পর্ব-২৩
পর্ব-২৪
নরকের শেষ তোরণ
মানুষ যে এত ভবিষ্যৎ ভবিষ্যৎ করে চেঁচায়, একটা রসাল ভবিষ্যতের জন্য মরণের আগের দিন পর্যন্ত লড়াই করে, মৃত্যুর সময়ও হায়পস্তানি নিয়ে বন্ধ করে দুই চোখ, কারণ তার চর্মচোখে সে শুধু দুনিয়াটাই দেখে। জন্তু যেমন খায়-দায়, হাগে-মুতে তারপর মরণ এলে একটা টানা মেরে মরে যায়। একটু অন্তরের চোখ দিয়ে দেখলে আজ সোনার বাংলার নিরানব্বই ভাগ মানুষও তাই। জননীর কোল থেকে মাটিতে পা ফেলেই সে দেখে তার পরিবারসহ তামাম জাহানের মানুষ শুধু আমার! আমার! জপছে। যারা আমার আমার করে সর্বক্ষণ চারপাশের সব কিছুতে নিজের দখলদারি কায়েম রাখতে চায়, বুঝতে হবে তাদের মানব সত্তাটা মরে গিয়ে দেহসর্বস্ব হয়ে গেছে। তারা এখন গোয়ালে বাঁধা গরুটার মতো হৃদয়ের চক্ষুহীন, অবোধ একটা জীব মাত্র। এই ভোগবাদী সংসারে মহাত্মনেরা বলে গেছেন, মানবাত্মা অমর বলেই মানুষের ভবিষ্যৎ অন্তহীন। তবু চক্ষু-কর্ণহীন মানুষেরা শুধু খামখাম, শুধু আমার আমার করে তার তিন পরাস্ত জীবনের বাতিটা এক ঘাটেই নিভিয়ে ফেলে। কথায় বলে, মানলে গুরু, না মানলে গরু। আত্মার অমরতা মানা না মানা যার যার প্রজ্ঞার দৌড় আর ব্যক্তিগত যুক্তির জিনিস।
আজ মানুষের পায়ের তলার মাটি, বুদ্ধি-বিবেকের আলো, জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তার সুবাতাস, মনের স্বাধীনতার আকাশ, মানবিকতায় উজ্জ্বল অফুরন্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন জোগাবার পানি না পেয়ে এই দেশের মানুষ নামের মহাবৃক্ষগুলো জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই বাবলার কাঁটাঝোপ হয়ে যাচ্ছে।
নবিজি সব শুনে বললেন, সে একজন কবি। তাকে বসে থাকতে দাও।
হায় স্বদেশে! হায় জননী! আজ জুতা-কালিকরার মুচিটাও কত কম সময় ও কালি খরচ করে কত বেশি টাকা হাতানো যায় সেই ধান্দায় থাকে, যেখানে কাজ নয়, সেবা নয়, শিকারের অপেক্ষায় উৎপেতে বসে থাকে অফিসের পিয়ন থেকে সর্বোচ্চ কর্তামশায়, যে দেশের স্তরে স্তরে খাদক, যে রাষ্ট্রের পনেরো আনা মানুষ বিকারগ্রস্ত, যাদের রক্তে মিশে গেছে লোভ, বিকৃত কামনা, অহংকার, আমিত্বের বড়াই, যাদের সকলেই শিকার ও শিকারি সেখানে মানুষ শব্দটাই বেমানান। বড়ো বেশি হাস্যকর।
স্তব্ধ আভা কনকের পাশে বসে এইসব ভাবতে থাকে। ইজিবাইকটা বাঁয়ে মোড় নেয়। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। বড় বড় শপিংমলগুলো ফাঁকা ফাঁকা। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো খালি খালি। ডান দিকে কিসমত নামের রেস্তোরাঁটার সাউন্ডবক্স থেকে ভেসে আসছে সুরা আল ইমরান-এর সুমিষ্ট সুর, ‘ওয়াতু ইজ্জু মান্তাসাও ওয়াতু জিলু মান্তাসাও বিইয়াদিকাল খাইড়। যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত করো কিংবা অপমানিত করো।’ এইকি নিয়তির খেলা, ভাগ্যের কাহিনি? আভার ঠোঁটে জ্বলে ওঠে বিদ্রূপের হাসি : যারা আজ সতেরো কোটি মানুষের ভাগ্যের ছক সামনে নিয়ে বসে আছে, ছক্কা-পাঞ্জার দান ফেলছে তাদের নিয়তিটা দেখতে তার বড় সাধ হয়। আর তখনই আভার চোখে ভেসে ওঠে নারায়ণগঞ্জের বৃষ্টিঝরা সেই রাতটা, একটু আগে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক দঙ্গল কুকুরের হোটেলে হোটেলে তল্লাশি। তার যে কী হয়! বুকের ভিতর কী যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে! এতক্ষণের অবরুদ্ধ কান্নাটা হৃদয়টাকে চুরমার করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তাই সে দাঁতে দাঁত কামড়ে অসহায়ের মতো পাশে বসা কনকের কাঁধে নিজের মাথাটা ছেড়ে দেয়। কনক সাড়া-শব্দহীন, মরা মাছের চোখের মতো চোখ দুইটা উদাস। আভার চোখের পানি ঝরঝর করে কনকের কাঁধে পড়ছে। কনক চমকে ওঠে। তারপর এক হাতে আভাকে আলগোছে ধরে তার মাথায় মমতার হাত বুলাতে থাকে। এই হাত মানুষের। দরদি এই হাত সান্ত্বনার, ভরসার, ভালোবাসার। এই কথা আভার চেয়ে আর কে ভালো জানে?
আজ কনকেরও কাঁদতে ইচ্ছা করছে। যার কোনো প্রবোধ নাই সে কান্নার মাঝে সান্ত্বনা খোঁজে। এই জীবনে কত মেয়ের সর্বনাশ করল, আঘাতে, অপমানে অন্যায়ভাবে কত মানুষের হৃদয় ছিন্নভিন্ন করল! আক্ষেপের আগুনে পুড়তে পুড়তে কনকের দুই চোখ নিঃশব্দে ভিজতে থাকে। সান্ত্বনার পরশ পেয়ে আভা অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে। তাই সে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এদিকে রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে দুই-একটা মেহগনি গাছ তাদের সহিষ্ণু প্রাণ নিয়ে আলো-ছায়ায় ঝুপথুপ, বেহাল-বোবা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আজ কনকও কি তাই? আভা চোখ বন্ধ করে কনককে বুঝতে চেষ্টা করে। এই বিরল প্রজাতীর তরুণটা সময় ও সমাজের এই শিকার শিকার খেলা দেখতে দেখতেই কি মরমির চেতনা দিয়ে জীবনের মানে খুঁজতে চাইছে?
রাস্তার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফুটপাতের চাখানাগুলোতে ছোট ছোট দলে তরুণেরা আড্ডা দিচ্ছে। আমাদের কাজী সাহেবে বলে গেছেন, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার সময় তার।’ আভা ভাবে, এই দেশে এখন যৌবন যার, কুকুর হয়ে যাবার সম্ভাবনা তার। তাই তরুণরা আজ এই সমাজের আতঙ্ক, নারীর কাছে বিভীষিকা।
একটা চাখানার সাউন্ডবক্স থেকে উচ্চরবে ভেসে আসছে একজন হুজুরের ক্রুদ্ধ-কঠিন গলা, ...আর তোমারা লানত প্রাপ্ত হবে, বঞ্চিত হবে খোদার রহমত থেকে এবং তোমাদের উপর নেমে আসবে আসমানি গজব, দুর্ভিক্ষ, মহামারি...।
আভা চমকে ওঠে। এত কঠিন, এত রুক্ষ জবানে মহান রাব্বুল আলামিনের বাণী কে উচ্চারণ করে? সে কি ভুলে গেছে খোদার নাম রাহমানুর রাহিম। তিনি ক্ষমাশীল, দয়ার সাগর। এবং তাঁর প্রিয় বন্ধু রাসুলে পাক করিম ছিলেন বিনয়, ভদ্রতা ও মহত্ত্বে জগতের শ্রেষ্ঠতম পুরুষ! সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাঁর ভালোবাসার আহ্বান, হাসনাহেনা ফুলের মতো সুরভিত ব্যবহার, দয়ালু কণ্ঠস্বর আর কোরআনের সুললিত বাণী শুনে জগতের সব পাপী-তাপী, রাজা-প্রজা, দাস-প্রভু সকলে পতঙ্গের মতো ছুটে এসে ঠাঁই নিয়েছিল ইসলামের ছায়াতলে। তো নামাজ শেষে প্রায়ই আমাদের নবিজি মসজিদে নববীর সামনে বসে সাহাবিদের সাথে কথা বলতেন। মাঝে মাঝে একজন ইহুদি এসে সবার পেছনে বসে মন দিয়ে রসুলের কথা শুনত। একদিন সাহাবিরা নবিজির কাছে তাঁদের পেছনে বসে থাকা ইহুদির কথা বললেন। নবিজি সব শুনে বললেন, সে একজন কবি। তাকে বসে থাকতে দাও।
মানুষকে শুধু ধর্মের শিকল দিয়ে নয়, হৃদয়ের সুধা দিয়ে, মানবতার ঐশ্বর্য দিয়ে ভালোবাসার জন্য জগতে এরচে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে?
আভার মনে আছে, একবার তার স্কুলের মাওলানা সাহেবকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ওয়াজিরা ওয়াজের সময় কেন এত উত্তেজিত গলায় বারবার গর্জন করেন?
মাওলানা সাহেব মুচকি হেসে বলেছিলেন, গর্জন না দিলে ওয়াজ জমে না, পাবলিকে খায় না। ওয়াজে যে যত জোশ আনতে পারে, পাবলিকের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে পারে, বাজারে তার চাহিদা তত বেশি।
তার মানে ওয়াজটাও আজ পণ্য! মঞ্চে দাঁড়িয়ে আল্লাহর মহিমার কথা বলতে গিয়েও ওয়াজিকে আজ বাজারের কথা, চাহিদার কথা মনে রাখতে হয়!
এইসব ভাবতে ভাবতে ব্যথিত, লাঞ্ছিত আভার মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়। এলাকাটা বেশ নিরাপদ মনে হলে কনকরা নেমে পড়ে। আসলে এই শহরে তাদের তো যাওয়ার কোনো জায়গা নাই তাই শুধু ঘের জালে আটকা পড়া মাছের মতো তারা এদিক-সেদিক ছুটছে। মানুষ দেখলে মনে সাহস আসে। শুধু নিজের উপর নয় মানুষের উপরেও বিশ্বাস বাড়ে। তাই ইজিবাইক থেকে নামতে নামতে আভা একটু সহজ গলায় বলে, টাউন হলের মোড়।
প্রিয় পুরুষের হেফাজতে একজন নারী যেভাবে অচেনা পথে হাঁটে তেমনি আভাও কনকের হাত ধরে হাঁটছে।
কনক এই শহরে প্রথম। তাই সবকিছুই তার কাছে অচেনা। চরালগীর চরে আসার আগে থেকেই তার চোখের মণিতে একটু একটু ব্যথা করত। এখন সকালে ঘুম থেকে উঠলে দেখা যায় দুই চোখেই প্রচুর কেতুর জমে আছে। তো কনক আজ এসেছিল চোখের ডাক্তারের কাছে। আভা এই শহরে এর আগে আরো কয়বার এসেছে। কিন্তু সময়ের অভাবে জয়নুল সংগ্রহশালাটা তার দেখা হয় নি। আজ ছুটি থাকায় শিল্পাচার্যের বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলো দেখার লোভে সে এসেছিল সকালের ট্রেনে। ইচ্ছা ছিল দুপুরের কমিউটারে ফিরে যাবে। যে দেশে প্রতিদিন শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় এক-দেড় ডজন মানুষ রাস্তাঘাটে আলুবর্তা হয়, ছিনতাইকারী, অজ্ঞানপার্টি, খুনিদের হাতে নির্মম হত্যার শিকার হয় আরো অন্তত দুই ডজন খানেক, বয়স নির্বিশেষে ধর্ষিতা হয় দুই-আড়াই ডজন নারী, সেখানে সহিসালামতে ফিরে যাওয়া শব্দটা প্রায়ই খুব ভয়ংকরের ভেতর থেকে বিদ্ঘুটে চেহারা নিয়ে বেরিয়ে আসে।
ওরা হাঁটছিল। মহিলা কলেজের মোড়ের বিরাট চত্বরে আসতেই রাস্তার পাশের আড্ডা থেকে এক তরুণ এলোমেলো পায়ে কনকের সামনে এসে দাঁড়ায়, ব্রাদার ম্যাচটা দেন।
অনিয়ম, অনাচারে তারুণ্যের মাধুর্যহীন চেহারা, ভাঙা চোয়ালের উপর সেই ফ্যাংলা ফ্যাংলা দাড়ি, পরনে সেই শর্টস, চোখে বিখাওজের মতো স্যাঁতসেঁতে নজর। যতটা সম্ভব আভা কনকের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। তবু ছেলেটা কনকের কাঁধের উপর দিয়ে আভার দিকে রাক্ষুসে চোখে তাকিয়েই থাকে। কনক বলে, ম্যাচ নাই।
নাই?
না।
শিট! শিট! কী যে মানুষ এরা, সিগারেটের মতন জিনিস খায় না! ম্যাচ রাখে না!
শেষবারের মতো আভাকে দু’চোখে গিলতে গিলতে ছেলেটা কনককে উপদেশ দেয়, ভবিষ্যতে আমাদের এলাকায় এলে ম্যাচ নিয়ে আসবেন।
ছেলেটা এলোমেলো পা ফেলে ফিরে যায়। কনকদের পাশ দিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছিল। আভা ডাক দেয়, এই থাম।
আবার পলায়ন। চোর পালাতে পারে। ডাকাত, ছিনতাইকারীর পালাবার অনেক পথ রয়েছে এই শহরের আনাচে-কানাচে। সরকারের পাঁচশ একর খাস জমি পকেটে নিয়ে ভূমি খেকুর পালাবার তিন হাজার পথ সরকার নিজেই রেডি করে রেখেছে। আস্ত সোনালি ব্যাংকটা লাগেজে ভরে উন্নত বিশ্বের সেকেন্ড হোমে পালিয়ে যাওয়ার পথের কোনো অন্ত নাই। কিন্তু আজ এই দেশে আভা কিংবা কনকের মতো সাধারণ মানুষের পালাবার সমস্ত পথ সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।
ওরা এসে নামল কালিমন্দিরের সামনে। পাশে ব্রহ্মপুত্র। ক্ষমতাধর প্রভুদের ছত্রছায়ায় শহর ঘেঁষে মরা নদীর কয়েক মাইল পার জুড়ে গড়ে উঠেছে পুঁতিগন্ধময় ঠাঁস বুনন বস্তি। সেই সুবাদে এদিকটা রীতিমতো লম্পট-লোচ্চা, মাতালের চারণ ভূমি। রাত বাড়লেই এদিকে মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। কথায় বলে না, নিজে সাউদ হলে খুনিকেও প্রথম দর্শনে মানুষ তার মতো সাউদ ভাবে। আভার হয়েছে সেই দশা। তাই তারা দুইজন কালিমন্দিরের কাছে এসে আলো ও মানুষ দেখে রিকশা থেকে নেমে পড়ে। কোন দিকে যাবে? সামনে একটা, ডানে একটা এবং বাঁ দিকের পথটা নদীর চরের দিকে চলে গেছে। সোজা সামনের দিকের পথটাই বেশি আলোকিত। হঠাৎ হঠাৎ দুই-একটা মিশুক-রিকশা তির বেগে ছুটে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে দুই-একজন বিড়ি টানতে টানতে গতর ছেড়ে হাঁটছে। চাখানা আর টং দোকানগুলোতে মানুষ ভিড় জমিয়ে কবকব গপ্প করছে, ফেকফেক করে হাসছে, কেউ কেউ খকখক করে কাশতে কাশতে জড়ানো গলায় খামাখাই খিস্তি ঝারছে। একটু দূরে রাস্তার পাশে, ইউক্যালিপ্টাস গাছের নিচে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছে এই রাস্তায় যাওয়াই নিরাপদ বলে মনে হয়। নদীর দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। ওপারের পাওয়ার প্লান্টের অসংখ্য বাল্ব থেকে আসছে বখতিয়ার খিলজির ঘোড়ার মতো উন্নয়নের ট্র্যাকে লাফিয়ে ওঠা বাংলাদেশের ঝলমলানি।
ভাইয়ের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে, প্রিয় পুরুষের হেফাজতে একজন নারী যেভাবে অচেনা পথে হাঁটে তেমনি আভাও কনকের হাত ধরে হাঁটছে। গাছটার পাশে যেতেই গাড়ি থেকে দুই জন পুলিশ নেমে এসে তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়, দাঁড়ান।
কনক আভার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে।
কোথায় যাচ্ছেন?
কনক : সামনে।
সামনে কোথায়?
আভা জানে কনক এই শহরের কিচ্ছু চিনে না। তাই সে বলে, পাটগুদামে।
এইবার পুলিশ আভার দিকে তাকায়, সাথের জন কে?
ভাই।
উনার নাম কী?
কনক।
শুধু কনক?
আভা তো কনকের পুরা নামটা জানে না। ফেসবুকেও তো দেখেছে শুধু কনক। তাই সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশ দুইজন চোখ ঠারাঠারি করে। এই সময় গাড়ি থেকে কতৃত্বের কড়া গলা ভেসে আসে, সাথের লোকটার পোরো নাম কি?
প্রশ্নটা করতে করতে দলের কর্তাটি গাড়ি থেকে নেমে এসে আভার সামনে দাঁড়ায়, সে আপনার ভাই?
হ্যাঁ, ভাই।
বাবার নাম কী?
আভা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে পুলিশ চোখেমুখে বিটলা হাসি নিয়ে কনকে জিগায়, আপনার বোনের বাপের নাম কী?
চুদানি খেলতে বারহইছ? থানায় গ্যালে বুঝবা চুদানি কী জিনিস।
তারা দুই জন-ই বোবা। কনকের মনে পড়ে সেই দুর্ঘটনার কথা। ধানমন্ডির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই তো সে মরতে চাইছে। তবু মৃত্যু নয় জীবন-ই তাকে বারবার খাদের অতল থেকে টেনে তুলছে!
মুহূর্তে কনকের ভেতরটা আচানক এক আলোতে ঝলমলিয়ে ওঠে। সেই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়ার পর সে মনে মনে স্থির করেছিল, মানুষকে সে মানুষের মতো ভালোবাসবে। তাই তো দু’হাতে তোলে নিয়েছিল অজ্ঞান আভার রক্তাক্ত দেহটা। নিজের আহত দেহ থেকে দিয়েছিল রক্ত। কনকের নীরবতায় পুলিশ ধমকে ওঠে, চুপ করে আছেন কেন?
তবু সে চুপ করেই থাকে। চুপ করে থাকে আভাও। যে কনক একদিন তাকে রক্ত দিল, নতুন একটা জীবন দিল, যার হৃদয়ের ছবি আভার হৃদয়ের আয়নায় কথা কয়, যে আজ সেই সন্ধ্যা থেকে স্নেহ-মমতার ছায়া দিয়ে তাকে আগলে রাখছে সে সেই কনকের পুরা নাম কী, বাপের নাম কী জানে না। শুধু একটা নাম না জানার জন্য আভার বুকে ছুটে চলা কনকের রক্ত, মনের শ্রদ্ধা, হৃদয়ের
মানবিক প্রেম সব মিথ্যা? সব কলঙ্ক! হায় বিধি! সেদিনের দুর্ঘটনায় তুমি কেন আমার মৃত্যু দিলে না?
দুই জনকেই জোর করে গাড়িতে উঠানো হয়, চুদানি খেলতে বারহইছ? থানায় গ্যালে বুঝবা চুদানি কী জিনিস।
এইসব বলতে বলতে সেই কর্তাটি আভার দিকে তাকিয়ে জিব চাটে।
কনক ভয়ংকরর ভাবে চিৎকার দিয়ে ওঠে, মুখ সামলে কথা বল।
কনকের গর্জনে প্রথমে পুলিশরা হকচকিয়ে ওঠে। তারপরই সেই কর্তা কর্তা গলাটা ড্রাইভিং সিটের পাশ থেকে ভেসে আসে, চুপকর মাদারচুদ।