তাজা রাখে। রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি জামাত-শিবিরের শক্ত ভক্ত। তলে তলে সেই আদি ও অকৃত্রিম লাইনও জেলা কমিটি পর্যন্ত পরিষ্কার রাখে। তিনি একবার নবম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ক্লাসে প্রক্সি দিতে গিয়ে সোজা ঘোষণা করে বসেন, এই দেশ স্বাধীন করতে তিরিশ লাখ মানুষ শহিদ হইছে না রে, মাত্র সাড়ে তিন হাজার। যুদ্ধের সময় আমি সেভেনে পড়ি। নিজের চোখে সব দেখছি।

এই নিয়ে মৌলানার আড়ালে শিক্ষকরা দুই-একদিন খুব হাসা-হাসি করল। কিন্তু কেউ তাকে একবার জিজ্ঞাসা করল না, কোন সাহসে এত বড় মিথ্যা তিনি কোমালমতি শিশুদের মনে দাগ কেটে কেটে বসিয়ে দিচ্ছেন। পাঁচ-দশ বছর পরে এইসব শিশুরাই নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পরবে। তখন যদি তারা এই মিথ্যা শিক্ষাটাকে সত্য বলে সমাজে প্রচার করতে শুরু করে?

আভা পবিত্র পবিত্র চেহারার গুরুটিকে সালাম দেয়। সালাম বিনিময় এবং কুশলাদি বিনিময় শেষ হলে তিনি উঠে এসে আভার এক চেয়ার পরে বসেন। মুখে পানের রস, ঠোঁটে বিনয়ের নরম হাসি, কারে বিশ্বাস করবাইন ম্যাডাম; বড়ো আপা কি পারত না জিনিসটা গোড়াত মাইরা দিতে?

লোকটার গলার স্বরে আভা চমকে ওঠে। এই মানুষটা ঠান্ডা গলায় মাঝে মাঝে পাওয়ারফুল বিস্ফোরণ ঘটায়। তাই আভার গলা খুব উদাস শোনায়, কী হইছে?

ফিজিক্স প্রেকটিক্যাল খাতার কথা।

আভা চুপ করে থাকে। এবার তার মনে পড়ছে। ক্লাস টেনের ফাইরুজ মেয়েটা গত দেড় বছরে ক্লাস করেছে মাত্র পঁচিশ দিন। একটা ব্যাবহারিক ক্লাসেও ছিল না। কিভাবে সে খাতায় সাইন করে। কোনোমতে একটা খাতা রেডি করে এনে সামনে রাখলেই আভা সাইন করে দেবে, না দেওয়া উচিত? বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হয়ে বিজ্ঞান শব্দের অর্থ কী যে জানে না আজ সে-ও তো এ প্লাস পাচ্ছে। পাক। কিন্তু শিক্ষক হিসাবে সে দেশ ও জাতীর সাথে প্রতারণা করতে পারে না। এই অধিকার অন্তত তার নাই। আভা নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে যাচ্ছে দেখে জলিল উদ্দিন অবাক হয়। ফাইরুজের বাবা ধনী ও দাপুটে মানুষ। তার ছোট ভাই এলাকার রাজনীতির মাঠে দাপিয়ে চলে। তাই জলিল উদ্দিনের হিসাবে ছিল, এইবার আভা ম্যাডাম তার বেয়েত হবেন।

মাঠে ফিজিক্যাল টিচার বাঁশি বাজিয়ে মেয়েদেরকে ডাকছিল। আভা নিঃশব্দে সেদিকে সরে যায়। শিক্ষকদের কেউ কেউ হন্তদন্ত হয়ে গেট দিয়ে স্কুলে ঢুকছিল। তাদের ব্যাচের পর ব্যাচ প্রাইভেট। তাই ঠিকমতো দাঁত মাজার সময় নাই সময় মতো স্কুলে আসবে কিভাবে? এবং এদের মেরুদণ্ড বলতেও কিছু নাই। স্টাফ মিটিংয়ে যে বেশি হাঁকডাক ছাড়ে তার সাথেই তারা আওয়াজ তুলে, ঠিক আছে, স্যারের কথাই ঠিক।

স্কুলের অরিজিনাল গুরুরা দশটা ছুঁই ছুঁই হলে হোন্ডায় ভমভমি শব্দ তুলে ছোটে এসে কোনোমতে জাতীয় সংগীতে শরিক হবে। আভা মাঠে আসতেই ক্লাস টেনের মারুফা দলবল নিয়ে তার কাছে চলে আসে। শীতলক্ষার ঢেউয়ের মতো স্মার্ট, সুন্দরী, উচ্ছল এক মেয়ে। আভা শুনেছে, এই মেয়ে আরো অনেকের মতোই সুযোগ মতো কমনরুমে তার শিষ্যবর্গ নিয়ে স্মার্টফোনে কিসব আজেবাজে ছবিও দেখে। এইরকম মূর্খ, রুচিহীন টাকাওয়ালা কোটি কোটি মানুষের দেশে মারুফারা দুই অক্ষর না পড়লেও সুখে-সম্পদে গা ভাসিয়েই জীবন কাটাতে পারবে।


ইচ্ছা করছে ছুটে গিয়ে সাবান দিয়ে গোসল করে আসে। মানুষ এত নির্বোধ আর অশ্লীল হয় কিভাবে?


একটু একটু মন খারাপ থাকলে আপুকে যা দারুণ লাগে না!

বিষণ্ন আভাকে হাসানোর জন্য এই কথা বলে মারুফা হাসতেই অন্যরাও হেসে ওঠে। মারুফার চোখের ঝিলিক, মুখের হাসি দেখলেই মনে হয়, সে আর মেয়ে নাই, তলে তলে নারী হয়ে গেছে! আভার খারাপ লাগে। এইসব ভাবতে খুব খারাপ লাগে। তবু মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গি দেখে আভাও হাসতে হাসেতে চড় তুলে তেড়ে যায়। এদের লেখাপড়ায় মন নাই, জ্ঞানে-সম্মানে বড় হওয়ার স্বপ্ন নাই খালি চিটকি-বিটকি, খালি কুচিন্তা।

আজ শিক্ষকরা আভার দিকে এমন চোখে চাইছে যে একটু পরেই বুঝি তার ফাঁসি হয়ে যাবে। তার মানে ঘটনাটা শুধু সে ছাড়া বাকি সবাই জেনে গেছে। একটা কিছু ঘটলেই শিক্ষকদের গ্রুপে গ্রুপে ফোনে খবর চালাচালি হয়। শুধু তাকেই কেউ কিছু জানায় না। কারণ এই স্কুলে আভাই একমাত্র শিক্ষক যার কোনো গ্রুপ নাই। কোনো মাজহাব নাই। তার গা ঘিন ঘিন করছে। ইচ্ছা করছে ছুটে গিয়ে সাবান দিয়ে গোসল করে আসে। মানুষ এত নির্বোধ আর অশ্লীল হয় কিভাবে? একবার ভাবে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে যাবে। কিন্তু ছুটি নেওয়ার অর্থ তার পরাজয়। পলায়ন। কেন পালাবে আভা, সে কি কোনো অন্যায় করেছে?

একটা মেয়ে সারাবছর থিওরিটিক্যাল করবে না, প্রাকটিক্যাল করবে না তবু স্কুল তাকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিবে। শিক্ষকরা অবাদে তার সব কিছু রেডি করে দিবে। তারপর যখন সেন্টারে যাবে তখন পেছন পেছন যাবে স্কুলের বিজ্ঞ শিক্ষকও। যেদিন যে বিষয়ের পরীক্ষা সেদিন যাবে সেই বিষয়ের জন। অফিসে বসে বসে এমসিকিউ’র তিশটা উত্তর রেডি করে ডিউটিরত শিক্ষককে দিয়ে চালান করে দেবে নিজের স্কুলের ছাত্রদের কাছে। তারপর ফিসফিস করে সঠিক উত্তরগুলো প্রথম বেঞ্চ থেকে শেষ বেঞ্চ পর্যন্ত দৌড়াবে। তারপর আসা যাক বিজ্ঞানের ব্যাবহারিকের কথা। পরীক্ষার দিন স্কুল থেকে একজন শিক্ষককে পাঁচশ টাকার দুই-একটা নোট খামে ভরে সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তিনি হাসি হাসি মুখে ব্যাবহারিক পরীক্ষার এক্সটার্নাল সাহেবের সাথে কথা বলতে বলতে এক ফাঁকে খামটা টেবিলের উপর রেখে বলবেন, স্যার, আমার স্কুলের তিরিশজন, পঁচিশের মধ্যে পঁচিশ চাই। কী আর করা। স্যার খামটা পকেটে রাখতে রাখতে ব্যাবহারিকের ছাত্রদের সামনেই বলবেন, আচ্ছা।

তো মৌখিকের ডাকে একেকজন তনয় হেলে-দুলে, একটু একটু উঁকি দেওয়া দাড়ি কিংবা মিনি ভি স্টাইলের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে সামনের টুলে এসে বসবে, তোমার নাম কী?আরাফাত...

কী খায়া আসছ?

মাছ-ভাত।

বাঙালির প্রধান খাদ্য কি?

ফল প্রকাশের পর শুধু এ প্লাস আর এ প্লাস। বাংলার আকাশ-বাতাস ছেয়ে যায় বিজয়ের ভি চিহ্নে। এই আত্মবিনাশী অন্যায়ের অনেকগুলো ধাপের একটিতে আভা সব সময় তার সাধ্য মতো প্রতিবাদ করে। অর্থাৎ সে অনিয়মিত ছাত্রীদের ব্যাবহারিক খাতায় সই করে না। মারুফাও তাদের একজন। তো একজন এই অন্যায়ের প্রতিবাদে খাতায় সাইন না করলে জুলুম নেমে আসবে। একজনের উপর অন্যায়ভাবে নেমে আসা অপমানের, জুলুমের প্রতিবাদ না করে সেটার মাত্রা যাতে আরো তীব্র হয় সেই জন্য আগুনে ঘি ঢালবে তার সহকর্মী সবকটি ভাই! আজ এই তো আমরা শিক্ষক। এই আমাদের মতো মানুষের হাতে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর আর দেশের ভবিষ্যৎ!

আভার এইসব ভাবনার ঘোরের মাঝেই ছুটির ঘণ্টা বাজে। শিক্ষকদের কাপড়-চোপড়ে যেন আগুন ধরে গেছে এইরকম ছোটাছুটি করে সবাই গিয়ে হাজিরা খাতার টেবিলের চারপাশে ভিড় জমায়। কার আগে কে ডিপার্চার দিবে। কারো পকেটে একটা কলম পর্যন্ত নাই। তাই তারা টেবিলের একটা কলম নিয়ে বাচ্চাদের মতো কাড়াকাড়ি করে। এনটিআরসির নিয়োগ পাওয়া গণিতের নতুন শিক্ষকটি অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে এইসব দেখে। সবেমাত্র সে কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি দিয়ে এসেছে। তাই হয়তো তার সম্মানে লাগছে। হয়তো পরিবেশ আর পরিস্থিতির শিকার হয়ে কিছু দিন পরে সে-ও সিনিয়রদের পথেই গা ভাসাবে।

দুই মিনিটের মধ্যেই স্কুল পরিষ্কার। এইসময় বড় আপার অফিসে আভার ডাক পড়ে। মার্কার কলম আর ডাস্টার নিজের ড্রয়ারে রেখে চোখ বুজে আভা একটু সময় দাঁড়িয়ে থাকে। তার মা-ও অন্যায়ের সাথে আপস করে নি। এই দুর্বৃত্তের দেশে তার মা সেই মতো পুরস্কারও পেয়েছে। আভা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত ধোয়ার জন্য বেসিনের সামনে যায়। জলে ভেজা আয়নায় তার থমথমে মুখ দেখতে দেখতে সে ঠিক করে, কিছুতেই মাথা নত করবে না।

দরজায় আভার ছায়া দেখে বড় আপা আদুরে গলায় ডাক দেয়, আরে আভা আসো আসো। তিনি কলিংবেলের লাল চোখে চামড়া লুজ হয়ে আসা ফর্সা তর্জনীটা চেপে ধরেন। দরজার বাইরে মোরগের উঁচু গলা কক্ কক্ করে আয়াকে ডাকে। ছুটি হয়ে গেলেও আয়া-পিয়নকে আরো অন্তত বিশ-তিরিশ মিনিট ছোটাছুটি করতে হবে। তাই দরজায় উঁকি মারে আয়ার অসন্তুষ্ট মুখ, দুই কাপ লেবু চা আর অলিম্পিকের এক প্যাকেট সল্টেস বিস্কুট নিয়া আয়। আভা না না করে ওঠে, আমি এখন চা খাব না। বাসায় গিয়ে একেবারে ভাত খাব।

আমি খাব।


জন্তুর কাছে আমরা সবাই অসহায়। মানুষ কি পশুর সাথে পারে?


এই কথা বলে বড় আপা পূর্ণচোখে আভার দিকে তাকায়। চোখ-মুখের তরতরে ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায় এককালে মহিলা রীতিমতো সুন্দরী ছিলেন। আভা অসহায় ভঙ্গিতে তার হালকা শরীরটা পার্টেক্স কোম্পানির গদি আঁটা দামি চায়েরের মাঝে লুকিয়ে ফেলতে চায়। আজ স্কুলের অফিসে, স্টাফরুমে, ক্লাসে ক্লাসে কত আয়োজন! কত অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা কিন্তু লেখাপড়া নাই। আভারা পড়ত গ্রামে মাটির দেওয়ালের স্কুলে। ঠিকমতো দরজা-জানালা নাই। বড় বড় হার্ডবোর্ডে কালো রং লেপে ব্লাকবোর্ড বানানো হয়েছিল। কারেন্ট নাই, ফ্যান নাই, টিনের চালের নিচে ঠিকমতো সিলিংও নাই তবু লেখাপড়া ছিল। শিক্ষকরা প্রাণপাত পড়াত, হৃদয় উজার করে ছাত্রছাত্রীদেরকে ভালোবাসত। তখন শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মাঝে মমতা আর শ্রদ্ধার একটা সেতু ছিল। সেই সেতু দিয়ে একজনের জ্ঞানের আলো আরেকজনের শূন্য হৃদয়কে তিলে তিলে আলোকিত করত।

আভার চোখ টলমল করে। বড় আপা ড্রয়ার খুলে সেই খাতাটা টেবিলে রাখে। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আভার পিঠে হাত রাখে, তুমি আমার মেয়ের মতো। তোমার সংগ্রাম, তোমার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু কার কাছে তুমি নীতির কথা বলবা, শিক্ষকের কর্তব্যের কথা বলবা? হুমায়ুন আজাদের সেই কবিতাটা পড়ছ না? স্কুলের লাইব্রিতে বইটা আছে। না পড়লে কাল নিয়ে পড়। ‘...সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।’

কলম দিয়ে কয়টা টানটুন দিয়ে আপদ বিদায় করো। দেখবা না। বুঝলে, চোখ খোলার দরকার নাই। আর কত...

তারপর আশপাশ কেউ আছে কিনা একবার নজর বুলিয়ে ফিসফিস করে বড় আপা বলে, জন্তুর কাছে আমরা সবাই অসহায়। মানুষ কি পশুর সাথে পারে?

আভার মুখ শক্ত হতে হতে প্রায় নীল হয়ে আসছে দেখে বড় আপা বলে, ঠিক আছে; তোমার কিছু করতে হবে না। আমি অই কেরানি বেটাকে দিয়ে করিয়ে নেব। ও বেটা একটা তক্ককের ছাও, আমার সব টিচারের সইটই নকল করতে পারে।

ফিরবার সময় বড় আপা আভাকে সাথে নিয়ে এক রিকশাতেই ফিরলেন। তার বাসার গেটে নামিয়ে দিয়ে চলে যাবার সময় বললেন, খামাখা ভেবো না, আমি কালকেই সব ম্যানেজ করে নিয়েছি।

আভা রিকশাওয়ালার দিকে একবার চেয়ে ফিসফিস করে জানতে চায়, আজ আসার পথে আমার আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছিল কি?

আরে না না। তুমি কাছে থাকলে আমার ভালো লাগে। ইস্কুলটাতে কতকগুলা গরু-ছাগলের সাথে ঢুসাঢুসি করতে করতে নিজেকেও কেমন ছাগল ছাগল লাগে।

আজ আভার কাছে তার দেহটা কেমন পাথর পাথর লাগে। সিঁড়ি ভেঙে দুতলায় উঠতে বরাবরেরচে অনেক বেশি সময় লাগে। কষ্ট লাগে।

দরজার তালা খুলতে খুলতে আভা বাড়ির বাতাসে নানান পদের ঝাল ছালুনের সুবাস পায়। তাহলে আজকেও উপদেবতাটি বাড়ির মালকিনির বিছানায় মেহেরবানি করে তশরিফ নিবেন!

বুড়ি শাশুড়িকে দুইদিন ধরে আভা দেখছে না। বোধহয় একটা উছিলা করে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। তবে বাতাসের গন্ধ বলে দেয়, আজ দেবতাটি এই বাড়িতে রাতের ভোজন সারবে। তবে কি মহিলা আজ তার নিজের বাচ্চাদেরকেও ঘুমের বড়ি দিয়ে আগেভাগে ঘুম পাড়িয়ে দিবে?

আভা ঘরে ঢুকেই টেবিলের উপর ব্যাগ, ছাতা রেখে পরনের শাড়িটা না পাল্টিয়ে সোজা বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। কাল রাতে এক ফোঁটা ঘুম হয় নি। পাশের রুমে খাটের কড়মড়ানি, দুইটা উন্মত্ত পশুর শ্বাস টানার ফোঁসফোঁসানি আভাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয় নি। তার মগজে আগুন, রক্তে আগুন, রগে রগে কহরের চাবুক! সে বিছানা ছেড়ে বাকি রাতটুকু ব্যালকনিতে বসে আল্লা! আল্লা! করে কাটিয়েছে।


আই অ্যাম এ প্লাস। সারাদেশ এই নিয়ে হাসাহাসি করে। এতেই ত বুঝা যায় এই জাতির লজ্জা নাই।


আভা ঘুমিয়ে পড়েছিল। দরজায় খুট করে একটা শব্দ হয়। সে বিছানা থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে, আপনি?

বুঝচ্ছেন ম্যাডাম, আপনেরে আমার নিজের বুইনের মতন লাগে। ভালা-মন্দ কিছু করলে আপনের থুইয়া ক্যানে খাই?

হাতের প্লেট-বাটি টেবিলে রাখতে রাখতে মহিলা আড় চোখে আভাকে একবার দেখে। আভা মনে মনে হাসে, হায় মানুষ! ব্যক্তিগত দুর্বলতা মানুষকে কতটা নড়বড়ে করে দেয়। আভাকে খুশি রাখার জন্য, হাতে রাখার জন্য সুযোগ পেলেই মহিলা তার কাছে নানান ছলে ঘুষ নিয়ে আসে। রাগে আভার শরীরটা রি রি করে। তার ইচ্ছা করছে চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে, কারো ব্যক্তিজীবনে নাক গলানো আমার ধাতে নাই। আপনি নির্ভয়ে চালিয়ে যান।

মহিলা খুব চতুর। আভাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে ফস করে বেরিয়ে যায়। কচুর লতি দিয়ে ছোট চিংড়ির ঝাল তরকারি, মুগের ডাল দিয়ে খাসির ভুনা মাংস, বেগুনের বড়া। মহিলা চলে যেতেই আভা উত্তরের জানালা দিয়ে একটা একটা করে সব ফেলে দেয়। নিচে একটা কুকুর শুয়ে ছিল। সে এসে গপগপ করে সাবার করে আভাকে বাজে একটা চিন্তা থেকে রেহাই দেয়।

আভা শাড়ি পাল্টে মেক্সি পড়ে। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশট্রেশ হয়ে ফিরে আসতেই বড় আপার ফোন, ভাত খাইছ?

মহিলার গলার টান শুনে আভার মনটা ভরে যায়। মুখে হাসি ফোটে, জি আপা এখন খাব। আচ্ছা আচ্ছা ভাত খাও। আমি একটু পরে কল দেবো।

না না আপা এখনই বলতে পারেন। পেটে এসিড হইছিল, একটা ওমিপ্রাজল খাইছি। আরো দশ মিনিট পর খাওয়ার সময় হবে। প্লিজ আপনি বলতে পারেন।

কী বলব মেয়ে তোমার ত রাগ বেশি। আমি জানি, যার আদর্শ যত শক্ত তার তত রাগ। এই যে বছর বছর রেজাল্ট হলেই টেলিভিশনে বিজয়ের ভি চিহ্ন দেখি। দেখি এ প্লাস পাওয়া ছেলে গৌরব করে বলছে, আই অ্যাম এ প্লাস। সারাদেশ এই নিয়ে হাসাহাসি করে। এতেই ত বুঝা যায় এই জাতির লজ্জা নাই। দুর্নীতি আর অনাচার দেখতে দেখতে, দুরাচারদের উৎপাত, অপমান, দুর্ভোগ সইতে সইতে আমরা আজ লজ্জা পেতেও ভুলে গেছি রে মেয়ে।


পর্ব-১৪
শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা