নরকের সহস্র তোরণ : ৬

পর্ব-৫

পর্ব-৬

রক্তের ঋণ

হাসপাতালের বিছানায় কনক ঘুমে তলিয়ে আছে। তার হাতে-পায়ে, কপালে ছোট ছোট অনেকগুলো ব্যান্ডেজ। শিথানের দিকে খাটের স্ট্যান্ডে একটা স্যালাইন থেকে ফোঁটা ফোঁটা তরল শক্তি চিকন নল বেয়ে নামছে তার অবশ-অচেতন দেহে। আভার জন্য রক্ত নেওয়ার পর তাকে চিকিৎসা দিয়ে ঘুমপাড়িয়ে রাখা হয়েছে। ব্যথানাশক ওষুধের সাথে মরফিনের তীব্র ক্রিয়ায় তার ঘোরগ্রস্ত ইন্দ্রিয় খোয়ারি ভাঙছে। স্বপ্ন দেখছে ধানমন্ডির সেই লাফাঙ্গা কনক। দেখছে সে মানব সভ্যতার, মানুষের জীবনের, বাঙালির ঐতিহ্যের সব আল-বাতর ভাঙতে ভাঙতে শেষ কিনারে এসে একা দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটা মস্ত খাদ। আর কোথাও যাওয়ার কোনো পথ নাই। সে সেই অতল খাদের সামনে দাঁড়িয়ে একা একা কাঁদছে। হঠাৎ কোত্থেকে যেন বন্ধুরাসব হৈ হৈ করতে করতে এসে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গেছে, আমরা চেরাপুঞ্জিতে বেড়াতে যাচ্ছি, চল আমাদের সাথে।

প্রস্তাব দিল রিটা চৌধুরী। ওর মুখ থেকে ভক ভক করে বিয়ারের গন্ধ আসছে। ওর বাবা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক। মালয়েশিয়া ও কানাডাতে ওদের সেকেন্ড হোম আছে। কনকের বাবা রিটাদের তুলনায় আঁস্তাকুড়ের ছুঁচো। তাই সে কনককে করুণা করে।


মাঝে মাঝে তার ইচ্ছা করে একটা ছুরি নিয়ে মা-বাপ-বোন নামক সবকটা কুকুর-কুকুরিকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শেষ করে দেয়।


কনকরা ক’জন সুযোগ পেলেই ঢাকা নামক এই ভাগাড় থেকে পালায়। বিদেশি মদ আর মেয়ে-মানুষের স্বাদে-গন্ধে ভোঁতা হয়ে আসে জিবের স্বাদ বদলায়, শরীরের জাড্য ভাঙে। তো বন্ধুদের সাথে কনক যেন ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বেড়াতে গেছে। সেখানে বাংলাদেশ সেন্টার থেকে অনেক নিচে, অনেক দূরে তাকিয়ে আছে সে। বুকের মাঝে খাবলা খাবলা আগুন। যার বাপের ঠিক নাই তার মতো দুঃখী কে? যতই জন্তু হোক এই জিনিস সে খুব ভালো করে বুঝতে পারে। হয়তো অবচেতনের সেই বিষক্ষতের বিষাক্ত রসের নিরন্তর ধারাপতনে, ফ্রয়েডীয় চেতনার বিদঘুটে ঈর্ষায় কিংবা সত্যিকারের একটু প্রেম, মমতার এক টুকরো জমিনের অভাব মাঝে মাঝে তাকে পাগল করে দেয়। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছা করে একটা ছুরি নিয়ে মা-বাপ-বোন নামক সবকটা কুকুর-কুকুরিকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শেষ করে দেয়। খুনি হোক, লম্পট হোক নিজের মন বলে একটা জিনিস আছে। কখনো বিরল মুহূর্তে সেই মনটা এক ফোঁটা শান্তির জন্য খাঁখাঁ করে। আর তখনই সে বন্ধুদের সাথে পালায়। পালিয়েই কি মুক্তি আছে? যাকে দেখতে চায় না বলে, যাকে ভুলতে চায় বলে সে-পালায় সেই মায়ের কথা তবু বারবার মনে পড়ে। কিন্তু মায়ের নাম মুখে নিতেও তার ঘেন্না হয়।

একটু নিঃসঙ্গ হলেই আর্মির সেই কালো মতো জেনারেলটার কথা ঘুরেফিরে মনে আসে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই লোকটাকে দেখছে। লোকটা তাদের বাসাতে এসেই তাকে কোলে নিয়ে কিংবা পাশে বসিয়ে তার সাথে আলাপ জুড়ত। আদর করত। দুনিয়ায় যত নামিদামি চকলেট আর খেলনা আছে লোকটা তাকে সব এনে দিত। আদর। মিষ্টি মিষ্টি আলাপ। মাঝে মাঝে লোকটা তাকে কোলে বসিয়ে, তার জিপ নিয়ে বেড়িয়ে পড়ত। কী ঝকঝকে মানুষ। কী তরতরে ধারাল ব্যক্তিত্ব। বয়ঃসন্ধিকাল। কনকের গালে ব্রণ উঠছে। একদিন ফাঁক মতো বাসার সবচে সুন্দরী আর কম বয়সী কাজের মেয়েটাকে সিঁড়ির নিচে পেয়ে জড়িয়ে ধরল।

একদিন বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জেনারেল তাদের বাসায় এল। তার সিজন্যাল সর্দি-জ্বর। সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ট্যাবে গেইম খেলছে। ছোট বোনটা স্কুলে। বাবা রংপুরে। দোতলায় কনকের মায়ের ফ্ল্যাটে তার হুকুম ছাড়া কাজের লোকদের উঠা নিষেধ ছিল। তো জেনারেল সাহেব তাকে দেখেটেখে বেরিয়ে গিয়ে পাশের রুমে চা খেতে বসে। কনক আজও দিব্যি মনে করতে পারে লোকটা তার মাকে আমুদে গলায় বলছে, প্লিজ, আরেকটা চুমু খাও। কনক এইসব মনে করতে চায় না। এইসব আগুন। এইসব হ্যামলক। সে যদি একটা সাব মেশিনগান হাতে পেত!

চেরাপুঞ্জির এত মেঘ, এত পাহাড়, সবুজ প্রকৃতির এই যে এত সম্ভার কিছুই কনকের চোখে পড়ে না। তার নির্জন মুহূর্তগুলো বিষাক্ত বিছার দংশনের মতো অমানুষিক কষ্টের, দহনের। সেই কিশোর বয়সে সে নির্বোধের মতো, পাগলের মতো লোকটার চোখ-নাক আর গায়ের কালো রঙটার কথা ভাবত। লোকটার ডান চিবুকের পাশে একটা লাল তিল আছে। ঠিক তারও একটা তিল এক-ই জাগায়, দেখতে এক-ই রকম। একটু একা হলেই সে হাতের আঙুল দিয়ে আলতো করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজের তিলটার অস্তিত্ব বারবার তালাশ করে দেখত। যখন গোঁফ উঠতে শুরু করেছে, রেশমি রেশমি কালো চুলে গাল দুইটা ঢেকে যাচ্ছে, তখন সে প্রায়ই দুপুরে বাড়ির সামনের রাস্তা পেরিয়ে ফাঁকা সেলুনে গিয়ে খুর দিয়ে তিলটা উপরে ফেলতে চাইত। তার সামনের বিশাল আয়নায় স্পষ্ট হয়ে আছে, কলঙ্কিত তিল, চুল, শরীরের কালো রং। কিশোর কনক একা একা তার দেহ থেকে কলঙ্কের কতটা কালি মুছে দিতে পারে?

দেহে যৌবন আসার পর আয়নার সামনে দাঁড়ালে কনকের শরীরটায় আরো তীব্র হয়ে ভেসে উঠত আরেকটা শরীর। শরীরটার পেছনের গোপন ইতিহাস। চেরাপুঞ্জির বাংলাদেশ সেন্টারে দাঁড়িয়েও কনক সেই এক-ই কথা ভাবছিল। অনেক উপর থেকে বাংলাদেশকে দেখা যায় না। দেখা যায় না রংপুরের ডিসি সাহেবকে। সে শুধু জেনারেলকেই দেখে। তাই মাথাটা নুয়ে পড়ে, আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে আসে চোখ দুইটা, লহড় তোলে মনে জ্বলতে থাকে নরকের আগুন।

ছোট করে চুলছাঁটা দীর্ঘদেহী কালো মতো একজন সুপুরুষ এসে কনকের পাশে দাঁড়ায়। কনকের মাঝে যেন জগতের সাড়া নাই; মাথা নুয়ে সে ভাবছেই। ভদ্রলোক অসীম মমতায় তার পিঠে একটা হাত রাখে, এত কী ভাবছ? কেন ভুলে যাও, পৃথিবীতে মানুষ আসে শুধু কষ্ট পেতে। এই যে সারে সারে, কাতারে কাতারে মানুষ দেখছ, তারা কেউ-ই সুখী না। সুখ একটা মরীচিকা। একটা মায়া। আমরা নির্বোধ মানুষেরা সুখ সুখ করে খামাখা ছুটছি।

কনক মাথা তুলে অবাক, আপনি?

হ্যাঁ, ছুটি কাটাতে এলাম।

একলা?

হ্যাঁ।

ফ্যামিলি?

নাহ্, লাইফ লং ব্যাচেলর।


কনক পৃথিবীর সমস্ত ঘৃণা নিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইছিল; পাড়ল না।


লোকটার চকচকে কালো চোখ দুইটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। কনকের কেমন জানি মায়া হয়। জীবনে যদি কারো সত্যিকারের ভালোবাসা পেয়ে থাকে, হৃদয়ের পলল মাটির পরশ পেয়ে থাকে তবে তা এই সে লোক। তাই সে মুখটাকে একটু হাসি হাসি করে বলে, এরকম জায়গায় একা এলে ভালো লাগে না। আপনজন কাউকে সাথে নিয়ে এলেই পারতেন।

এবার লোকটা নিঃশব্দে হাসে, আপনজন থাকলেই কী আর আপনজন হয়ে উঠতে চায়?

কেন?

জীবনে কত জটিলতা আছে, সংকট আছে।

যতকিছুই থাকুক আপনজন তো আপনজনই।

এই বলে কনক যেন লোকটার দিকে মমতার চোখে তাকিয়ে থাকে। লোকটার বিষণ্নতা তার ঠোঁটে, চোখে-মুখে কান্নার মতো ঝরে পড়ে। বড়ো করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটা একটু অবাক গলায় বলে, তোমার মধ্যে তো দারুণ চেইঞ্জ দেখছি!

কিসের?

চিন্তার।

কনক কথা বলে না। আবার তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মাথা নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। লোকটা এবার তার পিঠে, মাথায় বড়ো মমতায় হাত বোলাতে থাকে। কনকের অসহ্য লাগছিল। তাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আবার বলে, ভ্রমণে একা না আসাই ভালো।

লোকটা হাসে।

কনক অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এইবার লোকটা তার চোখে চোখ রেখে বলে, তুমি আমার আপনজনের কথা বলছিলে না?

কনক বোকার মতো মাথা নাচিয়ে সায় দেয়। লোকটা বলে, জানো, আমার পরম আপনজন এখানেই আছে।

এই বলে লোকটা কনকের দিকে তাকিয়ে রহস্যের হাসি হাসে।

কনক চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাকে যেন খুঁজছে দেখে লোকটা আবার কনকের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, তুমিই তো আমার আপনজন; আমার একমাত্র পুত্র।

কনক পৃথিবীর সমস্ত ঘৃণা নিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইছিল; পাড়ল না। তাই মাথাটা আবার নুয়ে পড়ে। একটু পরেই অনেক নিচ থেকে বেল ফাটানোর মতো একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে। বাংলাদেশ সেন্টারের মানুষগুলো হায়! হায়! করে ওঠে। কনক চোখ খুলে দেখে লোকটা তার পাশে নাই। সবাই নিচের দিকে ঝুকে তাকিয়ে আছে। সে-ও চেয়ে দেখে কয়েক হাজার ফুট নিচে সেই লোকটা গাছ থেকে পড়া পাকা কালো জামের মতো চ্যাপ্টা হয়ে পাথরে মিশে আছে; চারপাশে লাল লাল রস।

কনকের ঘুম ভেঙে যায়। সে ধড়ফড়িয়ে ওঠে। মগজটা ফাঁকা। তীব্র ব্যথা নাশকের ক্রিয়ায় শরীরে নেশার আমেজ। মাথার উপর স্যালাইনের খালি প্যাকেট ঝুলছে। ডান পায়ে হাঁটুর নিচে বিরাট একটা ব্যান্ডেজ। চোখের সামনে দুনিয়াটা একটু একটু দোলছে। ঝিমানোর মতো একটা ঘোরে সে-আবার আছন্ন হয়ে পড়তে চাইছে। মনে এখনো স্বপ্নের রেশ। কিন্তু সেই জেনারেলের মুখটা তাকে তাড়া করে। তাই কনকের ইচ্ছা হয় নিজের মুখটা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলতে।


বিকাল পাঁচটা তিরিশ মিনিটের সময় ভারতের চেরাপুঞ্জির বাংলাদেশ সেন্টার থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন।


খটখট পায়ে সকালের পবিত্রতা ভাঙতে ভাঙতে একজন নার্স এসে কনকের বেডের পাশে দাঁড়ায়, একটু আগে আপনার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরেছে।

এই কথা বলে সে একটা কাগজ কনকের সামনে মেলে ধরে, এই ফর্মটা ফিলাপ করে সইটই দিয়ে দেন।

কিসের ফর্ম?

কাল রাতে যে রক্ত দিলেন।

কনক নার্সের হাত থেকে কাগজ-কলম নিয়ে দ্রুত লিখতে থাকে। তার বুঝি এখন খুব তাড়া।
হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসতে আসতে কনকের মনে হয় এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে গল্পটা বাংলা সিনেমা হয়ে যাবে।

মহাসড়কের পাশে একটা খোলা হোটেলে বসে পোয়ারুটি-আলুভাজি দিয়ে কনক নাস্তা করে। হোটেলের সবার নজর তার দিকে। ক্যাশবাক্সের সামনে বসা লোকটা হাতের গামছা নাড়িয়ে ডাল-ভাজির বাসনের উপর থেকে মাছি তাড়াতে তাড়াতে বলে, আহারে মেলা লোক মরছে, হাসপাতালে আরো যে কতজন মরব।

কনকের সামনে বসা মুরুব্বি মানুষটা বলে, আফনে ত অহনও সুস্থ না; একলা একলা যাইবেন ক্যামনে, বাপ-ভাই কেউ আইছে না?

কনক এইসবে পাত্তা দেয় না। গত চার বছর ধরে এইসব সইতে সইতে এখন পুরোটাই সয়ে গেছে। তার সামনে বসা মুরুব্বির মাথায় টুপি। সম্ভবত পেনশনে আছে। কাজটাজ নাই তাই ফজরের পর একটু হাঁটাহাঁটি করে হোটেলে এসেছে। সামনে এক কাপ চা, দুই হাতে উঁচু করে ধরে খবরের কাগজ পড়ছে। কনক চায়ে চুমুক দিতে দিতে বিপরীত দিক থেকে দেখে, প্রথম পাতার কোনার দিকে ছোট করে সেই জেনারেলের ছবি। খামাখাই বুকটা কেঁপে ওঠে। সে ছবিটার নিচ থেকে পড়তে শুরু করে : মেজর জেনারেল তৌফিকুজ্জামান কাল বিকাল পাঁচটা তিরিশ মিনিটের সময় ভারতের চেরাপুঞ্জির বাংলাদেশ সেন্টার থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি গত চার বছর যাবৎ ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন।

কনক আর পড়ে না। সে ঢাকার ধানমন্ডি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে চার বছর হলো না? কনকের দুই চোখের কোনায় টলমল করছে দুই ফোঁটা পানি।


পর্ব-৭

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা