নরকের সহস্র তোরণ : ১৮

পর্ব-১৭

পর্ব-১৮

বিনির্মাণ থেকে বিলয়ের দিকে

কারণে-অকারণে মানুষ হাসে-কাঁদে। পাওয়া-নাপাওয়ার হিসাব মিলাতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে নিজেকে চৌচির করে। আঘাত-অপমান আর শোকে সংসার নামক ঘূর্ণিস্রোতে হাবুডুবু খায়। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি নিরন্তর এইসব অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই সে নিজেকে চিনে, জীবনকে ভালোবেসে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। ধাবমান জীবনের এই আবর্তে থমকে দাঁড়াবার সুযোগ নাই। যে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, সে কালের স্রোতে হারিয়ে যায়। সংসারের এই অলিখিত বিধি, মানব জীবনের এই অনির্বচনীয় চেতনা থেকেই হয়তো বিষণ্নতা আভাকে চেপে ধরতে পারে নি। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে, ব্যক্তির গোপন কষ্ট আর মানসিক চাপ চরম হলে অবচেতন প্রেষণা থেকে কেউ কেউ বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখায়। অর্থাৎ সে প্রাণময় ও ফুর্তিবাজ হয়ে ওঠে। আভাও কী তাই?

আভা চট করে বিছানা থেকে নেমে পড়ে। অনেকক্ষণ আগেই তার ঘুম ভেঙে গেছিল। শুয়ে শুয়ে এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কান্নায় তার দু’চোখ উপচে ওঠে। আজ তার মায়ের মৃত্যু দিবস। এইদিন রাতে তার মা গলায় দড়ি দিয়ে জীবনের দায় শোধ করেছিল। মহাকাল তাকে সময়ের বুক থেকে মুছে দিয়েছে।


বোধকরি মানুষ খোদাকে অস্বীকার করার হাজার হাজার যুক্তি খুব সহজেই জীবন ও প্রকৃতি থেকে বেছে নিতে পারে।


আভা উড়নার কোনা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাথরুমের দিকে চলে যায়। শহরের মসজিদে মসজিদে ফজরের আজান হচ্ছে। এক ফোঁটা পানি অতিরিক্ত খরচ করতে আভার ভয় লাগে। আর কিছুদিন পরেই এক চুমুক পানির জন্য হোসেনের কারবালা হবে এই পৃথিবী। তাই সে টেপ থেকে এক বদনা পানি নিয়ে কেবলামুখো বসে গভীর মনে অজু করে। আভা অজু শব্দের অর্থ জানে না। প্রয়োজনও বোধ করে না। তার বিশ্বাস অজুর অর্থ পবিত্রতা। শরীর-মন থেকে সব আর্বজনা ধুয়ে ফেলা।

গামছায় হাত-মুখ মুছে সে উত্তরের জানালাটা খুলে দেয়। একটা দমকা হাওয়ায় মনটা ভোরের আকাশের মতো পবিত্র পবিত্র লাগে। মহাকাশের মতো বড় লাগে। অতি সূক্ষ্ম বিষয়ও চোখের নজরে পড়ে। তাই বোধকরি মানুষ খোদাকে অস্বীকার করার হাজার হাজার যুক্তি খুব সহজেই জীবন ও প্রকৃতি থেকে বেছে নিতে পারে। তেমনি বিশ্বাসীর পক্ষেও দলিল মিলে লাখে লাখ। এইসব দলিলের দলাদলিতে আজ পৃথিবী জুড়ে শুধু হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান। আর কিছুদিন পর মহাকাশে বসে টেলিস্কোপ দিয়ে পৃথিবীতে মানুষের তালাশ করতে হবে।

আভা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামজে দাঁড়ায়। সে নিয়মিত নামাজি না। নাজামে দাঁড়ায়, মাঝে মাঝে যখন আর পারে না। সবকিছু অর্থহীন লাগে। সারা বুক জুড়ে ভেসে থাকে মায়ের মুখ তখন সে অজু করে জায়নামাজে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। পরতের পর পরত অন্ধকার। এই জন্যই হয়ত কেউ কেউ বলে, চোখ বন্ধ করলেই দেখবা দুনিয়া নাই।

আভা ধীরে ধীরে পষ্ট উচ্চারণ ও ছোট ছোট সুরা দিয়ে নামাজ শুরু করে। ফরজ নামাজের শেষ রাকাতে সে সুরা আল আসর পড়ছিল। মনে এখনো সেই উচ্চারণ বারবার ফিরে আসছে, ওয়াল আসরে, ইন্নাল ইনসানা লাফি খুসরিন : সময়ের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে (নিমজ্জিত) আছে।

জায়নামাজে আভা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে থাক। মনের মধ্যে কোনো আলোড়ন নাই, ভাবনা নাই। শেষ মুহূর্তে আভাকে তার ছোট খালার হাতে তুলে দিয়ে চলে যাবার সময় মা তাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে উঠেছিল, মা... আমার দুক্কিনী মা রে...ডরাইছ না; দুনিয়াতে যার কেউ নাই তার আল্লা আছে।

ওয়াল আসরে, ইন্নাল ইনসানা লাফি খুসরিন...। সময়ের বিবর্তনে মনন-মজ্জা হারানো ধর্মের কঠিন কঙ্কাল, বিশ্বায়নের হুজুগ, প্রযুক্তির যুক্তিহীন পাগলা ঘোড়া আমাদেরকে অন্ধের মতো তাড়িয়ে নিচ্ছে নরকের দিকে। এইসব ভাবতে ভাবতে আভার সুন্দর, বিষণ্ন মুখটা আরো বিষাদের কালো ছায়ায় ঢেকে যায়। আর বসে থাকার উপায় নাই। বাথরুমে যায়। বারবার চোখমুখ ধোয়, আয়নায় মুখ দেখে, না এখানো চোখে কান্নার রেশ।আরো পানি দেয়। তারপর চোখমুখ মুছে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা একটু আঁচড়ায়, মাথার উড়নাটা আরেকটু সামনের দিকে টেনে দেয়। আভার বড় বড় হান্ডি-পাতিল নাই। মালকিনির কাছে ধার করতে হয়। স্কুল থেকে একদিনের ছুটি নিয়েছিল। তাই রোজা রাখাটা সহজ হয়। এইদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে কোরআনের বাংলা তরজমা পড়ে। সৌদি সরকারের টাকায় একবার কোরআনের বাংলা অনুবাদের লাখ লাখ কপি সারাদেশে বিতরণ করা হয় তখন সে-ও এককপি পেয়েছিল।

আভা চার সের পোলাওয়ের চালের সাথে ছোট ছোট করে কাটা খাশির গোস্ত দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করে। তারপর কাগজের লাঞ্চবক্সে ভরে একটা রিকশা নিয়ে তার গরিব ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়, আজ আমার মায়ে মৃত্যুদিবস, দোয়া করবেন।

ছাত্রীদের মাকে এই কথা বলতে গেলেই বুকে যেন বন্দুকের গুলি লাগে। দু’চোখ ছলছল করে ওঠে। আভা আর দাঁড়ায় না। পেছনে মমতামাখা মিনতির গলা, ম্যাডাম একটু খাড়ুইন। এক গেলাস শরবত খায়া যাইন। এই রৈদের (রোদ) মইদ্যে...!


মানুষ কত সহজে একটু একটু করে নিজের ভিতরের বিবেকবান মানুষটাকে হত্যা করে!


একবারে তো সব নেওয়া যায় না তাই আভাকে আবার আসতে হয়। মালকিনির হান্ডি-পাতিলের সাথে তার ঘরের সবার জন্য পরিমাণ মতো দিতে হয়। নিজের জন্য মুঠখানেক রেখে আরো দশ প্যাকেট নিয়ে সে স্টেশনের দিকে চলে যায়। নিঃস্ব বুড়ো, সংসারের বোঝা বলে গরিব, অথর্ব মাকে ছেলেরা ভাত দেয় না এইরকম অসহায় বুড়ি, বিকলাঙ্গ নারী-পুরুষ-শিশু কিংবা যৌবনে নির্দয় ডাকু ছিল, পাবলিক ধরে হাত-পা ভেঙে কুঁকড়া করে দিয়েছে। বহুদিন একপেট ভালো খায় না। এখন টায়ারপরা পাছা ঘষটে ঘষটে স্টেশনের পাষাণে চড়াট করে আর সারাক্ষণ চেঁচায়, আমার আল্লা-নবির নাম...।

রিকশাটা নিয়েছিল ঘণ্টা হিসাবে। এখন চালক ছেলেটা যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে প্যাডেল মারছে। এক ঘণ্টার জায়গায় দেড় ঘণ্টাতে কুলাবে কিনা সন্দেহ। মানুষের এইসব প্রতারণা আভাকে কষ্ট দেয়। মানুষ কত সহজে একটু একটু করে নিজের ভিতরের বিবেকবান মানুষটাকে হত্যা করে! চারপাশের এইসব ছোট ছোট সরল আবিষ্কার আভাকে সারাক্ষণ ভাবায়। সব শেষে তো ছেলেটার জন্যও এক প্যাকেট থাকবে। ভাড়া দেওয়ার সময় কী সে আজ ঘড়ি দেখে টাকা দিবে? আভার বিচারে মানুষের এত ছোট হওয়া সাজে না। কত লক্ষকোটি বছর পর হিলিয়াম নামক জ্বালানির অভাবে পৃথিবীর সূর্যটা একদিন হঠাৎ নিভে যাবে, সেই হিসাব যে মানুষ কড়ায়-গন্ডায় দিতে পারে সে কেন মানুষের মুখ দেখে হৃদয়টা বুঝতে পারে না?

তিনদিন পর মনটা একটু স্থির হলে আভা রাতে ডেক্সটপের সামনে বসে। হোমে ঢুকতেই চ্যাট বক্সে দেখে কনক আছে। নিজের অজান্তেই সে মেসেঞ্জারে গিয়ে লিখতে থাকে, ভালো তো?

একটু পরেই উত্তর আসে, আছি...

আভা : এই আছির ক্লান্তিতে আমরা এখন নিশ্চুপ ভালো মানুষ।

কনক : আমাদের মধ্যবিত্তরা এখন প্যারাসাইট। তাই ক্ষমতাবান উচ্চবিত্তরা নির্ভয়ে লম্পট, তস্কর।

আভা : টাকার গন্ধে শিক্ষা-দীক্ষা, ধ্যায়ান-জ্ঞান সব এই দেশ থেকে পালিয়ে গেছে। তাই আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে একটি বিকারগ্রস্ত, মূর্খ জাতি।

কনক : ভাঙচুরের মধ্যে দিয়েই সময় বদলায়।

আভা : এই প্রাণঘাতী পচন থেকে পুনর্জীবন! অকল্পনীয়।

কনক : অবশ্যই।

আভা : কিন্তু কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপির কোনো আলামত দেখছি না তো?

কনক : সময় সবচে বড় ওষুধ। সে-ই পচায়, সে-ই সারায়।

আভা : আশাবাদী বচন।

কনক :
‘যে না-করে ভোগ,
সে বুঝে না ত্যাগের সুখ।’
পৃথিবীর এই ভোগী মানুষেরা একদিন ঘুরে দাঁড়াবে।

আভা : হা...হা...। কবিকে অভিনন্দন।

কনক : এটা আমার কথা নয়। সম্রাট অশোকের।

আভা : এখন কী পড়ছেন?

কনক : একজন রাশান বিজ্ঞানীর লেখা বই, ‘পৃথিবীর ভূ-গর্ভস্থ গঠন বৈশিষ্ট্য’।

আভা : বুঝলাম পৃথিবী একদিন শান্তির নীড় হবে। কিন্তু পরিবেশ! মাটি-পানি-বাতাসে মিশে যাওয়া লক্ষ লক্ষ কোটি টন ক্যামিকেল, কার্বন?

কনক : বিলয় থেকে বিনির্মাণের দিকে চোখ রাখুন, উত্তর পাবেন।

আভা : সেই তো ভালোবাসার কথা আসে, ফুল-পাখি, পাহাড়-নদী, স্বপ্ন...।

কনক : স্বপ্ন দেখাবার কারিগর না থাকলে মানুষ সবচে বেশি ভুল স্বপ্ন দেখে। এখানেই সক্রেটিস, বেগম রোকেয়া, ন্যালসন ম্যান্ডেলা, বঙ্গবন্ধুর দরকার পড়ে।

আভা : এইসব বির্তনের কথা, অপেক্ষার কথা। ক্যান্সারের রোগীর কি অপেক্ষার সময় আছে?


আজ ধর্ম-দর্শন আর বিজ্ঞানের নির্যাস নিয়ে মানুষের দিকে তাকালে আপনিও পৃথিবীর শেষ ঘণ্টা শুনতে পাবেন।


কনক : হুজুগ আর হুড়াহুড়ির ফল ভালো হয় না। ঐতিহাসিক উপমা দেশভাগ, পাকিস্তান নামক বিষফোড়ার জন্ম। আপনার বিজ্ঞান থেকেও বলা যায়, আমাদের দেহের গ্রন্থিগুলোর মাঝে থাইরয়েডের কিছু কিছু ভূমিকা ঠিক চিকিৎসকের মতো। অন্য গ্রন্থিগুলোর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সে প্রয়োজন মাফিক হরমোন পাঠিয়ে সুস্থ করে তুলে। প্রকৃতিও তাই। সুন্দর, স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য এই পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ছয়শ কোটি মানুষের সংকুলান আছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা খুব দ্রুত আটশ কোটির দিকে। রোগজর্জর গ্রহটার নাভিশ্বাস চলছে। মদোন্মত্ত হস্তির মতো সাধের এই দুনিয়া একদিন লাফিয়ে ওঠে তার ক্ষতবিক্ষত শরীর থেকে ঝেরে ফেলবে অপ্রয়োজনীয় সব ঝঞ্জাল। কারণ পৃথিবী নামক গ্রহটির ইতিহাস বিনির্মাণের ইতিহাস। বিলিয়ন বিলিয়ন কোটি বছরের মাঝে সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য গণবিলুপ্তি ঘটিয়ে পাঁচবার আপডেট হয়েছে। গণবিলুপ্তি বুঝেন তো?

আভা : জি। বিরূপ পরিবেশের কারণে পৃথিবী যখন হুমকির মুখে পড়ে তখন সে গণবিলুপ্তি ঘটায়। একেকটা গণবিলুপ্তিতে পৃথিবীর শতকরা নব্বই ভাগ জীবের বিলুপ্তি ঘটেছে। তারপর লক্ষ লক্ষ বছরে আবার পৃথিবী হয়ে উঠেছে উদ্ভিদ ও প্রাণীতে ভরপুর। সবশেষ গণবিলুপ্তিতে লক্ষ লক্ষ প্রজাতীর উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাথে বিলুপ্ত হয় অতিকায় ডাইনোসরও।

কনক : ধন্যবাদ। তো এইভাবে হাজার হাজার কোটি বছরের ঝাড়া-বাছার পর আসে মানুষ। চরালগীর চরের মানুষ মাঝে মাঝে রাগ করে তাদের ফিটিংবাজ ছেলে-মেয়েদেরকে বলে, বাঁচে না পুতের আফইট (বাহাদুরি) বেশি।’

আজ ধর্ম-দর্শন আর বিজ্ঞানের নির্যাস নিয়ে মানুষের দিকে তাকালে আপনিও পৃথিবীর শেষ ঘণ্টা শুনতে পাবেন।

আভা : গুরুকে সালাম।

কনক : হা...হা...হা। শুভরাত্রি।


পর্ব-১৯

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা