নরকের সহস্র তোরণ : ১০

পর্ব-৯

পর্ব-১০

নক্ষত্রের দিকে

কনকের আর পড়তে ইচ্ছা করছে না। বুকটা কেমন ভার হয়ে গেছে। কষ্টের পাথর বুকে নিয়ে মেয়েটা তার দুঃখের কথা বলছে। একেকটা মানুষ যেমন দেখতে একেক রকম তেমনি তাদের দুঃখও বিচিত্র কান্নার চাদর জড়ানো। গুটিকয় মানুষ বাদে সংসারে কোনো মানুষের মনেই আজ সুখ নাই, শান্তি নাই। কারণ তাদের চাওয়া ও পাওয়ার মাঝে, স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে আকাশ-জমিন পার্থক্য। কনক বাথরুমে চলে আসে। পেশাব করে। তারপর উঠে আসার সময় কে যেন দুম করে প্রশ্নটা করে, কনক তুমি গাঁজা খাও কেন?

সেই মেজরের গলা! কনক এবার চিৎকার দিয়ে ওঠে, আপনি আত্মহত্যা করলেন কেন?

বাথরুমটা নিথর কবরের মতো গুমোট হয়ে থাকে কতক্ষণ। তারপর আবার যেন ইথার থেকে লোকটার গলা ভেসে আসে। একটা অসহায় গলার ভাঙা ভাঙা আওয়াজ : আমি আর পারছিলাম না। তুমি ঢাকা থেকে পালিয়ে আসার পর কে যেন আমার বুকের মাঝে পাথার চাপিয়ে দেয়। এই সুন্দর পৃথিবীর কোথাও আমি আর কোনো সুখ খুঁজে পেলাম না। জীবনের সবকিছুই আমার কাছে অর্থহীন লাগতে শুরু করে। এক অপরাধবোধ আমাকে সারাক্ষণ কুকুরের মতো তাড়া করতে লাগল। মানুষ দেখলেই আমার মেজাজ আগুন হয়ে ওঠে। তো... ওসব বাদ দাও। আমাকে ক্ষমা কর। আজ কিছু কথা তোমাকে শুনতেই হবে : তোমার মা আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। পরিচয়ের এক বছরের মাথায় আমরা প্রেমে পড়লাম। যাকে বলে পাগলের মতো ভালোবাসা। ইন্টার শেষে আমি বাহিনীতে এলাম আর তোমার মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই দূরত্ব কিংবা বিরহের নিয়ামকে আমাদের সম্পর্কটা আরো গভীর হলো।


নারী বলো আর পুরুষ বলো সব দুর্বলরা পুঁটি মাছের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়বেই।


আমি তখন সেকেন্ড লেফটেনেন্ট কমিশন্ড নিয়ে চিটাগাঙে যোগ দিয়েছি। তার কিছুদিন পর তোমার মা আমাকে কিছু না জানিয়ে এক বিকালে এসে হাজির। বলল তার বিয়ের কথা পাকাপাকির দিকে। তাই সে ঢাকা থেকে ছুটে এসেছে। ইচ্ছা আজকেই আমাকে বিয়ে করবে। তোমার নানা তখন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল। আমাদের সেনাবাহিনীর প্রধানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বুঝতেই পারছ আমার ঘাড়ের উপড় কত ধারাল খড়গ! আমি কিছুতেই রাজি হলাম না। আমি বললাম যেভাবেই হোক বিয়েটা অন্তত তিন মাস ঠেকিয়ে রাখ। কারণ তিনমাস পর আমাদের বাহিনীর প্রধান পেনশনে যাবেন। তারপর যা হোক একটা কিছু হবেই। আমরা এক সাথেই ছিলাম। রাতে সে এক গ্লাস পানি ছাড়া কিছুই খেল না। শুধু কান্না আর কান্না। কয়েকদিন পরেই তার বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু আমার সাথে যোগাযোগটা সে রাখলই। দেড় মাস পর একটা চিঠি পেলাম। তার চিঠি। কিচ্ছু লেখা নাই। কোনো সম্বোধন না। শুধু একটা লাইন ‘আমার পেটে তোমার ছেলে, আমাদের ভালোবাসর ধন।’

বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কনকের অসাড় দেহটা চমকে ওঠে। ঘোর কেটে গেলে সে চোখ খুলতেই দেখে বেসিনের আয়নায় তার মুখ। ঠিক সেই জেনারেল। নাক-মুখ-কপাল আর ঝলমলে কালো চামড়া। আজ তার স্পষ্ট মনে পড়ে, কেন তার বাবা তাকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নিত, কেন সে পিতার আদর থেকে বঞ্চিত ছিল।

বুকের মধ্যে এক সমুদ্র উথাল-পাথাল ঢেউ নিয়ে কনক ব্যালকনিতে চলে আসে। দূরে হারিকেনের বিন্দু বিন্দু আলো। চরের কৃষকের ঘামে ম্লান হয়ে আসা লাল আলোগুলোর দিক থেকে কনক চোখ ফেরাতে পারে না। শহর থেকে আসা পাইকার নামের ধূর্ত প্রাণীগুলো সব এককাট্টা। তাই চার-পাঁচ মাসে অনেক টাকা আর ঘাম ঝরিয়ে ফলানো একেকটা তরমুজের দাম কৃষক কত পাবে? খুব বেশি হলে চৌদ্দ থেকে পনেরো টাকা। নদীর ওপারে নিয়ে এই তরমুজটাই পাইকাররা বেচবে চল্লিশ টাকা। এদেরকে সবাই ঠকায়। ঠকতে ঠকতে আজ ওরা নিঃস্বের নিঃস্ব। চৌদিকে জাল পাতা। নারী বলো আর পুরুষ বলো সব দুর্বলরা পুঁটি মাছের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়বেই।

কাজ ছাড়া থাকলে কনকের কেমন পাগল পাগল লাগে। পেশার সময়টুকু আর ঘুমানোর সময়টুকু বাদে কনক তার অন লাইন পত্রিকাটা নিয়ে ভাবে, কাজ করে। একজন-দুইজন করে ‘আমার মনের কথা’র পাঠক বাড়ছে। কোনো একটা জীবনের দুর্ভোগের কাহিনি শুনে যদি একজন বিকারগ্রস্ত নিষ্ঠুরের মন বদলে যায়! একটা মানুষও যদি মানুষকে ভালোবাসতে শিখে! কনক বুক ভরে চরের তাজা বাতাস টানতে টানতে ল্যাপটপের সামনে চলে আসে। আজকে সকালে আসা নতুন লেখাটা সে পড়তে শুরু করে :

আমার মনের কথা
ইশরাত জাহান আভা

২.
আমার অভিভাবক হিসাবে ব্যাংকে খালার নাম ছিল। তাই তিনি মাসে মাসে সেই ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে পাঁচ হাজার করে টাকা তুলে আনতেন। তাই খালার বাড়িতে আমি একটু ভালোই ছিলাম। খালার বড় ছেলে সৌদিতে থাকে। আমি কলেজে পড়ার সময় সে বিয়ে করতে বাড়িতে আসে। বাড়িতে কী আমোদ! কী কানাঘুষা! পাত্রী যে আমি। খালা ধরেই নিয়েছিল এই খবরে আমি হাতে আসমান পাব। বিয়ের তিনদিন আগে আমি পালিয়ে এসে উঠলাম ফিজিক্সের আফরোজা ম্যাডামের বাসায়। তিনি খুব বুদ্ধিমতি আর নরম মনের মানুষ। সব শুনে মেয়েদের হোস্টেলে ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার বয়স আঠারো পেরিয়েছে। তাই ব্যাংকে যোগাযোগ করে সব ঠিকঠাক করে দিলেন যাতে আমি নিজের টাকা নিজেই উঠাতে পারি।


মাঝে মাঝে শরীর নামের মেশিনটা বিদ্রোহ করে। সে আর এই নিঃসঙ্গতা মানতে চায় না।


হোস্টেলের মেয়েরা সাজ-পোশাক, রূপ-চেহারা, ফেসবুক আর ছেলেদের গপ্পো নিয়ে কলকলায়। আমার সাথে কারো জমে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি দিয়েই স্কুল নিবন্ধন পরীক্ষার জন্য গাউড-টাইড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। শেষমেষ বিবি আতুয়াজান বালিকা বিদ্যালয়ের এই মাস্টারি। স্কুলটার আনাচে-কানাচে, মাঠে পলিথিন-প্লাস্টিকের আবর্জনায় ভরা। স্কুলে যোগ দেওয়ার মাসখানেকের মধ্যে বুঝলাম শুধু স্কুলটার বাইরেই না ভিতরটাও আবর্জনায় দুর্গন্ধময়।

বড় আপার অনুমতি সাপেক্ষে মেয়েদের নিয়ে একটা সংগঠন খাড়া করলাম, এসো পরিচ্ছন্ন হই।’ আমাদের শিক্ষকদের অনেকেই সামনা-সামনি আমার খুব প্রশংসা করে, উৎসাহ দেখায়। মাসিক মিটিংয়ে কেউ কেউ সবার পক্ষ থেকে আমাকে অভিনন্দন জানায়। যারা অভিনন্দন জানায় আড়ালে আড়ালে তারাই অন্য শিক্ষকদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করে বলে, আসেন ভাই পরিচ্ছন্ন হই!

রুক্ষ আর বিশাল মাঠটা সারা বছর খাঁ খাঁ করে। অফিসের কাছে কয়টা গাছ আছে কিন্তু সারা স্কুলে একটি ফুলের গাছও নাই। স্কুলটায় ফুলের মতো প্রায় হাজারখানেক মেয়ে। ফুলের শুভা আর ঘ্রাণ না পেলে ওরা সত্যিকারের ফুল হয়ে উঠবে কিভাবে? কিভাবে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য বুকে মধু ধারণ করবে? অনেক সময় মেয়েদের হাত-পা কাটে, শরীরের সেই বিশেষ ঝামেলাটা হয়। এই বিষয়ে স্কুলে কোনো প্রস্তুতি নাই। আমি কৌশলে স্কুলের বড়ো আপার সাথে কথা বলে তাকে দিয়েই মিটিংয়ে প্রস্তাবটা উঠালাম। ‘এসো পরিচ্ছন্ন হই’ সংগঠনটি প্রতি মেয়ে পিছু মাসে এক টাকা চাঁদা উঠাবে। তার বদলে তারা স্কুলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখবে, মেয়েদের জন্য মজুদ রাখবে যথেষ্ট ন্যাপকিনের আর স্কুলে একটা বাগান করবে। বাহবা বাহবা ধাঁচের দুই-একটা অনুচ্চ শব্দের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটা পাস হয়ে গেলেও কারো কারো মুখ মলিন দেখায়। তারা ধরে নেয়, আমি উড়ে এসে জুড়ে বসতে চাইছি। কিন্তু তারা নিজেরা কিছুই করবে না। যদি কেউ ভালো কিছু করতে চায় তবে তাকে ছলে-বলে-কৌশলে রুখতে হবে। তা না হলে যে তাদের ইগোতে লাগে, আঁত জ্বলে।

আমার লড়াই চলছিল নিজের মনের সাথে, চারপাশের হিংসুটে আর নিন্দুকদের সাথে, পথে-ঘাটে মেয়েদের সুরক্ষার বিষয়ে। কিংবা আমার নিজের সাথে কি নয়? অবশ্যই। মাঝে মাঝে শরীর নামের মেশিনটা বিদ্রোহ করে। সে আর এই নিঃসঙ্গতা মানতে চায় না। সঙ্গের জন্য আরেকজন মানুষ চায়। পুরুষ মানুষ। কিন্তু পরিস্থিতি মোতাবেক অনেক মিথ্যা যেমন সত্য হয়ে ওঠে তেমনি আমরা মা-মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিলাম বলে যে রব উঠেছিল, অনেক দূরের সেই মিথ্যাটাই যে কোনোদিন সত্য হয়ে উঠতে পারে। তাই নিজের নিঃসঙ্গতাকে ভবিতব্য মেনে নিজেকে দশজনের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাইতাম।

রিপনের গ্রুপের একটা ছেলে খুব বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করলে আমি একদিন মরিয়া হয়ে একা একাই রিপনের সামনে দাঁড়ালাম, ছোট ভাই তোমার সাথে একটা কথা আছে।

রিপন তাদের বাসার সামনের টংদোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। আমার কথা বলার ভঙ্গি আর গলার স্বরে চমকে গিয়ে সে হাতের সিগারেট ফেলে দেয়ে, আপা আপনি?

লুবনা আজ স্কুলে গেছে না। শুনলাম তার জ্বর? চলো তাকে দেখতে যাব।

লুবনা রিপনের ছোট বোন। রিপনের চারপাশে চেলা-চামুণ্ডারা। ওরা বদমাইশের মতো দাঁত কেলিয়ে হাসছে। রিপন মাছি তাড়াবার মতো করে হাত ঝাড়া দিয়ে ওদেরকে সরিয়ে দেয়, চলেন আপা।

আভাকে দেখে লুবনা মহাখুশি। ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে, আপু আপনি!

সবচে বেশি খুশি লুবনার মা, আমার মেয়ের মুখে খালি আভা আপা! আভা আপা! আজ বুঝলাম ইস্কুলের সব মেয়েরা কেন আভা আপার জন্য পাগল।


অন্তত একজন শিক্ষার্থীকেও যদি কোনো শিক্ষক মানুষ করতে পারেন তবে তার শিক্ষক জীবন সার্থক।


ফিরবার সময় বাসা থেকে পথে নেমে আস্তে করে রিপনকে বললাম, ছোট ভাই ইমরুল ছেলেটা আদ্রিতাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। পরশুদিন আদ্রিতা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে, আপু কাল থেকে আমি আর স্কুলে আসব না।

তারপর চোখটোখ মুছে বলে কিনা গলায় দড়ি দিবে। আমি আর সইতে পারছিলাম তাই তোমার...

রিপন মাথা নুয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে, ঠিক আছে আপা আর লজ্জা দিবেন না।

বাসার কাছে এসে রিপনকে বললাম, ছোট ভাই, তোমরা তো রাজনীতি কর। একটু চাইলেই কিন্তু তোমরা সাধারণ মানুষের অনেক ভালোবাসা পেতে পার।

আমি সেই আভা যে শিশুকালে মা-বাপ হারিয়েছিল। এই রাষ্ট্র যার মায়ের সম্পদ, সতীত্ব রক্ষার তাগিদ বোধ করে না কিংবা অক্ষম। শুধু আমার না। এই দেশের সতেরো কোটি মানুষের কারোই না। ভাগ্য আমার যে, সড়ক দুর্ঘটনায় মরতে মরতে বেঁচে গেছি। আমার ধমনিতে এক মহৎ প্রাণ তরুণের রক্ত। যে অজ্ঞান আভাকে বাঁচার জন্য নিজের আহত, রক্তাক্ত দেহ থেকে রক্ত দিয়েছিল। আমি তার মহত্ত্বের, ভালোবাসার প্রতিদান দেবো আমার স্কুলের গরিব আর অসহায় মেয়েদেরকে নিজের সন্তানতুল্য ভালোবাসা দিয়ে, সেবা দিয়ে। আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে মিশরের এক মনীষী পাথরে খোদাই করে লিখে গেছেন, অন্তত একজন শিক্ষার্থীকেও যদি কোনো শিক্ষক মানুষ করতে পারেন তবে তার শিক্ষক জীবন সার্থক।


পর্ব-১১

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা